ঢাকা, শুক্রবার, ২ অগ্রহায়ণ ১৪২৫, ১৬ নভেম্বর ২০১৮
Risingbd
সর্বশেষ:

অঘটনের বিশ্বকাপে অনেক চমক

কমলেশ রায় : রাইজিংবিডি ডট কম
 
     
প্রকাশ: ২০১৮-০৭-০৮ ৪:৫১:৪১ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৮-০৭-২৯ ১:৫৯:০৭ পিএম

|| কমলেশ রায় ||

অঘটন ঘটার ছিল। ঘটেছে। আলাদা কিছু হওয়ার ছিল। হয়েছে। পুতিনের দেশে বিশ্বকাপ চলছে। অঘটন না ঘটে পারে? অনেকের মতে, অন্যরকম কিছু না হলেই বরং বেমানান হতো। একের পর এক অঘটন, টানটান নাটকীয়তা। একদিকে কান্না, অন্যদিকে উল্লাস। রাশিয়া বিশ্বকাপ নানা দিক দিয়ে উদাহরণ হয়ে থাকবে। ব্যতিক্রম ইতিহাসের কারণে আলোচনায় উঠে আসবে বারবার।

একে একে বিদায় নিয়েছে ‘ফেভারিট’ দলগুলো। জার্মানি নেই, আর্জেন্টিনা নেই, স্পেন নেই, ব্রাজিলও নেই। রঙিন বিশ্বকাপের রঙ হারানোর দশা। এশিয়ার প্রতিনিধিরা বিদায় নিয়েছে আগেই। সেমি ফাইনালে লাতিন আমেরিকার কোনো দলও নেই। বিশ্বকাপে এখন একচেটিয়া ইউরোপ। অনেকদিন বাদে ‘অল-ইউরোপিয়ান সেমিফাইনাল’ দেখতে যাচ্ছে বিশ্ব। বলাবাহুল্য, ইউরোপের কোনো দেশই জিতে নেবে সোনালী ট্রফিটা। এবারের বিশ্বকাপে অঘটনের শুরুটা হয়েছিল গত আসরের চ্যাম্পিয়নদের দিয়ে। প্রথম পর্বেই জার্মানির বিদায়! ভাবা যায়। গ্যারি লিনেকারের বিখ্যাত একটা উক্তি লোকের মুখে মুখে ফেরে। আর সেটা হলো : ‘ফুটবলে ২২ জন খেলোয়াড় একটা বলের পেছনে ৯০ মিনিট ছোটে আর খেলাটা শেষ পর্যন্ত জার্মানি জিতে যায়।’ কিন্তু এবার তিনি তার প্রবাদসম উক্তিটি নিজেই বদলে দিয়েছেন। কেন? একটু পেছনে ফেরা যাক। রাশিয়া বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম ম্যাচেই মেক্সিকোর বিপক্ষে হেরে যায় জার্মানি। পরের ম্যাচে সুইডেনের বিপক্ষে তারা দারুণ নাটকীয় এক জয় পায়। এই জয়ের পর লিনেকার নিজের মন্তব্যটি একটু পরিমার্জন করে টুইট করেন। টুইটে তিনি লেখেন: ‘দশজন নিয়ে খেললেও ৯০ মিনিটের ম্যাচ শেষ পর্যন্ত জেতে জার্মানিই।’ তৃতীয় ম্যাচে ঘটে অভাবনীয় ঘটনা। দক্ষিণ কোরিয়ার কাছে দুই গোলে হেরে বসে জার্মানি। ফলাফল বিদায়। আর এই বিদায়ের পর লিনেকার বলেন, ‘২২ জন খেলোয়াড় একটি বলের পেছনে ৯০ মিনিট ছুটলেও দিন শেষে সব সময় জার্মানি জেতে না। আগে যা বলেছিলাম তা এখন কেবলই ইতিহাস !’ ঠিকই তো, অতি চেনা জার্মানিকে এই আসরে একদম অচেনাই মনে হলো সবার কাছে।

শেষ ষোল থেকে বিদায় নিতে হয়েছে মেসির দল আর্জেন্টিনাকে। নক আউট পর্বের ম্যাচটিতে ৪-৩ গোলে জয় তুলে নেয় ফ্রান্স। কোয়ার্টার ফাইনালে আর পা রাখা হয়নি আর্জেন্টিনার। তার আগেই স্বপ্নভঙ্গের বেদনা নিয়ে মেসিদের ফিরতে হয়েছে দেশে। প্রথম পর্বেই অনেক ‘যদি-কিন্তু’ পার হতে হয়েছিল আর্জেন্টিনাকে। প্রথম ম্যাচে আইসল্যান্ডের সঙ্গে ড্র। মেসির পেনাল্টি মিস। দ্বিতীয় ম্যাচে ক্রোয়েশিয়ার কাছে হার। তৃতীয় ম্যাচে তাই নাইজেরিয়ার বিপক্ষে জয়ের কোনো বিকল্প ছিল না। তাতেও দ্বিতীয় পর্বে ওঠার ছাড়পত্র মিলত না, আইসল্যান্ড ক্রোয়েশিয়ার কাছে হেরে যাওয়ায় সেটা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু ফ্রান্সের ক্ষিপ্র গতি আর এমবাপ্পের জোড়া গোলের কাছে শেষ পর্যন্ত হার মানতে হয়েছে আর্জেন্টিনাকে। স্পেনকেও বিদায় নিতে হয়েছে দ্বিতীয় পর্ব থেকে। রাশিয়ার বিপক্ষের এই ম্যাচে নির্ধারিত সময়ে ছিল ১-১ গোলের সমতা। অতিরিক্ত সময় শেষে খেলা গড়ায় টাইব্রেকারে। স্নায়ুক্ষয়ী এ ম্যাচে স্বাগতিক রাশিয়ার কাছে ৪-৩ গোলে হেরে যায় স্পেন। রাশিয়া উঠে যায় কোয়ার্টার ফাইনালে। মেসি-রোনালদোর পর বিশ্বকাপ বিদায় জানায় ইনিয়েস্তাকে।

পাঁচবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলের বিশ্বকাপ মিশন শেষ হয়েছে কোয়ার্টার ফাইনালেই। বেলজিয়ামের গতিময় ফুটবলের কাছে ২-১ গোলে হেরে গেছে নেইমাররা। তাদের ‘হেক্সা’ ট্রফি জয়ের স্বপ্ন অধরাই রয়ে গেল। অথচ ম্যাচের শুরুতেই এগিয়ে যেতে পারত ব্রাজিল। সপ্তম মিনিটে নেইমারের নেওয়া কর্নারে থিয়াগো সিলভা পা ছোঁয়ালেও বল বারে লেগে ফিরে আসে। আসলে ভাগ্য সেদিন ব্রাজিলের পক্ষে ছিল না। ম্যাচের ১৩ মিনিটে শাদিলের নেওয়া কর্নারে বল ফার্নান্দিনহোর কনুইয়ে লেগে জালে ঢুকে যায়। আত্মঘাতী এই গোলে পিছিয়ে পড়ে ব্রাজিল। আক্রমণ বাড়ায় তারা। কিন্তু তাতে ফল আসেনি। বরং ৩১ মিনিটে আরেকটি গোল খেয়ে বসে। লুকাকু দারুণ গতিতে বল এগিয়ে নিয়ে বাড়িয়ে দেন ডানে। ২০ গজ বাইরে থেকে দারুণ শটে দুর্দান্ত এক গোল করেন বেলজিয়ামের ডি ব্রুইনো। দ্বিতীয়ার্ধে দীর্ঘ সময় ধরে লাগাতার আক্রমণের ফল মেলে। ৭৬ মিনিটে বদলি নামা রেনাতো অগুস্তো চমৎকার হেডে একটি গোল পরিশোধ করে। এরপর শুধু আক্রমণ পাল্টা আক্রমণই হয়েছে। খেলা জমে উঠেছে। অনেকগুলো সুযোগ তৈরি হয়েছে। কিন্তু নেইমারদের লক্ষ্য অর্জন হয়নি। ব্রাজিলের কোচ তিতে অবশ্য এই পরাজয়কে দুর্ভাগ্য মানতে নারাজ। নেইমারদের পাশাপাশি বেলজিয়ামকে প্রশংসায় ভাসিয়েছেন তিনি। তিতে বলেছেন, ‘আমি ভাগ্যে বিশ্বাসী নই। এটি হলো শিক্ষিত লোকদের অন্যের যোগ্যতাকে খাটো করে দেখানোর মতলব।’

এবারের আসরে সবচেয়ে বড় চমকের নাম বেলজিয়াম। ব্রাজিলকে হারিয়ে সেমি ফাইনালে উঠে তারা চমকের ষোল কলা পূর্ণ করেছে। বেলজিয়ামের কোচ রবার্তো মার্তিনেজ যেন হাওয়ায় উড়ছেন। তার কথায়ই সেটা স্পষ্ট, ‘আজ আমি পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ। ব্রাজিলকে হারানো তো স্বপ্ন সত্যি হওয়া। এই বিশ্বকাপে আর যদি কিছু নাও করতে পারি, তাতেও কোনো দুঃখ থাকবে না।’

চমকের কী শেষ আছে। ইংল্যান্ডের কথাই ধরা যাক। ২৮ বছর পর আবার শেষ চারে উঠল দলটি। সর্বশেষ তারা সেমি ফাইনাল খেলেছিল ১৯৯০ সালে। ইংল্যান্ড অধিনায়ক হ্যারি কেনও এগিয়ে আছেন আসরের সেরা খেলোয়াড় হওয়ার দৌড়ে। অন্যদিকে ক্রোয়েশিয়াও দাপটের সঙ্গে খেলে উঠেছে সেমি ফাইনালে। ১০ জুলাই প্রথম সেমিফাইনালে এখন পর্যন্ত অপরাজিত থাকা বেলজিয়াম মুখোমুখি হবে ফ্রান্সের। পরদিন দ্বিতীয় সেমি ফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে খেলবে ক্রোয়েশিয়া।

এবারের বিশ্বকাপে আলাদা করে নজর কেড়েছে জাপান। দুই গোলে এগিয়ে থেকেও বেলজিয়ামের কাছে তারা শেষ মিনিটে হেরে গেছে কেবল অভিজ্ঞতার ঘাটতিতে। এশিয়ার দল হিসেবে তারা ফুটবল বিশ্বের যথেষ্ট সমীহ আদায় করে নিয়েছে। খেলার পাশাপাশি পরিছন্নতা বিষয়ক সচেতনার জন্য তাদের খেলোয়াড় ও সমর্থকরা সবার মন জয় করে নিয়েছে। এদিকে জার্মানিকে হারিয়ে সবাইকে চমকে দিয়েছে দক্ষিণ কোরিয়া।

শুধু আয়োজক হিসেবে নয়, দল হিসেবেও এই বিশ্বকাপের অন্যতম চমকের নাম রাশিয়া। তারা শুরু থেকেই যেভাবে খেলেছে তার তুলনা মেলা ভার। ‘বিনা যুদ্ধে নাহি দিব সূচাগ্র মেদেনী’- এমন পণ করেই প্রতিটি ম্যাচে মাঠে নেমেছে তারা। কোয়ার্টার ফাইনালে ক্রোয়েশিয়ার কাছে টাইব্রেকারে গিয়ে তারা হেরেছে, তাতে বিন্দুমাত্র লজ্জা নেই। পরাজয়ের গ্লানি তো পরের কথা। রাশিয়াকে ফুটবলপ্রেমীরা অবশ্যই ধন্যবাদ জানাবে সুন্দর খেলার জন্য। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়ে যাওয়ার মানসিকতার জন্য। আয়োজক হিসেবেও তারা স্বার্থক। এই কারণেও রাশিয়া বিশ্ববাসীর অভিনন্দন পাবে। ‘কাজান এরেনা’ ফেভারিটদের কাছে যেন এক অভিশপ্ত নাম। জায়ান্ট ফুটবল দলগুলোর বিদায় হয়েছে রাশিয়ার অন্যতম এই ভেন্যুটিতে। প্রথমে জার্মানি, পরে আর্জেন্টিনা এবং সবশেষে ব্রাজিল। কাজানের দেয়ালে দেয়ালে শোভা পাচ্ছে মেসি, নেইমার, মুলারদের প্রতিকৃতি। এদের পাশাপাশি ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর ছবিও আছে। কাজানে পর্তুগালের কোনো খেলা ছিল না। শুধু সেখানের দেয়ালে প্রতিকৃতি থাকার কারণেই দ্বিতীয় রাউন্ডে রোনালদোকে বিদায় নিতে হলো কিনা কে জানে? ভাগ্য ভালো, অভিশপ্ত কাজানে এবারের বিশ্বকাপের আর কোনো ম্যাচ নেই। নইলে আবার কোন ‘জায়ান্ট’ ধরা খেতো কে জানে?

আর্জেন্টিনার বিদায়ের পর বাংলাদেশে বিশ্বকাপের রঙ ফিকে হতে শুরু করে। ব্রাজিলের বিদায়ে রঙ আরও হারিয়েছে। বাংলাদেশের বেশিরভাগ ফুটবল ভক্তের  কাছে আকর্ষণ হারিয়ে ফেলেছে বিশ্বকাপ। আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের কট্টর সমর্থকরা অবশ্য নতুন দুই দলের প্রতি তাদের সমর্থন অব্যাহত রেখেছে। ব্রাজিলের সঙ্গে বেলজিয়ামের খেলার দিন আর্জেন্টিনার সমর্থকরা ‘বেলজিয়াম-বেলজিয়াম’ করে গলা ফাটিয়েছেন। পেছনে অবশ্য কারণও আছে। আর্জেন্টিনা বিদায় নেওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাদেরকে তো কম ট্রলের শিকার হতে হয়নি। ব্রাজিলের বিদায়ের পর তারাও একহাত নিয়েছে। জবাবে দিয়েছে ফিরতি ট্রল। বেলজিয়ামের পক্ষে মিছিলও করেছে। এদিকে, প্রতিপক্ষের সমর্থকরাও তো ছেড়ে দেওয়ার পাত্র নয়। আর্জেন্টিনাকে হরিয়েছে ফ্রান্স। ব্রাজিলের সমর্থকরা এখন ফ্রান্সের সমর্থক। সেমি ফাইনালে ফ্রান্স-বেলজিয়াম ম্যাচের উত্তাপ তাই এদেশে এখন থেকেই ঊর্ধ্বমুখী। পারদ কেবলই চড়ছে। সমর্থক দুই পক্ষের মধ্যেই ‘কেউ কারে নাহি ছাড়ে সমানে সমান’ মনোভাব। রসিক জনেরা অবশ্য বিষয়টিকে দেখে মুখ টিপে হাসছেন। আর মনে মনে বলছেন, ‘একেই বলে দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানো’। সাবাশ সমর্থকগোষ্ঠী। পরাজয়ে ডরে না বীর।

বিশ্বকাপের আর মাত্র চারটি খেলা বাকি। দুটি সেমি ফাইনাল। তারপর ১৪ জুলাই তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচ। ১৫ জুলাই ফাইনাল। ওইদিন বিশ্ব ফুটবল পাবে নতুন চ্যাম্পিয়ন। ভাঙবে মিলনমেলা। চার বছর পর কাতারে হবে আরেকটি বিশ্বকাপ। অনেক মহাতারকাকেই সেই আসরে দেখা যাবে না। এবারের বিশ্বকাপ তো মেসি-রোনালদো-নেইমারদের কাছে মায়া হয়েই রইল। এটাই ফুটবলের আসল সৌন্দর্য। বাড়তি চমক। সেটা কখন কার কাছে কীভাবে ধরা দেবে, আগেভাগে কেউ বলতে পারে না। ব্রাজিলের কুতিনহোর কথা দিয়ে লেখা শেষ করা যাক। তিনি বলেছেন, ‘জানি, সব দিক থেকে সমালোচনা হবে আমাদের। কিন্তু জীবন থেমে থাকে না। এটাই ফুটবল।’

লেখক: সাংবাদিক ও সাহিত্যসেবক




রাইজিংবিডি/ঢাকা/৮ জুলাই ২০১৮/তারা

Walton Laptop
 
     
Marcel
Walton AC