ঢাকা, সোমবার, ৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৫, ১৯ নভেম্বর ২০১৮
Risingbd
সর্বশেষ:

অকাল মৃত্যুতে কুপোকাত ঢাকাই চলচ্চিত্র

রাহাত সাইফুল : রাইজিংবিডি ডট কম
 
     
প্রকাশ: ২০১৮-০৯-০৬ ৮:১৩:৫৮ এএম     ||     আপডেট: ২০১৮-০৯-০৯ ১১:৫৪:০৬ এএম

রাহাত সাইফুল : জহির রায়হান, জসিম, জাফর ইকবাল, মান্না, সালমান শাহ, পরিচালক তারেক মাসুদ। এই নামগুলো ঢাকাই চলচ্চিত্রে বিশেষভাবে জড়িয়ে আছে। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের দীর্ঘ ইতিহাস ও গৌরবের সঙ্গে জড়িয়ে আছেন তারা। চলচ্চিত্র শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে তাদের অবদান অতুলনীয়। তবে চলচ্চিত্রের হাল খুব বেশি দিন ধরে রাখতে পারেননি এই ক্ষণজন্মা শিল্পীরা। ক্যারিয়ারের তুঙ্গে থাকা অবস্থায় অকালে প্রাণ হারিয়েছেন তারা। তাদের অকাল মৃত্যুই যেন ঢাকাই চলচ্চিত্রকে কুপোকাত করেছে।

দেশ বিভাগের পরে পশ্চিম পাকিস্তানের চলচ্চিত্র প্রযোজক এফ দোসানির পূর্ব পাকিস্তানে চলচ্চিত্র প্রযোজনার ব্যাপারে নেতিবাচক মন্তব্যে ক্ষুদ্ধ হয়ে ১৯৫৬ সালে জব্বার খান ‘মুখ ও মুখোশ’ চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। এর পরে ফতেহ আলী লোহানী ‘আসিয়া’ ও ‘আকাশ আর মাটি’ মহিউদ্দিন ‘মাটির পাহাড়’, এ জে কারদার ‘জাগো হুয়া সাভেরা’ শিরোনামের ৪টি সিনেমার কাজ শুরু করেন। তাদের নির্মিত সিনেমা মোহিত করেছে দর্শকদের। ঢাকাই সিনেমার সাফল্য দেশের গণ্ডি পেরিয়ে দেশের বাইরেও সুনাম অর্জন করে। ১৯৫৭ সালে চলচ্চিত্র জগতে পদার্পণ ঘটে জহির রায়হানের। ‘জাগো হুয়া সাভেরা’ সিনেমায় সহকারী হিসেবে কাজ করার মাধ্যমে। ১৯৬১ সালে তিনি রূপালী জগতে পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন ‘কখনো আসেনি’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে। ১৯৬৪ সালে তিনি পাকিস্তানের উর্দু ভাষায় প্রথম রঙিন চলচ্চিত্র ‘সঙ্গম’ নির্মাণ করেন। একই বছর তিনি ‘কাঁচের দেয়াল’ নির্মাণ করেন। তার নির্মিত অন্যান্য চলচ্চিত্রগুলো হলো ‘বেহুলা’, ‘সঙ্গম’, ‘আনোয়ারা’। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি কলকাতা চলে যান এবং সেখানে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে প্রচারাভিযান ও তথ্যচিত্র নির্মাণ শুরু করেন। কলকাতায় তার নির্মিত চলচ্চিত্র ‘জীবন থেকে নেয়া’র বেশ কয়েকটি প্রদর্শনী হয়। চলচ্চিত্রটি দেখে সত্যজিৎ রায়, মৃণাল সেন, তপন সিনহা এবং ঋত্বিক ঘটক প্রমুখ ভূয়সী প্রশংসা করেন।

দেশ স্বাধীন হবার পর ১৯৭১ এর ১৭ ডিসেম্বর ঢাকা ফিরে আসেন এবং তার নিখোঁজ ভাই শহীদুল্লাহ কায়সারকে খুঁজতে শুরু করেন। জহির রায়হান ১৯৭২ সালের ৩০ জানুয়ারি ভাইয়ের সন্ধানে মীরপুরে যান এবং সেখান থেকে আর ফিরে আসেন নি। এভাবেই হারিয়ে গেছেন ঢাকাই চলচ্চিত্রের একজন দিকপাল জহির রায়হান। তার হাত ধরে সৃষ্টি হয়েছে অনেক খ্যাতিমান শিল্পী, নির্মাতা, চিত্রনাট্যকার। তিনি বেঁচে থাকলে ঢাকাই চলচ্চিত্র হয়তো আরো কিছু পেত।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে চলচ্চিত্রে নির্মাণে মনোযোগী হন নির্মাতা আলমগীর কবির। আলমগীর কবির ১৯৭৩ সালে নির্মাণ করেন মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র ‘ধীরে বহে মেঘনা’। এরপর ১৯৭৫ সালে ‘সূর্য কন্যা’, ১৯৭৭ সালে ‘সীমানা পেরিয়ে’, ১৯৭৯ সালে ‘রূপালী সৈকতে’, ১৯৮২ সালে ‘মোহনা’ ১৯৮৪ সালে ‘পরিণীতা’ ১৯৮৫ সালে তার সপ্তম ও সর্বশেষ পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘মহানায়ক’ নির্মাণ করেন তিনি। এছাড়াও নয়টি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন এই নির্মাতা। ‘সীমানা পেরিয়ে’খ্যাত নির্মাতা আলমগীর কবির ১৯৮৯ সালের ২০ জানুয়ারি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন। বগুড়া জেলায় চলচ্চিত্র বিষয়ক একটি অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে ঢাকা ফেরার পথে এ দুর্ঘটনা ঘটে।

সত্তর দশকে ঢাকাই চলচ্চিত্রে যুক্ত হন জনপ্রিয় অভিনেতা জাফর ইকবাল। তিনি একাধারে একজন মুক্তিযোদ্ধা, অভিনেতা ও সংগীতশিল্পী ছিলেন। বাংলা চলচ্চিত্রের স্টাইলিশ নায়কদের অন্যতম জাফর ইকবাল। শহুরে রোমান্টিক ও রাগী তরুণের ভূমিকায় দারুণ মানালেও সব ধরনের চরিত্রে ছিল তার স্বাচ্ছন্দ্য বিচরণ। অভিনয়ের পাশাপাশি চমৎকার গান গাইতে পারা এ অভিনেতা বেশকিছু সিনেমার গায়ক চরিত্রে অভিনয় করেছেন। ১৯৮৪ সালে আনোয়ার পারভেজের সুরে রাজ্জাক অভিনীত ‘বদনাম’ সিনেমায় ‘হয় যদি বদনাম হোক আরও’ তার জনপ্রিয় গানগুলোর মধ্যে অন্যতম।

‘আপন পর’ সিনেমায় কবরীর বিপরীতে অভিনয়ের মাধ্যমে চলচ্চিত্রে পা রাখেন তিনি। সব মিলিয়ে তিনি প্রায় ১৫০টি সিনেমায় অভিনয় করেন তিনি। যার বেশিরভাগই ছিল ব্যবসা সফল। ববিতার সঙ্গে তার জুটি ছিল দর্শক নন্দিত। এই জুটির বাস্তব জীবনে প্রেম চলছে বলেও সেসময় খবর রটেছিলো। তাদের সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ায় হতাশ হয়েই জাফর ইকবাল অসুস্থ হয়ে পড়েন বলে জোর গুঞ্জন উঠেছিল। স্টাইলিশ এই তারকার আলোও নিভে যায় অকালে। অনিয়ন্ত্রিত জীবন যাপনের ফলে তিনি ক্যানসারে আক্রান্ত হন। তার হার্ট এবং কিডনি নষ্ট হয়ে যায়। ১৯৯২ সালের ২৭ এপ্রিল তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

জাফর ইকবালের মৃত্যুর এক বছর পরে ঢাকাই চলচ্চিত্রে পা রাখেন নায়ক সালমান শাহ। ১৯৯৩ সালে তার অভিনীত প্রথম চলচ্চিত্র সোহানুর রহমান সোহান পরিচালিত ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ মুক্তি পায়। জনপ্রিয় এই নায়ক নব্বইয়ের দশকের বাংলাদেশে সাড়া জাগানো অনেক চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। ‘সুজন সখি’, ‘বিক্ষোভ’, ‘স্বপ্নের ঠিকানা’, ‘বিচার হবে’, ‘স্বপ্নের পৃথিবী’, ‘জীবন সংসার’, ‘চাওয়া থেকে পাওয়া’, ‘স্বপ্নের নায়ক’, ‘আনন্দ অশ্রু’সহ ২৭টি চলচ্চিত্র অভিনয় করেন এবং সব ক’টিই ছিল ব্যবসা সফল।

ঢাকাই চলচ্চিত্রে আকাশচুম্বি জনপ্রিয়তা ছিল সালমান শাহের। ক্যারিয়ারের তুঙ্গে থাকা অবস্থায় ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর তিনি রহস্যজনকভাবে মৃত্যুবরণ করেন। লাশ উদ্ধারের পর ধারণা করা হয় তিনি আত্মহত্যা করেছেন। কিন্তু পরিবারের দাবি, তাকে খুন করা হয়েছে। তার মৃত্যু নিয়ে এই রহস্যের জট দুই দশক পেরিয়ে গেলেও আজ পর্যন্ত খোলেনি। ১৯৯০-এর দশকের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নায়ক তিনি।

সালমান শাহর মৃত্যু শোক ভুলতে না ভুলতেই দুই বছরের মাথায় অকালেই ঝড়ে যান অ্যাকশন মাস্টার নায়ক জসিম। ১৯৯৮ সালের ৮ অক্টোবর মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণজনিত কারণে অকাল মৃত্যু হয় তার। বাংলা চলচ্চিত্রের অ্যাকশনের পথপ্রদর্শক হিসেবে পরিচিত তিনি। ১৯৭২ সালে ‘দেবর’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে চলচ্চিত্রের কাজ শুরু করেন। এরপর দেওয়ান নজরুল পরিচালিত ‘দোস্ত দুশমন’ চলচ্চিত্রে খলনায়কের অভিনয় করে। তার খলনায়ক অভিনয়ের সমাপ্তি ঘটে ‘সবুজ সাথী’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে। এই চলচ্চিত্রে তিনি নায়ক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন এবং মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত নায়ক হিসেবেই অভিনয় চালিয়ে যান।

আশির দশকের সকল জনপ্রিয় নায়িকার বিপরীতে অভিনয় করেছেন এই অ্যাকশন অভিনেতা। তবে শাবানা ও রোজিনার সাথে তার জুটিই সবচেয়ে দর্শকপ্রিয়তা অর্জন করেছিল। বিভিন্ন চলচ্চিত্রে তাকে শোষণ-বঞ্চিত মানুষের প্রতিনিধি হিসেবে দেখা যায়। ‘রংবাজ’, ‘এক মুঠো ভাত’, ‘কসাই’, ‘কাজের বেটি রহিমা’, ‘গরীবের ওস্তাদ’, ‘স্বামী কেন আসামী’, ‘মেয়েরাও মানুষ’, ‘গরিবের মাস্তান’সহ অসংখ্য জনপ্রিয় সিনেমায় তিনি অভিনয় করে ঢাকাই চলচ্চিত্রে অবদান রেখেছেন।

এরপরই অশ্লীলতার ভূত এসে ভর করে এদেশের চলচ্চিত্রে। এরপর থেকে ঢাকাই চলচ্চিত্রের শক্ত অবস্থান নড়বড়ে হয়ে যায়। ধীরে ধীরে হলবিমুখ হয় দর্শক। অশ্লীলতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন এস এম আসলাম তালুকদার মান্না। তিনি নায়ক মান্না নামেই অধিক পরিচিত। ১৯৮৪ সালে তিনি নতুন মুখের সন্ধানের মাধ্যমে চলচ্চিত্রে আসেন। এরপর থেকে একের পর এক চলচ্চিত্রে অভিনয় করে নিজেকে সেরা নায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন এবং চলচ্চিত্র অঙ্গনে তার শক্ত ভিত্তি গড়ে তোলেন।

অভিনয়ের পাশাপাশি চলচ্চিত্র প্রযোজনাও করেছেন তিনি। ‘দাঙ্গা’, ‘লুটতরাজ’, ‘তেজী’, ‘আম্মাজান’, ‘আব্বাজান’, ‘লাল বাদশা,’ ‘স্বামী স্ত্রীর যুদ্ধ’, ‘দুই বধূ এক স্বামী’, ‘মনের সাথে যুদ্ধ’, ‘পিতা মাতার আমানত’সহ তিন শতাধিক সিনেমায় অভিনয় করে জনপ্রিয়তার চূড়া ছুঁয়েছিলেন মান্না। ‘বীর সৈনিক’ সিনেমায় তিনি সেরা অভিনেতা বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন। মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ২০০৮ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মাত্র ৪৪ বছর বয়সে মান্না মৃত্যুবরণ করেন।

এদিকে তারেক মাসুদ বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রাক্কালে ষাটের দশকে পূর্ব পাকিস্তানের উদ্বেগের পটভূমিতে ছেলেবেলার মাদ্রাসা জীবনের অভিজ্ঞতা নিয়ে নির্মাণ করেন ‘মাটির ময়না’ সিনেমা। চলচ্চিত্রটি প্রথম চলচ্চিত্র হিসেবে ‘শ্রেষ্ঠ বিদেশী ভাষার চলচ্চিত্র’ বিভাগে একাডেমি পুরস্কার প্রতিদ্বন্দ্বীতার জন্য বাংলাদেশের মনোনয়ন লাভ করে। এটি বাংলাদেশের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র হিসেবে কান ফিল্ম ফেস্টিভালের জন্য নির্বাচিত হয় এবং ডিরেক্টরস ফোর্টনাইট বিভাগের সূচনা চলচ্চিত্র হিসেবে বিবেচিত হয়। ২০০২ সালের শেষের দিকে চলচ্চিত্রটি বাংলাদেশে প্রদর্শিত হবার অনুমতি লাভ করে। ‘মাটির ময়না’খ্যাত চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদ ২০১১ সালের ১৩ আগস্ট নির্মিতব্য চলচ্চিত্র ‘কাগজের ফুল’-এর শুটিং লোকেশন দেখে ঢাকায় ফেরার পথে মানিকগঞ্জের জোকা নামক স্থানে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন।

বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ডিজিটালের ছোঁয়ায় এগিয়ে যাচ্ছে ঠিকই কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলো রুপালি জগত থেকে প্রতিভাবান শিল্পীরা বিদায় নিচ্ছেন। তাদের হঠাৎ প্রস্থানে আজ ঢাকাই চলচ্চিত্র যেন খেই হারিয়ে ফেলেছে। সিনিয়র শিল্পীর অভাবে নির্মাতারা এখন নায়ক-নায়িকাকে কেন্দ্র করে সিনেমা নির্মাণ করছেন। একই ধরনের গল্পের সিনেমা দেখে দর্শক বিরক্ত। দর্শক হল বিমুখ হচ্ছেন। দর্শকবিহীন সিনেমা হলগুলো ধুঁকে ধুঁকে চলছে।  গুণীদের মধ্যে এখনো জীবিত রয়েছেন সোহেল রানা, ফারুক, ওয়াসিম, আলমগীর, ইলিয়াস কাঞ্চন, জাভেদ, ববিতা, শাবানাসহ অনেক গুণী অভিনেতা ও অভিনেত্রী। এসব শিল্পী-নির্মাতা চাইলে আবারো ঢাকাই সিনেমার হাল ধরতে পারেন। আবার পারেন ব্যবসাসফল সিনেমা উপহার দিতে। দর্শক ফিরবেন প্রেক্ষাগৃহে। চলচ্চিত্র ফিরে পাবে সোনালি যুগ।




রাইজিংবিডি/ঢাকা/৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮/রাহাত/তারা

Walton Laptop
 
     
Marcel
Walton AC