ঢাকা, সোমবার, ৭ কার্তিক ১৪২৫, ২২ অক্টোবর ২০১৮
Risingbd
সর্বশেষ:

ডিরেক্টরস গিল্ড: আমাদের সমস্যা ও সম্ভাবনা

মানিক মানবিক : রাইজিংবিডি ডট কম
 
     
প্রকাশ: ২০১৮-১০-০৪ ৫:৪১:০৩ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৮-১০-০৪ ৫:৫৩:১০ পিএম

||মানিক মানবিক||

ডিরেক্টরস গিল্ডের নির্বাচনের মাধ্যমে আমরা একটি নতুন কমিটি পেলাম। সাধারণ সম্পাদক ও দুই একজন সহ-সভাপতি ও কার্যনির্বাহী কমিটির মেম্বার ছাড়া এই কমিটির প্রায় সবাই নতুন। নবনির্বাচিত নতুন এই কমিটিকে অভিনন্দন জানাই।
আশাকরি, নতুন কমিটি তাদের উপর অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করবেন। টেলিভিশন ফিকশনের ডিরেক্টরদের যে সীমাহীন সংকট ও সীমাবদ্ধতা নিয়ে কাজ করতে হয় তা বলাবাহুল্য। একদিনে বা কয়েকদিনের মধ্যেই এই সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে; তা মনে করার‌ও কোনো কারণ নাই। কিন্তু সুদূরপ্রসারী ও কার্যকর কিছু পদক্ষেপ নিলে এই ইন্ড্রাস্ট্রির ভবিষ্যত; গঠনমূলক হ‌ওয়ার সমূহ সম্ভাবনা আছে বলে মনে করি‌।

প্রথমত, টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর সাথে আমরা কীভাবে বার্গেনিং করবো তার একটা বুদ্ধিদীপ্ত নীতিমালা দরকার। ডিরেক্টরস গিল্ড এককভাবে এই মুভমেন্টে না গিয়ে; অভিনয়শিল্পী সংঘ, প্রডিউসার গিল্ডসহ ঐক্যবদ্ধভাবে এগোতে হবে। কারণ আমাদের সবার স্বার্থ এক ও অভিন্ন। নিজেদের মধ্যে বিভেদ তৈরি করে খুব বেশি কিছু আদায় করা যাবে না।
একটি নাটকের নূন্যতম বাজেট, প্রচার পরবর্তী পেমেন্ট বিষয়ক জটিলতা, এজেন্সির দৌরাত্ম্যসহ সব ধরনের সংকট নিরসনের জন্য একতাবদ্ধ হ‌ওয়া ছাড়া উপায় নাই। FTPO'র মাধ্যমে এমন একটা মুভমেন্ট শুরু হয়েছিল; কিন্তু বেশিদূর এগোতে পারেনি, এটা আমরা জানি। অতীত অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে নতুনভাবে আবার শুরু করতে হবে বলে মনে করি।

দ্বিতীয়ত, আমাদের নির্মাতারা অনেক গুণী তাতে সন্দেহ নাই। কিন্তু এই গুণ আরো বিকশিত করার জন্য ডিরেক্টরস গিল্ড বছরে বেশ কিছু কর্মশালার আয়োজন করতে পারে। এই কর্মশালায় দেশ-বিদেশের গুণী নির্মাতাগণ টিভি ফিকশন ও চলচ্চিত্র বিষয়ক প্রশিক্ষণ প্রদান করবেন। এই কর্মশালায় গিল্ড ও গিল্ডের বাইরের সব পরিচালক অংশগ্রহণ করতে পারবেন। এমনকি একেবারে নতুন কোনো মুখ‌ও যদি এই কর্মশালায় অংশগ্রহণ করতে চায়, তাকেও সুযোগ দেয়া হবে। নির্দিষ্ট পরিমাণ ফি-এর মাধ্যমে পরিচালিত এই কর্মশালাটির শক্তিশালী সমন্বয়কারীর দায়িত্ব পালন করবে ডিরেক্টরস গিল্ড।

তৃতীয়ত, মাসে একটি ক্ল্যাসিক বা সমসাময়িক চলচ্চিত্রের প্রদর্শনীর আয়োজন করতে পারে ডিরেক্টরস গিল্ড। একজন চলচ্চিত্র বিশেষজ্ঞ বা পরিচালক এবং দর্শকবৃন্দ প্রদর্শনী শেষে চলচ্চিত্রটির বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করবেন। সেরা আলোচককে বিশেষ পুরস্কারে পুরস্কৃত করা হবে। পুরস্কারপ্রাপ্ত জিনিসটি হবে চলচ্চিত্র বিষয়ক।

 

চতুর্থত, গিল্ড চাইলে প্রতিবছর একটি টেলিভিশন নাট্য-উৎসবের আয়োজন করতে পারে।  ৩ থেকে ৫ দিনব্যাপী আয়োজিত এই উৎসব হবে সিনিয়র ও জুনিয়র নির্মাতাদের এক বিরাট মিলনমেলা ।  উৎসবে প্রদর্শনের জন্য নাটক আহ্বান করা হবে। বিগত বছরের সেরা কাজগুলো প্রদর্শিত হবে এখানে। ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা ও নাটকে অভিনীত তারকা অভিনয়শিল্পীর উপস্থিতির মাধ্যমে এই উৎসবে সাধারণ দর্শকের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। নূন্যতম দর্শনীর বিনিময়ে সাধারণ দর্শক এই নাটকগুলো উপভোগ করতে পারবেন এবং তারকা অভিনয়শিল্পীর সাথে ছবি তোলার সুযোগ পাবেন। একটি বিশেষজ্ঞ জুড়িবোর্ডের মাধ্যমে উৎসবের জন্য নির্বাচিত নাটকগুলো থেকে সেরা ৩টি নাটক পুরস্কৃত করা হবে।

পঞ্চমত, ডিরেক্টরস গিল্ডের একটি পত্রিকা থাকা আবশ্যক। সেটা মাসিক, ত্রৈমাসিক, বা ষান্মাসিক যেকোনো ফরম্যাটের হতে পারে। পত্রিকায় নাটক বিষয়ক বিভিন্ন সমস্যা-সম্ভাবনা ও নিউজের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় প্রবন্ধ-নিবন্ধ এবং সেরা ফিকশনের বা নতুন কোন চিত্রনাট্যকারের নির্বাচিত পাণ্ডুলিপি প্রকাশিত হবে। এক্ষেত্রে অবশ্য স্পন্সর পাওয়া নিয়ে একটা জটিলতার আশঙ্কা একদম উড়িয়ে দেয়া যায় না। তবে কাগজে নাটকের বিজ্ঞাপন ছেপে কিছুটা আর্থিক সংকট নিরসন করা যেতে পারে। এছাড়া  এই অঙ্গনে অথবা অঙ্গনের বাইরে যারা আমাদের শুভাকাঙ্ক্ষী আছেন; তারা তাদের নিজস্ব অনুদান অথবা বিজ্ঞাপন নিয়ে এগিয়ে এলে সমস্যার খানিকটা সমাধান হবে বলে মনে করি।

ষষ্ঠত, আমাদের দেশের মিডিয়াকেন্দ্রীক পেশাজীবী সংগঠনগুলোর মধ্যে একটা বিশেষ দূরত্বজনিত সংকট আছে। এক সংগঠন আরেক সংগঠনের সমালোচনা করা আমাদের মজ্জাগত। সুযোগ পেলে আমরা কেউ কাউকে ছাড় দেই না।

ডিরেক্টর বনাম আর্টিস্ট, আর্টিস্ট বনাম প্রযোজক, প্রযোজক বনাম রাইটার, টেলিভিশন বনাম চলচ্চিত্রের কলহ যেন চিরকালীন হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমার ব্যাক্তিগত অভিজ্ঞতায় জেনেছি, চলচ্চিত্রের লোকজনকে আমরা খুবই আন্ডার এস্টিমেট করি; অপরদিকে চলচ্চিত্রের লোকজন‌ও আমাদের ছোটপর্দার মানুষ বলে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে। এটা চলতে পারে না; নিজেদের মধ্যে ঠোকাঠুকি করে আমরা নিজেদের শক্তি ক্ষয় করছি। তাতে লাভবান হচ্ছে সুযোগ সন্ধানীরা। এই সংকটের সমাধান হওয়া দরকার। ফরম্যাট ভিন্ন হলেও আমরা সবাই এক‌ই পথের পথিক। চলচ্চিত্র ও টেলিভিশনের বিভিন্ন সংগঠনগুলো ঐক্য‍বদ্ধ থাকলে এই সংকটের কার্যকর সমাধান সম্ভব। এক্ষেত্রে ডিরেক্টরস গিল্ড কার্যকর ভূমিকা গ্ৰহণ করতে পারে।

সবচেয়ে ভালো হয়, সবগুলো সংগঠন একটি জোন বা ক্যাম্পাসের মধ্যে নিয়ে আসতে পারলে। ফলে আমাদের পারস্পরিক জানাশোনা ও আন্তঃযোগাযোগ বাড়বে। পরস্পর লেনদেন (বস্তুগত ও ভাবগত উভয়ক্ষেত্রে) মাধ্যমে আমরা আরও সংহত হবো। সেই ক্ষেত্রে এফডিসি হতে পারে সবচেয়ে উত্তম ক্যাম্পাস। কর্মবান্ধব এমন বিশাল এলাকা এখন কর্মহীন অবস্থায় পড়ে আছে। কর্মশালা, সেমিনার, শুটিং, এডিটিং, ডাবিং করার জন্য এরচেয়ে বড় এলাকা ঢাকায় দ্বিতীয়টি নেই। ডিরেক্টরস গিল্ড সরকারের সাথে আলোচনা করে সবগুলো সংগঠনকে একটি ক্যাম্পাসের আওতায় আনতে পারে। যদিও চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতি,  প্রযোজক সমিতি, সহকারী পরিচালক সমিতি, চিত্রগ্ৰাহক সমিতি অনেক আগে থেকেই এই সুবিধাটি পেয়ে আসছেন এবং সেটাই সঙ্গত। কিন্তু আজকের এই ডিজিটাল চলচ্চিত্রের যুগে সব মিডিয়াই মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। টেলিভিশন মিডিয়ার মানুষ চলচ্চিত্রে, চলচ্চিত্রের মানুষ টেলিভিশনে; একে অন্যের ফিল্ডে গিয়ে এন্তার কাজ করছে। তাহলে কলা-কুশলীরা কেন আলাদা থাকবেন? কেন এক‌ই অঙ্গনে এত বিভেদ? আমরা জানি একতাই বল। যেভাবে আমাদের চলচ্চিত্র এবং টেলিভিশন মিডিয়া আজ ধ্বংসের মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছে; সেখানে আমাদের দলাদলি ও বিভক্তি এই সেক্টরকে আরো দুর্বল করছে সন্দেহ নাই। এই বিভক্তির সুদূরপ্রসারী ফল কী হতে পারে চিন্তাশীল মানুষ মাত্রই আন্দাজ করতে পারছেন।

পরিশেষে, আমাদের সব সংগঠনের‌ই বনভোজন-প্রীতি প্রবল। এটা দোষের কিছু নয়। তবে এই অনুষ্ঠানটি আমরা প্রত্যেক সংগঠনই আলাদা আয়োজন করি। সেটা কেন একসাথে নয়! আমরা যদি সবাই বছরের একটা দিন  পিকনিক নামক এই মহামিলনের সুযোগটা নিতে পারি সেটা আমাদের আরো শক্তিশালী ও কার্যকরী করবে এতে কোন সন্দেহ নাই। আমার এই প্রস্তাবনা কারো সমালোচনা নয়; এটি একটি মতামত এবং আমার ব্যক্তিগত। এই মতামতের পক্ষে-বিপক্ষে নিশ্চয়ই অনেক সমালোচনা আছে। সেই সমালোচনাকে স্বাগত জানাই। মিডিয়া বান্ধব একটি সুন্দর সকালের প্রত্যাশা আমাদের সবার।

লেখক: টিভি নাটক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা



রাইজিংবিডি/ঢাকা/৪ অক্টোবর ২০১৮/তারা

Walton Laptop
 
     
Walton