ঢাকা, বুধবার, ৪ পৌষ ১৪২৫, ১৯ ডিসেম্বর ২০১৮
Risingbd
সর্বশেষ:

শিক্ষকের যোগ্যতা-অযোগ্যতা

অলোক আচার্য : রাইজিংবিডি ডট কম
 
     
প্রকাশ: ২০১৮-১০-০৫ ২:৪৫:১২ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৮-১১-১৪ ১:৫২:০৯ পিএম

অলোক আচার্য : টাঙ্গাইলের বিন্দুবাসিনী সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষককে টেনে হিঁচড়ে বাইরে বের করে আনছে সেই স্কুলের কোনো ছাত্রী বা অভিভাবক- এমন একটি ছবি অক্টোবরের ২ তারিখ দেশের বিভিন্ন জাতীয় প্রিন্ট ও অনলাইন মিডিয়ায় প্রকাশিত হয়। শিক্ষক সমাজের জন্য এই দৃশ্য অপমানজনক! তবে ইদানিং এমন দৃশ্য নতুন নয়। ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় সন্তানতুল্য ছাত্রীদের যৌন হয়রানির অভিযোগ রয়েছে। দীর্ঘদিন বিষয়টি ছাত্রীরা সহ্য করে এসেছে। হয়তো শিক্ষক বলেই ভয়ে বা লজ্জায় বিষয়টি সামনে আসেনি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত নোংরামিটা সামনে এসেছে। প্রতিনিয়ত দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এমন বা এরচেয়েও কুৎসিত ঘটনা ঘটছে। ঘটনাটি এমন সময়ে ঘটলো যখন তার দুই দিন পরেই শিক্ষক দিবস।

শিক্ষকতা কতটা মহান যে, তাদের কর্মকাণ্ড শ্রদ্ধায় স্মরণ করার জন্য আলাদা একটি দিন রয়েছে। কিন্তু কতিপয় নৈতিক অধঃপতনে যাওয়া শিক্ষকের জন্য পুরো শিক্ষক সমাজকেই কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হচ্ছে। শিক্ষকতা কোনো পেশা নয় বরং এটি একটি ব্রত। এটিই শিক্ষকতা সম্পর্কে সম্যক ধারণা। তবে বাস্তবে এটিকে পেশা হিসেবেই গ্রহণ করা হয়। তবে আর দশটা পেশা থেকে এর দায়িত্ব ও উদ্দেশ্য ভিন্ন। একজন শিক্ষক কেমন হবেন? এসব বিষয় নিয়ে প্রচুর গবেষণা হয়েছে। সেসব গবেষণা থেকে বেরিয়ে এসেছে একজন শিক্ষকের দায়িত্ব ও গুণাবলি। খুব সাধারণভাবে বোঝালে যিনি তোমাকে একদিনের জন্যও কোনো বিষয়ের শিক্ষা প্রদান করেছেন তিনিই শিক্ষক। শিক্ষক, শিক্ষা ও শিক্ষার্থী শব্দগুলো পারস্পরিক নির্ভরশীল ও একে অপরের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কযুক্ত। শিক্ষকবিহীন শিক্ষা যেমন কল্পনা করা যায় না, তেমনি শিক্ষার্থীবিহীন শিক্ষাও অর্থহীন। শিক্ষক তার কাছে আসা শিক্ষার্থীদের জীবনে বেঁচে থাকার, জীবন যুদ্ধে জয়ী হবার মন্ত্র শিখিয়ে দেন। তিনি শিক্ষার্থীদের মনের আবেগ নিয়ন্ত্রণের দীক্ষা দেন। তিনি চান যেন তার শিক্ষার্থী জীবনের সব প্রতিকূলতা পেরিয়ে বিজয়ী হোক।

অন্যদিকে একজন শিক্ষককে বলা হয় আজীবন ছাত্র। জ্ঞান অন্বেষণে তার তৃষ্ণা অপরিসীম। নিজে না শিখলে অন্যকে কী শেখাবেন? তাই তো তাকে পড়তে হয়, জানতে হয় এবং জানাতে হয়। এই জানানোর কাজটি হচ্ছে শিক্ষকতার জীবনের সবচেয়ে পরিশ্রমী এবং কঠিন কাজ। কারণ তার জানানোর কাজটি সফল হয়েছে কি না বুঝতে পারাও একটি বড় দক্ষতার ব্যাপার।  একজন শিক্ষক হচ্ছেন সেই ব্যক্তি ডিনি একাধারে পরামর্শক, সহায়ক এবং তিনি নিজেই শিক্ষা সহায়ক সামগ্রীর উন্নয়ন সাধন করবেন। তার আচরণ হবে রোল মডেল। তিনি সমাজের দর্পণ, কারিকুলাম প্রস্তুতকারক এবং  মূল্যায়ণকারী নির্দেশক ইত্যাদি গুণাবলিসম্পন্ন মানুষ। সত্যি কথা বলতে একদিক থেকে শিক্ষক অতিমানব, যাদের থাকে সহজেই আকৃষ্ট করার ক্ষমতা। আবার একদিক থেকে শিক্ষক খুব সাধারণ একজন মানুষ, যারা তৈরি করেন অসাধারণ সব মানুষ। শিক্ষা কোনো পেশা নয় বরং একটি সেবা। সমাজে অনেক সেবামূলক কাজ রয়েছে। এর মধ্য শিক্ষা অন্যতম। তিনি ছাত্রছাত্রীর মধ্যে ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটান। শিক্ষকের এই কাজটির সফলতা ও ব্যর্থতার মধ্যে রয়েছে দেশ ও জাতির ভবিষ্যত।

বাস্তবে বিভিন্ন কারণে আমাদের দেশের শিক্ষক সমাজ আজ প্রশ্নের সম্মুখীন। কারণ পাস করা সার্টিফিকেটের জোরে যে কেউ শিক্ষকতা পেশায় ঢুকে পরছে কিন্তু সেই ব্যক্তি শিক্ষক হিসেবে কেমন তা যাচাই করার উপায় নেই। একজন শিক্ষক অবশ্যই সৎ ও নৈতিক চরিত্রের অধিকারী হবেন। কিন্তু সার্টিফিকেট মেধার মূল্যায়ন করলেও মনুষ্যত্বের মূল্যায়ণের ক্ষমতা রাখে না। ফলে শিক্ষকতা পেশায় থেকেও অনেকে নানা অনৈতিক কার্যকলাপে জড়িয়ে পরছেন। এবং এজন্য শিক্ষক সমাজের দিকে আঙুল উঠছে। তাছাড়া শিক্ষাকে পুঁজি তৈরির উপাদান হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করেছেন অনেকে। দেশে হাজার হাজার কিন্ডারগার্টেন গড়ে উঠেছে। নামী-দামি বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে নানা কারণে অতিরিক্ত টাকা আদায় করা হয়। বড় হওয়ার বিভিন্ন পর্যায়ে অনেক শিক্ষকের সহচার্যে এসেছি। তবে তাদের সবাই কিন্তু মনে ঠাঁই করে নেননি। কেউ কেউ আজও মনে দাগ কেটে রেখেছেন। প্রাথমিক পর্যায় থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত কয়েকজন শিক্ষককেই আজও বারবার মনে পরে। সেসব শিক্ষকের আদর্শ নিয়ে এগিয়ে চলেছি। প্রকৃতপক্ষে পিতামাতার মতো শিক্ষকের স্থানও তার সন্তানসম ছাত্রছাত্রীদের মাঝে। তার আদর্শই ভবিষ্যতে শিক্ষার্থীর মধ্যে প্রতিফলিত হয়।

শিক্ষক নিয়ে ছোটবেলায় পড়া বাদশা আলমগীরের কবিতা মনে পড়ছে। এই কবিতা আমরা সবাই পড়েছি। আমার খুব ভালো লাগতো। শিক্ষকের মর্যাদা দেবার উৎকৃষ্ট উদাহরণ এই কবিতা। পড়েছি এবং শিক্ষকদের নিয়ে কল্পনায় অন্য রকম উচ্চতা চিন্তা করেছি। একজন বাদশা হয়ে যিনি শিক্ষকের প্রতি অত্যন্ত শ্রদ্ধাশীল এবং শিক্ষকের প্রতি সন্তানের একটু অবহেলাও তিনি মেনে নিতে পারেননি। শিক্ষকের চিন্তাতেও যখন ঐ অবহেলার বিষয়টি ছিল না তখন বাদশা তাকে বিষয়টি ধরিয়ে দেন। এই বিষয়টিও যে সন্তানের শিক্ষার মধ্যে আনা উচিত ছিল তা বোঝানোর জন্য তিনি শিক্ষককে ডেকেছিলেন। আর তাই বাদশা আলমগীরকে কবিতায় মহান বলে বর্ণনা করা হয়েছে। যিনি সত্যই বুঝেছিলেন শিক্ষকের মর্যাদা কেমন হওয়া উচিত। পড়িয়ে রেজাল্ট ভালো করাতে পারলেই কিন্তু শিক্ষকের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। বরং তার দায়িত্ব প্রতিটি শিক্ষার্থীর মধ্যে লুকিয়ে থাকা সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ ঘটানো। একজন শিক্ষকই যা আবিষ্কার করতে পারেন এবং তা ব্যবহারে পথ দেখাতে পারেন। তবে বর্তমানে গুটিকয়েক শিক্ষকের কর্মকাণ্ডে প্রায়ই এ পেশা সমালোচিত হয়। কিন্তু গুটিকয়েক উদাহরণ থেকে সার্বিক মূল্যায়ন করাটা বোকামী। শুধু পেশায় নিয়োজিত হলেই শিক্ষক হওয়া যায় না। শিক্ষক হতে হলে তার সম্পর্কিত গুণাবলি অর্জন করতে হবে। বাবা-মা যেমন সন্তানের বুকের ভেতর বেঁচে থাকেন, ঠিক তেমনি করে শিক্ষক বেঁচে থাকেন তার শিক্ষার্থীর মধ্যে। আমার অনেক শিক্ষক যেমন আজও বেঁচে আছেন আমার মধ্যে।

শিক্ষক হিসেবে একজন মানুষ কখন সফল বিষয়টি নির্ণয় করা তার চাকরির বয়সের উপর নির্ভর করে না। বরং সেই শিক্ষক কতজন শিক্ষার্থীর ভেতর নিজের আদর্শ প্রভাবিত করতে পারছেন, কতজনকে মানুষ হওয়ার সঠিক পথ দেখাতে পেরেছেন তার উপর নির্ভর করে। শিক্ষক বেঁচে থাকেন শিক্ষার্থীর মধ্যে। মানুষ হওয়ার সেই মন্ত্র একমাত্র শিক্ষকের ভেতরেই থাকে। একজন শিক্ষার্থীর শিক্ষক সম্পর্কে নেতিবাচক মন্তব্য করার সুযোগ পাওয়াই উচিত নয়। কারণ যে প্রকৃত শিক্ষক সে কোনদিন শিক্ষার্থীর জীবনে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে এমন কিছু করেন না। শিক্ষকতা পেশায় থাকলেই প্রকৃত শিক্ষক হওয়া যায় না। এটাও এক ধরনের প্রাণান্ত চেষ্টার ফল। দেশের মেধাবী সন্তানরা বের হয় শিক্ষকের হাত ধরে। শিক্ষকের মাধ্যমেই শিক্ষার রস সমাজে ছড়িয়ে পরে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য বর্তমান সময়ে শিক্ষকরা লক্ষ্য থেকে অনেকটাই বিচ্যুত হয়েছে। কেবল পেশা হিসেবে নেয়ার জন্য তাদের আজ এই দশা। শিক্ষকতাকে ব্রত হিসেবে নিলে এমনটি হতো না।  ভালো শিক্ষক হতে হলে সার্টিফিকেটের সাথে দরকার ভালো মানসিকতা। শিক্ষকতা পেশায় আসার আগে মন স্থির করতে হবে। কোনো এক দু’জন শিক্ষকরূপী অমানুষের জন্য শিক্ষক সমাজের অসম্মান মেনে নেয়া যায় না। আর দশটা চাকরির যোগ্যতা আর শিক্ষকতার যোগ্যতা তাই এক মাপকাঠিতে বিচার করলে চলবে না।



রাইজিংবিডি/ঢাকা/৫ অক্টোবর ২০১৮/তারা

Walton Laptop
 
     
Marcel
Walton AC