ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৫, ১৩ ডিসেম্বর ২০১৮
Risingbd
সর্বশেষ:

ভোট হোক, জোট হোক, উৎসব হোক রঙিন

জাফর সোহেল : রাইজিংবিডি ডট কম
 
     
প্রকাশ: ২০১৮-১২-০১ ৪:১৮:৫৭ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৮-১২-১০ ৪:১১:০৪ পিএম

জাফর সোহেল: এ প্রজন্মের তরুণদের অধিকাংশের কাছেই ভোটের উৎসব কী তা অজানা। এখনকার বাঙালি তরুণদের অধিকাংশই ভোট উৎসব দেখেনি। বিক্ষিপ্তভাবে স্থানীয় পরিষদের দু-একটি নির্বাচনে সম্প্রতি নৌকা-ধানের শীষের লড়াই হলেও এটাকে ঠিক নির্বাচনী উৎসব বলা যায় না। এদেশে এক সময় ছিল, যখন নির্বাচন মানেই হাটে-ঘাটে-মাঠে পোস্টার-ফেস্টুন আর মিছিল-মিটিংয়ে সরগরম থাকত।

গত দশ বছরে ইউপি নির্বাচন, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা, সিটি কর্পোরেশনসহ অনেক নির্বাচন হয়েছে। এসব নির্বাচনের অনেকগুলোই হয়েছে বিতর্কিত। অনেক নির্বাচনে অংশ নেয়নি দেশের প্রধান বিরাধী দল। ফলে নির্বাচন হয়েছে অনেকটা একমুখী। স্বভাবতই নির্বাচনী উৎসবে যোগ দিয়েছে একটি পক্ষ। অপর পক্ষ একে উৎসব মনে করেনি। তারা মুখ গোমরা করে ঘরে বসে থেকেছে। এর ফলে যা হয়েছে তা হলো- সামগ্রিকভাবে জাতীয় ক্ষতি। উৎসবমুখর জাতি সত্যিকারের একটি নির্বাচনী উৎসব থেকে বঞ্চিত হয়েছে।

এজন্য দায় কার? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে ধাঁধায় পড়তে হয়। একটা পক্ষ জোর গলায় বলে যাচ্ছে দায়টা পুরোপুরি ক্ষমতাসীনদের। কিন্তু একটি রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে জনগণের পালস্ বুঝে সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে সেই অভিযোগকারী কতটা পরিপক্কতার পরিচয় দিয়েছে, সে প্রশ্নও মানুষের মনে আছে। সুতরাং হিসেব অতটা সহজ নয়। তাই দায়-দায়িত্বের সেসব প্রশ্নের উত্তর না খুঁজে এখন বরং সময় হয়েছে, উৎসব কীভাবে ফিরে পেতে পারি এবং কীভাবে বাঙালিকে উৎসবে উদ্বেল করা যায় সে চিন্তা করার।

একটা উৎসব আমাদের খুব দরকার। একটা শান্তিপূর্ণ রঙিন উৎসব। নৌকা-ধানের শীষের প্রকম্পিত মিছিলে বাংলার আকাশ বাতাস মুখরিত হচ্ছে, গা ছমছম করছে এক অন্যরকম উত্তেজনায়, চায়ের কাপে ঝড় উঠছে বাংলার গাঁওগ্রামে, উঠোনে উঠোনে চলছে বৈঠকি, কোথাও কোথাও ভাঁপা পিঠা আর মোয়ার সঙ্গে রঙিন এককাপ চা...। এমন হলে কতই না সুন্দর হয়, ভালো হয়! কিন্তু ভালোটা যাদের হাতে, তারা কতটা তা চায়? গানের কথায় বলি: ‘আমি তো ভালা না ভালা লইয়া থাক’- শেষ পর্যন্ত আবারো যদি একপক্ষ বলে, ‘আমরা তোমাদের সঙ্গে নাই’; তখন প্রতিপক্ষ যদি বলে, ‘যাও, তোমাদের না এলেও চলবে’- তখন কী হবে? তারপরও আমরা আশাকরি, ৩০ ডিসেম্বর সকালে একটি উৎসব চূড়ান্ত রূপ পাবে। ১১তম বারের মতো অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া জাতীয় নির্বাচনে বাংলাদেশের জনগণ একটি নির্মোহ, নির্ভেজাল পরিবেশে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবে। এটা প্রত্যাশা। জনগণের প্রত্যাশা পূরণের দায়িত্ব যাদের কাঁধে তারা নিশ্চয়ই বিষয়টি দেখবেন। তাদের ওপর আমাদের সে আস্থা আছে।

বেশ কিছু সংলাপীয় অধ্যায় রাজনীতিতে আমরা দেখলাম গত নভেম্বরের শুরুতে। ভোটের জন্য একের পর এক জোটের গঠন-ভাঙন-পুনর্গঠন দেখলাম। দেখলাম গোলন্দাজবাহিনীর সাবেকদের দুই জোটে পাল্টাপাল্টি যোগদানের মহড়া। অধ্যাপক আবু সাঈদের মতো একেবারে চরমতম আওয়ামী লীগার যোগ দিয়েছেন বিএনপি জোটে। আবার শমসের মবিন চৌধুরীর মতো খাস বিএনপির লোকও যুক্ত হয়েছেন আওয়ামী জোটে। একইভাবে ধর্মের লেবাসধারীরাও সমান তালে ভোল পাল্টেছেন। এমন আশ্চর্য সমীকরণ বাঙালি তার রাজনৈতিক ইতিহাসে কবে দেখেছে কে জানে? আমার মনে আশঙ্কা জাগে, যুদ্ধাপরাধীর তকমা গায়ে লাগিয়ে তাড়া খাওয়া দলটিও শেষ পর্যন্ত স্বাধীনতার স্বপক্ষের শক্তির ছাতার নিচে ঠাঁই পায় কি না! রাজনীতিতে তো শেষ কথা বলে কিছু নেই!

ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকে বামপন্থী আর ডানপন্থীদের আদর্শের বিচ্যুতি দেখে হা-হুতাশ করছেন। আমার মনে হয়, এতে হা-হুতাশ করার কিছু নেই। কারণ, এদেশের বাম আর ডানের লোকদের লেবাসীয় গেরো যতটা শক্ত-পোক্ত, নৈতিকতার গেরো ততটাই খেলো। সুসময়ে দুধের মাছি হতে কখনো এরা না করে না। সেই স্বৈরাচার এরশাদ সরকারের আমল থেকেই এদের এমন চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের উদাহরণ আছে। গত কয়েক বছরের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত মাস এই নভেম্বর। এ মাসে ঐক্য অনৈক্যের যেসব নাটক দেখা গেল, সেখানে তো এসব চরিত্রের ছড়াছড়ি। সুতরাং চমকে ওঠার কিছু নেই। কিন্তু দুঃখ এই, এসব অনেক কিছুই খুব অল্প সময়ের মধ্যে দেখলাম। নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহের সংলাপ-পাল্টা সংলাপে এটা পরিষ্কার ছিল না- সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন কি না? কিন্তু নভেম্বরের শেষ সপ্তাহে এটা পরিষ্কার- খালেদা জিয়া ভোটে দাঁড়াতে পারবেন না। 

অংশগ্রহণমূলক আর উৎসবমুখর নির্বাচনের মধ্যে একটা ফারাক আছে। নির্বাচন এলেই বাঙালির দেহমনে একটা আনন্দের ডুগডুগি বাজতে শুরু করে। তরুণ সমাজে প্রাণচাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। পাড়ার শিশুরা বুঝে, না-বুঝে লাফাতে শুরু করে স্লোগানের তালে তালে। ভোট চাইতে গেলে উৎসুক গিন্নিরাও সব দলবেঁধে বেরিয়ে আসে আঙিনায়- নেতা দেখে, নেতার সাঙ্গপাঙ্গ দেখে! সবকিছু স্বাভাবিক নিয়মে চলতে দিলে পরিবেশ থাকে উৎসবমুখর। বাড়িতে বাড়িতে এমনকি ভোজের উৎসবও হয়। এসব হয় যখন নির্বাচনের মাঠে থাকা সবাই সমান সুযোগ পায়। যখন সবপক্ষের সঙ্গে দায়িত্বশীল ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান একই রকম আচরণ করে। কিন্তু এর ব্যত্যয় হলে উৎসব উধাও হতে বাধ্য। মানুষের মনের আনন্দ চুপসে যায়। তখন কতজন বা কয়টি দল নির্বাচনে অংশ নিল সেটি মুখ্য ব্যাপার থাকে না। অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হলেও তা জনগণের কাছে প্রত্যাশিত বা আকাঙ্খিত কিছু হয় না। 

স্বাধীন নির্বাচন কমিশনের কাছে আমাদের প্রত্যাশা থাকবে, তারা একটি উৎসবমুখর নির্বাচন জাতিকে উপহার দেবেন। কেবল নামমাত্র অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন যেন না হয়। সেজন্য যেসব করণীয় আছে তার সবগুলোই যেন তারা করার চেষ্টা করেন। দেশের মানুষ নির্বাচন কমিশনের পাশে আছে। কমিশন চাইলে একটি উৎসব ৩০ ডিসেম্বর অবশ্যই সম্ভব। এটা সরকারের জন্যও সুযোগ। কারণ ইতিহাসে লেখা থাকবে, দলীয় সরকারের অধীনে কী করে একটি সুষ্ঠু অবাধ ও উৎসবমুখর নির্বাচন বাংলাদেশে হয়েছিল আর সে নির্বাচন কারা উপহার দিয়েছিল।

লেখক: সাংবাদিক

 

 

 

 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/১ ডিসেম্বর ২০১৮/তারা    

Walton Laptop
 
     
Marcel
Walton AC