ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৫, ১৩ ডিসেম্বর ২০১৮
Risingbd
সর্বশেষ:

তারামন বিবির যুদ্ধ কি শেষ?

দীপংকর গৌতম : রাইজিংবিডি ডট কম
 
     
প্রকাশ: ২০১৮-১২-০১ ৬:০১:৫০ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৮-১২-০১ ৬:১২:৪৯ পিএম
তারামন বিবি, ছবি: সংগৃহীত

দীপংকর গৌতম : মুক্তিযুদ্ধ বাঙালির বহু আকাঙ্ক্ষার ধন। এ আকাঙ্ক্ষা অনেক পুরনো। নানাকার, টঙ্ক, তেভাগা, ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহসহ বিভিন্ন কৃষক সংগ্রাম স্বাধীনতা সংগ্রাম থেকে আলাদা ছিল না। বাঙালির গণসংগ্রামের এই ধারাবাহিকতায় ৫২, ৬২, ৬৯-এর পথ পেরিয়ে এক সাগর রক্তের বিনিময়ে অনেক আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে আসে মুক্তির সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। আমাদের মহান স্বাধীনতা। বিশেষত ২৫ মার্চ দিবাগত মধ্যরাতে ঘুমন্ত বাঙালির ওপর পাকিস্তান সেনাবাহিনী হায়েনার মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে। নিরাপরাধ নিরস্ত্র বাঙালির ওপর চালানো হয় নারকীয় তাণ্ডব। হত্যার মধ্য দিয়ে তারা প্রতিবাদমুখর স্বাধীনতাকামী বাঙালিকে চিরতরে স্তব্ধ করতে চেয়েছিল।

১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ শুরু হয় স্বাধীনতা যুদ্ধ। দেশ হানাদার মুক্ত করতে মরণপণ লড়াইয়ে অংশ নেয় সরকারী কর্মকর্তা-কর্মচারী, রাজনৈতিক কর্মী, ছাত্র, শ্রমিক, কৃষক, পেশাজীবী, শিল্পী সংগ্রামী নির্বিশেষে সকল শ্রেণীর মানুষ। পাকবাহিনীর আক্রমণ ও গণহত্যা মোকাবেলার জন্য গড়ে তোলা হয় প্রতিরোধ। সেই প্রতিরোধ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলো কৃষক, মজুর, মেহনতী মানুষ নির্বিশেষে। সবাই যেন হাতে অস্ত্র নিতে মরিয়া হয়ে উঠেছিলো। তাদের একজন তারামন বিবি। তিনি ১৯৫৭ সালে কুড়িগ্রাম জেলার চর রাজিবপুর উপজেলার শংকর মাধবপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।

তারামন বিবি মুক্তিযুদ্ধে ১১ নং সেক্টরে নিজ গ্রামে ছিলেন। তখন ১১ নং সেক্টরের নেতৃত্বে ছিলেন কমান্ডার আবু তাহের। মুহিব হাবিলদার নামে এক মুক্তিযোদ্ধা তারামন বিবিকে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়ার জন্য উৎসাহিত করেন। যিনি তারামনের গ্রামের পাশের একটি ক্যাম্পের দায়িত্বে ছিলেন। তিনি তারামনকে ক্যাম্পে রান্নাবান্নার জন্য নিয়ে আসেন। তখন তারামনের বয়স ছিলো মাত্র ১৩ কিংবা ১৪ বছর। কিন্তু পরবর্তী সময়ে তারামনের সাহস ও শক্তির পরিচয় পেয়ে মুহিব হাবিলদার তাকে অস্ত্র চালনা শেখান।

এই প্রশিক্ষণ তাকে অনন্য এক উচ্চতায় নিয়ে যায়। মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে সম্মুখ সমরে তিনি অংশ নেন এবং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ২০১১ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি ডয়চে ভেলের সাথে আলাপচারিতায় নিজের সৈনিক হয়ে ওঠার গল্প শোনান তারামন বিবি।  এছাড়াও দীর্ঘ নয় মাসের অসংখ্য ঘটনার মাঝ থেকে স্মৃতি হাতড়িয়ে জানান একদিনের সরাসরি যুদ্ধের ঘটনা।  ঘটনা ছিল ঠিক মধ্য দুপুরের।  সবাই খেতে বসেছে।  তারামনকে পাকিস্তানি সেনাদের কেউ আসছে কি না দেখার জন্য বলা হলো। তারামন সুপারি গাছে উঠে দূরবীন দিয়ে চারদিকে লক্ষ্য রাখছিলেন। হঠাৎ দেখলেন, পাক বাহিনীর একটি গানবোট তাদের দিকে আসছে। সবার খাওয়া বন্ধ। দ্রুত প্রস্তুতি নিয়ে অ্যাকশনের অপেক্ষা করতে লাগলেন সবাই। তারামন সেদিন সহযোদ্ধাদের সঙ্গে যুদ্ধে অংশ নেন। দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত যুদ্ধ চলে। সেদিন তারা শত্রুদের পরাস্ত করতে সক্ষম হন। অনেক বার তাদের ক্যাম্প পাকবাহিনী আক্রমণ করেছে, তবে ভাগ্যের জোরে তিনি প্রতিবার বেঁচে যান।

শুধু সম্মুখ যুদ্ধ নয়। নানা কৌশলে শত্রু পক্ষের তৎপরতা এবং অবস্থান জানতে গুপ্তচর সেজে সোজা চলে গেছেন পাক বাহিনীর শিবিরে। কখনও সারা শরীরে কাদা মাটি, চক, কালি এমনকি মানুষের বিষ্ঠা পর্যন্ত লাগিয়ে পাগল সেজেছেন তারামন। চুল এলো করে বোবা সেজে পাক সেনাদের সামনে দীর্ঘ হাসি কিংবা কান্নার অভিনয় করেছেন। কখনও প্রতিবন্ধী কিংবা পঙ্গুর মতো চলাফেরা করে শত্রুসেনার খোঁজ নিয়ে এসেছেন নদী সাঁতরে গিয়ে। আবার কলা গাছের ভেলা নিয়ে কখনও পাড়ি দিয়েছেন ব্রহ্মপুত্রের শাখা নদী।  আর জান-মানের কথা না ভেবে এসব দুঃসাহসী কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন একমাত্র দেশমাতৃকার মুক্তির জন্য।

বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভের পর ১৯৭৩ সালে তৎকালীন সরকার মুক্তিযুদ্ধে তারামন বিবিকে তার সাহসীকতা ও বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য ‘বীর প্রতীক’ উপাধিতে ভূষিত করেন। কিন্তু ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত তাকে খুঁজে বের করা সম্ভব হয়নি। ১৯৯৫ সালে ময়মনসিংহের আনন্দমোহন কলেজের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ও গবেষক বিমল কান্তি দে প্রথম তার সন্ধান পান। এ কাজে বিমল কান্তিকে সহায়তা করেন কুড়িগ্রামের রাজীবপুর কলেজের অধ্যাপক আবদুস সবুর ফারুকী। এরপর নারীদের অধিকার নিয়ে কাজ করছে এমন কয়েকটি সংগঠন তাকে ঢাকায় নিয়ে আসে। সেই সময় তাকে নিয়ে পত্রিকায় প্রচুর লেখালেখি হয়। অবশেষে ১৯৯৫ সালের ১৯শে ডিসেম্বর তৎকালীন সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে তারামন বিবিকে তার বীরত্বের পুরস্কার হাতে তুলে দেন। তারামন বিবিকে নিয়ে আনিসুল হকের লেখা ‘বীর প্রতীকের খোঁজে’ নামক একটি বই রয়েছে। আনিসুল হক রচিত ‘করিমন বেওয়া’ নামক একটি বাংলা নাটকের কেন্দ্রীয় চরিত্র তারামন বিবি।

তারামন বিবির স্বামীর নাম আবদুল মজিদ। এই দম্পতির এক ছেলে ও এক মেয়ে। তিনি দীর্ঘদিন অসুস্থ ছিলেন। অবশেষে অসুস্থ অবস্থায় গত শুক্রবার রাতে তিনি মারা যান। এর মধ্য দিয়ে শেষ হয় তার গৌরবময় সংগ্রামী জীবন। ডিসেম্বর বাঙালির বিজয়ের মাস। এই মাসের সূচনাদিনে চলে গেলেন একাত্তরের রণাঙ্গনের  বীরযোদ্ধা, বীরপ্রতীক তারামন বিবি। কিন্তু তারামন বিবির যুদ্ধ কি শেষ? স্বাধীন এই দেশ দেশী-বিদেশী নানামুখী ষড়যন্ত্রের শিকার। তারই প্রতিফলন আমরা দেখি পঁচাত্তরের পনেরোই আগস্টে। স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করে মুক্তিসংগ্রামের চলমান ধারা রুখে দেয় ষড়যন্ত্রকারীরা। এরপর মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত শক্তি ক্ষমতায় বসে। তারামন বিবিরা নিখোঁজ হয়ে যান ইতিহাসের পাতা থেকে। তারপর তাকে যখন খুঁজে বের করা হলো তখনও কি বোঝা গিয়েছিলো এই বীরকন্যা কেমন আছেন? যে কারণে তিনি যুদ্ধ করেছিলেন আজও কি সে স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয়েছে? তার লড়াইয়ের সেই পতাকা যখন যুদ্ধাপরাধীদের গাড়িতে শোভা পেত তখন তার কেমন লেগেছে? এখনও যুদ্ধাপরাধীরা নির্বাচনের ফ্রণ্টে দাঁড়িয়ে আসন ভাগাভাগি করে। তাহলে তারামন বিবির সংগ্রাম শেষ হলো কীভাবে? তারামন বিবিদের সংগ্রাম শেষ হয় না। মেহনতী মানুষের অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা ,চিকিৎসা, বাসস্থানের দাবি যতদিন থাকবে, শ্রেণী সংগ্রাম যতদিন থাকবে ততদিন তারামন বিবিদের স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়ার সংগ্রাম চলবে। তার সংগ্রামী জীবনের প্রতি জানাই শ্রদ্ধাঞ্জলি।



রাইজিংবিডি/ঢাকা/১ ডিসেম্বর ২০১৮/তারা

Walton Laptop
 
     
Marcel
Walton AC