ঢাকা, মঙ্গলবার, ৪ আষাঢ় ১৪২৬, ১৮ জুন ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

অবশেষে শিরোপা: পরিণত বাংলাদেশের সুখকর ছবি

জাফর সোহেল : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-০৫-২০ ৪:৪৩:২৮ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৯-০৫-২০ ৪:৪৪:৪৮ পিএম
Walton AC 10% Discount

জাফর সোহেল: মোসাদ্দেক হোসেন সৈকতের ব্যাটে গত শুক্রবার রাতে ক’জন ভরসা করেছিলেন? আমার ভরসা ছিল না। বরং মনপ্রাণ তাকিয়ে ছিল মাহমুদুল্লাহ রিয়াদের ফিনিশিং হ্যান্ডের দিকে। শেষ ৫ ওভারে যখন প্রায় ১৪ রান করে দরকার, তখন শুরুর সৌম্য ঝড়ের সুখ ভুলে আরেকটি ফাইনাল দুঃখ চোখ রাঙাচ্ছিল! কিন্তু পরিণত বাংলাদেশ দল যে দিনে দিনে অনেককেই পরিণত করে তুলছে মোসাদ্দেক হোসেন সৈকত দেখালেন তার ছবি। এমন একটি ভারসাম্যপূর্ণ দল আমরা কবে দেখেছি? কবে এমন সম্মিলিত পারফর্মেন্স নিয়মিত দেখা গেছে? সত্যিই দারুণ! অসাধারণ! যে অভিজ্ঞতা আমাদের নিতে হয়েছে অনেক দিন, সেই তিক্ত অভিজ্ঞতা অন্যদের ফিরিয়ে দিতে পারার মধ্যে এক ধরনের আত্মতৃপ্তি আছে। টাইগাররা শুক্রবার রাতে জাতিকে উপহার দিয়েছে এমন সুখের আর আনন্দের অনন্য অনুভূতি। মাশরাফি বাহিনীকে এজন্য আমাদের প্রাণঢালা অভিনন্দন এবং ধন্যবাদ।

টানা ছয়টি টুর্নামেন্টের ফাইনাল আমরা হেরেছি। ঘরের মাঠে এশিয়া কাপের ফাইনালে হারের পর সাকিব-মুশফিকদের চোখের জলে ক্যামেরা ঝাপসা হয়ে গিয়েছিল! কে জানে, ভিজে গিয়েছিল হয়ত ক্যামেরার পেছনের মানুষদের চোখও। সে চোখ তো আমরা দেখি না। যেমন দেখি না টাইগারদের একেকটি প্রত্যাশিত জয়কে পরাজয়ে অনূদিত হতে দেখে কত মানুষের চোখ ঝাপসা হয়, অন্তর জুড়ে কান্না নামে; আমরা সেসব দেখি না। শেষবার শ্রীলঙ্কায় আবার যখন এশিয়া শ্রেষ্ঠত্বের মঞ্চ প্রস্তুত হলো, যখন শিরোপা কেবল এক বলের দূরত্বে, তখনো কলিজা ছিন্নভিন্ন করে দেন এক দিনেশ কার্তিক। এক বলে ছয় মারতেই হবে, এমন সমীকরণও যখন প্রতিপক্ষ জয় করে ফেলে, তখন আর কী-ই বা করার থাকে! এমন কঠিনতর দুঃখও টাইগার আর তাদের ভক্তদের পেতে হয়েছে!

কিন্তু কী জানি যাদুমন্ত্র জানেন মাশরাফি, সব দুঃখকে, সব বেদনাকে পায়ে দলে নতুন করে পথ চলতে জানেন তিনি। শেখান সারথীদেরও। এ এক আশ্চর্য চরিত্র মাশরাফি বিন মুর্তজা! তিনি ভাঙবেন, মচকাবেন, কিন্তু নিঃশেষ হবেন না। নিজের জীবনের লড়াইয়ে যেমন বারবার অপারেশনের টেবিল থেকে উঠে এসেছেন খেলার মাঠে তেমনি বারবার ধ্বংসস্তুপ থেকেই ফিনিক্স পাখির মতো উত্থান ঘটিয়েছেন বাংলাদেশ দলের। ক’দিন আগে নিউজিল্যান্ডে খেলতে গিয়ে এই দলটিই পড়ে গিয়েছিল একেবারে সাক্ষাত জমের হাতে! পরম করুণাময়ের অশেষ কৃপায় তারা ফিরে পেয়েছেন নতুন জীবন। যাদের বুকের ভেতরে এখনো টিপটিপ করছে অটোমেটিক রাইফেলের গুলির ভয়। ক্রাইস্টচার্চের সেই ভয়ার্ত মুখগুলোকে, মরে যাওয়া অন্তরগুলোকে জয়ের মন্ত্রে উজ্জীবিত করে তোলেন ম্যাজিশিয়ান মাশরাফি। তিনি এমনই এক নেতা, ভয়ের ছবি মুছে দেন যিনি জয়ের রঙে, হামেশাই। আইরিশদের মাটিতে ওয়ালটন ত্রিদেশীয় সিরিজ জেতাটা এজন্যই অনেক বেশি গুরুত্বের, অনেকে বেশি প্রয়োজনের। কাপ্তান মাশরাফি দেশ ছাড়ার আগে বলেছিলেন, একটা এমন জয় অনেক কিছুই পাল্টে দিতে পারে, উল্টে দিতে পারে হিসাব-নিকাশ। সেই পাল্টে দেওয়ার জয়টা আমরা পেয়ে গেছি। এখন হিসাব পাল্টানোর পালা। সেটি নিশ্চয়ই বিশ্বমঞ্চে, ইংল্যান্ডের মাটিতে, আগামী মাসে হবে।

ইদানিং ক্রিকেট পাগল জাতি হিসেবে ভারতীয়দের চেয়ে অনেক বেশি আবেগী মনে করা হয় বাঙালিকে। সামনের যে বিশ্বকাপ, সেখানে এই আবেগী জাতির দলের প্রতি প্রত্যাশা অনেক। স্বপ্নের সীমাটা অনেকে রেখেছেন সেমি পর্যন্ত। তবে আমি নিশ্চিত জানি, অনেকেই গোপনে সেই সীমাটা টেনে নিয়েছেন একেবারে শিরোপা পর্যন্ত। কিংবা নিদেনপক্ষে ফাইনাল মঞ্চে! মন্দ না, স্বপ্ন দেখতে তো আর মানা নেই। তবে, মনে রাখতে হবে, নিজেদের স্বপ্নের পরিধি নিজেরা যেমন ঠিক করছি, তেমনি ফল ভালো হোক, মন্দ হোক সেটাও নিজেরা সয়ে নেয়ার মানসিকতা রাখতে হবে। মাঠের লড়াইয়ে অনেক কিছুই হতে পারে। নিশ্চিত জেতা ম্যাচও হাতছাড়া হয় যেতে পারে! তখন অন্তত আমাদের বীরদের অসম্মান করা যাবে না। দেখবেন, এই শুক্রবারের মতোই অনেক দিন আমাদের হবে, টাইগাররা এমন অনেক হাসি আমাদের উপহার দেবে। সুখে এবং দুঃখে সবসময় টাইগারদের পাশে থাকতে হবে। বাঙালিকে আনন্দের অনিন্দ্য সুন্দর উপলক্ষগুলো দিবে টাইগাররাই। অপেক্ষা কেবল সময়ের।

ওয়ালটন ত্রিদেশীয় টুর্নামেন্টের এই ফাইনাল জেতাটা টাইগারদের নতুনতর পর্যায়ে উন্নীত হওয়ার দৃপ্ত শপথের জানান দিচ্ছে। জানান দিচ্ছে, সপ্তাহ দুয়েক পরের ‘মহা কাপে’র লড়াইয়ে ব্যঘ্রশাবকেরা কাউকেই ছাড় দেবে না এতটুকু, তা প্রতিপক্ষ কয়েকবার কাপটি বগলদাবা করুক কিংবা র‌্যাংকিংয়ে যত উচ্চতাতেই থাকুক। বাঙালি এবার খেলবে, লড়বে, জিতবে।

একটা সময় এমন ছিল, আমরা মাঠে খেলতে নামতাম আর নিশ্চিত হারের পাশাপাশি হিসাব চলত, কতটা সম্মানজনক হার বরণ করা যায়! জয় তো একটা প্রহেলিকা। তখন একটি একক ভালো পারফর্মেন্সের জন্যেও ভক্তদের ছিল তীর্থের কাকের অপেক্ষা। যদি হাবিবুল বাশার একটা ফিফটি করেন, যদি আশরাফুল একটা সেঞ্চুরি করতে পারেন কিংবা যদি মোহাম্মদ রফিক ৫টা উইকেট বাগাতে পারেন!  এরকম যেকোন একটা ঘটনা ঘটলেই বাঙালি ক্রিকেট ভক্তরা বর্তে যেত। একটি ভালো পারফর্মেন্স দেখার জন্য ভক্তরা মাঠে গিয়েছে অনেক সকাল আর অনেক বিকাল। হার দেখতে দেখতে ক্লান্ত বিষণ্ণ হয়েছেন অনেকে। সেই দিন ফুরিয়েছে। ভক্তদের ধৈর্যের প্রতিদান এক সময় দেয়া শুরু করে টাইগাররা। বাঘের থাবায় ধরাশায়ী হতে শুরু করে প্রবল শক্তিধররা। এরপর পদ্মা-মেঘনায় অনেক জল গড়ালো, টাইগার ক্রিকেটে জন্ম হতে শুরু করল তারকার। ‘বাংলাদেশের প্রাণ’ সাকিব আল হাসান, রান মেশিন তামিম ইকবাল, মিস্টার ডিপেন্ডেবল মুশফিকুর রহিম, কাটার মাস্টার মুস্তাফিজ, ফিনিশার মাহমুদউল্লাহ আর ক্যাপ্টেন ফ্যান্টাস্টিক মাশরাফি বিন মুর্তজারা নিজেরা যেমন বনেছেন তারকা তেমনি ভক্তদেরও উপহার দিয়েছেন একের পর এক অসাধারণ জয়।

কাপ্তান মাশরাফি দিনে দিনে হয়ে উঠলেন ‘কাপ্তান অব এশিয়া’। তিন দেশের লড়াইয়ে অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর এখন কাপ্তান মাশরাফি এশিয়া ছাড়িয়ে ‘কাপ্তান অব ওয়ার্ল্ড’ অভিধা পাওয়ার অপেক্ষায়। এসবই বাংলাদেশের ক্রিকেটের বদলে যাওয়ার মায়াবী ছবি, সুখকর ছবি। টাইগার ভক্তরা এখন প্রাণভরে জয়ের সুধা পান করে, উদযাপনে উন্মাতাল হয় টিএসসির প্রাঙ্গণ।

বদলে যাওয়ার ধারাবাহিক ছবির শেষ কিস্তি একটু ভিন্নতর মর্যাদারও বটে। একে তো দেশের বাইরের টুর্নামেন্ট তারওপর গ্রুপ পর্বের কোনো ম্যাচ না হেরে অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন। তারও ওপরে যদি বলি, ছয় ছয়টা ফাইনাল হাত থেকে ফসকে যাওয়ার পরে আসল ঐতিহাসিক বিজয়। অতএব এই জয়কে উন্মাতাল উদযাপনে বাধা নেই। এই জয়ের মাহাত্ম্য অনেক অনেক বেশি। বিশ্বকাপের মঞ্চে এটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রেরণা হবে। টাইগাররা জানবে, মানবে- ফাইনালও জিততে পারে তারা, এমনকি বিশ্বকাপ ফাইনালও!

অতীতে অনেক অশ্রুজলের গড়াগড়ি হয়েছে; টিপ্পনি আর পরিহাসের হাসি অনেক হেসেছে ‘অভিজাতেরা’। এখন সময় হয়েছে এসব ক্ষতে প্রলেপ দেয়ার। এখন আমাদের জিততে হবে, জিতে জিতেই দিতে হবে জবাব। দীর্ঘদিনের ব্যথা-বেদনার উপশমের জন্য এখন এমন সব জয় চাই, এমন অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হওয়া চাই, এমন টানা জয় চাই। আগামী মাসের বিশ্বাকাপেও টাইগারদের এমন অনেক অসাধারণ জয়ের ছবি আমরা দেখব, এমন ধারাবাহিক জয় উপভোগ করব- এমনটাই প্রত্যাশা। জয়তু মাশরাফি, জয়তু টিম টাইগারস।

লেখক: সংবাদকর্মী

 

 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/২০ মে ২০১৯/তারা

Walton AC
     
Walton AC
Marcel Fridge