ঢাকা, শনিবার, ৬ শ্রাবণ ১৪২৫, ২১ জুলাই ২০১৮
Risingbd
সর্বশেষ:

আত্মহননের চেয়েও ভয়াবহ যে মৃত্যু

অজয় দাশগুপ্ত : রাইজিংবিডি ডট কম
 
     
প্রকাশ: ২০১৮-০৬-১৯ ৮:২৮:১১ এএম     ||     আপডেট: ২০১৮-০৭-০৩ ৪:৫৮:০৪ পিএম

অজয় দাশগুপ্ত : ঈদ আনন্দে ভাসছে দেশ। সরকার বা প্রশাসন সবাইকে আমরা সাধুবাদ জানাই। সবার ওপরে ভালোবাসা জানাই মানুষকে। এই দেশের মানুষ মূলত আনন্দপ্রিয়। তারা সুযোগ পেলেই আনন্দে মেতে ওঠে। শান্তিপ্রিয় মানুষের জীবনে আনন্দ আর বেদনা কেন যে এত হাত ধরাধরি করে চলে সেটাই বুঝি না! ঈদের দুদিন আগে বাংলাদেশ আরো একটি অপ্রিয় ঘটনার মুখোমুখি হয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধ আমাদের অহংকার হলেও আজ তার গায়ে অনেক আঁচড়। একাত্তর কত আগের ঘটনা সেটা বিবেচ্য নয়, মূলত এটাই সত্য এর গায়ে এখন অনেক বিপদের ঝাপটা। যাদের আমরা সাহসী মানুষ বলি,  যাদের আমরা আত্মত্যাগী বলে মনে রাখি, যাদের অবদান ছাড়া এই ভূমি আমাদের হতো না, কি অবস্থা আজ তাদের? কেমন আছেন তারা?

ঈদের আগে ঢাকায় একটি রেল ক্রসিংয়ের পাশে যে মানুষটির রক্তমাখা শরীর পাওয়া গেল কে তিনি? তিনি কি সত্যি কোন সাধারণ মানুষ ছিলেন? দুনিয়ার ইতিহাসে যেসব মানুষ নন্দিত বা যাদের সন্তানেরা ইতিহাসের অংশ তাদের কীভাবে মনে রাখে সেসব দেশ? দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যারা প্রাণ দিয়েছিলেন তাদের উত্তরাধিকারীদের দাপট দেখার মতো। দেশ, সরকার, জাতি তাদের এমনভাবে রাখে যেন নতুন প্রজন্ম প্রজন্মের পর প্রজন্ম জানতে পারে কেন এদের পূর্বপুরুষরা প্রাণ দিয়েছিলেন। কি মহতী প্রেরণা এদের বাবা মা কিংবা আত্মীয় স্বজনদের উদ্ধুদ্ধ করেছিল দেশের জন্য সর্ব্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকারে। তা যদি না হয়, তাহলে সে দেশটির কপালে জোটে ইতিহাসের নির্মম অপঘাত। তাদের ভবিষ্যত প্রজন্ম কোনো কালেও শান্তিতে বসবাস করতে পারে না। বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে মাত্র সাতচল্লিশ বছর। অর্ধশতাব্দী পেরুনোর আগেই তছনছ হয়ে গেছে ইতিহাস। সেই কবে বঙ্গবন্ধু ও চার জাতীয় নেতা জীবন দিয়েছিলেন তারপর বিরুদ্ধ স্রোতে ভাসা দেশ হয়ে উঠেছিল মিনি পাকিস্তান। এক জেনারেল যিনি কিনা মুক্তিযুদ্ধে সামিল হয়েছিলেন, তাকে সামনে রেখে ইতিহাস হয়ে উঠেছিল মহা এক কালো অধ্যায়। পরে আরেক জেনারেল এসে পূর্ণ করেছিলেন ষোলকলা। আমরা ভেবেছিলাম এই বুঝি নিয়তি।

কি জানি কি আছে ইতিহাসের মনে। সে কেন জানি ঘুরে দাঁড়ালো। বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা এলেন। ক্ষমতায় এসেই তিনি নেমেছিলেন ইতিহাস শুদ্ধ করার কাজে। সে কি উত্তেজনা! মানুষের মনে সে কি নতুন প্রেরণা! শাহবাগের আন্দোলনে জেগে ওঠা মানুষকেও ঘুম পাড়িয়ে দিল অপশক্তি। সেই অপশক্তি যারা একাত্তরে আমাদের দেশ চায়নি। চায়নি বাঙালি মাথা তুলে নিজের পরিচয়ে বাঁচুক। তাদের তখনো যা এখনো তা। তাদের দিলে পাকিস্তান। আচরণে রাজাকারি। বিশ্বাসে মৌলবাদ। সত্যি বলতে কি তারা যখন নিজেদের পায়ের তলার মাটি হারাতে শুরু করলো, যখন বুঝলো পুনঃপ্রতিষ্ঠিত রাজাকার শিরোমণিরা ফাঁসিতে ঝুলবেই, তখন তারা নেমে এসেছিল নিজস্ব কায়দায়। একাত্তরে তারা আমাদের সূর্য সন্তানদের চোখ বেঁধে ঘর থেকে ধরে নিয়ে গিয়ে হত্যা করেছিল। এবার নামলো চোরাগোপ্তা কায়দায়। একটা দুটো এভাবে কয়েকটা লাশ ফেলার পর আমাদের দুর্বল বিবেক ভয়ে মিইয়ে গেল। সরকারও বুঝে  গেল মাঠে আরো একদল আছে, যাদের আদর্শ নীতি বা মুক্তিযুদ্ধের কারণে চটালে ভোটবাক্সে নেগেটিভ প্রভাব পড়তে পারে। সে থেকে দাবার ছক গেলো পাল্টে। এমন এক ত্রাস আর ভয়ের রাজত্ব কায়েম হলো,  দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হলো মুক্তবুদ্ধির তারুণ্য। বহাল তবিয়তে মাঠে রয়ে গেলো পরাজিত বাহিনীর রেখে যাওয়া দালালেরা।

এরাই এক এক করে নিঃশেষ করে দিচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের শক্তিকে। যার এখন অবদি সর্বশেষ শিকার সুমন জাহিদ। সুমন জাহিদ ধর্মবিরোধী  কোন লেখা লিখেছিলেন? প্রমাণ করতে পারবে কেউ যে তিনি ধর্মবিরোধী বা বিশ্বাসবিরোধী কথা বলেছিলেন? তাহলে কী তার অপরাধ? ঘাতকদের বিচার যখন চলছিল, তখন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিয়েছিল সুমন জাহিদ। এরপর থেকে তাকে ফোনে হুমকি দিয়ে আসছিল কেউ কেউ। এ নিয়ে সে পুলিশের কাছেও গিয়েছে। একটা বড় সময় ধরে নানা ফোন থেকে তাকে হুমকি দেওয়া হতো। সুমন জাহিদের এ রকম মৃত্যু তাই এই প্রশ্নকেও সামনে নিয়ে আসে-ওই হুমকিদাতাদের কেউ কি সুমনকে হত্যা করল? ওকে হত্যা করে ট্রেন লাইনের ওপর রেখে যাওয়া হয়েছিল কি না, তাই বা কে বলবে? ওকে ট্রেনে কাটা পড়তে কি কেউ দেখেছে? মাঝেমধ্যেই  জাতীয় পতাকায় মুড়িয়ে বড় ছেলেটাকে মোটর সাইকেলের সামনে বসিয়ে ছুটতো সুমন। বাংলাদেশের প্রতি এত মমত্ব ওর থাকবে না তো কার থাকবে? মায়ের মৃত্যুর পর কেউই তো ছিল না তার। মায়ের নামে ঢাকার সড়কটি করার পেছনে একক অবদান ছিলো তার- এই তার অপরাধ।

ঈদের দিন ই-মেইলে দেখি এক ভদ্রলোক একটি বার্তা পাঠিয়েছেন। শুধু আমাকে না, আমার সাথে আরো কয়েকজন লেখককে। ইনি সুমন জাহিদের মামা। যিনি বলছেন, তার কাছেই মানুষ হয়েছিল এই এতিম ছেলেটি। তিনি নিশ্চিত কোনোভাবেই আত্মহত্যা করতে পারে না তার ভাগ্নে। কোনো কারণ নাই তেমন। একজন ডাক্তার হিসেবে তিনি মোটিভেশন এবং রক্তাক্ত দেহ দেখেও মনে করতে পারছেন না এটি আত্মহত্যা। একটা মানুষ ট্রেনে কাটা পড়লে শুধু মাথায় আঘাত পাবে? বা তার শরীর ছিন্নভিন্ন হবে না? হিসাব মেলে না। কারণ দেশে এখন এগুলোর হিসাব কেউ মেলায় না। সুমন জাহিদের মরণকালটাও সেভাবে বেছে নেয়া হয়েছে। ফিফা বিশ্বকাপ, ঈদ উৎসবের আমেজে মগ্ন দেশে সবাই ভুলে যাবে এই ঘটনা। মানুষকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। এটা এখন তাদের গা সওয়া। এটা খুব ভালো করেই জানে ঘাতকেরা।

শুধু প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে এ জন্যেই কি স্বাধীন হয়েছিলাম আমরা? এ জন্যে কি মুক্তিযুদ্ধে জান দিয়েছিলেন শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভিন? চেতনা আদর্শ লোপাট হতে হতে একদিন মুক্তিযুদ্ধের সব শক্তি উধাও হয়ে যাবে। দেশ তো থাকবে। তাকে থাকতেই হবে। থাকবে পদ্মা মেঘনা যমুনা। থাকবে মানুষ।  এসব নদীতে কি সেদিন পানি প্রবাহিত হবে, না রক্তের ধারা? সেদিনের মানুষ কি এই অকৃতজ্ঞ জাতিকে মার্জনা করবে? না সব ভুলে তখনকার বাংলাদেশ হবে এক ককটেল জাতির দেশ যার আধা পাকি আধা হিন্দী আর আধা বাঙালি। দ্রুত খাদের দিকে ধাবমান জাতিকে বাঁচাতে না পারলে এদেশের কি হতে পারে ভাবতেই ভয় পাই। সুমন জাহিদের হত্যাকাণ্ডের কি আদৌ সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার হবে? আহা বাস্তবতা। এ কেমন মৃত্যু যাকে ‘আত্মহত্যা’ মানতে পারলেও খুশী হতাম আমরা?



রাইজিংবিডি/ঢাকা/১৯ জুন ২০১৮/তারা

Walton Laptop
 
     
Walton