ঢাকা, মঙ্গলবার, ৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৪, ২১ নভেম্বর ২০১৭
Risingbd
সর্বশেষ:

আশা জাগানিয়া নতুন চর, বসতি গড়ার স্বপ্ন

রফিকুল ইসলাম মন্টু : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৭-০৯-০৯ ৪:০৮:২৩ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৭-০৯-১১ ২:৫৮:৩৬ পিএম

বাংলাদেশের সমুদ্র তীরবর্তী উপকূলীয় এলাকায় রয়েছে অফুরন্ত সম্ভাবনা। সমুদ্র-নদী থেকে আহরিত মৎস্য সম্পদে জীবিকা চলে লাখো মানুষের। লবণ চাষ, শুঁটকি উৎপাদন, কাঁকড়া চাষ, চিংড়ি চাষে জীবিকা চলে বহু মানুষের। দ্বীপের পলি মাটিতে কৃষি আবাদ বহু মানুষের ভাগ্য বদলে দিয়েছে। সয়াবিনের মতো অর্থকরী ফসল উৎপাদনেও বিপ্লব ঘটেছে উপকূলে। সমুদ্র সৈকতের খনিজ বালু এই জনপদের আরেক সম্ভাবনা। পর্যটন খাতেও উপকূলজুড়ে রয়েছে অফুরন্ত সম্ভাবনা। এসব সম্ভাবনা ও সম্ভাবনা বিকাশের অন্তরায় উপকূলের প্রান্তিক জনপদ ঘুরে তুলে ধরেছেন রফিকুল ইসলাম মন্টু। আজ প্রকাশিত হলো এই ধারাবাহিকের দ্বিতীয় পর্ব।

নদীর তীরে দাঁড়িয়ে আঙুল তুলে নতুন চরের সীমারেখা টানার চেষ্টা করছিলেন পঁচাত্তর বছর বয়সী সোলায়মান। এই নদীতেই ডুবেছে তার বাড়ি, টিনের ঘর, গাছপালা, পুকুর, চাষের জমি- সবকিছু। নদীর তাড়া খেয়ে পিছিয়ে গেছেন। সেই নদীতে নতুন চর দেখে তিনি এখন আশায় বুক বাঁধছেন। আবার মনে পড়ছে সেই পুরনো দিনের গল্প।

দ্বীপ উপজেলা সন্দ্বীপের পশ্চিমে মেঘনা তীরের রহমতপুর, হরিশপুর এলাকার গল্প এটি। ভাঙ্গনপ্রবণ এলাকা হিসেবে পরিচিত এই এলাকার ভাঙ্গন থেমে এখন নতুন চরের দেখা মিলেছে। ভাটার সময় পলি মাটির ওপর দিয়ে পায়ে হেঁটে যাওয়া যায় অনেক দূরে। স্থানীয়দের দেয়া ধারণা মতে, এই চরের দৈর্ঘ্য প্রায় ২০ কিলোমিটার। অর এই চর ঘিরে সোলায়মানের মতো এলাকার বহু মানুষ জীবনের নতুন স্বপ্ন বুনছেন।

শুধু সন্দ্বীপ নয়, সমগ্র উপকূলেই ভাঙ্গনের পাশাপাশি রয়েছে গড়ার চিত্র। নতুন চর জাগছে হাতিয়া, মনপুরা, মহেশখালী, কুতুবদিয়া, চর মোন্তাজ, রাঙ্গাবালী, গলাচিপাসহ বিভিন্ন এলাকায়। বাড়ছে ভূখণ্ডের পরিধি। এইসব নতুন চর প্রকৃত ভূমিহীনদের পাওয়ার কথা থাকলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে চর দখল করে নেয় প্রভাবশালীরা। যে ভূমিহীন চরের জমির অপেক্ষায় থাকেন বছরের পর বছর, তার নাম ওঠে না খাসজমির তালিকায়। কোথাও নতুন চর থেকে যায় বন বিভাগের দখলে। এ নিয়ে বিরোধ থাকে স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে। অথচ ভূমিহীনদের মাঝে খাসজমির যথাযথ বন্টন উপকূলের সম্ভাবনা বিকাশে সহায়ক হতে পারে।   

সন্দ্বীপের বিভিন্ন এলাকা সরেজমিন ঘুরে চোখে পড়েছে এক একটি এলাকার ক্ষয়ে যাওয়ার চিত্র। ভাঙ্গন ধেয়ে আসছে, এক একটি বাঁধ বিলীন হয়ে গেছে। ঘরবাড়ি সরিয়ে মানুষ নতুন বাঁধের পাশে ঘর বেঁধেছে। শখ করে লাগানো আম-জাম গাছ, অতি যত্ন করে বাঁধানো পুকুর ঘাট, স্বজনদের কবরস্থান সবই চোখের সামনে বিলীণ হতে দেখেছেন এখানকার মানুষ। আলাপকালে ভাঙ্গন কবলিতরা বলেছেন, বছরে কয়েকবার বাড়ি বদলানোর ফলে তাদের জীবনে নেমে আসা অবর্ণনীয় দুর্দশার খবর নিতে কেউ আসে না। মাথা গোঁজার ঠাঁই নেই বলে, সেই ভাঙ্গন কবলিত বেড়ি বাঁধের ধারেই আশ্রয়। কোনভাবে বেঁচে থাকার চেষ্টা। হারিয়ে যাওয়া সেই চর তারা ফিরে পাবেন- এ যেন আশার গল্প।

আরেক চিত্র দ্বীপ জেলা ভোলার মনপুরার। বাপদাদার ভিটে হারিয়ে কেউ ভেঙে যাওয়া নদীর পাড়েই ক্ষুদ্র ব্যবসায় জীবিকা নির্বাহের চেষ্টা করছেন। কেউবা বাড়িঘর হারিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন নৌকায়। ঘুমানো, খাওয়া-দাওয়া কিংবা জীবিকার তাগিদে মাছ ধরা চলে সেখানেই। পরিবেশের বিরূপ প্রতিক্রিয়ায় ৮-১০ বার বাড়ি বদল করেও এদের জীবনে আসেনি স্থিতিশীলতা। দূরে নতুন চরের খাসজমির দিকে চোখ এদের। কিন্তু সেখানে এক খণ্ড জমি পেতে আরেক যুদ্ধে অবতীর্ন হতে হয়। হাতে জমির কাগজপত্র পেয়েও অনেকেরই ঠাঁই মেলে না নতুন চরে।



সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, ভোলার দ্বীপ উপজেলা মনপুরার চর নিজাম ও চর কলাতলীতে নিঃস্ব মানুষদের ঠাঁই মিলছে না। ভাঙ্গন কবলিত আন্দিরপাড়, রামনেওয়াজ, সাকুচিয়াসহ বিভিন্ন এলাকা মানুষেরা অতিকষ্টে দিন যাপন করছেন। এক জীবনে সর্বোচ্চ ১৪ বার পর্যন্ত বাড়ি বদলেছেন, তবুও আসেনি স্থিতিশীলতা। নানামূখী দুর্যোগে বিপন্ন উদ্বাস্তু মানুষেরা এখন আর কোথাও যাওয়ার স্থান পাচ্ছেন না। যাদের কিছু অর্থকড়ি আছে, তারা জমি কিনে অন্যত্র বাড়ি করতে পারলেও যাদের সেই সামর্থ্যটুকু নেই, তারা পড়ে আছেন এখানেই।

নদীভাঙ্গন, জলোচ্ছ্বাস, জোয়ারের পানি বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড়সহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগে দেশের উপকূলীয় অঞ্চলের বহু মানুষ সব হারিয়ে মাথা গোঁজার ঠাঁই খুঁজছে এখানে-সেখানে। বিশেষজ্ঞরা এদের জলবায়ু স্থানচ্যুত বলে চিহ্নিত করেছেন। এসোসিয়েশন ফর ক্লাইমেট রিফিউজিস (এ.সি.আর) এবং ইয়াং পাওয়ার ইন সোশ্যাল এ্যাকশন (ইপসা) পরিচালিত গবেষণায় বলা হয়েছে, দেশে ইতিমধ্যে প্রায় ৬০ লাখ মানুষ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে স্থানচ্যুত হয়েছে। মনপুরার এই উদ্বাস্তু মানুষেরা তাদেরই অন্তর্ভূক্ত।     

মনপুরা ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের পূর্ব আন্দিরপাড়। গত কয়েক বছরে এই এলাকার বহু মানুষ বাড়িঘর হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছেন। এলাকাটি ঘুরে চোখে পড়ে জোয়ারের পানি ঢুকছে বাড়িঘরে, নদীপাড়ের বহু ভিটে থেকে সরিয়ে নেয়া হয়েছে বাড়ি। হাঁটাচলার রাস্তা, হাটবাজার, পুরনো গাছপালা, সান বাঁধানো পুকুর, স্বজনদের কবরস্থান সবই বিলীন হয়ে যাচ্ছে মেঘনায়। একটি বড় এলাকা বাইরে রেখে তৈরি হচ্ছে নতুন বেড়িবাঁধ। জীবনের ঝুঁকি নিয়েও কিছু অসহায় উদ্বাস্ত মানুষ বসবাস করছেন আন্দিরপাড়ে। আন্দিরপাড় ৪ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা জাহাঙ্গীর হোসেন। বয়স ৭০ পেরিয়েছে। সম্পদশালী গৃহস্থ ছিলেন। মাছের ব্যবসায় জীবিকা নির্বাহ করতেন। বয়সের ভারে ন্যূয়ে পড়া এই মানুষটিকে এখন দিনের রোজগার দিনেই করতে হয়।

স্থানীয় সূত্র বলছে, গত কয়েক বছরে আন্দিরপাড় ও রামনেওয়াজ এলাকা থেকে অন্তত দশ হাজার পরিবার নিঃস্ব হয়েছে। এদের মধ্যে কিছু মানুষ এলাকায় আছে। অনেকে আবার জীবিকার তাগিদে অন্যত্র ছুটেছে। এই এলাকাটি ভেঙে মেঘনার বুকে চর কলাতলী জেগে উঠলেও সেখানে ঠাঁই মিলছে না অনেকেরই। এই তালিকায় কাঞ্চন মাঝি, জাহেদ মাঝি, খালেক ব্যাপারী, মহিউদ্দিন মাঝি, জাহাঙ্গীর ব্যাপারী, হিরণ মিস্ত্রিসহ অনেকের নামই রয়েছে।

সমুদ্র মোহনায় মনপুরার আরেকটি দ্বীপ চর নিজাম। সত্তরের ঘূর্ণিঝড়ের পর থেকে এখানে জনবসতি শুরু হলেও এখানে উদ্বাস্তু মানুষের অধিকার মেলেনি। এই চরে বিপুল পরিমাণ খাসজমি পড়ে থাকলেও তা উদ্বাস্তুদের মাঝে বন্দোবস্তের ব্যবস্থা হয়নি। ১৯৮৫ সালে এই চরে ৭০টি নিঃস্ব পরিবার তিন একর করে খাসজমি বন্দোবস্ত পায়। তারা এর দখল বুঝে পেয়েছে। কিন্তু ২০০৪ সালে বন্দোবস্তকৃত আরও ৪৫০টি পরিবার তাদের দখল বুঝে পায়নি। অথচ তাদের কাছে বন্দোবস্তের কাগজপত্র রয়েছে।

তবে এ বিষয়ে স্থানীয় বন বিভাগের বিট অফিসার আওলাদ হোসেন পালোয়ান বলেন, চর নিজাম সংরক্ষিত বন হিসাবে স্বীকৃতি পায় ২০০২ সালে। এখানকার কিছু মানুষকে এই চরের জমি বন্দোবস্ত দেয়া হয় ২০০৪ সালে। সংরক্ষিত বন এলাকায় বন্দোবস্ত হতে পারে না। সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরের মধ্যে সমন্বয় করে সিদ্ধান্ত গ্রহণের দাবি তার। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মনপুরা ভূমি অফিসের একাধিক কর্মকর্তা বলেন, নদীর বুকে জেগে ওঠা খাস জমি বন্দোবস্তের ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের  সমস্যা রয়েছে। অন্যতম সমস্যা পাল্টাপাল্টি মামলা। এ কারণে কিছু এলাকায় বন্দোবস্ত প্রক্রিয়া বন্ধ রয়েছে। তবে চরের খাসজমিতে নিঃস্ব এবং উদ্বাস্তু মানুষেরা স্থান পাচ্ছে।



উপকূলের বিভিন্ন এলাকায় রয়েছে এমন নতুন চর। নতুন চর নিয়ে এলাকার মানুষ অনেক স্বপ্ন দেখছে, বকেয়া খাজনাপাতি শোধ করে জমির কাগজপত্র ঠিক করছে; কিন্তু তারপরেও বহু প্রশ্ন তাদের মনে। এই জমি কী প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তরা পাবে, নাকি চলে যাবে প্রভাবশালীদের দখলে? চর দখলের কোনো ষড়যন্ত্র হবে না তো? ক্ষতিগ্রস্ত মানুষেরা তাদের ন্যায্য অধিকার ফিরে পাওয়ার আশা নিয়ে দিন গুনছেন।

স্থানীয় বাসিন্দাদের সাথে আলাপে জানা গেল, উপকূলের নিঃস্ব মানুষগুলো নতুন জেগে ওঠা চরের প্রকৃত মালিকানা পেলে বদলে যেতে পারে উপকূলের সম্ভাবনা বিকাশের চিত্র। অস্থায়ী মানুষদের পক্ষে স্থায়ীভাবে কিছু করা সম্ভব নয়। জীবন ও জীবিকা নিয়ে যেখানে টানাটানি, সেখানে বিশেষ কোনো কাজে যুক্ত হওয়া তাদের পক্ষে সম্ভব হয় না। সে কারণে খাসজমির সুষ্ঠু বন্দোবস্তের দাবি সংশ্লিষ্টদের।             

জলবায়ু স্থানচ্যুত মানুষের অধিকার ও পুনর্বাসন নিয়ে কর্মরত বেসরকারি সংস্থা ইপসার এইচএলপি প্রোগ্রামের টিম লিডার মোহাম্মদ শাহজাহান বলেন, বাংলাদেশের সরকারের জলবায়ু স্থানচ্যুতি নীতিমালা সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়ন করা খুব গুরুত্বপূর্ণ কাজ। বর্তমানে যে বিষয়টি প্রচলিত তা হলো জলবায়ু অভিযোজন পরিকল্পনা ও কার্যক্রমগুলো অস্বচ্ছ ও দুর্নীতির শিকার। দ্রুততার সাথে এই বিষয়গুলোর সমাধান করা জরুরি। তিনি বলেন, নাগরিক সমাজ এ ক্ষেত্রে সক্রিয় পর্যবেক্ষকের ভূমিকা পালন করতে পারে। আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক গোষ্ঠী বিশেষত দাতা দেশগুলোর দুর্নীতি দূরীকরণের ও স্বচ্ছতা আনার প্রয়াসগুলোকে সাহায্য করা উচিত। জলবায়ু স্থানচ্যুতির নীতিমালা ও কার্যক্রম পরিচালনার জন্য তহবিল প্রদানই যথেষ্ট নয়। তহবিলের তদারকি বাঞ্ছনীয় এবং কার্যক্রমের যথাযথ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা প্রয়োজন।



 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/৯ সেপ্টেম্বর ২০১৭/তারা

Walton
 
   
Marcel