ঢাকা, শনিবার, ৬ কার্তিক ১৪২৪, ২১ অক্টোবর ২০১৭
Risingbd
সর্বশেষ:

মাছে-গাছে এক সাম্রাজ্য বানিয়েছেন এরশাদ

রেজাউল করিম : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৭-১০-১১ ৭:৩৪:০৬ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৭-১০-১১ ৭:৩৪:০৬ পিএম

রেজাউল করিম, চট্টগ্রাম : মাত্র ১২ হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে নিজের বাড়ির পুকুরে পোনা উৎপাদন করে সাবলম্বী হওয়ার চেষ্টা করেছিলেন সদ্য ডিগ্রি পাস করা এক তরুণ। সেই দিনের সেই তরুণ এখন শুধু মাছ বিক্রি করে প্রতিদিন আয় করেন ৪০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা। মাছ নিয়ে দীর্ঘ ২৯ বছর কেটেছে তার। 

তিনি চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার দুর্গম পদুয়া ইউনিয়নের সুখবিলাস গ্রামের এরশাদ মাহমুদ। সমগ্র চট্টগ্রামে মৎস্য চাষাবাদে তিনি মডেল খামারি। পেয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর পুরস্কার। নিজের বাড়ির পুকুর থেকে যে মাছ চাষের সূচনা করেছিলেন এরশাদ মাহমুদ, তার এখন মৎস্য খামারের সংখ্যা ৫৬টি। শুধু মাছের খামারই নয়, এরশাদ মাহমুদের কৃষিভিত্তিক অন্যান্য প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে বিলুপ্তপ্রায় প্রাণী গয়াল প্রজনন কেন্দ্র, বায়োগ্যাস প্লান্ট, আম বাগান, লিচু বাগান, কলাবাগান, আগর বাগান, বণ্যপ্রাণীর অভয়ারণ্য। এরশাদ মাহমুদের এই সমন্বিত প্রকল্পের নাম ‘সুখবিলাস ফিশারিজ এন্ড প্লান্টেশন’। তার এমন সাফল্যের গল্প যেন স্বপ্নকে হার মানায়।  

সরেজমিন সুখবিলাসে
রাঙ্গুনিয়া উপজেলার চন্দ্রঘোনা ফেরি পার হয়ে রাজস্থলী-বান্দরবান সড়ক। এই সড়ক ধরে ১০ কিলোমিটার দূরত্বে বাঙ্গালহালিয়া বাজার অতিক্রম করে কিছু দূর গেলেই রাস্তার দুই পাশে সারি সারি মৎস্য খামার, লিচু বাগান, আম বাগান, কলাবাগান, মাল্টা আর কমলা বাগান। যে কাউকে প্রশ্ন করলেই সবাই এক বাক্যে এই সব মাছের খামার আর বাগানের মালিকের নাম বলে দিতে পারেন। এরশাদ মাহমুদের সবগুলো বাগান, খামার এক দিনে পরিদর্শন করে শেষ করতে পারবেন না কেউই। একজন এরশাদ মাহমুদই রাঙ্গুনিয়ার সুখবিলাস থেকে শুরু করে সমগ্র বাঙ্গালহালিয়া এলাকায় নীরবে ঘটিয়েছেন কৃষি ও মৎস্য বিপ্লব।

যেভাবে শুরু
১৯৮৮ সাল। সদ্য স্নাতক পাস করে অর্থ উপার্জনে মনোযোগী হওয়ার চেষ্টা করছিলেন এরশাদ মাহমুদ। বাবা এবং মা দুজনই চট্টগ্রাম আদালতের আইনজীবী। শহরেই নিজেদের বাড়ি। জন্ম থেকে শহরে বড় হওয়া এবং পড়ালেখা। গ্রামে মাঝে মধ্যে বেড়াতে গেলেও কখনো কয়েক দিনের বেশি থাকা হতো না। এরশাদ মাহমুদ বলেন, ‘‘সবাই গ্রামে পড়ালেখা করে শহরে গিয়ে কর্মসংস্থান কিংবা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার স্বপ্ন দেখে। কিন্তু আমার স্বপ্ন ছিল ভিন্ন। আমি কখনো চাকরি করব না। নিজে করে নিজের পায়ে দাঁড়াব- এটাই ছিল আমার স্বপ্ন। সেই স্বপ্নকে রূপ দিতেই আমি শহর থেকে সুখবিলাস গ্রামে ফিরে আসি।’’

 



তিনি বলেন,  চট্টগ্রামের হালদা নদীতে প্রাকৃতিকভাবে কার্প জাতীয় মাছের পোন উৎপাদিত হয় এটা তিনি কলেজে পড়ার সময়ই জানতেন। কিন্তু চট্টগ্রামসহ দেশের কোথাও চাষাবাদ করে বাণিজ্যিকভাবে মাছ উৎপাদন তখনো প্রচলন হয়নি।

এরশাদ বলেন, ‘‘আমি ডিগ্রি পাস করেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, গ্রামের বাড়ির সামনের পুকুরে মাছের পোনা ছেড়ে সেগুলো বড় করে বিক্রি করব। সেই পরিকল্পনা থেকে ১৯৮৮ সালের মাঝামাঝি সময়ে হালদা নদীতে উৎপাদিত ১২ হাজার টাকার মাছের পোনা সংগ্রহ করে গ্রামের বাড়ি সংলগ্ন পুকুরে অবমুক্ত করি। এরপর নিজে বাড়িতে সার্বক্ষণিক অবস্থান করে সেই পোনার জন্য খাবার সংগ্রহ থেকে পরিচর্যা, পাহারা দেওয়া সবই আমি একাই করতে থাকি। আমাকে খুব বেশি দিন অপেক্ষা করতে হয়নি। মাত্র নয় মাস পরই ১২ হাজার টাকার সেই পোনা মাছ থেকে আমি প্রায় দেড় লাখ টাকার মাছ বিক্রি করতে সক্ষম হই। শুধু পুকুরের মাছ বিক্রি করে এত বড় অংকের টাকা হাতে আসায় আমার স্বপ্ন বিস্তৃত হয়।’’

এরশাদ মাহমুদ বলেন, ‘‘আমার বাবা-মাসহ পরিবারের সব সদস্য শহরে বসবাস করতেন। পরিবারে অর্থসংকট ছিল না। তাই আমি মাছ চাষ করে যে টাকা আয় করলাম, সেই টাকা আমি আবার নতুন করে বিনিয়োগের চেষ্টা করি। গ্রামের আশপাশে চাষাবাদ হয় না। সারা বছর পানি জমে থাকে এমন জমি ও জলাশয় আমি কিনে নিয়ে সেখানে নতুন করে মাছের চাষ শুরু করি। এমন ধারাবাহিকতা চলতে থাকে বছরের পর বছর।’’

তিনি বলেন, ‘‘এক মাছের খামারের আয় দিয়ে আমি প্রতিবছর নতুন মাছের খামার তৈরি করি। এভাবে গত ২৯ বছরে আমার মাছের খামারের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫৬টি। সবগুলো খামারই গ্রামের বাড়ির ১০ কিলোমিটারের মধ্যে।’’

এসব খামারে রুই, কাতলা, নাইলোটিকা, চিংড়ি, পাঙ্গাস, কালিবাস, পাবদা, ব্ল্যাক কার্প, কই, শিং, রুই, শোল, চিতল, বোয়াল, কোরাল ইত্যাদি মাছ চাষ করা হয়।

বিনিয়োগ এবং আয়
এরশাদ মাহমুদ বলেন, ‘‘আমি ১২ হাজার টাকা দিয়ে শুরু করেছিলাম এই টুকু শুধু মনে আছে। এরপর আমি আর বিনিয়োগের হিসাব করিনি। প্রতিমাসে কিংবা প্রতিবছর মাছ চাষাবাদ থেকে যে লভ্যাংশ আসে, তার সবই আমি আবার নতুন করে বিনিয়োগ করি। নতুন খামার করি, সবুজ বনায়নে ফলজ ও বনজ বাগান তৈরি করি। তাই আমার কাছে আলাদা করে বিনিয়োগের হিসাব নেই।’’ 

 



বর্তমানে এরশাদ মাহমুদের ৫৬টি মৎস্য খামার থেকে দৈনিক মাসিক আয়-ব্যয়ের তথ্য জানাতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘‘আমার খামারে মাছের জন্য প্রতিদিন কমপক্ষে ৩০ হাজার টাকার খাদ্য প্রয়োজন নয়। তবে এর মধ্যে অধিকাংশ খাদ্য বায়োগ্যাস প্লান্টের প্রকল্প থেকে আমি নিজেই উৎপাদন করি। এর ফলে মাছের জন্য দৈনিক ১৫-১৬ হাজার টাকার খাবার কিনতে হয়। এর বিপরীতে দৈনিক মাছ বিক্রি করে আয় হয় সর্বনিম্ন ৪০ হাজার টাকা থেকে সর্বোচ্চ দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত।’’

এরশাদ মাহমুদের খামারে নিয়মিত অনিয়মিত মিলিয়ে ১৫০ জন শ্রমিক-কর্মচারী কাজ করেন। তাদের দৈনিক ও মাসিক ভিত্তিতে বেতন পরিশোধ করা হয়। শ্রমিকদের বেতন এবং মাছের খাবার কেনা বাবদ গড়ে প্রতিদিন ৪০ হাজার টাকা ব্যয় হয়। সব খরচ বাদে এই খামার থেকে প্রতিমাসে ৯ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত লাভ করেন এরশাদ মাহমুদ।

প্রতিমাসে এত টাকা কী করেন এরশাদ
শুধু মাছের খামার থেকেই এরশাদ মাহমুদ আয় করেন নয় থেকে ১০ লাখ টাকা। এই টাকায় তিনি কী করেন?- এমন প্রশ্নের জবাবে এরশাদ মাহমুদ বলেন, ‘‘আমার বিলাসী জীবনের শখ নেই। বিলাসিতার শখ নেই বলেই আমি শহর থেকে গ্রামে এসে নিজে সাবলম্বী হয়েছি। গ্রামের কয়েকশত মানুষকে সাবলম্বী করেছি।’’

মৎস্য খামার থেকে আয়কৃত অর্থ দিয়ে সুখবিলাস এলাকার ১২৪ জন দরিদ্র শিক্ষার্থীর শিক্ষাব্যয় বহন করেন এরশাদ মাহমুদ। তিনি গ্রামের ৭০ জন প্রবীণ ব্যক্তিকে নিয়মিত বয়স্ক ভাতা দেন। প্রকল্পের আয়কৃত টাকায় গঠন করা হয়েছে বিবাহ ফান্ড, শিক্ষা ফান্ড এবং চিকিৎসা ফান্ড। এলাকার দরিদ্র মেয়ের বিয়ের সময়, অসুস্থ হলে চিকিৎসার জন্য এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের  প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণ কিংবা আসবাবপত্রের জন্য আবেদন করলে এ সব ফান্ড থেকে অনুদান দেওয়া হয়। আয়কৃত অর্থ থেকে সবুজায়ন, বন্যপ্রাণীর অভয়ারণ্য, গাছের চারা উৎপাদনে ব্যয় করা হয়। তৈরি করা হয় ফলজ ও বনজ বাগান।

গয়াল প্রজনন কেন্দ্র এবং বায়োগ্যাস
এরশাদ মাহমুদ বলেন, তার গ্রাম পাহাড়ি এলাকার। চারপাশে পাহাড় বেষ্টিত। গ্রামের পাশ দিয়ে রয়েছে বন্য হাতির চলাচলের রাস্তা। বন্যপ্রাণীর প্রতি ভালোবাসা থেকে পরিবেশের ক্ষতি না করে উন্মুক্ত পাহাড়ে বিলুপ্তপ্রায় প্রাণী গয়ালের প্রজনন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেছেন। পাশাপাশি রয়েছে গরু ও ভেড়ার খামার। মাত্র তিনটি গয়াল দিয়ে শুরু করা এই প্রজনন কেন্দ্রে এখন গয়ালের সংখ্যা ২১টি। গরু ও ভেড়া রয়েছে অর্ধশতাধিক। বড় করার পর প্রতিটি গয়াল দেড় থেকে তিন লাখ টাকায় বিক্রি হয়। একই পাহাড়ে গয়াল এবং গরুর খামার থেকে সংগৃহীত গোবর দিয়ে সার ও গ্যাস উৎপাদনের লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট। এই প্ল্যান্ট থেকে ২০টি পরিবারকে গ্যাস সরবরাহ দেওয়া হচ্ছে বিনামূল্যে। এই প্ল্যান্ট থেকে উৎপাদিত মাছের খাবার এবং সার মাছের খামারে এবং ফলজ ও বনজ বাগানে ব্যবহার করা হয়।

একই পাহাড়ে এরশাদ মাহমুদ সাত বছর আগে অবমুক্ত করেছিলেন তিনটি হরিণ। বর্তমানে সেখানে হরিণের সংখ্যা অর্ধশতাধিক। প্রতি দিন ভোরে এবং বিকেলে হরিণের দল এরশাদের মৎস্য খামারে পানি খেতে আসে। এরশাদের মৎস্য খামারকে ঘিরে রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের অর্ধশতাধিক ফিশ ঈগল। খামার থেকে মাছ খেয়ে এসব ঈগল জীবন ধারণ করে। জীববৈচিত্র্য রক্ষার স্বার্থে এসব পাখির জন্য প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেন না এরশাদ।

 



এরশাদের ফলজ ও বনজ বাগান
শুধু একের পর এক মৎস্য খামার করেই নিজেকে থামিয়ে রাখেননি এরশাদ মাহমুদ। মৎস্য খামারের পাশাপাশি এরশাদের রয়েছে ২০টির অধিক ফলজ ও বনজ গাছের বাগান। এর মধ্যে রয়েছে চার হাজার গাছের লিচু বাগান, ১০ হাজার গাছের আম বাগান, তিন হাজার গাছের কলা বাগান, পাঁচ হাজার গাছের মাল্টা ও কমলা বাগান। এ সব বাগান থেকে প্রতি মৌসুমে লাখ লাখ টাকার ফল বিক্রি হয় বলে এরশাদ মাহমুদ জানান। এখনো প্রতি সাপ্তাহিক বাজারে এরশাদের কলা বাগান থেকে সাত থেকে ১০ হাজার টাকার কলা বিক্রি হয়। এরশাদের বনজ গাছের মধ্যে রয়েছে ১০ হাজারেরও বেশি আগর ও সেগুন গাছ।

প্রধানমন্ত্রী পুরস্কার
এত সাফল্য, মাসে লাখ লাখ টাকা আয় হলেও এরশাদ মাহমুদ সাধারণ জীবন-যাপন করেন। নিজের খামারে শ্রমিকের মতো কাজ করেন। সাফল্যের স্বীকৃতিও পেয়েছেন তিনি। ২০১৩ সালে দেশে নাইলোটিকা মাছ উৎপাদনে বিশেষ অবদান রাখায় তাকে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ পুরস্কারে ভূষিত করা হয়। এরশাদ মাহমুদ বলেন, ‘‘পুরস্কার গ্রহণের সময় প্রধানমন্ত্রী আমাকে দেশের আমিষের অভাব পূরণে আরো বেশি বেশি কার্প জাতীয় মাছের উৎপাদন করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। আমি প্রধানমন্ত্রীর সেই উপদেশ মতো মাছ চাষে মনোযোগী হয়েছি।’’

ব্যক্তি জীবনে এরশাদ মাহমুদ
পাঁচ ভাই ও তিন বোনের মধ্যে এরশাদ মাহমুদ দ্বিতীয়। বাবা প্রয়াত অ্যাডভোকেট নুরুচ্ছফা তালুকদার ছিলেন চট্টগ্রাম আদালতের সিনিয়র আইনজীবী এবং পাবলিক প্রসিকিউটর। মা মৃত নুর নাহার বেগম। এরশাদ মাহমুদের বড় ভাই ড. হাছান মাহমুদ রাঙ্গুনিয়ার সংসদ সদস্য। সাবেক পরিবেশ ও বনমন্ত্রী। ছোট তিন ভাই চট্টগ্রামের প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী। ভাই-বোন ও পরিবারের সবাই শহরে আধুনিক জীবনে অভ্যস্ত। ব্যক্তি জীবনে এরশাদ মাহমুদ বিবাহিত এবং এক সন্তানের জনক। তার স্ত্রী শাকিলা আক্তার গৃহিণী। ছেলে আদেল সাদিক মাহমুদের বয়স ছয় বছর। 



রাইজিংবিডি/চট্টগ্রাম/১১ অক্টোবর ২০১৭/রেজাউল/বকুল

Walton
 
   
Marcel