ঢাকা, রবিবার, ৭ কার্তিক ১৪২৪, ২২ অক্টোবর ২০১৭
Risingbd
সর্বশেষ:

ডায়াবেটিসের ১০টি নীরব উপসর্গ

এস এম গল্প ইকবাল : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৭-০৯-২৬ ১১:৩১:৪৮ এএম     ||     আপডেট: ২০১৭-০৯-২৬ ১২:৩৯:২১ পিএম
প্রতীকী ছবি

এস এম গল্প ইকবাল : আমেরিকান অ্যাসোসিয়েশন অব ডায়াবেটিস এডুকেটরসের মুখপাত্র, ইলিনয়েসের সনদপ্রাপ্ত ডায়াবেটিস শিক্ষক এবং রেজিস্টার্ড ডায়েটিশিয়ান মেলিসা জয় ডবিনস বলেন, ‘ডায়াবেটিস এমন না যে আপনি একদিন জেগে ওঠলেন এবং হঠাৎ করে আপনার তৃষ্ণা লাগছে, ক্ষুধা লাগছে ও ঘনঘন বাথরুমে যেতে হচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘ডায়াবেটিস ধীরে ধীরে হয়।’ হার্ভার্ড মেডিক্যাল স্কুলের মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক, জসলিন ডায়াবেটিস সেন্টারের স্টাফ ফিজিশিয়ান এবং মেডিক্যাল ডাক্তার অ্যারন সাইপেস বলেন, ‘বাস্তবিকপক্ষে, বেশিরভাগ মানুষ ডায়াবেটিসের প্রাথমিক পর্যায়, এমনকি মাধ্যমিক পর্যায়েও জ্ঞাত থাকে না যে তাদের ডায়াবেটিস আছে।’ তিনি যোগ করেন, ‘ডায়াবেটিসের এসব পর্যায়ে আপনি উদ্দীপিত না হওয়ার মানে এই নয় যে আপনি ডায়াবেটিস সংশ্লিষ্ট সমস্যা থেকে রেহাই পাচ্ছেন।’

আপনি যত সময় ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ না করে পার করবেন, আপনার তত বেশি হৃদরোগ, কিডনি রোগ, অঙ্গচ্ছেদ, অন্ধত্ব এবং অন্যান্য মারাত্মক জটিলতার ঝুঁকি বেড়ে যায়। ড. সাইপেস বলেন, ‘আমরা পরামর্শ দিচ্ছি যে ডায়াবেটিস রোগীরা ডায়াবেটিসের ঝুঁকিপূর্ণ বিষয়সমূহ (যেমন- পারিবারিক ইতিহাস, ওজন বেড়ে যাওয়া ইত্যাদি) যেন নিয়মিত মূল্যায়ন করেন।’ আপনি যদি অসুস্থতাবোধ করেন, তাহলে সাধারণ রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে ডায়াবেটিস রোগ নির্ণয়ের জন্য ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলুন।

নিচের সূক্ষ্ম ডায়াবেটিস উপসর্গগুলোকে ডায়াবেটিসের নীরব উপসর্গ বলা যায়। এসব উপসর্গের ব্যাপারে লোকে সচেতন বা জ্ঞাত থাকে না বললেই চলে। এবার জেনে নেওয়া যাক ডায়াবেটিসের ১০টি নীরব উপসর্গ সম্পর্কে।

১. আপনি স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি পিপাসার্ত হন
প্রচুর পরিমাণে মূত্রত্যাগ আপনাকে বিশুষ্ক বা পিপাসার্ত করে তুলবে। ডবিনস ডায়াবেটিস রোগীদের কমন একটি উপসর্গ লক্ষ্য করেন: ডায়াবেটিস রোগীরা তৃষ্ণা মেটাতে বিভিন্ন পানীয়ের (যেমন- জুস, সোডা, চকলেট মিল্ক) দিকে ঝুঁকে। এসব শর্করাযুক্ত পানীয়ের অতিরিক্ত শর্করা ব্লাডস্ট্রিমকে পূর্ণ করে। এ কারণে রোগীরা সমস্যার দিকে এগিয়ে যায়।

২. আপনি অল্প ওজন হারিয়েছেন
ডায়াবেটিসের একটি ঝুঁকিপূর্ণ বিষয় হচ্ছে স্থূলতা বা ওজন বেড়ে যাওয়া। অন্যদিকে, কয়েক পাউন্ড ওজন কমে যাওয়া হতে পারে ডায়াবেটিসের নীরব উপসর্গের একটি। ড. সাইপেস বলেন, ‘দুটি কারণে ওজন হারাতে পারে। একটি হচ্ছে, আপনি যে পানি হারান (মূত্রত্যাগের মাধ্যমে)। দ্বিতীয়টি হচ্ছে, আপনি প্রস্রাবের সঙ্গে কিছু ক্যালরি হারান এবং আপনার শরীর রক্তের শর্করা থেকে সব ক্যালরি শোষণ করতে পারে না। যাদের ডায়াবেটিস আছে তারা যদি রক্তের শর্করা নিয়ন্ত্রণ করে, তাহলে কিছু ওজন বেড়ে যেতে পারে। ড. সাইপেসের মতে এটি একটি ভালো দিক। কারণ এর দ্বারা রক্ত শর্করার মাত্রায় ভারসাম্য আসে।

৩. আপনি বাথরুমে বেশি যান
ডবিনস বলেন, ‘আপনার ডায়াবেটিস থাকলে খাবারের শর্করা নিয়ন্ত্রণে শরীরের কার্যক্ষমতা কমে যাবে, তাই ব্লাডস্ট্রিমে শর্করার পরিমাণ বেড়ে যাবে।’ তিনি বলেন, ‘আপনার শরীর এসব শর্করাকে প্রস্রাবে পাঠিয়ে শর্করামুক্ত হয়।’ তাই বেশি করে বাথরুমে যাওয়া ডায়াবেটিসের একটি উপসর্গ হতে পারে। ড. সাইপেস বলেন, ‘অধিকাংশ রোগীরা কতবার বাথরুম ব্যবহার করে তার ব্যাপারে অপরিহার্যভাবে সচেতন থাকে না।’ তিনি আরো বলেন, ‘যখন আমরা রোগীদেরকে প্রস্রাবের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করি, উত্তর হিসেবে শুনি: ওহ, হ্যাঁ, আমার মনে হয় আমি স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বাথরুমে যাই।’ আপনার জন্য সতর্কতামূলক প্রশ্ন হচ্ছে, আপনার রাতে কতবার প্রস্রাবের জন্য জাগার প্রয়োজন হয়? এক বা দুই বার স্বাভাবিক হতে পারে, কিন্তু প্রস্রাব ত্যাগের জন্য জাগরণের আধিক্য ডায়াবেটিসের উপসর্গ হতে পারে।

৪. আপনি অস্থির এবং ক্ষুধার্ত হন
নিউ মেক্সিকোর একটি এন্ডোক্রাইনোলজি ক্লিনিকের নার্স প্র্যাকটিশনার এবং আমেরিকান ডায়াবেটিস অ্যাসোসিয়েশনের হেলথ কেয়ার অ্যান্ড এডুকেশনের ২০১৪ সালের সভাপতি মার্জোরি সাইপ্রেস বলেন, ‘হঠাৎ অস্থির হওয়া এবং অবিলম্বে কার্বোহাইড্রেটর প্রয়োজন দেখা দেওয়া ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য বিরল কিছু নয়।’ তিনি ব্যাখ্যা করেন, ‘যখন আপনার উচ্চ রক্ত শর্করা থাকবে, তখন শর্করা নিয়ন্ত্রণ করতে শরীরের সমস্যা হবে।’ তিনি আরো বলেন, ‘আপনি যদি উচ্চ কার্বোহাইড্রেট সমৃদ্ধ কোনো কিছু খান, আপনার শরীর একটু অত্যধিক ইনসুলিন নিঃসরণ করে এবং দ্রুত আপনার শর্করা কমে যায়। এটি আপনাকে অস্থির করে তুলবে এবং কার্বোহাইড্রেট বা শর্করা পাওয়ার জন্য আপনার আকাঙ্ক্ষাকে জাগ্রত করবে। এ অবস্থা আপনাকে ভিশাচ সাইকেল বা দুষ্ট চক্রের দিকে নিয়ে যেতে পারে।’

৫. আপনি সবসময় ক্লান্ত হন
আপনি নিশ্চয় প্রতিনিয়ত ক্লান্ত হন। অগ্রসরমান ক্লান্তি মনোযোগ দেওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি উপসর্গ। এ ক্লান্তি আপনি শরীরে শক্তির জন্য যা খাচ্ছেন তা শরীরে সঠিকভাবে মিশ্রিত না হওয়া এবং যেসব কোষের জন্য এসব খাওয়া হচ্ছে তাদের নিকট শর্করা পৌঁছতে না পারার কারণে হতে পারে। ডবিনস বলেন, ‘আপনার শরীরের জন্য যা প্রয়োজন আপনি তা পাচ্ছেন না।’ এর ফলাফল প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আপনি ক্লান্ত হয়ে যাচ্ছেন এবং আলস্যবোধ করছেন।’ অনেক সময় টাইপ ২ ডায়াবেটিসের ক্ষেত্রে অল্প সময়ের জন্য আপনার শর্করা বেড়ে যেতে পারে। তাই ডায়াবেটিসের এ উপসর্গ ধীরে ধীরে আসতে পারে।

৬. আপনি বিষণ্ন ও বদমেজাজী হন
সাইপ্রেস বলেন, ‘আপনার রক্ত শর্করা কাজ না করলে আপনি শুধুমাত্র খারাপবোধ করবেন না, আপনি বদমেজাজীও হতে পারেন।’ প্রকৃতপক্ষে, উচ্চ রক্ত শর্করা বিষণ্নতার মতো উপসর্গকে বয়ে আনতে পারে। সাইপ্রেস বলেন, ‘আপনি খুব ক্লান্ত অনুভব করবেন, কোনো কিছু করতে মন চাবে না এবং বাইরে বের হতে চাবেন না, শুধুমাত্র ঘুমাতে ইচ্ছে হবে।’ তিনি সেসব রোগীদের দেখবেন, যারা মনে করে তাদের বিষণ্নতার চিকিৎসার প্রয়োজন। তাদের রক্ত শর্করা স্বাভাবিক পাওয়া গেলে তিনি মেজাজ উন্নয়নে গুরুত্ব দেবেন।

৭. আপনার দৃষ্টি ঝাপসা মনে হয়
আপনার কি দৃষ্টি ঝাপসা মনে হয়? এ প্রসঙ্গে ড. সাইপেস বলেন, ‘আতঙ্কিত হবেন না। এটি ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথি বা রেটিনা ক্ষয়ের ফলাফল নয়, রেটিনোপ্যাথি হলে চোখের পেছনে রক্তনালী ক্ষতিগ্রস্ত হয়।’ ডায়াবেটিসের প্রাথমিক ধাপে চোখের লেন্স ভালোভাবে ফোকাস করতে পারে না, কারণ চোখে শর্করা জমে যা সাময়িকভাবে লেন্সের গঠনের পরিবর্তন করে। ড. সাইপেস বলেন, ‘আপনি ডায়াবেটিসের কারণে অন্ধ হয়ে যাবেন না।’ তিনি রোগীদের আশ্বস্ত করেন, প্রায় ছয় থেকে আট সপ্তাহ পর আপনার রক্ত শর্করা স্থিতিশীল হয়ে যাবে, আপনি আর ঝাপসা দেখবেন না, আপনার চোখ খাপ খাইয়ে নেবে।

৮. আপনার কাটা ও ক্ষত খুব ধীরে সারে
ড. সাইপেস ব্যাখ্যা দেন, ‘আপনার রক্ত শর্করার মাত্রা উচ্চ হলে শরীরের ইমিউন সিস্টেম এবং শরীর আরোগ্যলাভের প্রক্রিয়া ভালোভাবে কাজ করে না।’ এ কারণে শরীরের কোথাও কেটে গেলে, ক্ষত হলে কিংবা আঁচড় লাগলে সেরে ওঠতে দেরি হয়।

৯. আপনার পা অসাড় হয়
আপনার যে ডায়াবেটিস আছে তা উপলব্ধি করার আগেই উচ্চ মাত্রার শর্করা নানারকম জটিলতার সৃষ্টি করতে পারে। ড. সাইপ্রেস বলেন, এসব জটিলতার একটি হচ্ছে কোমল স্নায়ুর ক্ষতিগ্রস্ততা, যা আপনার পায়ে অসাড়তা সৃষ্টি করে।

১০. আপনার ইউরিনারি ট্র্যাক্ট ইনফেকশন ও ইস্ট ইনফেকশন আছে
প্রস্রাবে উচ্চ মাত্রার শর্করা থাকার কারণে যোনিনালী ব্যাকটেরিয়া ও ইস্টের প্রজনন স্থল হয়ে যেতে পারে, যার ফলে ইউরিনারি ট্র্যাক্ট ইনফেকশন বা মূত্রনালীর সংক্রমণ এবং ইস্ট ইনফেকশন বা ছত্রাক সংক্রমণ হতে পারে। আবৃত্তিশীল ইনফেকশন উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সাইপ্রেস বলেন, সাধারণত আপনার ইনফেকশন হলে ডাক্তার ডায়াবেটিস আছে কিনা নির্ণয় করবেন, যদি ইতোপূর্বে আপনার তা না থাকে। তিনি বলেন, যেসব নারীরা ইউরিনারি ট্র্যাক্ট ইনফেকশনের কারণে ইমার্জেন্সি রুমে যায়, তাদের ইনফেকশন প্রায়ক্ষেত্রে প্রতিহত করা হয়।

তথ্যসূত্র : রিডার্স ডাইজেস্ট

 

 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৭/ফিরোজ

Walton
 
   
Marcel