ঢাকা, শুক্রবার, ৩০ অগ্রহায়ণ ১৪২৪, ১৫ ডিসেম্বর ২০১৭
Risingbd
সর্বশেষ:

অপ্রত্যাশিত ওজন হ্রাসের ৯ কারণ

এস এম গল্প ইকবাল : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৭-১২-০৬ ৮:৫৬:০২ এএম     ||     আপডেট: ২০১৭-১২-০৬ ১২:৫১:১৭ পিএম
প্রতীকী ছবি

এস এম গল্প ইকবাল : আপনি যদি ওজন কমানোর কোনো পন্থা অবলম্বন করেন এবং দেখা যাচ্ছে যে সত্যি সত্যি আপনার ওজন কমছে, তাহলে আপনাকে অভিনন্দন! এতে আপনার প্রত্যাশা অনুযায়ী কাজ হচ্ছে।

কিন্তু যদি অনিচ্ছাকৃতভাবে বা অপ্রত্যাশিতভাবে ওজন হারান, তাহলে সেলিব্রেশন করবেন না। আপনার ওজন হচ্ছে আপনার সার্বিক স্বাস্থ্যের মার্কার এবং ওজনের বড় ধরনের হ্রাসবৃদ্ধির মানে হচ্ছে আপনার গুরুতর কোনো সমস্যা বা রোগ আছে।

কোনো প্রচেষ্টা ছাড়া যদি আপনার ওজন হ্রাস পায়, তাহলে ডাক্তারের শরণাপন্ন হোন এবং ওজন হ্রাসের প্রকৃত কারণ নির্ণয় করতে প্রয়োজনীয় মেডিক্যাল পরীক্ষা করান।

মাউন্ট সিনাইয়ে অবস্থিত আইকান স্কুল অব মেডিসিনের ডায়াবেটিস, এন্ডোক্রিনোলজি অ্যান্ড বোন ডিজিজের অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর রেশমি শ্রীনাথ বলেন, ‘যদি আপনি তিন থেকে ছয় মাসের মধ্যে আপনার শরীরের ওজন ৫ থেকে ১০ শতাংশ হারান, তাহলে আপনার চেক আউট করার প্রয়োজন হবে।’ উদাহরণস্বরূপ, যদি আপনি কোনো প্রচেষ্টা ব্যতিরেকে কয়েক মাসের মধ্যে ১৫ পাউন্ড ওজন হারান, তাহলে তা হতে পারে আপনার স্বাস্থ্যের কোনো অবনতির লক্ষণ। আপনার টাইট-ফিট ড্রেস ঢিলেঢালা হয়ে গেলেও আপনার ডাক্তারের কাছে যাওয়া উচিত হবে।

ডাক্তারের সঙ্গে অ্যাপয়েন্টমেন্টের পূর্বে আপনার লাইফস্টাইল, খাদ্যাভ্যাস এবং ঘুমের শিডিউলে কোনো পরিবর্তন এসেছে কিনা এবং স্বাস্থ্য সমস্যার কোনো উপসর্গ (যেমন- ক্লান্তি বা মাথাব্যথা) দেখা দিয়েছে কিনা মাথায় গেঁথে নিন বা কাগজে লিখে নিন। ওজন হ্রাসের সঠিক কারণ নির্ণয়ে এসব বিষয় সাহায্য করবে।

এ প্রতিবেদনে অপ্রত্যাশিত ওজন হ্রাসের ৯টি কারণ তুলে ধরা হল।

১. ক্যানসার

ক্যানসার দ্রুত ওজন হ্রাস করে। ডা. রেশমি শ্রীনাথ বলেন, ‘যদি কেউ আকস্মিক ওজন হ্রাসের রিপোর্ট করে এবং বলে যে তাদের খাবার গ্রহণ, এক্সারসাইজ রুটিন এবং ওষুধে কোনো পরিবর্তন আসেনি, তাহলে এটি ক্যানসারের মতো মারাত্মক কোনো রোগের লক্ষণ হতে পারে।’ রেজিস্টার্ড ডায়েটিশিয়ান মায়া ফেলার বলেন, ‘ওয়াস্টিং সিন্ড্রোম বা ক্যানসার ক্যাকেক্সিয়া বা কমপক্ষে ১০ শতাংশ অপ্রত্যাশিত ওজন হ্রাসের সঙ্গে অনেক ক্যানসার সম্পর্কযুক্ত।’ তিনি বলেন, ‘সিস্টেমিক প্রদাহ, নেগেটিভ প্রোটিন ও এনার্জি ব্যালেন্স, স্বাস্থ্যবান শরীর বা অপ্রয়োজনীয় চর্বিমুক্ত শরীরের অপ্রত্যাশিত ওজন হ্রাস দ্বারা ক্যানসার ক্যাকেক্সিয়া চিহ্নিত করা যায়।’ এটি বেশিরভাগ ক্ষেত্রে গ্যাস্ট্রিক ও অগ্ন্যাশয় ক্যানসারের শেষ পর্যায়ে ঘটে থাকে এবং ফুসফুস, মাথা ও গলা এবং কোলরেক্টাল ক্যানসারের ক্ষেত্রেও তা ঘটে থাকে।

২. স্ট্রেস

ডা. রেশমি শ্রীনাথ বলেন, ‘আমার কাছে এমন কিছু লোক আসে যারা কর্মক্ষেত্রে চাপে পড়েছে বা পরিবারের সঙ্গে অপ্রত্যাশিত উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে কিংবা সোশ্যাল স্ট্রেসের বা সামাজিক চাপ সৃষ্টিকারী অ্যাজেন্টের দ্বারা প্ররোচিত হয়েছে এবং তারা খাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে অর্থাৎ তাদের ক্ষুধা হ্রাস পেয়েছে।’ এই ক্ষুধা হ্রাস ‘ফাইট অর ফ্লাইট হরমোন’ এর সঙ্গে আবদ্ধ যা আপনি স্ট্রেস বা মানসিক চাপে পড়লে আপনার শরীর নিঃসরণ করে। ডায়েটিশিয়ান ফেলার বলেন, ‘ব্রেইনের হাইপোথ্যালামাস নামে একটি স্ট্রাকচার ‘কর্টিকোট্রপিন-রিলিজিং হরমোন’ উৎপাদন করে যা ক্ষুধাকে দমন করে।’ তিনি বলেন, ‘ব্রেইন এপিনেফ্রাইন বা অ্যাড্রিনালাইন হরমোন উৎপাদনের জন্য কিডনির উপর অবস্থিত অ্যাড্রিনাল গ্ল্যান্ডকে মেসেজ পাঠায়, যা শরীরের ফাইট-অর-ফ্লাইট রেসপন্সকে উদ্দীপিত করে এবং এর ফলে আপনার ক্ষুধা সাময়িকভাবে দমিত হবে।’ আপনার ক্ষুধা না থাকলে খাবারের প্রতি আপনার অনীহা থাকবে যা ওজন হ্রাসের কারণ।

৩. অন্ত্রের রোগ

ডা. রেশমি শ্রীনাথ বলেন, ‘সেলিয়াক রোগ, ক্রোন’স রোগ, ল্যাকটোজ ইনটলারেন্স এবং অন্ত্রের ড্যামেজ ওজন হ্রাস করে, কারণ এসব ম্যালঅ্যাবজরপশন ঘটায় অর্থাৎ পরিপোষক পদার্থ বা পুষ্টি শোষণ ক্ষমতা হ্রাস বা ব্যাহত করে।’ কোনো কিছু অন্ত্রকে প্রয়োজনীয় পরিপোষক পদার্থ শোষণে বিরত রাখলে তাকে ম্যালঅ্যাবজরপশন বলে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে অন্ত্ররোগের চিকিৎসা সহজেই করা যায়, যেমন- সেলিয়াক রোগের ক্ষেত্রে গ্লুটেনমুক্ত ডায়েট গ্রহণ করা। কিন্তু অন্ত্ররোগ ডায়াগনোসিস করার জন্য আপনার একজন গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিস্টের কাছে যাওয়া উচিত।

৪. ডায়াবেটিস

যখন লোকদের প্রথম ডায়াবেটিস ডায়াগনোসিস করা হয়, তারা প্রচুর ওজন হারান। ডা. রেশমি শ্রীনাথ বলেন, ‘এর কারণ হচ্ছে তাদের শর্করা এত বেশি যা প্রকৃতপক্ষে তাদের কিডনিসমূহ এবং তাদের সিস্টেমকে আচ্ছন্ন করে রাখে। তারা ফুয়েলের জন্য রক্ত শর্করা ব্যবহার করতে সমর্থ হয় না, রক্ত শর্করা কিডনি দ্বারা শুধুমাত্র পরিস্রাবিত ও নিষ্কাশিত হয়ে যায়। তাই শর্করার যেখানে যাওয়া প্রয়োজন (যেমন- মাংসপেশি, হাড়) সেখানে না গিয়ে হারিয়ে যায়।’ সাধারণত যেসব লোকদের মধ্যে ডায়াবেটিস ডেভেলপ করছে তাদের মধ্যে অত্যধিক তৃষ্ণা, প্রস্রাবের প্রবণতা বৃদ্ধি, দৃষ্টির অস্পষ্টতা এবং হাতে ও পায়ে অসাড়তার লক্ষণ দেখা দেয়।

৫. থাইরয়েড রোগ

আপনার থাইরয়েড আপনার মেটাবলিজম বা বিপাক নিয়ন্ত্রণ করে, তাই এটি আমাদের সেন্স দেয় যে থাইরয়েড সমস্যা ওজন সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। হাই মেটাবলিজম বা উচ্চ বিপাকের জন্য আপনি ওজন হারাতে পারেন। অত্যধিক উচ্চ বিপাক স্বাস্থ্যের ক্ষতি ক্ষতি করতে পারে। ডা. রেশমি শ্রীনাথ বলেন, ‘যদি কারো ওভারঅ্যাক্টিভ থাইরয়েড থাকে (এ রোগটিকে হাইপারথাইরয়েডিজম বলে), তাদের দ্রুত ওজন হ্রাস পেতে পারে এবং মাঝেমাঝে এর সঙ্গে অতিরিক্ত সমস্যা যুক্ত হতে পারে, যেমন- হৃদস্পন্দন বৃদ্ধি, অধিক উদ্বেগ, ভীষণ নার্ভাসনেস ও শিহরণ এবং অনিদ্রা।’

৬. অ্যাড্রিনাল ঘাটতি

অ্যাড্রিনাল ঘাটতি অ্যাডিসন’স রোগ নামেও পরিচিত যা শরীর পর্যাপ্ত করটিসল উৎপাদন করতে না পারলে হয়ে থাকে। এই করটিসল সেই করটিসল যা স্ট্রেস রেসপন্সের সঙ্গে জড়িত। ডা. রেশমি শ্রীনাথ ব্যাখ্যা করেন, ‘হাই স্ট্রেস বা উচ্চ মানসিক চাপে আপনার শরীরে প্রচুর পরিমাণে করটিসল উৎপাদন হয় যা নরমাল রেসপন্স বা স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া। যেসব লোকদের খুব নিম্ন মাত্রায় করটিসল থাকে তাদের মধ্যে এই নরমাল স্ট্রেস রেসপন্স হতে পারে না, তাই তারা সুপার সিক বা খুব অসুস্থ হয়ে যায়।’ তিনি যোগ করেন, ‘অ্যাড্রিনাল ঘাটতির জন্য সাধারণত দ্রুত ওজন হ্রাস, বমিবমি ভাব, মস্তিষ্ক দুর্বল হওয়া বা সংজ্ঞা হারানো এবং অন্যান্য ইনফেকশন হয়ে থাকে।’

৭. রিউম্যাটয়েড আর্থ্রাইটিস

রিউম্যাটয়েড আর্থ্রাইটিস হচ্ছে, দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহমূলক ব্যাধি যা আপনার জয়েন্টের ক্ষতি করে এবং এটিও আপনার ওজন হ্রাসে ভূমিকা পালন করতে পারে। ডায়েটিশিয়ান ফেলার ব্যাখ্যা করেন, ‘এর কারণ হচ্ছে- রিউম্যাটয়েড আর্থ্রাইটিসের ক্ষেত্রে, প্রো-ইনফ্ল্যামেটরি সাইটোকিন শুধুমাত্র প্রদাহকে উদ্দীপিত করে না, শক্তি ব্যয়ও বৃদ্ধি করে, যার মানে হচ্ছে প্রতিদিন বেশি করে ক্যালরি ও চর্বি পুড়ছে।’ বেশিরভাগ ক্ষেত্রে রিউম্যাটয়েড আর্থ্রাইটিস ৩০ থেকে ৫০ বয়সের মধ্যে ডেভেলপ করা শুরু করে।

৮. বিষণ্নতা

ক্ষুধা কমে যাওয়া এবং ওজন হ্রাস পাওয়া হচ্ছে, ডিপ্রেশন বা বিষণ্নতার কমন উপসর্গ। ডায়েটিশিয়ান ফেলার বলেন, বিষণ্নতায় ভোগা লোকের শক্তি হ্রাস পেতে পারে এবং অনেক বিষয়ে তাদের আগ্রহ কমে যেতে পারে। খাবারের প্রতিও তাদের উদাসীনতা দেখা দেয় ও কম খাবার গ্রহণ করে, যার ফলে ওজনও কমে যায়।

৯. প্যারাসাইট

মাউন্ট সিনাইয়ে অবস্থিত আইকান স্কুল অব মেডিসিনের মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক প্যাসকেল এম. হোয়াইট বলেন, ‘এমন অনেক উপসর্গ আছে যা প্যারাসাইট বা পরজীবীর সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত, বিশেষ করে পাকস্থলী ও অন্ত্র সম্পর্কিত উপসর্গসমূহ, যেমন- হেলমিন্থস বা কৃমিরোগ এবং প্রোটোজোয়া।’ তিনি বলেন, ‘ডায়রিয়া, বমিবমি ভাব, বমি এবং ক্ষুধার অভাব অনিচ্ছাকৃত ওজন হ্রাসে অবদান রাখতে পারে।’

তথ্যসূত্র : রিডার্স ডাইজেস্ট



রাইজিংবিডি/ঢাকা/৬ ডিসেম্বর ২০১৭/ফিরোজ

Walton
 
   
Marcel