ঢাকা, শনিবার, ৩ ভাদ্র ১৪২৫, ১৮ আগস্ট ২০১৮
Risingbd
শোকাবহ অগাস্ট
সর্বশেষ:

বিপদে রক্ত সংগ্রহ করে দেবে ‘ব্লাড ম্যানেজার’

ছাইফুল ইসলাম মাছুম : রাইজিংবিডি ডট কম
 
     
প্রকাশ: ২০১৮-০৭-১৭ ২:২৫:৪৮ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৮-০৭-১৭ ৩:১৭:২০ পিএম

ছাইফুল ইসলাম মাছুম : ‘আমরা চাইলে রক্ত কৃত্রিমভাবে তৈরি করতে পারি না। শুধুমাত্র মানুষই পারে রক্ত দিয়ে মানুষকে বাঁচাতে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি, প্রতিবছর বহুসংখ্যক মানুষ মারা যাচ্ছে জরুরি মুহূর্তে প্রয়োজনীয় রক্তের অভাবে। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রতি বছর রক্তের প্রয়োজন ৯ লাখ ব্যাগ। অথচ জনবহুল এই দেশে এখনো মানুষ মারা যাচ্ছে রক্তের অভাবে। আমরা চাই না, রক্তের অভাবে আর কোনো মানুষের মৃত্যু হোক।’ কথাগুলো বলছিলেন বাংলাদেশ ব্লাড ডোনারস ফোরামের কেন্দ্রীয় সভাপতি কামরুল হাসান।

রক্ত নিয়ে কাজ করেন কামরুল হাসানের সংগঠন বাংলাদেশ ব্লাড ডোনারস ফোরাম। যেখানে রক্তের প্রয়োজন, সেখানে ছুটে চলেন তারা। রক্ত সংগ্রহ করে বাঁচিয়ে তোলেন মুমূর্ষু রোগীর প্রাণ। ‘নিরাপদ হোক রক্তদান, আমার রক্তে বাঁচুক প্রাণ’ এই স্লোগান নিয়ে ২০১৪ সাল থেকে কাজ শুরু করেছে তরুণ স্বেচ্ছাসেবকদের এই সংগঠন।

সংগঠনটির শুরুর গল্প বলতে গিয়ে সভাপতি কামরুল হাসান বলেন, ‘আমার এক আত্মীয়ের সিজার অপারেশনের জন্য বিরল এ নেগেটিভ গ্রুপের রক্তের প্রয়োজন হয়। সেই রক্তের জন্য হন্যে হয়ে রক্তদাতা খুঁজেছি আমরা। বিভিন্ন ব্লাড ব্যাংক আর মেডিকেলগুলোতে কোথাও খুঁজে পাচ্ছিলাম না দুর্লভ গ্রুপের এই রক্ত। এদিকে চিকিৎসক জানালেন, দ্রুত সিজার করতে না পারলে বড় ধরনের সমস্যা হতে পারে। এরপর দিশেহারা হয়ে সবাইকে ফোন দেওয়া শুরু করলাম। রক্তের প্রয়োজন নিয়ে পোস্ট করলাম ফেসবুকেও। আমার এক বন্ধু মেহেদী এ ধরনের সেবামূলক কাজের সঙ্গে জড়িত থাকায় মাত্র আধা ঘণ্টার মধ্যে এক ব্যাগ এ নেগেটিভ রক্তদাতা খুঁজে পেয়েছিলাম। এত দ্রুত রক্তদাতা খুঁজে পেয়ে কিছুটা অবাকই হয়েছিলাম। সেদিন প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, আজ থেকে রক্তের প্রয়োজনে মানুষকে সাধ্যমতো সহযোগিতা করবো। সেই অনুযায়ী কাজ করতে গিয়ে দেশের বিভিন্ন জেলার স্বেচ্ছাসেবকদের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়। আমি চিন্তা করতে থাকি কীভাবে দেশের সকল স্বেচ্ছাসেবক ও রক্তদাতাদের একটি প্লাটফর্মে নিয়ে আসা যায়। যাতে দেশের যেকোনো প্রান্তে খুব দ্রুত রক্তদাতা খুঁজে পাওয়া সম্ভব। এই চিন্তা থেকে ফেসবুকে বিভিন্ন জেলার স্বেচ্ছাসেবী সংগঠকদের নিয়ে একটি ফেসবুক গ্রুপ খুলি। জেনে নিই, কে কীভাবে কাজ করছে। বুঝতে পারলাম বেশিরভাগ স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলো কাজ করছে নিজ জেলা বা উপজেলাভিত্তিক। তাই আমি সিদ্ধান্ত নিলাম সারাদেশে ছড়িয়ে দেবো বাংলাদেশ ব্লাড ডোনারস ফোরামের কার্যক্রম।’

কামরুল হাসান দেশের ৬৪ জেলায় ছড়িয়ে দিয়েছেন রক্ত দানের সামাজিক আন্দোলন। এখন পর্যন্ত মুমূর্ষু রোগীদের ২৫ হাজার ব্যাগ রক্ত সংগ্রহ করে দিয়েছেন তারা। রক্ত সংগ্রহের পাশাপাশি মাঠ পর্যায়েও শুরু করেছেন বিনামূল্যে রক্তের গ্রুপ নির্ণয় ও রক্তদানে জনসচেতনতামূলক কর্মসূচি। বর্তমানে ২১ সদস্যের কেন্দ্রীয় কমিটি ছাড়াও প্রত্যেক জেলায় সংগঠনটির শাখা কমিটি রয়েছে।

 


বাংলাদেশ ব্লাড ডোনারস ফোরাম রক্তদান কার্যক্রমকে আরো সহজ করতে সম্প্রতি ‘ব্লাড ম্যানেজার’ নামে একটি অ্যাপ চালু করেছে। যেখানে খুব সহজেই সারাদেশের ৬৪ জেলার রক্তদাতার সন্ধান মিলবে। অ্যাপটিতে সারাদেশের স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকদের ছবিসহ বিস্তারিত তথ্য দেওয়া আছে। অর্থাৎ যার জেলায় রক্তের প্রয়োজন হবে অ্যাপটির মাধ্যমে রক্তগ্রহীতারা সেই জেলায় স্বেচ্ছাসেবকের মাধ্যমে যোগাযোগ করে রক্তদাতার সন্ধান পাবেন। এছাড়াও সরাসরি অ্যাপ থেকে সার্চ করে যেকোনো গ্রুপের রক্তদাতা খুঁজে নেওয়া যাবে। অ্যাপটিতে রক্তদাতারা নিজের ছবিসহ নিবন্ধন করে সহজেই রক্তদান কার্যক্রমে অংশ নিতে পারবেন। ‘ব্লাড ম্যানেজার’ অ্যাপটির বিশেষ সুবিধা হচ্ছে, নিবন্ধিত রক্তদাতাদের ৪ মাস পরপর রক্তদানের সময় অটো গ্রিন সিগন্যাল কালারের মাধ্যমে মনে করিয়ে দেবে তিনি রক্ত দিতে পারবেন। যাদের ৪ মাস সময় হয়নি তাদের লাল কালার সিগন্যাল দিয়ে মনে করাবে তার এখনো রক্তদানের উপযুক্ত হননি। অ্যাপটির মাধ্যমে মেডিকেল টিমের সঙ্গে যোগাযোগ করে বিনামূল্যে চিকিৎসা নেওয়া যাবে। রক্তদানের সচেতনতা ও উপকারিতা সম্পর্কে বিস্তরিত তথ্যও জানা যাবে। রক্তদানকেন্দ্রীক এ ধরনের ব্যতিক্রমী অ্যাপ বাংলাদেশে প্রথম।

ফেসবুক কর্তৃপক্ষ থেকে স্বীকৃতি পেয়েছে সংগঠনটি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক টিম বাংলাদেশে এসে রক্তদান নিয়ে একটি সেমিনারের আয়োজন করে। সেখানে বাংলাদেশ ব্লাড ডোনারস ফোরামকে সম্মাননা দেয় ফেসবুক কর্তৃপক্ষ। কামরুল বললেন, আমরা সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছিলাম প্রোগ্রামে যাবো কিনা, যাবার পর তাদের কথা শুনে মুগ্ধ হয়ে কাজের গতি আরো বেড়ে গেল। সংগঠনটি কাজের স্বীকৃতি হিসেবে অর্জন করেছে পুলিশ ব্লাড ব্যাংক, লায়নস ক্লাব, বীর প্রতীক কর্নেল (অবঃ) দিদারুল ফাউন্ডেশন থেকে সম্মাননা ক্রেস্ট।

ভবিষ্যতে ৬৪ জেলায় রক্তদাতার সন্ধান দিতে কল সেন্টার চালু করারও পরিকল্পনার কথা জানান কামরুল হাসান। তিনি বলেন, ‘রক্তের অভাবে যাতে একটিও রোগীর মৃত্যু না হয় সেই স্বপ্ন দেখছি। একদিন আমাদের এই প্রজন্মই রক্ত সঙ্কটের সমাধান করবে।’

অ্যাপটি গুগল প্লে-স্টোরে blood manager নামে পাওয়া যাচ্ছে।




রাইজিংবিডি/ঢাকা/১৭ জুলাই ২০১৮/ফিরোজ/তারা

Walton Laptop
 
     
Walton