ঢাকা, সোমবার, ৬ কার্তিক ১৪২৫, ২২ অক্টোবর ২০১৮
Risingbd
সর্বশেষ:

যে চোখে শরৎ দেখেছি || আফসানা বেগম

আফসানা বেগম : রাইজিংবিডি ডট কম
 
     
প্রকাশ: ২০১৭-০৯-২২ ২:৩৮:২১ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৮-১০-২১ ২:১৭:১৪ পিএম

অন্য বহু কারণ বাদ দিয়ে অনেক সময় নিজের জন্মের সার্থকতার জন্য কেবল একটি কারণকেই বাহবা দিতে ইচ্ছে করে, যা হলো, এমন একটি অঞ্চলে জন্মেছি এবং বেড়ে উঠেছি যেখানে ছয়-ছয়টি ঋতু জানান দিয়ে আসে আর যায়; হাজার ব্যস্ততাতেও তাদের আগমন, উপস্থিতি কিংবা তিরোধান কিছুতেই এড়ানো যায় না। এই ভাবনাটা আরো বেশি করে মনে এলো যখন কাজের প্রয়োজনে পৃথিবীর এমন কোথাও দিনের পর দিন থাকতে হয়েছে বা হচ্ছে, যেখানে বলতে গেলে ঋতু পরিবর্তন বলে কিছু নেই। সারাবছর এক আবহাওয়া, হোক না সে আরামদায়ক বসন্ত! অজায়গায় বসে বসে ভাবি, এখানে জন্মালে কী হতো রবীন্দ্রনাথের ষড়ঋতুর গানের, আদৌ লেখা হতো কি? ঋতুর পরিবর্তন কেন্দ্র করে এই যে আজীবন নিজের মধ্যে মানসিক তথা শারীরিক পরিবর্তন দেখেছি, কখনো বসন্তের রঙে নিজেকে রাঙিয়েছি, কখনো শীতে কুঁকড়ে গেছি, কখনো গ্রীষ্মের ঘামে ভিজে আবার বর্ষায় শীতল হয়েছি, শরতের স্নিগ্ধ আভা সারা শরীরে আবীরের মতো লেগে থেকেছে, এ সমস্ত কী করে হতো এই অঞ্চলে না জন্মালে!

বেড়ে ওঠার পেছনে প্রতি বছরে প্রতি ঋতুর ফেলে যাওয়া চিহ্নের অবদান অনস্বীকার্য। এক ঋতুর বৈশিষ্ট্যের উপরে কখনো অন্যের ছাপ পড়ে গেলেও প্রত্যেকটিকে বিশেষভাবে আলাদাও করতে পেরেছি, যেমন করেছি শরতকে।

সারাবছর গানের স্কুলে যাওয়া-আসা করে, সমবেত সঙ্গীতে গলা মিলিয়ে গেলেও, কৈশোরের চঞ্চলতার মধ্যে একদিন হঠাৎ করেই লক্ষ করলাম ‘আজ ধানের ক্ষেতে রৌদ্র-ছায়ায় লুকোচুরি খেলা রে ভাই / নীল আকাশে কে ভাসালে সাদা মেঘের ভেলা।’ উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে তা যেন আলাদা কোনো আবেদন নিয়ে চোখের সামনে ভেসে উঠছে। বাড়ি থেকে বেরোতেই হয়ত যে আকাশ দেখেছি, তার সঙ্গে হুবহু মিলে গেছে বহু বছর আগে কবির চোখে দেখা কোনো আকাশ। সাদা আর নীল, কেবল দুটো রঙে ভরে উঠে একটা আকাশ মানুষের মনের অবস্থা আমূল বদলে দিতে পারে, উপলব্ধিটা যেন বিস্ময়কর লাগল তখন। ছাদে দাঁড়িয়ে দেখা এই মাত্র কদিন আগের ধূসর মেঘে ঢেকে থাকা, সারাক্ষণ তর্জনে-গর্জনে ভীতিকর হয়ে ওঠা আকাশটার বদলে তার স্নিগ্ধ চেহারা মন ভরিয়ে দিল। কখনো কোনো ঢলে যাওয়া বিকেলে হয়ত ছাদের রেলিং ধরে আকাশের দিকে তাকিয়ে কেটে গেল শরতের অসংখ্য মুহূর্ত। মাথার উপরে অর্ধবৃত্তাকার আকাশের একদিক থেকে আরেকদিকে একটি নির্দিষ্ট মেঘপুঞ্জের ধীরে ধীরে, কখনোবা বেশ দ্রুত চলে যাওয়া দেখতে দেখতে নিজেকে প্রায়ই হেলে থাকা অবস্থায় আবিষ্কার করতাম। এই এক সাদা মেঘের এত নকশা, এই এক সাদা মেঘ দিয়েই কল্পনায় সাজানো যায় জীব-জন্তু, মানুষ, এমনকি শহর! সবচেয়ে ভালো লাগত মফস্বল শহরের রাস্তা ধরে চলে যাবার সময়ে একতলা-দোতলা বাড়িগুলোর দেয়ালের পেছনে মেঘের যে সারি দেখতাম। চিরকালের পাহাড়প্রিয় আমি, নিজের অজান্তে কল্পনা করে নিতাম অসংখ্য পাহাড়ের সারি, তুষারে ঢাকা। আমার কৈশোরের শহরে হয়ত বহুবার মায়া করে তাকিয়েছিলাম রামসাগরের দিকে। দিঘি খুঁড়ে মাটিগুলো স্তূপ করে রাখা হয়েছিল দিঘির চারদিকে। সেই স্তূপের দিকে তাকিয়ে একের পর এক পাহাড়ের একটা দীর্ঘ সারির ধারণা জন্ম নিত আমার মনে। আর সেরকম এক সারি পাহাড়ের চূড়ায় তুষারের উপস্থিতি কল্পনা করা সিনেমা কিংবা ফটোগ্রাফির কল্যাণে হয়ত অসম্ভবও ছিল না। ভরা শরতে দিনের পর দিন তুষারে ঘেরা পাহাড়ের সারি দেখতে দেখতে বাড়ি ফেরার ভাবনা আমাকে আচ্ছন্ন করে রাখত। আজো হঠাৎ মেঘের দিকে তাকালে কৈশোরের সেই সব মুহূর্ত আমাকে হাসায়। তবে এ তো বলতে গেলে শরৎ নিয়ে কল্পনার রাজ্য আমার, বস্তুত শরতের বাস্তবতা ছিল আরো ব্যাপক।

মুষলধারে বৃষ্টি হতো আমার সেই স্মৃতিময় শহরে। তারপর যেদিন শেষ এক চোট বৃষ্টি হয়ে আকাশটা ঝকঝকে হয়ে উঠত, শরতের আভাস পেয়ে যেতাম। আমাদের খেলার মাঠের চারদিকে, রাস্তার দুই ধারে ঘাসের ভেতর থেকেই মাথা ফুড়ে উঠত লম্বা কাশফুল। ধীরে ধীরে চারদিকে যেন ছড়িয়ে পড়ত সাদা সমুদ্র, সামান্য ঢেউ লাগলেই সেই সমুদ্রে অগুনতি ঢেউ আর ফেনা। ঢেউয়ের দিকে তাকিয়ে কাটিয়ে দেয়া যেত লম্বা সময়। ধুসর সাদা কাশবনে চড়া সূর্যের আলো মনকে তেনই চকচকে পরিষ্কার করে দিত। কাশবনের দিকে তাকিয়ে দিন পার করার মতো একটা সময়েই ঢাকের আওয়াজ শুরু হতো। দিন-রাত এদিক-ওদিক থেকে ঢাক আর মন্দিরার শব্দে তখন ভোর হতো, রাত গড়াত। প্রায় সমান সংখ্যক হিন্দু-মুসলিমের বাস ছিল যে শহরে, সেখানে আমাদের জীবনে পূজার উপস্থিতি ছিল অতি স্বাভাবিক ঘটনা। যার উৎসব সে যেমন তৈরি হতো, যার উৎসব নয় সে-ও যেন একইভাবে তৈরি হতো আনন্দ ভাগাভাগির জন্য। পাড়ায় পাড়ায় মণ্ডপ সাজানোর কাজ শুরু হতো। মাঠে যেদিন প্যান্ডেলের জন্য প্রথম বাঁশটা পোঁতা হতো, সেদিন থেকেই সেখানে শুরু হতো পাড়ার বড়ো ভাইদের আড্ডা। ধীরে ধীরে বাকিরাও সেই জটলার আশেপাশে নিজেদের আড্ডার জায়গা করে নিত। কিছু একটা তৈরি হচ্ছে, সেই সৃষ্টিকর্ম দেখার আগ্রহ কিংবা একটা মিলনমেলায় অংশগ্রহণের সুযোগ, দুটোই আমাদের টানত। সেখানে কিছু পরে পরে একটিই আলোচনা ঘুরেফিরে প্রধান হয়ে উঠত, যা হলো, ওমুক পাড়ার মণ্ডপ বা দেবীমূর্তীর সাজগোজ কতটা চোখ ধাঁধানো হচ্ছে, কার প্যান্ডেল কতটা আকর্ষণীয় হচ্ছে।

সেই শহরে বরাবরই টেলিভিশন দেখার ক্ষেত্রে কলকাতার দূরদর্শন চ্যানেলের জনপ্রিয়তা ছিল বিটিভিকে ছাড়িয়ে। সেখানে কলকাতার বিভিন্ন এলাকার মণ্ডপের ছবি আর প্রতিযোগিতা দেখে আয়োজকরা আরো উৎসাহ পেতেন বইকি। আমার কাছে অবশ্য এক মণ্ডপের সঙ্গে অন্য মণ্ডপের পার্থক্য কিংবা তাদের তুলনার চেয়ে তাদের আয়োজন করা গানের অনুষ্ঠান কিংবা বিরতিহীন ঢাকের আওয়াজ অনেক বেশি আকর্ষণীয় মনে হতো। রাত-বিরাতে কখনো মনে হতো ঢোলের লাঠিটা যেন খেপে গেছে, লয় বাড়তে বাড়তে হয়ে উঠেছে জমজমাট আর রাতের নিস্তব্ধতায় শব্দ বাড়তে বাড়তে চড়ে গেছে সপ্তমে। নিদ্রায় আর জাগরণে ক্রমাগত ঢাকের আওয়াজ শুনতে শুনতে শোনাটাই আমার নেশা হয়ে যেত, যেন সেই তালে অঙ্ক করছি, সেই তালেই চেয়ারে বসে দুলে দুলে পড়ছি। সত্যি কথা বলতে কী, এই যে বসে এ কথাটা লিখছি, এই এখনো  চোখ বন্ধ করে কান পাতলে একটানা ঝিঁঝির ডাকের মতো ঢাকের আওয়াজ আমার কানে আসছে!   

স্কুলের বন্ধুদের বাড়িতে পূজার খাবার খেয়ে বেড়ানো ছিল সে সময়ের বড়ো আনন্দ। আমাদের ঈদের মতো একদিনে শুরু হয়েই তো আর শেষ হতো না তাদের উৎসব। তাই ঘুরে ঘুরে একেকদিন একেক বন্ধুর বাসায় যাওয়া যেত। বাসায় বছরজুড়ে যতই নারকেলের নাড়ু তৈরি হোক না কেন, পূজার দিনগুলোয় তাদের বানানো নানানরকম নারকেল আর তিলের নাড়ুগুলোর স্বাদ কখনো ভোলার নয়। তখন সমস্ত বাড়িতে ছিল সবার জন্য অবারিতদ্বার। কারো বাড়িতে যাবার জন্য আগে থেকে সময় আর সুযোগ নির্ধারণ করতে হতো না, কারো কাছে সময়ও চেয়েও নিতে হতো না, গিয়ে ঢুকে গেলেই চলত। তবু পাড়াতো এক মাসিমা আমার অতিরিক্ত পছন্দের কথা জানতেন বলেই, ফিরে আসার সময়ে কয়েকটা নাড়ু বেঁধেও দিতেন। আমি অবলীলায় নিয়ে চলে আসতাম, পেটপুরে খেয়ে নেবার পরেও সেই ছোটো পোটলা নিতে কখনো ‘না’ বলিনি।

ক্লাসের এক বন্ধু একবার দুটো গোলাপ ফুল হাতে গুঁজে দিয়ে বলল, দিলাম তোকে, বইয়ের ভেতরে রাখবি। ঠাকুরের পায়ের নিচে থেকে এনেছি। রাখলে তোর ভালো আর ফেললে ঠাকুর কিন্তু পাপ দেবে। আমি সযতনে ভূগোল বইয়ের মধ্যে চ্যাপ্টা করে বসিয়ে রাখলাম। যতবার খুলি ততবার ফুলদুটোকে ধীরে ধীরে বিবর্ণ হতে দেখি কিন্তু ফেলার কথা ভাবি না। বইয়ের ভিতরে বড়োজোর প্রিয় গাছের পাতা বা ফুলের পাপড়ি রাখার পক্ষপাতি ছিলাম আমি। কিন্তু আস্ত ফুল রেখে বইটা ফুলিয়ে রাখতে মোটেও ইচ্ছে করছিল না আমার। কিন্তু কী করব, যখনই ফেলার কথা ভাবতাম, বন্ধুর কথা মনে পড়ত, ঠাকুর পাপ দেবে। আর তখন মনের মধ্যে আরম্ভ হতো অদ্ভুত আরেক জটিলতা। একে তো ঠাকুর পাপ দেবে বলে ফেলতে পারছি না, তার উপরে ঠাকুর পাপ দেবে বলে বিশ্বাস করছি, এজন্য আল্লাহ কি আমায় ছেড়ে দেবে? সুতরাং উপুর্যুপরি পাপের বোঝা মাথায় নিয়ে বেশ কিছুদিন কেটে গেল। এক সময় ফুল শুকিয়ে চ্যাপ্টা হয়ে বইয়ের পাতার সঙ্গে মিশে গেল। আমার সবচেয়ে অপছন্দের বিষয় সেই ভূগোল বইয়ে আমার হাতইবা পড়ত আর কবার! সুতরাং ফুল সেখানেই থেকে গেল নিশব্দে। আর প্রতিদিন নিত্য নতুন চমক নিয়ে ব্যস্ত হয়ে ওঠা কৈশোরের সেই সময়টাতে ওই ফুলের কথা আমার কখনো মনেও পড়ত না। মনে না থাকার কারণে পাপবোধও ছেড়েছিল আমাকে। তবে সেই দ্বিগুণ পাপবোধ হয়ত কোনো কারণে আমার ভিতরে আমার নিজেরই সৃষ্টি। কারণ দিনের পর দিন একসঙ্গে থাকতে থাকতে আমরা কেউ কারো ধর্মকে আলাদা করে ভাবতে শিখিনি, কারো ধর্মীয় ভাবনাকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য কারো বিশ্বাসকে নাকচ করিনি কখনো। মাত্রাতিরিক্ত সহনশীলতা ছিল বলেই হয়ত পারিবারিকভাবে হৈ হুল্লোড় করে আমরা একজন আরেকজনের উৎসবে যোগ দিতাম, যোগ না দিয়ে চুপচাপ থাকা যায় এমন ভাবনা আমাদের মধ্যে কোনো কালে আসেনি।

পাড়ার এক বন্ধু ছিল, বাসার আশেপাশের এ-পাড়া ও-পাড়ার রাস্তা তার ছিল নখদর্পণে। আর ওদিকে রাস্তার ভূগোল শেখার ব্যাপারে আমি ছিলাম মোটামুটি অজ্ঞ। সে সঙ্গে থাকলে কোনো চিন্তা থাকত না, কৌতূহল মেটাতে যত দূরেই যেতাম, মৌমাছির মতো ঠাওর করে করে সে ঠিক আবার বাড়ির সামনে এনে উপস্থিত করত। আর সবচেয়ে বড়ো ব্যাপার ছিল যে তার জানা ছিল আশেপাশে কোথায় সবচেয়ে বড়ো বড়ো শিউলি গাছ আছে। শিউলি ফুলের ব্যাপারে আবার সে বেশ খুঁতখুঁতেও ছিল, এই গাছের ফুলের পাপড়িগুলো বেশি বড়ো, ওই গাছের ফুলের বোঁটার রঙ বেশি কমলা, নানারকমের ব্যাখ্যা ছিল তার। আমি চোখ বুজে সেই সমস্ত ব্যাখ্যাকে গ্রহণ করতাম। এ ব্যাপারে তাকে খনিকটা বোদ্ধা মনে হতো আমার। পুতুলের শাড়িতে রঙ করবার জন্য আমাদের  দরকার পড়ত বেশি রঙিন বোঁটা আর মালা গাঁথবার জন্য বেশি বড়ো পাপড়ি। ভোরবেলায় দরকারমতো গাছের উদ্দেশে বেরিয়ে পড়তাম তার সঙ্গে। অক্টেবর আসতে না আসতেই হিমালয়ের কাছের শহরটিতে কুয়াশা নেমে আসত। ভোরে সাদা-নীল আকাশ ধূসর হয়ে থাকত কুয়াশায়। প্রায় প্রতিদিনই বাড়িতে সবাই ঘুমিয়ে থাকতেই বেরিয়ে পড়তে হতো, কুয়াশার মধ্যে দরজা ভিড়িয়ে বাড়ি থেকে পালানোর মতো করেই চলে যেতাম বলতে গেলে। এখনো মনে আছে দরজা ভিড়িয়ে কয়েক পা এগিয়ে গিয়ে দাঁড়াতাম, পিছনে ফিরে দেখতাম কেউ টের পেল নাকি, দিনের পিঠে দিন চলে গেলে একই দূরত্বে দাঁড়িয়ে বাড়ির গেট আর দেখা যেত না; কুয়াশায় ঢেকে যেত। তারপর বন্ধু যেখানে অপেক্ষা করার কথা, সেই পর্যন্ত এক ছুট। নরম কাপড়ের বোচকা ভর্তি করে শিউলি  ফুল সংগ্রহ করে তবেই ফিরতাম ঘণ্টাখানেক পরে। কোনোদিন এসে দেখেছি বাড়িতে তখনো সব ঘুমিয়ে, নিশব্দে নরম শিউলি মেঝের উপরে ঢেলে দিয়ে মালা গাঁথতে শুরু করেছি। এত কষ্ট যার জন্য সে মালা টিকত কতক্ষণ? কিছু পরেই বাদামি হয়ে গলে গলে নষ্ট হতো, সুগন্ধটা চলে যেত আরো আগে। পোলাওয়ের রঙ নাকি শিউলির বোঁটা দিয়েও হতে পারে, কে এই কথা মাথায় ঢুকিয়েছিল জানি না, আমি আর আমার বোদ্ধা বন্ধু লক্ষ লক্ষ শিউলি ফুল জোগাড় করে পোলাওয়ের রঙ বানানোর পরিকল্পনা করতাম। আর আমরা তেমন কিছু একটা আবিষ্কার করে ফেললেও, আরো একটা জিনিস আবিষ্কার যে করবই সে বিষয়ে বদ্ধপরিকর ছিলাম। সেটা হলো শিউলির মালাকে কী করে বকুলের মালার মতো দীর্ঘজীবন দেয়া যায়। শরৎ এলে আমাদের জীবনের মূল ভাবনাই হয়ে দাঁড়াত এটা। কোনো কোনোদিন আবহাওয়া সামান্য ঠান্ডা থাকার কারণে মালাটা একটু বেশি সময় তরতাজা থাকলে আমরা ধরে নিতাম, নিজেদের মতো যুক্তি খাটিয়ে পানি ছেটানো থেকে শুরু করে যা যা আমরা করছি সেসব খুব কাজে দিচ্ছে আর আমরা নিশ্চয় সাফলতার খুব কাছে চলে এসেছি।

সফল হয়ত আমার কোনোদিনও হতাম না। শরতের যেমন আসার নির্দিষ্ট সময় ছিল, ছিল যাবারও, তেমনি শিউলিও ফুটত, ঝরত আর গলে গলে পঁচে যেত নির্দিষ্ট সময়ে। অথচ তারই মাঝখানে অদ্ভুত এক সাফলতা এসেছিল আমাদের দুজনের জীবনে। পাড়ার এক প্রিয় বড়ো আপুর বিয়ে ঠিক হলো। আপু আমাদের দুজনকেই ভীষণ আদর করতেন। বিয়ে হয়ে আপু চলে যাবেন এই ভেবে আমরা যারপরনাই কষ্টে সময় পার করছিলাম। আপুর সামনে হেসে কথা বলি আর বাড়িতে ফিরে বন্ধ ঘরে গলা জড়াজড়ি করে কাঁদি। আপুর গায়ে হলুদের দিন ঠিক হয়ে গেল। তখন শরৎকাল। আমাদের শিউলি কুড়ানোর দিন। আমরা ঠিক করলাম অদ্ভুত এক উপহার দিয়ে আপুকে চমকে দেবো, আমাদের ভালোবাসা এবং বেদনার কথা যেন একসঙ্গে বুঝতে পারেন তিনি। আগে থেকেই মাকে বলে একটা হলুদ অরগেন্ডি শাড়ি জোগাড় করা হলো। তারপর দ্বিগুণ পরিমাণ শিউলি জোগাড় করে আনলাম নির্দিষ্ট ভোরে। দুজনে একসঙ্গে বসে দ্রুতহাতে মালা গেঁথে সেই মালাগুলো নির্দিষ্ট দূরত্বে আলগা সেলাই করে আটকে দিলাম শাড়িটার মধ্যে। পুরো শাড়িতে অন্তত বিশ-পঁচিশটা শিউলির ডোরা। সাদা-কমলা-হলুদের মাখামাখিতে সেই শাড়ির দিকে তাকিয়ে নিজেদেরই চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল। আর শাড়ি থেকে ভুরভুর করে বেরোতে লাগল তাজা শিউলির সুবাস। সে সময়ে বিয়ের প্রায় অনুষ্ঠানই দুপুরের মধ্যে শেষ হতো বলে বাঁচা গেল। শিউলির মালার ডোরাকাটা শাড়ি দেখে আপু আমাদের দুজনকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেললেন। সে সময়ে মফস্বল শহরে অবশ্য এমনিতেও মেয়েরা বিয়ে ঠিক হবার পর থেকেই নানানজনকে জড়িয়ে ধরে কান্নাকাটি করে সময় পার করত। কিন্তু ওই মুহূর্তে আমাদের কাছে মনে হলো আপু জানতে পেরেছেন যে আমরা তাকে কত ভালোবাসি আর তার অভাব আমাদের কাছে কত বেদনাদায়ক হবে। আগে থেকে ঠিক করা শাড়ি বাদ দিয়ে আমাদের বানানো শাড়ি পরে আপু হলুদের পিড়িতে গিয়ে বসলেন। এই ছিল আমাদের শারদীয় সাফলতা।




রাইজিংবিডি/ঢাকা/২২ সেপ্টেম্বর ২০১৭/তারা

Walton Laptop
 
     
Walton