ঢাকা, শুক্রবার, ৩০ অগ্রহায়ণ ১৪২৫, ১৪ ডিসেম্বর ২০১৮
Risingbd
সর্বশেষ:

শারদ স্মৃতি || ফরহাদ খান

ফরহাদ খান : রাইজিংবিডি ডট কম
 
     
প্রকাশ: ২০১৮-১০-১১ ৮:০২:০৭ এএম     ||     আপডেট: ২০১৮-১০-২১ ২:১৫:১৬ পিএম

সেই কবে থেকে শুনে আসছি, পড়ে আসছি বইয়ে- বাংলাদেশ ষড়ঋতুর দেশ। হয়তো বা ছিলো কোনো এক কালে। এখন আছে বলে মনে হয় না। এখনতো মনে হয় আমাদের ঋতু একটাই। আর, সেটা হলো গ্রীষ্ম। সারা বছর ধরেই তো এখন দহনের কাল। বর্ষা ঝিমিয়ে পড়েছে। শীত ম্রিয়মান। অন্যগুলোর হদিস পেতে হলে পঞ্জিকা দেখতে হয়।

তবু কিছু কিছু নিসর্গদৃশ্য, কিছু ঘটনা মনে করিয়ে দেয় ঋতুচক্রের অস্তিত্ব। তাছাড়া দুয়েকটি ঋতুর কথা মনে পড়ে টেলিভিশনের কল্যাণে। রবীন্দ্রনাথ তাঁর গানে বলেছিলেন, ‘বাঁশি, তোমায় দিয়ে যাব কাহার হাতে’। রবীন্দ্রনাথের উদ্বেগ দূর হয়েছে। বাঁশি এখন টেলিভিশন চ্যানেলের হাতে। তাদের বাজানো সুরে এখন জানতে পাই, কোন ঋতু চলছে, কোনটা আসছে। প্রমথ চৌধুরী বলেছিলেন, বাংলাদেশে প্রবল ঋতু একটাই। তা হলো বর্ষা। তাঁর কথা, ‘এক বর্ষাকে বাদ দিলে বাকি পাঁচটি ঋতু যে ঠিক কবে আসে কবে যায়, তা এক জ্যোতিষী ছাড়া আর কেউ বলতে পারেন না’।

বর্ষার সেদিন প্রায় অবসিত। তখন তো শুধু আষাঢ়-শ্রাবণ নয়, বর্ষার বর্ষণ চলতো ভাদ্র পর্যন্ত; যেটা নাকি শরতের প্রথম মাস। বিদ্যাপতির পদে আছে- ভরা ভাদর মাহ ভাদর। মোট কথা, বর্ষার প্রভাব ছিলো ভাদ্র পর্যন্ত। সেই সঙ্গে ছিলো ভাদ্রের ‘তালপাকা গরম’। ভ্যাপসা। একেবারে অসহ্য। এখনতো আরো! ভাদ্র আর আশ্বিন মিলে কী করে যে শরৎ ঋতু হলো, তা মাথায় আসে না। হয়তো জোড় মেলাবার জন্যে। শরতের মাস হিসেবে আশ্বিনকে মানা যায়। ভাদ্রকে কিছুতেই নয়। আমার বড়মা অর্থাৎ বড়চাচি, কথায় কথায় ছড়া কাটতেন। তাঁর প্রিয় দুটি লাইন ছিলো, কে-না কইল কথা, গা ঘোরে না, ঘোরে মাথা! তাঁর মুখেই শুনতাম শীতের ছড়া, ‘আশ্বিন-গা শিনশিন, কার্তিক-শীত আসছে ঠিক’- একে একে মাঘ পর্যন্ত। বড়মা নেই। আশ্বিনের সেই গা শিনশিন করা মিষ্টি ভাবও নেই। ভাদ্রের ভ্যাপসা গরমের ভাপ এখন আশ্বিনেও।

শরৎ ঋতুর যে সব লক্ষণ তা সেই আশ্বিনেই। শিউলি, শাপলা-শালুক, আকাশের নীল, সাদা মেঘ আর নদীর দুই তীর ‘ফুলে ফুলে সাদা’ কাশবন বলে দেয়- এখন শরৎ কাল। কাশফুল নিয়ে মুগ্ধ ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। ‘আমরা বাঁধিব কাশের গুচ্ছ’ এমন কথাও আছে তাঁর গানে। কাজটা কতো যে ঝামেলার তা তিনি জানতেন বলে মনে হয় না। কাশফুলের মাহাত্ম-কীর্তন এখন টেলিভিশনের পর্দায়, খবরের কাগজের পাতায়। কাশফুল দেখে দেখে বড় হয়েছি। কাশফুলের প্রতি তাই বিশেষ অনুরাগ জন্মায়নি। বারবার দেখা জিনিসের প্রতি আগ্রহ থাকে না। তো, এই কাশফুলের দেখাও মেলে আশ্বিনে। এই সময়ে শিশিরভেজা শিউলির গাছতলায় পড়ে থাকার কথা। না, শিশিরের এখনো দেখা নেই। নেই সেই আশ্বিনের বিখ্যাত ঝড়। টানা ঝোড়ো হাওয়া। সেই সঙ্গে গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টির ঝাপটা। না, কিছুই নেই। তবে শিউলি আছে। ছোটবেলায় দেখতাম, আমার মা বাংলা মাসগুলো গুণতে গিয়ে ভাদ্রের পরে বলতেন ‘পুজোর মাস’। তারপর আবার কার্তিক দিয়ে শুরু। ১৯৫৫ সালের দিকে, আমি তখন ক্লাশ ফোর থেকে ফাইভে উঠেছি- ক্লাশে নোটিশ পড়ে শোনালেন আমাদের এক স্যার। সামনে সাত কি নয়দিনের ছুটি। উপলক্ষ্য দুর্গাপূজা। তখন স্কুলে এই পুজোর ছুটিও একটু লম্বা হতো। এই রকম ছুটি আগের চার ক্লাশেও পেয়েছি। কিসের জন্য পেয়েছি তা নিয়ে মাথা ঘামাইনি। আমাদের কাছে তখন গরমের ছুটি ছিলো গুরুত্বপূর্ণ। তো, মায়ের ‘পুজোর মাস’ এবং স্কুলে ‘দুর্গা পুজোর ছুটি’ নিয়ে বেশ ধাঁধায় পড়ে গেলাম। বাবার কাছ থেকে জানলাম, আশ্বিন মাসে হিন্দুদের দুর্গা পুজো- তাই পুজোর ছুটি। আর, সমাজের রীতি অনুযায়ী শ্বশুরের নাম বউদের মুখে আনতে নেই। তোমার মা তা মেনে চলেন। মায়ের এক চাচা শ্বশুরের নাম- আশ্বিন। তাই মায়ের মুখে তা পুজোর মাস।

আমি তখন দশমবর্ষীয় বালক। পাড়ার বন্ধুরা মিলে একসঙ্গে স্কুলে যাই। খেলাধুলা করি। আমাদের ক্লাস ফোরের বাংলা বইয়ে তখন রামায়ণ-মহাভারতের গল্প ছিলো। রাম-অর্জুন-ভীমের বীরত্ব নিয়ে আমরা বলাবলি করতাম। ভাইপো মোমিন বললো, রাম অনায়াসে বুড়ো আঙুল দিয়ে আমাদের স্কুলের বাড়িটা ধসিয়ে দিতে পারে। ফুফাতো ভাই আখতার আরেক কাঠি সরেস! তার বক্তব্য, রামতো বুড়ো আঙুলে, কিন্তু অর্জুন কড়ে আঙুল শুধু ঠেকালেই হলো, বিল্ডিং শেষ। তো বীর সম্পর্কে এই ছিলো আমাদের ধারণা। পরে জানলাম এরা সব হিন্দু বীর। মুসলমানদের বীর আলাদা। পুঁথিপাঠের আসর থেকে চিনলাম হাতেম তাই, আমির হামজা, হানিফাদের। মুসলমানরা নামাজ পড়ে। হিন্দুরা করে পুজো। ভাইপো মোমিনের মুখে শুনলাম যারা পুজো করে তারা সব কাফের। পুজো দেখাও শক্ত গুণা’র কাজ। আমরা তখনো কেউ অবশ্য পুজো দেখিনি। যারা পুজো করবে সেই হিন্দুরা প্রায় সব দেশত্যাগী। গ্রামে তখন জেলেপাড়ায় কয়েকঘর, কুমোরপাড়ায় কিছু, একঘর মাত্র স্বর্ণকার আর একঘর গাছি- অর্থাৎ খেজুরের রস তৈরির কারিগর।

পাশের গ্রামে থাকতেন নাকালি কাকা। পেশায় এখনকার ভাষায় পল্লী চিকিৎসক। তাঁর ভালো নাম হৃষিকেষ প্রামাণিক। তিনি বিখ্যাত ছিলেন নাকালি ডাক্তার নামে। গ্রামে একটা দাতব্য চিকিৎসালয় ছিলো। বিরাট চৌহদ্দি। একতলা চিকিৎসালয় দেখার মতো। ঐ চৌহদ্দির মধ্যেই প্রথম দেখি ইউক্যালিপটাস গাছ। সে চিকিৎসালয় তখন তালাবন্ধ। তাই নাকালি ডাক্তারই ছিলেন ভরসা। জটিল রোগ বলতে তখন ছিলো কালাজ্বর, ম্যালেরিয়া আর বাত। নাকালি কাকা সাইকেলে চলাফেরা করতেন। হ্যান্ডেলে ঝুলানো চামড়ার ব্যাগ। তারমধ্যে ওষুধপত্র, সিরিঞ্জ ইত্যাদি। ম্যালেরিয়ায় ছিলো কুইনাইন ইনজেকশান- কী যেন নাম ছিলো তার, মনে নেই। কালাজ্বরের জন্য ছিলো স্টিবাটিল ইনজেকশান। মনে পড়ে, নাকালি কাকা বেশ কায়দার সঙ্গে ইনজেকশান দেওয়ার কাজটি করতেন। বাতের জন্য ছিলেন জেলেপাড়ার পতিত হালদার। তিনি দিতেন সালসা। হলুদ তার রঙ। বাতের ব্যাথা নাকি তাতে কমেও যেতো।

১৯৫৫-তে আমাদের জেলেপাড়ার জেলেরা আয়োজন করলো চড়কপুজোর। যতো না পুজো তার চেয়ে বেশি হৈ-হুল্লোড়। উঠানের মাঝখানে পোঁতা লম্বা কাঠের খুঁটি। তার আগায় আটকানো বাঁশের দু’দিকে কোমরে দড়িবাঁধা দু’জন। একজন তাদের ঘোরাচ্ছে। এই খুঁটির নামটা চড়কগাছ। শুনলাম এই খুঁটিটাকেই নাকি পুজো করা হবে। শুনেতো আমার নিজের চোখই চড়কগাছ! পুজো দেখা ভাগ্যে ছিলো। পুজো দেখতে পেলাম নাকালি কাকার বাড়িতে ১৯৫৭-তে। ভাদ্রেই শুনলাম কাকার বাড়িতে এবার দুর্গাপুজো হবে। কুমোর আসবে পশ্চিমবঙ্গ থেকে। আমাদের কুমোর পাড়ার কুমোরদের দৌড় হাঁড়ি কলসি, সানকি আর সরা অবধি। তবু মুগ্ধ হয়ে তাদের কাজ দেখতাম। এবার সুযোগ এলো মূর্তি গড়ার কুমোর দেখার। সমবয়সী ভাইপো মোমিন যদিও নিষেধ করেছিলো, তবু কুমোরের কাজ দেখার জন্য প্রায় প্রতিদিনই যাওয়া হতো। শেষের দিকে আর যাওয়া হয়নি। গ্রামের হিন্দুদের কথাতো আগেই বলেছি। আশেপাশের গ্রামেও কোনো হিন্দুর বসতি ছিলো না। ঢাকি এসেছিলো মেহেরপুর থেকে। পুরুত ঠাকুরও মেহেরপুরের।

মূর্তি গড়া শেষ হলো। আমাদের কুমোরপাড়ায় ছোট্ট একটা কালী মন্দির ছিলো। সেখানকার জিভ বের করা মূর্তি দেখে ভয় পেতাম। ফলে ওদিকে যাওয়ার সময় মন্দিরের দিকে তাকাতাম না। কিন্তু দুর্গা ও তার ছেলেমেয়েদের দেখে ভালো লেগেছিলো। হাসি পেলো অসুরের অবস্থা দেখে। এর মধ্যে হাতিমুখো গণেশ আর লক্ষ্মীর নাম চেনা-চেনা মনে হলো। স্বর্ণকারের খাতায় দেখেছিলাম- ‘ওঁ গণেশায় নমোঃ’। আর লক্ষ্মী, অলক্ষ্মীর নামতো আমাদের মা-খালা-চাচীদের মুখে অহরহ শোনা যেতো। সম্পর্কে এরা আবার দুই বোন- বড়ো হয়ে জেনেছি। অলক্ষ্মী অবশ্য দুর্গার সঙ্গে ছিলো না। মূর্তি বিসর্জন অর্থাৎ ডোবানো হলো নাকালি কাকার প্রায় বাড়ির সামনেই সাগরখালি নদীতে। হিন্দু-মুসলমান সবাই ধরাধরি করে জেলেনৌকায় বিরাট বাহিনীসহ দুর্গার মূর্তিকে তুলে দিলো। ফেলার সময়ে থাকলো শুধু হিন্দুরা। হিন্দুর পুজো। হিন্দু আর ক’জন? দেখলো মুসলমানরা। ঢাকিদের বাজনা আর ধুনুচি হাতে নিয়ে জেলে যুবকদের সে কি নাচ! আজও মনে পড়ে। মনে পড়ে নাকালি কাকার বাড়িতে পুজোর নেমন্তন্ন খাওয়ার কথাও। নাকালি কাকার বাড়ির সামনে দেবদারু পাতায় মোড়া প্রবেশদ্বারে লেখা দেখেছিলাম: ‘শারদীয় দুর্গোৎসব’। হালে যেন পানি পেলাম। মোমিনকে গিয়ে বললাম, আমিতো পুজো দেখতে যাইনি, গিয়েছি উৎসব দেখতে। মোমিনের মন আবশ্য তাতে গলেনি। বেশ গালমন্দ শুনতে হয়েছিলো।

শরতের ব্যাপারে আমার কোনো উচ্ছ্বাস ছিলো না। এখনো নেই। তবে, শরতের আশ্বিন এলে মায়ের কথা মনে পড়ে। আশ্বিনকে মা বলতেন ‘পুজোর মাস’। তখন হাসতাম। কথাটা মনে পড়লে এখনো হাসি, না কি কাঁদি- বুঝে উঠতে পারি না।




রাইজিংবিডি/ঢাকা/১১ অক্টোবর ২০১৮/তারা

Walton Laptop
 
     
Marcel
Walton AC