ঢাকা, শুক্রবার, ৩০ অগ্রহায়ণ ১৪২৪, ১৫ ডিসেম্বর ২০১৭
Risingbd
সর্বশেষ:

অনিয়ন্ত্রিত ইটভাটায় স্বাস্থ্য ও পরিবেশের ব্যাপক বিপর্যয়

হাসান মাহামুদ : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৭-০৬-০৮ ৮:৩৯:৫৭ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৭-০৬-১০ ১১:৩২:২৫ এএম

হাসান মাহামুদ : দেশে বিভিন্ন আইন এবং তদারকি ও নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান থাকা সত্বেও ইটভাটার দৌরাত্ম্য কমছে না। মালিকরা মানছেন না কোনো নিয়মকানুন৷ বন উজাড়, কৃষির ক্ষতি ও দেশের ভূ-প্রকৃতি ধ্বংস করে মাটি পুড়িয়ে তৈরি করা হচ্ছে ইট। ফলে ইটভাটা সংশ্লিষ্ট এলাকার পাশাপাশি সারা দেশেই পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য মারাত্মক ঝুঁকিতে ফেলছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইটভাটার কারণে পরিবেশ দূষণ, ভূমির উর্বরতা হ্রাস ও বন উজাড় হচ্ছে৷ কৃষি জমি দিন দিন কমছে। ইটভাটাতে মাটির জোগান দিতে ফসলের জমি অকেজো গর্তে পরিণত হচ্ছে। কেবল সমতল ভূমি নয়, কোথাও কোথাও পাহাড় পর্যন্ত কাটা হয় ইটভাটার মাটি জোগাড় করার জন্য। এমনকি ইট তৈরির জন্য কাঁচা মাটিও বিদেশে পাচার করা হচ্ছে।

ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরের তথ্য মতে, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে মোট আবাদি জমির পরিমাণ ছিল ২ কোটি ১৭ লাখ একর। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য মতে, ১৯৮৪ সালে দেশে মোট আবাদি জমির পরিমাণ ছিল ২ কোটি ২ লাখ ৩৮ হাজার একর। ১৯৯৭ সালে এসে কমে এসে তা ১ কোটি ৭৪ লাখ ৪৯ হাজার একরে এবং সর্বোপরি ২০১২ সালে বাংলাদেশের আবাদি জমির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ কোটি ৫৪ হাজার একরে। ২০১৬ সালে এর পরিমাণ হয়েছে প্রায় ১ কোটি ৪০ হাজার একরের কাছাকাছি।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু ইটভাটার কারণে এই হারে কৃষি জমি কমেনি। এর সঙ্গে রয়েছে অন্যান্য কারণও। তবে অন্যতম প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে ইটভাটার আগ্রাসন। পরিবেশবিদরা বলছেন, প্রতিবছর জনসংখ্যা বাড়ার কারণে বাড়তি আবাসন, রাস্তাঘাট, স্কুল-কলেজ ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণে ভূমির ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করছে। এতে আবাদি জমি দিন দিন কমছে। এভাবে চলতে থাকলে একসময় দেশের আবাদি জমির পরিমাণ শূন্যের কোটায় এসে দাঁড়াবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এজন্য এখনই সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের তাগিদ দিয়েছেন তারা।

রাজধানীর বাইরে বিভিন্ন রাস্তার দুপাশে যতদূর চোখ যায় শুধু ইটের ভাটা। এসব ইটের ভাটায় কয়লার পাশাপাশি কাঠও পোড়ানো হয়৷ অথচ কাঠ পোড়ানো নিষিদ্ধ৷ ফসলি জমিতে লোকালয়ে এসব ইটভাটার চিমনির উচ্চতা কোনোটিরই ৬০ ফুটের বেশি নয়৷ অথচ চিমনি থাকতে হবে ১২০ ফুট লম্বা৷ ইটের ভাটার চিমনি থেকে নির্গত কালো ধোঁয়ায় এসব এলাকার বাসিন্দারা অতিষ্ঠ৷ এমনকি আশপাশের গাছ মরে যাচ্ছে৷ গাছের পাতা শুকিয়ে ঝরে পড়ছে৷

ইটভাটার প্রভাব সর্ম্পকে চিকিৎসক ডা. আকতার উজ-জামান রাইজিংবিডিকে বলেন, ইটের ভাটার কারণে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের মানুষ শ্বাসকষ্ট ও চোখের রোগে বেশি আক্রান্ত হন।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের সমন্বয়কারী স্থপতি ড. ইকবাল হাবিব বলেন, গবেষণায় দেখা গেছে, ইটভাটা মাটি, পানি এবং জনস্বাস্থ্যের ব্যাপক ক্ষতি করছে৷ ইটভাটার ধোঁয়ায় যে কার্বন মনোঅক্সাইড থাকে তা বাতাসকে যেমন দূষিত করে, তেমনি গাছপালা এবং ফসলের ক্ষতি করে৷ ইটভাটার বর্জ্যে যে সালফার থাকে তা নদী বা জলাশয়কে দূষিত করে৷ এর ফলে আশপাশের নদী থেকে মাছসহ সব ধরনের জলজ প্রাণী এবং উদ্ভিদ বিলুপ্ত হয়ে যায়৷ ইটভাটার আগুনের প্রচণ্ড তাপে ইটভাটার আশপাশের ফসলি জমি নিষ্ফলা হয়ে যায়৷ এমনকি পার্বত্য এলাকায় পাহাড়ও এখন ইটভাটার কারণে ঝুঁকির মুখে রয়েছে৷ আর ইটভাটার কারণে বাতাস দূষিত হওয়ায় মানুষ নানা রোগে আক্রান্ত হয়৷

ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০১৩ তে উল্লেখ আছে, ইটভাটায় ফসলি জমির উপরের মাটি (টপ সয়েল) ব্যবহার করলে প্রথমবারের জন্য দুই বছরের কারাদণ্ড ও ২ লাখ টাকা জরিমানা করা হবে। দ্বিতীয় বার একই অপরাধের জন্য ভাটা কর্তৃপক্ষকে ২ থেকে ১০ বছরের জেল এবং ২ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা করা যাবে। অনুমোদন না নিয়ে ইটভাটা স্থাপন করলে এক বছরের কারাদণ্ড এবং ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা যাবে। কিন্তু এখনো আইন বাস্তবায়ন করতে পারেনি সরকার। ফলে ইটভাটার আগ্রাসনও বন্ধ করা যাচ্ছে না।

আইনে জনবসতি, সংরক্ষিত এলাকা, বাণিজ্যিক এলাকা, বনভূমি, জলাভূমি এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা এলাকায় ইটভাটা স্থাপন করলে একই শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। ইটভাটায় কয়লার পরিবর্তে কাঠ ব্যবহার করলে তিন বছরের কারাদণ্ড এবং ৩ লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় শাস্তি হতে পারে। এসব আইন সরকারের অফিস আদালতের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও বাস্তবে তার প্রয়োগ দৃশ্যমান হচ্ছে না। ফলে কৃষি, পরিবেশ ও মানুষের স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন দেশের সচেতন নাগরিক, কৃষিবিজ্ঞানী, চিকিৎসক ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা।

এসব বিষয়ে পরিবেশ ও বনমন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বলেন, বায়ু দূষণ অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের মতো বাংলাদেশেরও সমস্যা। ২০১৩ সালে এ বিষয়ে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বায়ু দূষণে এক বছরে দেশে ১ লাখ ৫৪ হাজার ৮৯৮ জন প্রাণ হারিয়েছেন। বায়ু দূষণের ক্ষতি কমানোর বিষয়টি সরকার গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে।

মন্ত্রী বলেন, বায়ু দূষণ নিয়ন্ত্রণ বিধিমালা বা নীতিমালা প্রণয়ন ও জনসচেতনতামূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে নির্মল বায়ু ও পরিবেশের টেকসই উন্নয়নকল্পে ১৪৬ কোটি ৪ লাখ টাকা ব্যয়ে ‘নির্মল বায়ু এবং টেকসই পরিবেশ’ নামের একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। প্রকল্পটি আগামী ২০১৯ সালের জুন মাসের মধ্যে শেষ হবে। আমরা আশা করছি, এর মাধ্যমে রাজধানীতে নির্মল বায়ু নিশ্চিত করা যাবে।

ইটভাটার কারণে পরিবেশে বিরুপ প্রভাব কমাতে বেশকিছু পদক্ষেপ গ্রহণের কথা বলছেন বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবী সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। তিনি রাইজিংবিডিকে বলেন, কৃষিজমি নষ্ট ও পরিবেশের ক্ষতি করে ইট তৈরি এবং উর্বর ফসলি জমির উপরের অংশ দিয়ে ইট বানানো বন্ধ করতে হবে। মাটির ইটের বিকল্প হিসেবে যেসব উপকরণ ও প্রযুক্তি উদ্ভাবন করা হয়েছে, তার ব্যবহার বাড়াতে হবে। সরকারের যেসব বিভাগ অবকাঠামো নির্মাণ ও তদারকির দায়িত্বে নিয়োজিত তাদেরকেও এ ব্যাপারে এগিয়ে আসতে হবে।

পরিবেশ ও বনমন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু তদারকি কার্যক্রম সম্পর্কে বলেন, পরিবেশের ওপর বিরুপ প্রভাবের কথা বিবেচনা করে আইনের মাধ্যমে পরিবেশ দূষণকারী ইটভাটা নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

তিনি জানান, ২০১৩ সালে থেকে ২০১৭ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত ৫০৫টি অবৈধ ইটভাটার বিরুদ্ধে এনফোর্সমেন্ট পরিচালনা করে ১৩ কোটি ৭৯ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ ধার্য করা হয়েছে। পাশাপাশি মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে ২০১৪ সাল থেকে চলতি বছরের পর্যন্ত ২৮৫টি অবৈধ ইটভাটার কাছ থেকে ৩ কোটি ৪৫ লাখ ২ হাজার টাকা আদায় করা হয়েছে।


* বিলুপ্তির পথে দেশের এক চতুর্থাংশ উদ্ভিদ ও প্রাণী

* বৈশ্বিক পরিবেশ দূষণে দিনে মারা যাচ্ছে সাড়ে ৪ হাজার শিশু

* পরিবেশ দূষণরোধে প্রণীত বিভিন্ন আইন বাস্তবায়নে দুরবস্থা

 


রাইজিংবিডি/ঢাকা/৮ জুন ২০১৭/হাসান/রফিক

Walton
 
   
Marcel