ঢাকা, শুক্রবার, ৩০ অগ্রহায়ণ ১৪২৪, ১৫ ডিসেম্বর ২০১৭
Risingbd
সর্বশেষ:

জালিয়াতির নতুন পন্থা, ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার সন্তান

হাসান মাহামুদ : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৭-১২-০১ ৭:৫৯:২৮ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৭-১২-০২ ৯:৩৪:২৯ এএম

হাসান মাহামুদ: স্বাধীনতার পর থেকে অমুক্তিযোদ্ধা কিংবা স্বাধীনতাবিরোধী অনেককেই ‘মুক্তিযোদ্ধা’ সেজে সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ উঠে আসছে। এর মধ্যে অনেক অভিযোগের সত্যতাও পাওয়া গেছে। প্রশাসনে চাকরিসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা নেওয়ার জন্য এবার জালিয়াতির নতুন পন্থা হিসেবে চালু হয়েছে ‘মুক্তিযোদ্ধার সন্তান’ সার্টিফিকেটের জন্য ‘ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার সন্তানের’ আবেদন।

এরই মধ্যে বিভিন্ন সময়ে এসব ‘মুক্তিযোদ্ধার সন্তান’ বা ‘মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সন্তান’ হিসেবে পরিচয় দেওয়া এই ভুয়াদের সনাক্ত করা গেছে। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়  এবং জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের (জামুকা) কর্মকর্তাদের তথ্য মতে, এখনো দেশে অনেক প্রতারক রয়ে গেছেন, যারা ‘ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার সন্তান’ হয়েও মুক্তিযোদ্ধার সন্তান পরিচয়ে সরকারি চাকরিতেও রয়েছেন। এসব ভুয়াদের চিহ্নিত এবং আইনের আওতায় আনতে কাজ করছে সরকারের কয়েকটি গোয়েন্দা সংস্থা।

মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, বর্তমানে কয়েকটি জেলা কারাগারে কর্মরত কয়েকজন কর্মকর্তাসহ প্রশাসনের বিভিন্ন পদে এ রকম জালিয়াতি করে নিয়োগ পাওয়া অনেকের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে। কিন্তু তদন্তের স্বার্থে প্রশাসনের ওসব অধিদপ্তর ও পরিদপ্তরের নাম প্রকাশ করা হচ্ছে না বলেও জানিয়েছেন মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিব।

সম্প্রতি মুক্তিযোদ্ধা সন্তান কোটায় ভুয়া সনদে ৮ কারারক্ষী সাময়িক নির্বাচিত হওয়ার ঘটনায় ‍বিষয়টি আরো বেশি আকারে প্রশাসনের তদারকির আওতায় আসে। নিয়োগে প্রদত্ত কাগজপত্রে সন্দেহ হওয়ায় কারা কর্তৃপক্ষের তদন্ত সাপেক্ষে তা প্রমাণিত হওয়ার পরপরই তাদের সাময়িক নির্বাচন বাতিল করেছে। একইসঙ্গে সারাদেশের সব মুক্তিযোদ্ধা সহ সকল কোটার নিয়োগ প্রদানে বিশেষ গোয়েন্দা সংস্থার রিপোর্ট প্রাপ্তির পরই চূড়ান্ত নিয়োগ দিতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দিয়েছেন কারা মহাপরিদর্শক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ ইফতেখার উদ্দীন।

এছাড়া গত বছরের মাঝামাঝিতে কারা অধিদপ্তর থেকে মুক্তিযোদ্ধা কোটায় চাকরি নেওয়া ২০ জনের একটি তালিকা যাচাই-বাছাই করতে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। যাচাই করে দেখা যায়, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী ও সচিবের স্বাক্ষর জাল করে মুক্তিযোদ্ধার সাময়িক সনদ দিয়ে চাকরি নিয়েছিলেন সাতজন। তখন মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে অভিযুক্তদের চাকরি বাতিল করে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে কারা অধিদপ্তরকে সুপারিশ করা হয়।

এর আগে ২০১৬ সালের ৮ আগস্ট ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সনদে মুক্তিযোদ্ধার সন্তান হিসেবে পুলিশে চাকরি নেওয়া সিরাজগঞ্জের ১৯ জন পুলিশ কনস্টেবলকে আটক করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। ২০১২ সালে তারা চাকরি নিয়েছিলেন বলে দুদকের অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে। অনুসন্ধানে আরো জানা যায়, মুক্তিযোদ্ধার পোষ্য কোটায় চাকরির জন্য টাকার বিনিময়ে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সনদ তৈরি করে দেন সিরাজগঞ্জের বেলকুচি উপজেলার সাবেক মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মো. সহিদুর রেজা। জনপ্রতি পাঁচ থেকে ছয় লাখ টাকার বিনিময়ে এই সনদ দেওয়া হয়েছে বলে পরিবারগুলো অভিযোগ করে তখন।

বর্তমানে যে কোনো ধরনের একটি চাকরি মানেই সোনার হরিণ। সেক্ষেত্রে একটি সরকারি চাকরি যেন সোনায় সোহাগা। যে কোনো পর্যায়ের সরকারি চাকরিতে মুক্তিযোদ্ধা কোটা রয়েছে। আর এই সুযোগটাই নিচ্ছে কতিপয় অসাধু।

মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পরিপত্র অনুযায়ী, মুক্তিযোদ্ধার সন্তান ও নাতি-নাতনিদের জন্য বরাদ্দ রয়েছে ৩০ শতাংশ চাকরি কোটা। স্বাধীনতার পর চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে মুক্তিযোদ্ধাদের যে ৩০ শতাংশ কোটা ছিল তা-ই সন্তান ও নাতি-নাতনিদের জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে মুক্তিযোদ্ধার সন্তান সেজে সহজে চাকরি লাভের আশায় মুক্তিযোদ্ধার ভুয়া সনদ সংগ্রহের প্রবণতা বেড়ে গেছে।

গত ৭ আগস্ট মুক্তিযোদ্ধার সন্তান পরিচয়ে ভুয়া সনদে চাকরি নেওয়ায় যশোরে নাছিমা খাতুন নামে এক মহিলা পুলিশ কনস্টেবল আটক হন। ২০১৩ সালে তিনি পুলিশে চাকরি পান। তার পিতা আব্দুল কুদ্দুস ‘মুক্তিযোদ্ধা’ ছিলেন এই হিসেবে একটি ‘মুক্তিযোদ্ধা সনদপত্র’ দাখিল করে মুক্তিযোদ্ধার পোষ্য কোটায় পুলিশ কনস্টেবল পদে চাকরি পান নাছিমা খাতুন। কিন্তু তার সদনপত্র ভুয়া ছিলো তা ফাঁস হয়ে যায়।

২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে জয়পুরহাট জেলায় পুলিশের নিয়োগ দেওয়া হয়। সেখানে পাঁচবিবির মির্জাপুর গ্রামের আবু সালামের ছেলে শাহিদুজ্জামান এবং শ্রীমন্তপুর গ্রামের মৃত কফিল উদ্দিনের ছেলে কবিরুল ইসলাম কাগজে কলমে মুক্তিযোদ্ধার সন্তান দাবি করে কনস্টেবল পদে আবেদন করেন। মুক্তিযোদ্ধার কোটায় কনস্টেবল হিসেবে তাদের চাকরি হওয়ার পর তারা ঢাকার মেট্রোপলিটন পুলিশের দাঙ্গা বিভাগে যোগদান করেন। পরবর্তী সময়ে তাদের সনদ ভুয়া দাবি করে পাঁচবিবি উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মিছির উদ্দিন মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয়সহ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করেন। বিষয়টি তদন্তের পর ২০১৬ সালের জুনে অভিযোগ প্রমাণিত হয়। পরে মুক্তিযোদ্ধার ভুয়া সনদে চাকরি নেওয়ার অভিযোগে তাদের বিরুদ্ধে মামলা হয় এবং তারা গ্রেপ্তার হন। তারা ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের দাঙ্গা বিভাগে কর্মরত ছিলেন।

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন খাদ্য অধিদপ্তরে ২০১০ সালে খাদ্য পরিদর্শক, উপখাদ্য পরিদর্শক ও সহকারী উপখাদ্য পরিদর্শকসহ ১০ ক্যাটাগরিতে জনবল নিয়োগ করা হয়। খাদ্য মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো অনেকের মুক্তিযোদ্ধা সনদই সঠিক নয় বলে জানায় মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়। পরে এসব যাচাই-বাছাইপূর্বক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। গত বছর প্রাথমিক সহকারী শিক্ষক পদেও ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার সন্তান পরিচয়ে আবেদন করার অভিযোগ পাওয়া যায়। এ রকম বিভিন্ন চাকরির ক্ষেত্রে মুক্তিযোদ্ধার পোষ্য কোটায় ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার পোষ্যরা চাকরি নিচ্ছেন বলে এখন প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো গণমাধ্যমে সংবাদ ছাপা হচ্ছে।

জানা গেছে, শুধু চাকরি ক্ষেত্রে নয়, কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিশেষ কোটায় ভর্তির ক্ষেত্রেও ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সন্তান সেজে আবেদন করতে দেখা যায়। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৩-১৪ শিক্ষাবর্ষের বিশেষ কোটায় সাঈদুর রহমান নামে এক শিক্ষার্থী ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সন্তান হিসেবে ভর্তির চেষ্টা করে। এমনকি বিশেষ কোটার কারণে ছেলেটি মেধা তালিকায় প্রথমও হয়। পরে বিষয়টি জানাজানি হলে বিশেষ কোটায় ভর্তি কমিটির সমন্বয়ক প্রফেসর ড. মনিরুজ্জামান তার নাম বাদ দেন।

মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক সচিব অপরূপ চৌধুরী জানান, যখন কোনো অভিযোগ পাওয়া যায় মন্ত্রণালয় তা গুরুত্বের সাথে বিবেচনা ও তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা নেয়। এক্ষেত্রে শাস্তিমূলক ব্যবস্থাই বেশি নেওয়া হয়। তবুও ভুয়াদের সংখ্যা এতো বেশি যে এদের খুব সহজে দমন করা যাচ্ছে না। তবে আমাদের নির্দেশনা রয়েছে প্রতিটি নিয়োগ কমিটি যেন সুচারুরূপে আবেদনের সাথে দাখিলকৃত মুক্তিযোদ্ধা সনদগুলো যাচাই-বাছাই করে।





রাইজিংবিডি/ঢাকা/১ ডিসেম্বর ২০১৭/হাসান/শাহনেওয়াজ

Walton
 
   
Marcel