ঢাকা, বুধবার, ২৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৪, ১৩ ডিসেম্বর ২০১৭
Risingbd
সর্বশেষ:

মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে স্মৃতিমূলক বইয়ের ছড়াছড়ি, গবেষণা কম

হাসান মাহামুদ : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৭-১২-০৩ ২:৪১:২০ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৭-১২-০৫ ৮:৫৭:৩৫ এএম

হাসান মাহামুদ : মুক্তিযুদ্ধ এবং বঙ্গবন্ধু শব্দগুলো ব্যবহার করে সংগঠন, কমিটি কিংবা পরিষদের অভাব নেই। এ দুটো বিষয় নিয়ে রাজনীতি হচ্ছে, ব্যবসা হচ্ছে। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের মাহাত্ম, আবেদন কিংবা জাতির এই অবিসংবাদিত নেতার নীতি, আদর্শ ও কর্মময় জীবন প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে ছড়িয়ে দেওয়া ও টিকিয়ে রাখার জন্য পরিকল্পিত গবেষণাকর্ম বা উদ্যোগ খুব বেশি নেওয়া হচ্ছে না। ফলে কয়েক যুগ বা শতাব্দি পরে বিষয়গুলোর প্রকৃত ইতিহাস, বার্তা ও ত্যাগ বাঙালি সভ্যতা থেকে হারিয়ে যাওয়ার শঙ্কা দেখা দিতে পারে।

মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধু নিয়ে গবেষণার প্রয়োজনীয়তা এবং বস্তুনিষ্ঠ প্রকাশনার উপযোগিতা নিয়ে শিক্ষাবিদ, ইতিহাসলেখক এবং বিশেষজ্ঞদের মতামতে এমন শঙ্কা ফুটে উঠেছে।

মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধু বাঙালি জাতির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। বাংলাদেশের জন্ম এবং বিকাশের ইতিহাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত এই ‍দুটো শব্দ। কিন্তু একটি জাতির ইতিহাসে যে কোনো বিষয় যুগের পর যুগ কিংবা প্রজন্মের পর প্রজন্ম বেঁচে থাকে গবেষণায়, সর্বজনস্বীকৃত প্রকাশনায়। কিন্তু অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই দুটি বিষয়ে হাজারো প্রকাশনা, গ্রন্থ থাকলেও অধিকাংশই বিতর্কিত ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট। গবেষণাও রয়েছে নামমাত্র। এমনকি স্বাধীনতার ৪৬ বছর পরেও সর্বজনস্বীকৃত কিংবা সরকারিভাবে মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধু বিষয়ে তেমন নির্ভরযোগ্য খুব বেশি গ্রন্থ প্রকাশ হয়নি।

বাস্তবতা হচ্ছে, ভাষা আন্দোলন, ছয় দফা, গণ অভ্যুত্থান, অপারেশন সার্চলাইট, মুক্তিযুদ্ধ কিংবা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিগত পর্যায়ে স্তুতিমূলক বইয়ের ছড়াছড়ি রয়েছে। এর বেশির ভাগই বিভিন্ন লেখার কপি কিংবা অনুলিখন। মৌলিক গবেষণাকর্ম বা গবেষণালব্দ প্রকাশনার সংখ্যা খুবই কম।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির লাইব্রেরিয়ানের অফিসকক্ষের কম্পিউটারে ক্যাটালগ খুঁজে দেখা যায়, মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ বিষয়ে ৪০২টি বই সংরক্ষিত রয়েছে। কিন্তু কোনো গবেষণা গ্রন্থ নেই। এমফিল ও পিএইচডি নিবন্ধিত করার খাতায় খোঁজ করে পাওয়া যায় বঙ্গবন্ধুর ওপর সুনির্দিষ্ট মাত্র একটি গবেষণা পত্র আছে। ‘স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশে ইসলামী আদর্শ ও মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান-এর অবদান’ শিরোনামে একটি গবেষণা তথ্য ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ থেকে প্রকাশিত হয় ২০১৫ সালের জুলাইয়ে। যদিও গবেষণাটি করেন মো. আশিকুর রহমান নামের একজন ছাত্র। কোনো শিক্ষকের গবেষণার খোঁজ পাওয়া যায়নি প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত দেশের সর্বোচ্চ এই বিদ্যাপীঠে।

অনুমান করা যায়, দেশের অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়েরও একই অবস্থা। কিছু পজিশনিং পেপার কিংবা জার্নালে এসব বিষয়ে কিছু নিবন্ধ পাওয়া যেতে পারে কিন্তু ওগুলো কোনো ভাবেই বৃহৎ কোনো গবেষণালব্ধ কর্ম নয়। প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণার জন্য একটি উদ্যোগ ছিলো ‘বঙ্গবন্ধূ, মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশ গবেষণা ইনস্টিটিউট’ প্রতিষ্ঠা করার। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯৯৯ সালে গবেষণা ইনস্টিটিউটটি প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে এর কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়।

এরপর মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের দল হিসেবে পরিচিত বর্তমান ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ দু’দফায় ক্ষমতায় এলেও গবেষণা ইনস্টিটিউটটি আর চালু হয়নি। যদিও গত ২৪ অক্টোবর জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের রজতজয়ন্তী অনুষ্ঠানে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আকম মোজাম্মেল হক বলেছিলেন, ‘খুব শিগগিরই মুক্তিযুদ্ধ বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ গবেষণা ইনস্টিটিউট এর কার্যক্রম চালু হবে’। কিন্তু এরপর থেকে এখনো এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন থেকে কোনো ঘোষণা আসেনি।

প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ অধ্যাপক মুনতাসির মামুন রাইজিংবিডিকে বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধ এবং বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে যে পরিমাণ গবেষণা হওয়ার প্রয়োজন ছিল, যে পরিমাণ প্রকাশনা হওয়ার কথা ছিল, তা হয়নি।’

তিনি আরো বলেন, ‘আবার, বঙ্গবন্ধু মানেই একটি প্রতিষ্ঠান। তার মতো মানুষকে নিয়ে যে পরিমাণ গবেষণা প্রয়োজন ছিলো তা হচ্ছে না। যদিও বাজারে পাওয়া যায়, বঙ্গবন্ধুর ওপর অনেক বই আছে। তবে অধিকাংশ বই-ই চর্বিতচর্বণ। এই মহান ব্যক্তিকে নিয়ে গবেষণামূলক বইয়ের অনেক সংকট।’

ইতিহাসবিদ ও শিক্ষাবিদ অধ্যাপক সৈয়দ আনোয়ার হোসেন রাইজিংবিডিকে বলেন, ‘জাতির জনকের জীবন, কর্ম ও নীতি নিয়ে যে পরিমাণ গবেষণা হওয়ার প্রয়োজন ছিল তা খুব একটা হয়েছে বলে আমার মনে হয় না। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তো নয়ই। ৪৬ বছরে আমরা একটি নির্ভরযোগ্য মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকাই পেলাম না।’

তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয় এ বিষয়ে আওয়ামী লীগ খুব একটা ঐকান্তিকতার পরিচয় এখনো দিতে পারেনি। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কবিতা লেখা হয়েছে, প্রবন্ধ লেখা হয়েছে এবং গবেষণা গ্রন্থও বের হয়েছে। কিন্তু সিংহভাগ যাকে বলা যায় স্তুতিমূলক। তাকে বায়োগ্রাফি বলা যায় না।’

তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগ সরকার ১৯৯৬-২০০১ মেয়াদে এক মার্কিন অধ্যাপককে অন্তত নিয়ে এসেছিলো বঙ্গবুন্ধুর জীবনী লেখানোর জন্য। কিন্তু সেই কাজটি হয়নি। আমি মনে করি বিদেশিদেরকে দিয়ে বঙ্গবন্ধূর জীবনী লেখানো খুব একটা সম্মানজনক নয়। বাংলাদেশেই অনেক ভালো গবেষক আছেন। ইংরেজি ভাষাতেও যথেষ্ট দক্ষতা আছে। তাদেরকে নিয়ে যদি আওয়ামী লীগ বিশেষভাবে সচেষ্ট হয় আমি মনে করি যে, বঙ্গবন্ধুর ওপর একটি গবেষণাগ্রন্থ বেরিয়ে যাবে, যা নির্ভরযোগ্য সূত্র হিসেবে বিবেচিত ‍হবে।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক রাইজিংবিডিকে বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর নামে অবকাঠামো নির্মাণের চেয়ে তার জীবন, কর্ম ও আদর্শের ওপর গবেষণাকে বেশি প্রাধান্য দেওয়া উচিত। কারণ, এসব বিষয়ে গবেষণা আমাদের ইতিহাসকে সমৃদ্ধ করবে, স্থায়িত্ব দেবে এবং নতুন প্রজন্মের ইতিহাসবোধকে জাগ্রত করবে।’

তিনি বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর সংক্ষিপ্ত ৫৫ বছরের জীবনে বহু ঘটনা আছে, বহু মুহূর্ত আছে। এগুলো আমাদের ইতিহাসকে প্রভাবিত করেছে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা এবং বঙ্গবন্ধুর ইতিহাস একসূত্রে গাঁথা। আমরা বাংলাদেশ নিয়ে গবেষণা করলে যেমন বঙ্গবন্ধু আসবে, তেমনি বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে গবেষণা করলে সেখানে বাংলাদেশ, মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা সংগ্রাম সামঞ্জস্যপূর্ণ। সে কারণে এখানে গবেষণার প্রচুর সুযোগ আছে। প্রয়োজনও রয়েছে।’

আরেফিন সিদ্দিক আরো বলেন, ‘অন্যান্য নেতা যারা ছিলেন তারা ইতিহাস থেকে সৃষ্ট। আর বঙ্গবন্ধুর জীবন মূল্যায়ন করলে দেখা যায় বঙ্গবন্ধু ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন। সেই কারণে ইতিহাস গবেষণায় বঙ্গবন্ধু ফিরে ফিরে আসবেন। বিভিন্ন গবেষণার মাধ্যমে নতুন নতুন তথ্য উদঘাটন হলে জাতি উপকৃত হবে, বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধ যুগ যুগ ইতিহাসে, আমাদের প্রেরণায় বেঁচে থাকবে।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান এ বিষয়ে রাইজিংবিডিকে বলেন, ‘আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার প্রেক্ষাপট, ঘটনাপ্রবাহ অনেক। এমন অনেক বিষয় আছে যে, আমরা বুঝিও না, সেসব বিষয় কীভাবে মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার সঙ্গে জড়িত। বিভিন্ন ব্যক্তি, ঘটনা, বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ তারিখ-মাস-সন, বিষয়বস্তু নিয়ে বড় আকারের গবেষণা কর্মের অভাব রয়েছে।’

উপাচার্য বলেন, ‘তবে কিছু কিছু গবেষণা হচ্ছে। জাতীয় পর্যায়ে, স্থানীয় পর্যায়ে, খুব স্থানীয় পর্যায়েও গবেষণা হতে আমরা দেখছি। কিন্তু বড় আকারের কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক কোনো গবেষণা, যেগুলোর মাধ্যমে জাতি আরো অনেক জানতে পারতো, তেমন গবেষণা কমই হচ্ছে। এমন গবেষণা প্রয়োজন।’



রাইজিংবিডি/ঢাকা/৩ ডিসেম্বর ২০১৭/হাসান/শাহনেওয়াজ

Walton
 
   
Marcel