ঢাকা, বুধবার, ২৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৪, ১৩ ডিসেম্বর ২০১৭
Risingbd
সর্বশেষ:

মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সংরক্ষণের পাশাপাশি পর্যটক আর্কষণের উদ্যোগ

হাসান মাহামুদ : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৭-১২-০৪ ৬:৪৭:২০ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৭-১২-০৮ ১২:২২:৩৪ পিএম
সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ঘিরে সরকারের নতুন পরিকল্পনার প্রস্তাবিত নকশা

হাসান মাহামুদ : স্বাধীনতার অসংখ্য সাক্ষীবহন করা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের স্বাধীনতাস্তম্ভ প্রকল্পের পূর্ণাঙ্গ কাজ সম্পন্ন করতে তৃতীয় পর্যায়ের নতুন প্রকল্প গ্রহণ করছে সরকার। নতুন পরিকল্পনায় এখানে বসবে ৭ মার্চের জনসভা মঞ্চের রেপ্লিকা। বসবে আত্মসমর্পণ দলিল স্বাক্ষরের নিদর্শন টেবিল। জনসভার জন্য নির্মিত হবে স্থায়ী মঞ্চ। এমনকি ঐতিহাসিক এই উদ্যানের সব স্মৃতি সংরক্ষণের পাশাপাশি এটিকে দেশী এবং বিদেশী পর্যটকদের কাছে আরো আকর্ষণীয় করে গড়ে তোলা হবে ।

একটি দেশের কৃষ্টি-ঐতিহ্য বেঁচে থাকে ইতিহাসে। এ জন্য সঠিক ইতিহাস সংরক্ষণের বিকল্প নেই। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানকে ঘিরে সরকার এরই মধ্যে দুই পর্যায়ের বৃহৎ প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন করেছে। এবার এখানে ‘সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে স্বাধীনতাস্তম্ভ নির্মাণ (তৃতীয় পর্যায়)’ শীর্ষক প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে।

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক আহ্বান এবং স্বাধীনতাযুদ্ধে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর পরাজয় ও আত্মসমর্পণের দলিল স্বাক্ষরের উজ্জ্বলতম স্মৃতিকে সংরক্ষণ করতে প্রকল্পের তৃতীয় পর্যায় বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে ২৩৮ কোটি টাকা। ২০১৯ সালের জুনের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

এই ‘প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি)’ তৈরি হয় ২০১৫ সালে। এরপর বিভিন্ন পর্যায়ে এটি যাচাই-বাছাই এবং বাস্তবায়নের উপায় নিয়ে মিটিং হয়েছে। পরিকল্পনা কমিশনে বর্তমানে এটি জমা হয়েছে। মন্ত্রণালয় আশা করছে, ২০১৮ সালের শুরুর দিকে এটি অনুমোদন পাবে।

জানতে চাইলে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়কমন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক রাইজিংবিডিকে বলেন, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক যে কোনো প্রকল্পের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর আন্তরিকতা বেশি থাকে। এই প্রকল্পের বিষয়েও প্রধানমন্ত্রীর আগ্রহ ও নির্দেশনা রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুসারেই প্রকল্পটির ডিপিপি তৈরি থেকে শুরু করে যাবতীয় কাজ চলছে।

তিনি বলেন, প্রকল্পটি জাতীয় জাদুঘর কর্তৃপক্ষের অধীনে বাস্তবায়িত হবে। তবে আমরা আশা করছি স্বাধীনতার স্মৃতি সংরক্ষনের এই প্রকল্পটি যথাসময়েই সম্পন্ন করা যাবে।

জানা গেছে, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের স্বাধীনতাস্তম্ভ প্রকল্পের তৃতীয় পর্যায়ের নতুন প্রকল্পে স্মৃতি সংরক্ষণের পাশাপাশি জাতি এবং বিদেশীদের কাছে প্রকৃত চিত্র তুলে ধরার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এক্ষেত্রে ঐতিহাসিক উদ্যানটিকে পর্যটকদের কাছে আরো আকর্ষণীয় করে গড়ে তোলা হবে।

নতুন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সুবিধার্থে উদ্যানের সুউচ্চ তবে অপ্রয়োজনীয় বেশকিছু গাছ কাটা পড়তে পারে। গ্লাস টাওয়ারের চারপাশে নতুন করে ঘাস রোপণ করে বৃত্ত গড়ে দেওয়া হবে। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের সঙ্গে একীভূত হবে শিশুপার্ক। নতুন রাইড বসিয়ে পার্কটি দর্শনার্থীদের কাছে আকর্ষণীয় করে তোলার পাশাপাশি পার্কের নিচে তৈরি হবে পার্কিং। পার্ক ও উদ্যান মিলিয়ে নির্মিত হবে পাঁচটি ফুড কোর্ট। দর্শনার্থীদের জন্য বসার জন্য বানানো হবে বেঞ্চ। পাশাপাশি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের নিরাপত্তাও জোরদার করা হবে। শিশুপার্ক ও পার্কিং নির্মাণের দায়িত্ব ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনকে দেওয়া হয়েছে।

জানা গেছে, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের সৌন্দর্য বৃদ্ধির বিষয়টি অগ্রাধিকার পাচ্ছে। গ্গ্নাস টাওয়ারের দৃষ্টিসীমায় যেন বিঘ্ন না ঘটে সে কথা মাথায় রেখে স্থাপনা নির্মাণ করা হবে। এ কারণে অপ্রয়োজনীয় বড় গাছও কেটে ফেলা হতে পারে। সে সঙ্গে শিশুপার্কের এমন কোনো রাইডও স্থাপন করা হবে না, যা গ্লাস টাওয়ারকে বাধাগ্রস্ত করে।

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের শিখা চিরন্তনের সামনে দিয়ে শিশু পার্কের নতুন প্রবেশপথ তৈরি করা হবে। এর ফলে শিশুপার্ক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের সঙ্গে একীভূত হবে। এ প্রবেশপথের দু’পাশে কৃত্রিম জলাশয় ও ঝরনা তৈরি করা হবে। এ ছাড়া ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণ এবং ১৬ ডিসেম্বরে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর আত্মসমর্পণের স্থান দু’টি চিহ্নিত করে দু’টি স্থাপনা নির্মাণ করা হবে।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা গেছে, শিশুপার্কের বেশিরভাগ রাইড পুরনো হয়ে গেছে। এগুলো বদলে নতুন রাইড আনার পরিকল্পনা হচ্ছে। এ ছাড়া সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ায় শিশু পার্কে আসা বাচ্চারাও মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে ধারণা নিতে পারবে।

উদ্যানে চিহ্নিত করা হবে সাতটি ঐতিহাসিক স্থান। স্থাপন করা হবে ঐতিহাসিক ৭ মার্চের জনসভা মঞ্চের রেপ্লিকা। প্রতিস্থাপন করা হবে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর আত্মসমর্পণ দলিল স্বাক্ষরের নিদর্শন টেবিল। শিশু পার্ককে না সরিয়ে একীভূত করা হবে স্বাধীনতাস্তম্ভ প্রকল্পের সঙ্গে। উদ্যানের একাংশে জনসভার জন্য নির্মিত হবে স্থায়ী মঞ্চ। সাংস্কৃতিক বলয় গড়ে তোলার অংশ হিসেবে উদ্যানকে রমনা পার্ক এবং বাংলা একাডেমির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর স্বাধীনতাসংগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধ ও সশস্ত্র বিজয়ের গৌরবময় স্মৃতিকে চির অম্লান করে রাখতে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে স্বাধীনতাস্তম্ভ নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়। ১৭ বছর পর নানা বাধাবিপত্তি পেরিয়ে দুই পর্যায়ে ২০১৪ সালের জুনে সম্পন্ন হয় স্বাধীনতাস্তম্ভ প্রকল্পের কাজ। মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে পূর্ত মন্ত্রণালয় প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ করে।

নগর গণপূর্ত বিভাগ সূত্র জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানকে দৃষ্টিনন্দন পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দেন। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার দুটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে- উদ্যানের দক্ষিণ পাশে জনসভার জন্য স্থায়ী মঞ্চ নির্মাণ এবং উত্তর পাশে শিশু পার্ককে উদ্যানের সঙ্গে একীভূত করা। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুসারে স্থাপত্য নকশা ও উদ্যান নিয়ে পূর্ণাঙ্গ নকশা তৈরির জন্য স্থাপত্য অধিদপ্তরকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। ২০১৪ সালের ২৮ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পূর্ত মন্ত্রণালয় পরিদর্শনকালে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের স্বাধীনতাস্তম্ভ প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন করতে  এসব নির্দেশনা দেন।

স্থাপত্য অধিদপ্তর সূত্র জানায়, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুসারে কাজ করেছে অধিদপ্তর। প্রকল্পের আওতায় শিশুদের জন্য বড় আকারে শিশুপার্ক গড়ে তোলা হবে। শিশু পার্ককে উদ্যানের সঙ্গে একীভূত করে এটিকে থিম পার্ক হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। শিশুরা যাতে খেলা ও আনন্দচ্ছলে ইতিহাসের সঙ্গেও পরিচিত হতে পারে সে জন্য ভাস্কর্য, ম্যুরাল সংযুক্ত করা হতে পারে।

বর্তমানে রাজধানীতে পল্টনের মুক্তাঙ্গন ছাড়া জনসভার জন্য নির্দিষ্ট আর কোনো জায়গা নেই। মুক্তাঙ্গনেও আবার বড় জনসভার পরিসর নেই। সেই চিন্তা থেকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের একটি স্থানে জনসভার জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হতে পারে। পরিকল্পনা অনুসারে উদ্যানের একটি নির্দিষ্ট স্থানে যাতে জনসভা করা যায় সে জন্য পাকা বেদি তৈরি করা হবে। ৭ মার্চে যে জায়গায় প্রধানমন্ত্রীর জনসভা হয়েছে সেখানেই এ বেদি নির্মাণ করা হতে পারে।

স্বাধীনতা প্রকল্পের তৃতীয় পর্যায়ের পরিকল্পনায় ল্যান্ডস্কেপিংয়ের (নৈসর্গিক দৃশ্য) বিষয়টিও রয়েছে। এতে অপরিকল্পিতভাবে লাগানো গাছ কেটে ফেলা হতে পারে। স্বাধীনতাস্তম্ভের গ্লাস টাওয়ার, ম্যুরাল, শিখা চিরন্তন- এগুলো উদ্যানের যেকোনো জায়গা থেকে যাতে দেখা যায় সেদিকে খেয়াল রেখে নতুন করে বৃক্ষরোপণের পরিকল্পনা নেওয়া হবে।

১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু যে স্থান থেকে ঐতিহাসিক ভাষণ দিয়েছিলেন, তা চিহ্নিত করে সেখানে মঞ্চের রেপ্লিকা স্থাপনের পরিকল্পনা ছিল প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায়েই। একইভাবে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী যে টেবিলে আত্মসমর্পণের দলিল সই করেছিল, তা যথাস্থানে স্থাপন ও সংরক্ষণেরও কথা ছিল। কিন্তু তা হয়নি। এ দুটি জায়গা শিশু পার্কের মধ্যে পড়েছে। পার্ককে উদ্যানের সঙ্গে একীভূত করে সেই কাজ এখন তৃতীয় পর্যায়ে সম্পন্ন হবে।

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের আগের নাম ছিল রেসকোর্স ময়দান। বাংলাদেশের জন্মের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ময়দানটি। দেশের মোড় পরিবর্তনকারী ঐতিহাসিক অনেক জনসভা ও ঘটনা এখানে সংঘটিত হয়েছে। নতুন পরিকল্পনা অনুসারে শিশু পার্কের প্রবেশপথই হবে স্বাধীনতাস্তম্ভ প্রকল্পের প্রবেশপথ। পুলিশ কন্ট্রোলরুমের জায়গায় হবে কার পার্কিংয়ের স্থান। পুলিশ কন্ট্রোলরুমের স্থানে, যেখানে ব্রিটিশ আমলে নির্মিত জিমখানা ও গ্যালারি রয়েছে, সেগুলোকে সংস্কার ও নবায়ন করে রক্ষা করা হবে। একটি দোতলা ভবনকে লাইব্রেরিতে রূপান্তরের পরিকল্পনাও রয়েছে। আদালতের নির্দেশনা অনুসারে পুলিশ কন্ট্রোলরুম চলে গেলেও রয়ে গেছে শাহবাগ থানা। এটি স্থানান্তরের বিষয়ে আলোচনা চলছে বলেও জানা গেছে।

২০০৯ সালে হাইকোর্ট এ উদ্যান থেকে স্বাধীনতা-পরবর্তীকালে নির্মিত সব স্থাপনা অপসারণের নির্দেশ দেন। সেই নির্দেশনা অনুসারে মহানগর পুলিশ কন্ট্রোলরুম ইতিমধ্যে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। শিশু পার্ক সরিয়ে না নিলেও একীভূত করা হচ্ছে।

জানা গেছে, স্বাধীনতাস্তম্ভ প্রকল্প মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় থেকে সরিয়ে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অধীনে দেওয়া হয়েছে। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় প্রকল্পের দেখভালের দায়িত্ব দিয়েছে জাতীয় জাদুঘর কর্তৃপক্ষকে। এ প্রকল্পের অংশ হিসেবে নির্মিত ভূগর্ভস্থ স্বাধীনতা জাদুঘর ২০১৪ সালের ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবসে সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়।

 

 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/৪ ডিসেম্বর ২০১৭/হাসান/এনএ

Walton
 
   
Marcel