ঢাকা, শুক্রবার, ৩০ অগ্রহায়ণ ১৪২৪, ১৫ ডিসেম্বর ২০১৭
Risingbd
সর্বশেষ:

ট্রাস্টের অব্যবহৃত জমিতে বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণের চিন্তা

হাসান মাহামুদ : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৭-১২-০৫ ৩:৪১:৩১ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৭-১২-০৮ ১২:২৫:৫৯ পিএম

হাসান মাহামুদ : স্বাধীনতার পরের বছর বঙ্গবন্ধু সরকার মুক্তিযোদ্ধাদের কল্যাণে গঠন করে মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট। কিন্তু নেতৃত্বের অভাব, ব্যবস্থাপনার ঘাটতি এবং দুর্নীতির কারণে গত দুই যুগে বন্ধ হয়ে গেছে ট্রাস্টের ২৯টি প্রতিষ্ঠান। এবার শেষ চেষ্টা হিসেবে বন্ধ থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর অব্যবহৃত জমিতে বাণিজ্যিক ও আবাসিক বহুতল ভবন নির্মাণের চিন্তাভাবনা করছে সরকার।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট বাংলাদেশের এবং মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য বিরাট একটি আশির্বাদ ছিল। কিন্তু দায়িত্বশীলদের খামখেয়ালী আর প্রায় সব সরকারের আমলে নীতিনির্ধারকদের অদূরদর্শিতার কারণে এই কল্যাণ ট্রাস্ট এখন খাদের কিণারে এসে দাঁড়িয়েছে।

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, বন্ধ থাকা ২৯টি প্রতিষ্ঠানের হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পত্তি ও ১০১ কোটি টাকার ঋণ নিয়ে এখন বিপাকে পড়েছে সরকার। বর্তমানে ট্রাস্টের তিনটি প্রতিষ্ঠান চালু রয়েছে। এগুলো হলো- ঢাকার পূর্ণিমা ফিলিং অ্যান্ড সার্ভিস স্টেশন, চট্টগ্রামের ইস্টার্ন কেমিক্যাল লিমিটেড ও ঢাকার মিমি চকলেট লিমিটেড। এর মধ্যে ফিলিং স্টেশন ছাড়া অন্য দুই প্রতিষ্ঠান দেনার দায়ে জর্জরিত।

ট্রাস্টের আয়ের প্রধান উৎস হচ্ছে এখন ১৬০ কোটি টাকার ফিক্সড ডিপোজিট (এফডিআর)। এর মধ্যে ৪২ কোটি টাকার এফডিআর থেকে পাওয়া লভ্যাংশ দিয়ে মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের জন্য ‘বঙ্গবন্ধু ছাত্রবৃত্তি’ দেওয়া হয়। আর বাকি ১১৮ কোটি টাকার এফডিআর থেকে লভ্যাংশ বাবদ পাওয়া মাসিক ৬৯ লাখ টাকা এবং গুলিস্তান মার্কেটসহ কয়েকটি মার্কেটের ভাড়া ও পূর্ণিমা ফিলিং স্টেশন মিলিয়ে পাওয়া ৭৩ লাখ টাকা দিয়ে বর্তমানে ট্রাস্টের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ব্যয় নির্বাহ করা হচ্ছে। এরপরও অবসরে যাওয়া কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অন্যান্য পাওনা অর্থাভাবে পরিশোধ করতে পারছে না ট্রাস্ট। বন্ধ এসব প্রতিষ্ঠানে প্রায় চারশ’ কর্মকর্তা-কর্মচারীর জন্য প্রতিবছর ট্রাস্টের ব্যয় হয় ১৮ কোটি টাকা।

গত কয়েক বছরে কল্যাণ ট্রাস্টের তিনশ’ কোটি টাকার বেশি ঋণ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হস্তক্ষেপে মওকুফ করা হয়েছে। তবুও অস্তিত্ব সংকটে ভুগছে ট্রাস্টের অধীনের প্রতিষ্ঠানগুলো।

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক রাইজিংবিডিকে বলেন, ‘বর্তমান সরকার প্রথম থেকেই মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টকে লাভজনক করার কথা ভাবছে। প্রধানমন্ত্রী নিজেও এই প্রতিষ্ঠানগুলোর খোঁজখবর নেন। কিন্তু বিভিন্ন কারণে পরিকল্পণা ফলপ্রসু হয়ে উঠছে না। বর্তমানে বন্ধ থাকা প্রতিষ্ঠানগুলো চালু করে ট্রাস্টকে লাভজনক করার জন্য চেষ্টা চলছে।’

জানা গেছে, গাজীপুরের কুনিয়া মৌজার ২ দশমিক ৬৮ শতাংশ, রাজধানীর মোহাম্মদপুরের গজনবী রোডের ১/৬ প্লটের দশমিক ২২ একর, চট্টগ্রামের নাসিরাবাদের ১ দশমিক ৯৩ একরসহ ১১টি প্রতিষ্ঠানের জমিতে ডেভেলপারের মাধ্যমে ভবন নির্মাণ করে ভাড়া দেওয়ার প্রস্তাবনা আলোচনা পর্যায়ে রয়েছে। গত ১৭ অক্টোবর ট্রাস্টের প্রধান কার্যালয়ে এ নিয়ে বৈঠকও হয়। এরপর গত দুমাসে উদ্যোগের আর অগ্রগতি হয়নি। তবুও ট্রাস্ট্রের কর্মকর্তারা আশা করছেন অব্যবহৃত জমিতে বাণিজ্যিক ও আবাসিক বহুতল ভবন নির্মাণের উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে। ফলে কিছুটা হলেও লোকসান কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে বলে আশা করছেন তারা।

বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধে শহীদ বা আহত মুক্তিযোদ্ধা পরিবারসমূহের কল্যাণে বিভিন্ন কর্মসূচির বাস্তবায়নে বিধিবদ্ধ দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন একটি কল্যাণধর্মী প্রতিষ্ঠান। ১৯৭২ সালে সেপ্টেম্বরে রাষ্ট্রপতির একটি অধ্যাদেশবলে (রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশ নম্বর ৯৪, ১৯৭২) এ ট্রাস্ট প্রতিষ্ঠিত হয়।

শহীদ ও আহত মুক্তিযোদ্ধা পরিবারসমূহের পুনর্বাসনের লক্ষ্যে গৃহীত বিভিন্ন কার্যক্রমে অর্থায়নের লক্ষ্যে সরকার ১৯টি শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের মালিকানা ট্রাস্টের কাছে হস্তান্তর করে। পরে মুক্তিযোদ্ধাদের কল্যাণে ২২টি লাভজনক প্রতিষ্ঠান নিয়ে ১৯৭২ সালে মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট গঠন করে বঙ্গবন্ধু সরকার। এরপর জিয়া ও এরশাদ সরকার ট্রাস্টে নয়টি প্রতিষ্ঠান যুক্ত করায় মোট প্রতিষ্ঠান দাঁড়ায় ৩২টিতে। কিন্তু লাভজনক এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১৪টি প্রতিষ্ঠানই এরশাদের আমলের শেষ দিকে এবং ১৯৯১ সালে ক্ষমতায় আসা বিএনপি সরকারের পাঁচ বছরে বন্ধ করে দেওয়া হয়। অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোও তখন থেকে ব্যবস্থাপনার ঘাটতি ও দুর্নীতির কারণে ঝুঁকির মধ্যে পড়ে। এরই ধারাবাহিকতায় ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় আসার আগেই বন্ধ থাকা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা এসে দাঁড়ায় ২৯টিতে।

ট্রাস্টের নিয়ন্ত্রক মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়। মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের সব প্রতিষ্ঠান পরিচালনার দায়িত্ব বঙ্গবন্ধু সরকারের আমলে ছিল প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের। ২০০২ সালে মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় গঠনের পর মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টসহ এর আওতাধীন সব প্রতিষ্ঠান এ মন্ত্রণালয়ের অধীনে নিয়ে আসা হয়। তখন থেকে ট্রাস্টের বাকি প্রতিষ্ঠানগুলোও একে একে বন্ধ হতে শুরু করে। গত আট বছরে এসব প্রতিষ্ঠান একাধিকবার চালুর উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা কার্যকর হয়নি।

ট্রাস্টের অতিরিক্ত প্রধান হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা মোহাম্মদ হোসেন বলেন, ‘২০০২ সালে ট্রাস্ট মন্ত্রণালয়ের অধীনে যাওয়ার পর থেকে চিঠি চালাচালি করতে গিয়েই সিদ্ধান্তহীনতায় অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠান আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছে। এ ছাড়া নেতৃত্বের অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতি তো রয়েছেই।’

এর থেকে উত্তরণের উপায় জানতে চাইলে তিনি বলেন, ট্রাস্টের পুরো কার্যক্রম বাণিজ্যিক কাজের সঙ্গে যুক্ত। এ জন্য সংশ্নিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর বিভিন্ন বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা প্রয়োজন হয়। সেক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী সবসময় এই ট্রাস্টের বিষয়ে যত্নশীল ও আগ্রহী। তিনি সরাসরি হস্তক্ষেপ করলে অনেক সমস্যার তড়িৎ সমাধান হতে পারে।’

সামগ্রিক বিষয়ে ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আজাহারুল হক বলেন, ‘ট্রাস্টকে লাভজনক করার বিষয়ে আমাদের প্রচেষ্টা ও চিন্তা অব্যাহত রয়েছে। লোকসান কমিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের কল্যাণে ট্রাস্টকে লাভজনক করার জন্য বন্ধ থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর যেসব জমি অব্যবহূত অবস্থায় পড়ে আছে, সেসব স্থানে বাণিজ্যিক ও আবাসিক বহুতল ভবন নির্মাণের চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে।’

ট্রাস্টের প্রধান এই ব্যক্তি আরো বলেন, ‘এই পরিকল্পনা বর্তমানে মতামত পর্যায়ে রয়েছে। সুনির্দিষ্ট মতামত ও সরকারের আগ্রহের প্রেক্ষিতে কার্যক্রম শুরু হতে পারে।’

 

 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/৫ ডিসেম্বর ২০১৭/হাসান/শাহনেওয়াজ

Walton
 
   
Marcel