ঢাকা, মঙ্গলবার, ১০ মাঘ ১৪২৪, ২৩ জানুয়ারি ২০১৮
Risingbd
সর্বশেষ:

মুক্তিযুদ্ধের মাহাত্ম্য রক্ষায় এবার খেতাব পুনর্মূল্যায়ন হচ্ছে

হাসান মাহামুদ : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৭-১২-৩০ ৯:৪৭:২৭ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৮-০১-১২ ১০:২২:০৩ এএম

হাসান মাহামুদ : নয় মাস রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম, অজস্র ত্যাগ-তিতিক্ষার ফল আমাদের স্বাধীনতা। স্বাধীনতার জন্য সর্বস্তরের মানুষ লড়েছে, প্রাণ দিয়েছে। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য দেওয়া খেতাবগুলোর বেশিরভাই সামরিক ও আধা-সামরিক বাহিনীর সদস্যরা পেয়েছেন। ফলে সর্বস্তরের এই জনযুদ্ধ অদূর ভবিষ্যতে সামরিক যুদ্ধ হিসেবেও আখ্যায়িত হতে পারে বলে উপলদ্ধি করেছে সরকার। এ অবস্থায় যুদ্ধের মাহাত্ম্য ও বীরত্বসূচক খেতাবগুলো পুনর্মূল্যায়নের উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার।

এক্ষেত্রে মুক্তিযুদ্ধে অবদানের জন্য সামরিক ও আধা-সামরিক বাহিনীর মতো বেসামরিক মুক্তিযোদ্ধাদেরও বেশি সংখ্যায় খেতাবে ভূষিত করা হতে পারে। এমনকি খেতাবপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে যুদ্ধে প্রথম প্রতিরোধকারী পুলিশ বাহিনীর সদস্যরাও বঞ্চিত হয়েছেন। বিষয়টিও এবার বিবেচনায় আনতে যাচ্ছে সরকার। একই সঙ্গে বাতিল করা হচ্ছে বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত ও মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত চার খুনির মুক্তিযুদ্ধের খেতাব।

একাত্তরে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে সরকার মুক্তিযোদ্ধাদের বীরশ্রেষ্ঠ, বীর উত্তম, বীর বিক্রম ও বীর প্রতীক- এই চার ধরনের উপাধি দিয়েছে। জানা গেছে, উদ্যোগের অংশ হিসেবে সব খেতাবই পুনর্মূল্যায়ন করবে সরকার। এক্ষেত্রে সরকার মনে করে, খেতাবের বিষয়টি পুনর্মূল্যায়ন প্রয়োজন। তা না হলে রাজনৈতিক নেতৃত্বে পরিচালিত মুক্তিযুদ্ধ একসময় বিশ্বের কাছে সামরিক যুদ্ধ হিসেবে বিবেচিত হবে।

এ বিষয়ে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক রাইজিংবিডিকে বলেন, বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। বিলম্বে হলেও এ মহতী উদ্যোগটি নিতে পেরে আমরা আনন্দিত। বিশেষ করে বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত ও মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত চার খুনির মুক্তিযুদ্ধের খেতাব বাতিল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিয়ে একটি সারসংক্ষেপ মন্ত্রিসভার বৈঠকে উপস্থাপন করতে যাচ্ছে শিগগিরই।

১৯৭১ সালে স্বাধীনতাযুদ্ধে যারা অবদান রেখেছিলেন, তাদের মধ্যে থেকে অবদানের ভিত্তিতে সরকার সাতজনকে বীরশ্রেষ্ঠ, ৬৮ জনকে বীর উত্তম, ১৭৫ জনকে বীর বিক্রম ও ৪২৬ জনকে বীর প্রতীক উপাধিতে ভূষিত করে। এই সাতজন বীরশ্রেষ্ঠ ছাড়াও ৬৮ জন বীর উত্তম খেতাবপ্রাপ্তদের মধ্যে ৬৬ জন বিভিন্ন বাহিনীর সদস্য। এখানে মাত্র দুজন রয়েছেন বেসামরিক মুক্তিযোদ্ধা। ১৭৫ জন বীর বিক্রমের মধ্যে ১৩৭ জন বিভিন্ন সামরিক বাহিনীর সদস্য এবং ৩৮ জন গণবাহিনী (মুক্তিযোদ্ধা, গেরিলা, মুজিব বাহিনী) ও পুলিশের সদস্য। বীর প্রতীক খেতাবপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সংখ্যা ৪২৬ জন। এর মধ্যে মুক্তিবাহিনীর সদস্য ১২০ জন ও সামরিক বাহিনীর সদস্য ৩০৬ জন।

১৯৭৩ সালের ১৫ ডিসেম্বর বাংলাদেশ গেজেটের একটি অতিরিক্ত সংখ্যায় প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এই খেতাবপ্রাপ্তদের নাম ঘোষণা করা হয়।

এরপর মুক্তিযুদ্ধের বাইরে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে বাঁচাতে গিয়ে নিজ বাহিনীর বিপদগামী কিছু সেনা সদস্যের হাতে নিহত হন কর্নেল জামিল আহমেদ। ২০১০ সালে তাকে বীর উত্তম খেতাব প্রদান করা হয়। এছাড়া স্বাধীনতার পর এ পর্যন্ত পার্বত্য চট্টগ্রাম, টাঙ্গাইল-ময়মনসিংহ, রাজশাহী ও অন্যান্য স্থানে পরিচালিত অপারেশনে সেনাবাহিনী ও বাংলাদেশ রাইফেলসের (বর্তমানে বিজিবি) ১২৬ জন বীরত্বসূচক খেতাব পেয়েছেন।

এদিকে সশস্ত্র বাহিনীর বাইরে স্বল্পসংখ্যক বেসামরিক মুক্তিযোদ্ধা পদক পাওয়ার ঘটনা নিয়ে জাতীয় সংসদে আলোচিত হয়। ২০১৬ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর সংসদের প্রশ্নোত্তর পর্বে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক জানিয়েছিলেন, মুক্তিযুদ্ধে রাজনৈতিক ও বেসামরিক মুক্তিযোদ্ধাদেরও বীরত্বের জন্য ‘বীরত্বসূচক খেতাব’ পুনর্মূল্যায়ন করা হবে।

তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধে রাজনৈতিক ও বেসামরিক মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বের মূল্যায়ন করে খেতাব না দেওয়া হলে মনে হবে এটা সামরিক মুক্তিযুদ্ধ ছিল। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ সামরিক নয়, রাজনৈতিক জনযুদ্ধ ছিল।

ইতিহাসবিদরা বলছেন, যুদ্ধ করে স্বাধীনতা অর্জনে বাংলাদেশকে যে পরিমাণ রক্ত দিতে হয়েছে তা অভাবনীয়। ৩০ লাখ মানুষের প্রাণ আর ৪ লাখেরও বেশি নারীর সম্ভ্রম হারাতে হয়েছে। প্রাণ বাঁচাতে ১ কোটি মানুষ যেমন ভারত-মিয়ানমারে আশ্রয় নিয়েছিল, তেমনি কয়েক লাখ মানুষ অস্ত্র তুলে নিয়েছিল হাতে। যুদ্ধে অবদানের জন্য যে পদক দেওয়া হয়, তার মধ্যে সাতজনকে বীরশ্রেষ্ঠ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হলেও বেসামরিক যোদ্ধাদের কাউকে এ পদক দেওয়া হয়নি।

একইভাবে বীর বিক্রম ১৭৫ জনের মধ্যে কেবল ৩৮ জন বেসামরিক যোদ্ধা এবং পুলিশ। সেই তুলনায় বীর প্রতীক খেতাব পাওয়া বেসামরিক যোদ্ধার সংখ্যা তুলনামূলক বেশি। মোট ১২০ জন বেসামরিক মুক্তিযোদ্ধা এই খেতাব পেয়েছেন। আর সামরিক বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে এই খেতাব পেয়েছেন ৩০৬ জন।

ইতিহাসবিদরা মনে করেন, মুক্তিযুদ্ধে সামরিক বাহিনীর কয়েক হাজার সেনার পাশাপাশি সাধারণ মুক্তিযোদ্ধারাও ব্যাপক অবদান রেখেছেন। খেতাব দেওয়ার সময় এই অবদান সেভাবে উঠে আসেনি। সে হিসেবে সরকারের এই উদ্যোগতে স্বাগত জানিয়েছেন তারা।

বাতিল হচ্ছে বঙ্গবন্ধুর চার খুনির খেতাব : মুক্তিযুদ্ধের পর বিভিন্নভাবে খেতাব পেলেও পরবর্তীতে তাদের কৃতকর্মের জন্য সাজা হয়েছে দেশে। সেক্ষেত্রে তাদের খেতাবও পুনর্বিবেচনা করছে সরকার। এর অংশ হিসেবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আত্মস্বীকৃত ও মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত চার খুনির মুক্তিযুদ্ধের খেতাব বাতিল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিয়ে মন্ত্রিসভার বৈঠকে পেশ করার জন্য গত দুই মাস আগেই একটি সারসংক্ষেপ প্রস্তুত করেছে। সর্বোচ্চ আদালত ওই খুনিদের ফাঁসির আদেশ দিলেও রাষ্ট্র তাদের মর্যাদা বা খেতাব বাতিল করেনি এখনো।

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইট ও গেজেটে দেখা গেছে, পলাতক ছয় খুনির অন্যতম ক্যাপ্টেন নূর চৌধুরীর নামের সঙ্গে ‘বীর বিক্রম’, মেজর শরিফুল হক ডালিমের নামের সঙ্গে ‘বীর উত্তম’, রাশেদ চৌধুরীর নামের সঙ্গে ‘বীর প্রতীক’ ও মোসলেহ উদ্দিন খানের নামের সঙ্গে ‘বীর প্রতীক’ উপাধি রয়েছে। তালিকা সর্বশেষ হালনাগাদ করা হয়েছে ২০১৫ সালের ১১ আগস্ট। অথচ ১৯৯৮ সালের ৮ নভেম্বর এই চারজনসহ মোট ১৫ জনকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করেন ঢাকার দায়রা জজ আদালত। ২০০৯ সালের ১৯ নভেম্বর আপিল বিভাগ রায় চূড়ান্ত করেন।

মন্ত্রিসভার বৈঠকের জন্য তৈরি করা সারসংক্ষেপে মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের সচিব অপরূপ চৌধুরী উল্লেখ করেছেন, ‘খেতাবপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকায় তাদের নাম থাকা জাতির জন্য অত্যন্ত লজ্জাজনক।’



রাইজিংবিডি/ঢাকা/৩০ ডিসেম্বর ২০১৭/হাসান/রফিক

Walton
 
   
Marcel