ঢাকা, রবিবার, ২ পৌষ ১৪২৫, ১৬ ডিসেম্বর ২০১৮
Risingbd
সর্বশেষ:

সিসিক নির্বাচন: বিজয়ের মালা কার?

কেএমএ হাসনাত : রাইজিংবিডি ডট কম
 
     
প্রকাশ: ২০১৮-০৭-২৩ ৮:২৭:০১ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৮-০৮-০৩ ৪:০৬:১৩ পিএম
ছবি: কিসমত খন্দকার

কেএমএ হাসনাত, সিলেট থেকে ফিরে : জমে ওঠেছে সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচন। পর্যবেক্ষকদের মতে আওয়ামী লীগ সমর্থিত বদরউদ্দিন আহমদ কামরান এবং বিএনপি সমর্থিত আরিফুল হক চৌধুরীর মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা হবে। দুজনেরই জেতার সম্ভাবনা সমান সমান। ধর্মভিত্তিক দলগুলোর ভোট যেকোনো প্রার্থীর বিজয়ে বড় ভূমিকা রাখবে বলে অনেকেই ধারণা করছেন।

সিলেট সিটি করপোরেশনের বিগত নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী বদর উদ্দিন কামরানের পরাজয়ের অন্যতম কারণ ছিল নিজ দলের একটি অংশ নানা কারণে তাকে সমর্থন দেয়নি। এছাড়া অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের সঙ্গে তার সম্পর্ক তেমন ভাল ছিল না। বলা হয়ে থাকে গতবারের অবস্থা এবার আর নেই। এরই মধ্যে অর্থমন্ত্রীর ঘনিষ্টজনরা নির্বাচনে কামরানের পক্ষে জোর প্রচার চালাচ্ছেন। অর্থমন্ত্রীর ছোট ভাই ড. এমএ মোমেনও কামরানের পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণায় সিলেটে অবস্থান করছেন। এখন আর দলীয় কোনো কোন্দল নাই বলেও বদরউদ্দীন আহমদ কামরান রাইজিংবিডিকে বলেছেন।

বিএনপির প্রার্থী আরিফুল হক চৌধুরীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহী প্রার্থী থাকায় এতদিন অনেকটা হতাশা বিরাজ করছিল। তার ওপর ২০ দলীয় জোটের অন্যতম শরীক দল জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী থাকায় তাদের শিবিরে হতাশাটা অনেক বেশি ছিল। সম্প্রতি বিদ্রোহী প্রার্থী মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক বদরুজ্জামান সেলিম তার প্রার্থীতা প্রত্যাহার করায় অনেকটা স্বস্তি ফিরে এলেও বিএনপি শিবিরে জামায়াতে ইসলামীর ভোট নিয়ে শঙ্কা কাটেনি। এছাড়া ছোট ছোট অন্যান্য ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলের ভোট যে বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে তা বোঝা যায় মূল প্রতিদ্বন্দ্বি দুই প্রার্থী এসব ধর্মভিত্তিক দলগুলোর নেতাদের কাছে যোগাযোগ দেখে।

নানা সমীকরণ এবং আঞ্চলিক কারণসহ ধর্মভিত্তিক দলগুলোর সঙ্গে কামরানের সখ্যতা বহুদিনের। সিলেট পৌরসভা পরবর্তীতে সিটি করপোরেশনের নির্বাচন সামনে অন্যতম আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে যারা সিলেটে জীবন-জীবিকার সন্ধানে অবস্থান করেন তাদের মধ্যে কামরানের গ্রহণযোগ্যতা বেশি। আর এদের সংখ্যাও কম নয়।

২০০৮ সালে সেনা নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে অনুষ্ঠিত সিলেট সিটি নির্বাচনে কারাবন্দি থেকেই মেয়র নির্বাচিত হন মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি বদরউদ্দিন আহমদ কামরান। বিরোধী নানা সমালোচনা সত্ত্বেও সে নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়ী হন তিনি।

জিন্দাবাজারের একটি হোটেলে রাইজিংবিডির এই প্রতিনিধির সঙ্গে কথা হয় স্থানীয় অধিবাসী সৈয়দ আহসানুল হকের সঙ্গে। তিনি বলেন, কামরানের অন্যতম গুণ হচ্ছে তিনি খুব সহজেই সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশে যেতে পারেন। যেকোনো প্রয়াজনে তার কাছে খুব সহজেই যাওয়া যায়। কামরানকে কেউ আগে সালাম দিতে পারে না। তিনিই সবাইকে আগে সালাম দেন।

তিনি বলেন, সিলেটের লোকজন এলাকার উন্নয়নের চাইতে ভালো ব্যবহার ও সম্মানটা অনেক বড় করে দেখে। এ কারণে সিলেটবাসীর কাছে তার গ্রহণযোগ্যতাও বেশি। টানা প্রায় ১৭ বছর তিনি সিলেট সিটি করপোরেশন ও পৌরসভার মেয়র ও চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। সিলেট শহরের এই প্রিয় মানুষটিও হেরে যান গত নির্বাচনে। সে নির্বাচনে তিনি বিএনপি প্রার্থী আরিফুল হক চৌধুরীর কাছে প্রায় ৩১ হাজার ভোটের ব্যবধানে হেরে যান।

বিগত নির্বাচনে আরিফুল হক চৌধুরীর কাছে হেরে যাওয়া প্রসঙ্গে মিরা বাজারের আকছাদ চৌধুরী বলেন, নির্বাচনে কামরানের পরাজয়ের পেছনে অনেকগুলো কারণ কাজ করেছে। এর মধ্যে দলীয় কোন্দল, অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে সম্পর্কেও দূরত্ব এবং তার মেয়াদকালে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন না হওয়া উল্লেখযোগ্য কারণ।

বিগত ২০১৩ সালে সিলেট সিটি করপোরেশনে মোট ভোটারে সংখ্যা ছিলেন ২ লাখ ৯১ হাজার ৪৭ জন। এর মধ্যে ১ লাখ ৭ হাজার ৩৩০ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন আরিফুল হক চৌধুরী। আওয়ামী লীগ নেতা ও প্রাক্তন মেয়র বদরউদ্দিন আহমদ কামরান পান ৭২ হাজার ১৭৩ ভোট। দুজনের ভোটের ব্যবধান ছিল ৩১ হাজার ১৫৭ ভোটের। তবে গত নির্বাচনে ১ লাখ ১০ হাজার ৫২২ ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগই করেননি। বলা হয়ে থাকে, ভোটকেন্দ্রে না যাওয়া এসব ভোটারদের বেশিরভাগই আওয়ামী লীগ ও কামরানের ভোটার।



জানা গেছে, কামরানের সঙ্গে সিলেট-১ আসনের সাংসদ ও অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের দূরত্ব দীর্ঘদিনের। এই দূরত্বের সুযোগে গত নির্বাচনে মেয়র নির্বাচিত হয়ে বিএনপি দলীয় নেতা আরিফুল হক চৌধুরী সখ্যতা গড়ে তুলেন অর্থমন্ত্রীর সাথে। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মিসবাহউদ্দিন সিরাজের সঙ্গেও কামরানের বিরোধিতা রয়েছে বলে জানা যায়। এছাড়া এবার কামরানের সাথে আওয়ামী লীগ থেকে পাঁচ নেতা মেয়র পদে দলীয় মনোনয়ন দাবি করেন। দলের মহানগর সাধারণ সম্পাদক আসাদ উদ্দিন মেয়র প্রার্থী হতে দীর্ঘদিন থেকেই মাঠে সক্রিয় ছিলেন।

দলের ভেতরের এই দূরত্ব বিভেদগুলো কী এবার ঘোচাতে পারবেন কামরান? এক্ষেত্রে কামরান যতোটা সফল হবেন নির্বাচনের মাঠে ততোই এগোবেন মহানগর আওয়ামী লীগের এই সভাপতি।

এ বিষয়ে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের ঘনিষ্টজনরা বলেছেন, গত বছরের নির্বাচন আর এ বছরের নির্বাচন এক নয়। কামরান সাহেবের সঙ্গে দলীয় যেসব সমস্যা ছিল সেগুলো এখন আর নেই। আমরা সবাই একযোগে নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নিচ্ছি। অর্থমন্ত্রী দেশের বাইরে। তার ছোট ভাই ড. এমএ মোমেন ও নির্বাচনী প্রচারণায় সিলেট আসা-যাওয়া করছেন। এবারের নির্বাচনে নৌকা মার্কার বিজয় অবশ্যম্ভাবী। কারণ বর্তমান সরকারের সময়ে সিলেটের ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। আর এই উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে নৌকার বিজয়ের বিকল্প নেই। আমাদের মধ্যে কোনো কোন্দলও নেই। দলীয় কোন্দল আছে এমন কথা প্রচার করে বিরোধীপক্ষ নির্বাচনী ফায়দা লুটতে চাচ্ছে।

সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আসাদউদ্দিন আহমদ রাইজিংবিডিকে বলেন, দলের সভানেত্রী ও বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার কড়া নির্দেশ রয়েছে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে। কাজেই আওয়ামী লীগ এবার অন্য যেকোনো সময়ের চাইতে অনেক বেশি ঐক্যবদ্ধ। দলের সভানেত্রী যাকে মনোনয়ন দিয়েছেন আমরা তার পক্ষে রয়েছি। এখানে ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দেও সুযোগ নেই। দলের সভানেত্রীর নির্দেশে সব পর্যায়ের নেতা-কর্মীরা কামরানের পক্ষে মাঠে নেমেছেন।

তবে সিলেট জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আলী আহমদের দাবি আওয়ামী লীগ ঐক্যবদ্ধ হলেও এবার কোনো লাভ হবে না। তিনি বলেন, কামরান সালাম দিয়ে ও শুভেচ্ছা জানিয়ে ১৭ বছর কাটিয়ে দিয়েছেন। কোনো উন্নয়ন করেননি। অথচ আরিফুল হক মাত্র দুই বছর দায়িত্ব পালনের সুযোগ পেয়েছেন। এই দুই বছরে তিনি প্রত্যাশার চেয়ে বেশি উন্নয়ন করেছেন। ফলে এবার ভোটাররা যোগ্য প্রার্থীকেই বেছে নেবেন।

সিলেটের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ-বিএনপির পাশাপাশি শক্ত অবস্থান রয়েছে কয়েকটি ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলের। এদের মধ্যে সাংগঠনিক সামর্থ্য বিবেচনায় স্বাভাবিকভাবেই শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী আন্দোলন। হেফাজতে ইসলাম সরাসরি প্রার্থিতা না করেও ভোটের মাঠে প্রভাব ধরে রেখেছে। এছাড়া বিগত কয়েকটি নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, আঞ্জুমানে আল ইসলাহ, খেলাফত মজলিস ও জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের মতো সংগঠনের প্রার্থীরাও গড়ে ১০-১৫ হাজার ভোট পেয়েছেন। সিলেট সিটি করপোরেশনের ২০১৩ সালের নির্বাচনে জয়-পরাজয় নির্ধারণে এসব ইসলামী দলের ভোট বড় ভূমিকা রেখেছে বলে ধারণা করা হয়। এবারের নির্বাচনেও এসব ভোট বড় নিয়ামক হয়ে ওঠবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এ বিষয়ে বদরউদ্দিন আহমদ কামরান বলেন, দলীয় কোন্দল নয় বরং ৫ মে ঢাকার ঘটনায় হেফাজতে ইসলামী গত নির্বাচনে পরাজয়ের জন্য বড় ভূমিকা রেখেছিল। তবে এবারের পরিস্থিতি গতবারের মতো হবে বলে আমি মনে করিনা।

অন্যদিকে বিএনপি মনোনীত মেয়র প্রার্থী আরিফুল হক চৌধুরী বললেন, ২০ দলীয় জোটের শরিক জামায়াত জোটের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। তারা আলাদা প্রার্থী দিলেও আমার তেমন ক্ষতি হবে না। বিজয় আমাদের সুনিশ্চিত।

তবে নগরীর বিভিন্ন জায়গা ঘুরে ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে প্রার্থী ও দলীয় নেতাদের কথার মধ্যে ফাঁক পাওয়া গেছে। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির শীর্ষ থেকে তৃণমূল পর্যায়ের নেতা-কর্মীরাও হেফাজত ও জামায়াতের ভোট নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন। ধর্মভিত্তিক দলগুলো সমর্থকদের ভোট যে প্রার্থীর দিকে যাবে সেই আগামী দিনের নগর পিতার দায়িত্ব পাবেন বলে অভিমত জানিয়েছেন ভোটাররা। এ অবস্থায় বড় দুদলের প্রার্থীদের বিজয়ের সম্ভাবনা ফিফটি ফিফটি।




রাইজিংবিডি/ঢাকা/২৩ জুলাই ২০১৮/হাসনাত/সাইফ

Walton Laptop
 
     
Marcel
Walton AC