ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১ ভাদ্র ১৪২৫, ১৬ আগস্ট ২০১৮
Risingbd
শোকাবহ অগাস্ট
সর্বশেষ:

গরু মোটাতাজাকরণ ট্যাবলেট চোরাচালানী চক্র তৎপর

আসাদ আল মাহমুদ : রাইজিংবিডি ডট কম
 
     
প্রকাশ: ২০১৮-০৭-২৭ ২:৪৬:৪৮ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৮-০৮-১০ ৬:০০:০৭ পিএম

আসাদ আল মাহমুদ: কোরবানির ঈদ সামনে রেখে তৎপর হয়ে উঠেছে সংঘবদ্ধ চোরাচালানকারী চক্র। পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে চোরাচালান হয়ে দেশের অভ্যন্তরে আসছে গরু। একই সঙ্গে চোরাইভাবে আসছে গরু মোটাতাজাকরণের ট্যাবলেট।

বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) তৎপরতার কারণে এই অবৈধ ওষুধ ধরাও পড়ছে। শুধু দিনাজপুরের হিলি সীমান্ত এলাকায় গত দুই মাসে ২০ লাখ ৩০ হাজার পাঁচশ ৫০টি ট্যাবলেট ধরা পড়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গেল জুন মাসে ২ লাখ ২৮ হাজার ডেক্সিন ট্যাবলেট ও ২৮ হাজার প্রাকটিন ট্যাবলেটের দুটি চালান আটক করেন হিলি সীমান্তের বিজিবি সদস্যরা। এছাড়া চলতি জুলাই মাসের ৩, ৭, ১২ ও ১৩ তারিখে পৃথক অভিযান চালিয়ে ৭ লাখ ৬১ হাজার নয়শ ৫০টি প্রাকটিন ট্যাবলেট, নয় লাখ ৪০ হাজার ডেক্সিন ট্যাবলেট ও ৭২ হাজার ছয়শটি সিজেট ট্যাবলেট আটক করা হয়।

এরপরও সীমান্ত দিয়ে এ ধরণের নিষিদ্ধ ট্যাবলেট আনার তৎপরতা থামছে না বলে অভিযোগ রয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এ ধরণের ট্যাবলেটের এক ব্যবসায়ী জানান, হিলি সীমান্ত পার করার পর  ট্যাবলেট চলে যায় গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ থানা এলাকায়। সেখান থেকে বগুড়ায়। তারপর আসে ঢাকার মিটফোর্ড এলাকায়। পরে দেশের বিভিন্ন স্থানে খামারিদের কাছে সরবরাহ করা হয়।

তিনি বলেন, ‘সীমান্ত এলাকা ছাড়া দেশের অন্যান্য স্থানে এসব ট্যাবলেট বহনে তেমন কোনও ঝামেলা পোহাতে হয় না। প্রতিবছর কোরবানির ঈদ সামনে রেখে এই ট্যাবলেটের চাহিদা কয়েকগুণ বেড়ে যায়।

এ বিষয়ে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের পরিচালক ডা. হীরেশ রঞ্জন ভৌমিক বলেন, ‘প্রতিবছরের মতো এবারও কোরবানির ঈদ সামনে রেখে দেশের বিভিন্ন এলাকায় গরু মোটাতাজা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে আমাদের পক্ষ থেকে বাড়তি সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। যারা গরু মোটতাজা করছেন তাদের ওপর বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবীর মাধ্যমে এবং আমরা নিজেরাও কঠোর নজরদারি করছি। বাড়ি বাড়ি গিয়ে অথবা সভা-সেমিনার ও উঠান বৈঠকের মাধ্যমে প্রাণিসম্পদ বিভাগের লোকজন তাদের পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছেন। তারা যেন প্রাকৃতিক উপায়ে দানাদার খাদ্য খড় ও ঘাস খাইয়ে গরু মোটাতাজা করেন।’

তিনি বলেন, ‘এরপরও কেউ যদি গরু মোটাতাজাকরণ কাজে ট্যাবলেট ব্যবহার করে তাদের বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

তিনি আরো বলেন, ‘এসব ট্যাবলেট খাইয়ে গরু মোটাতাজাকরণ করলে গরুর শরীরে পানি জমবে, গরুকে অত্যধিক মোটা দেখা যাবে। গরু অবশ হয়ে যাবে। এমনকি গরু স্ট্রোকও করতে পারে। তাই আমরা বারবার খামারিদের সতর্ক করছি তারা যেন কোনোভাবেই এসব গরু মোটাতাজাকরণ ট্যাবলেট  ব্যবহার না করেন।’

লিভার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মবিন খান এ ব্যাপারে বলেন, ‘বৃদ্ধিবর্ধক হরমোন ইনজেকশন (স্টেরয়েড) জাতীয় ওষুধ খাইয়ে গরু মোটাতাজা করা হয়। পাশাপাশি ইউরিয়া সার খাওয়ানো হয়। এ সকল ওষুধ ও কেমিক্যাল খাওয়ানো গরুর মাংস খেলে লিভার নষ্টসহ জটিল রোগ, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, আথ্রাইটিস হয়ে হাড় ভেঙ্গে যাওয়া, চোখে ছানি পড়া ও বুদ্ধিজনিত ঘাটতি হওয়ার আশংকা দেখা দেয়।’

কিডনি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. হারুন অর রশীদ বলেন, ‘ঐ পশুগুলোর কিডনিসহ স্বাস্থ্যঝুঁকি বেশি।’ তিনি মানুষের জীবন রক্ষার্থে মোটাতাজাকরণ ওষুধ পরিহার করে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় পশু লালন পালন ও খড়, খৈল, ভুসি, ঘাস খাইয়ে স্বাস্থ্যবান করার আহ্বান জানান।

কেন্দ্রীয় ভেটেরিনারি হাসপাতালের অতিরিক্ত চিফ ভেটেরিনারি অফিসার ডা. মো. শহীদুল ইসলাম এ ব্যাপারে বলেন, ‘পাম ট্যাবলেট ও স্টেরয়েড জাতীয় ইনজেকশন গরুর শরীরের কোষকে দ্রুত বিভাজিত করে। অনেক ক্ষেত্রে কোষে পানির পরিমাণ বেড়ে যায় এবং দৃশ্যত গরু মোটা দেখায়। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ঐ সব গরুর মাংসের গুণগত মান কমে যায় এবং তা মানুষের শরীরের জন্য ক্ষতিকর। গরু বিক্রয়ের আগে সাধারণত ঐ সব ইনজেকশন ব্যবহার করার ফলে তা সম্পূর্ণভাবে নিঃশেষ হয়ে যাওয়ার আগে জবাই করার ফলে তা গরুর শরীরে থেকে যায় এবং তা মানুষের শরীরে চলে যায়।’

বিশেষজ্ঞ পশু চিকিৎসকগণের মতে, মোটাতাজাকরণের ওষুধ খাওয়ালে গরু দেখতে মোটা হয় ঠিকই। শরীরে চামড়ার নিচে পানি জমে ফুলে যায় কিংবা চর্বি বেড়ে যায়। ঐ ওষুধে গরুর মুখমণ্ডল ফুলে যায়। আসলে মাংস একটুও বাড়ে না। এটা এক ধরনের প্রতারণা। কোন কোন বেপারী গরুকে ইউরিয়া সার খাওয়ায়। ইউরিয়া সার কেমিক্যাল জাতীয়। যে কোন কেমিক্যাল ক্যান্সার সৃষ্টিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। আর তাই নিষিদ্ধ ট্যাবলেটে গরু মোটাতাজাকরণের ক্ষতিকারক দিকগুলো সম্পর্কে জানাতে জনসচেতনতা গড়ে তোলা জরুরি বলে মনে করেন।

ঔষধ ব্যবহারে মোটাতাজা পশু শনাক্ত করার উদ্যোগের পদক্ষেপ সম্পর্কে উভয় ডিসিসি’র সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এ ধরণের পশু শনাক্ত করার জন্য প্রতি হাটে দুই থেকে তিনজন পশু বিশেষজ্ঞ থাকেন। পশুকে হাটে তোলার আগে এই বিশেষজ্ঞরা পরীক্ষা করে দেখেন। তারা পশু বিক্রির অনুমতি  দিলেই কেবল পশু বিক্রির জন্য হাটে উঠতে পারে।




রাইজিংবিডি/ঢাকা/২৭ জুলাই ২০১৮/আসাদ/হাসান/শাহনেওয়াজ

Walton Laptop
 
     
Walton