ঢাকা, শুক্রবার, ২ অগ্রহায়ণ ১৪২৫, ১৬ নভেম্বর ২০১৮
Risingbd
সর্বশেষ:

আন্তর্জাতিক হালাল মার্কেটে বাংলাদেশের বিপুল সম্ভাবনা

হাসান মাহামুদ : রাইজিংবিডি ডট কম
 
     
প্রকাশ: ২০১৮-১০-২৮ ৮:৩৭:০৭ এএম     ||     আপডেট: ২০১৮-১১-০৪ ৪:২৫:৩১ পিএম
অলংকরণ : গিয়াস উদদীন সিজার

হাসান মাহামুদ : আগের তুলনায় মানুষের মধ্যে সচেতনতা এবং ধর্মীয় মূল্যবোধ বেড়েছে। ফলে বিশ্বজুড়ে বেড়েছে হালাল পণ্য ও সেবার চাহিদা। মুসলিম প্রধান দেশ হিসেবে ভালো সম্ভাবনা থাকলেও প্রয়োজনীয় সনদ, উদ্যোগ ও নীতিমালার অভাবে সুফল পাচ্ছে না বাংলাদেশ।

বিশ্বব্যাপী হালাল পণ্যের চাহিদা বাড়ছে। বর্তমানে হালাল পণ্যের আন্তর্জাতিক বাজার তিন লাখ কোটি ডলার ছাড়িয়ে গেছে। এটি পৃথিবীর মোট খরচের প্রায় ১১ দশমিক ৯ শতাংশ। ট্রান্সপারেন্সি মার্কেট রিসার্চের হিসাব অনুযায়ী, ২০১৫ সালে পৃথিবীতে হালাল পণ্যের বাজারমূল্য ছিল প্রায় ২ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার। এই চাহিদা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। এটি ২০২৪ সালে প্রায় ১০ দশমিক ৫১ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছবে। এ বিশাল বাজারে পণ্যের সিংহভাগ জোগান দিচ্ছে অস্ট্রেলিয়া, ব্রাজিল, নিউজিল্যান্ড ও থাইল্যান্ড।

কিন্তু বাংলাদেশ বিশ্বের দ্বিতীয় মুসলিম অধ্যুষিত দেশ হয়েও হালাল খাদ্য রপ্তানিতে অনেক পিছিয়ে আছে। আমাদের হালাল পণ্য উৎপাদন ও আন্তর্জাতিকভাবে বাজারজাত করার উজ্জ্বল সম্ভাবনা রয়েছে। হালাল পণ্য হিসেবে বর্তমানে বাংলাদেশ বেশ কয়েকটি দেশে শুধু গরুর মাংস রপ্তানি করছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এর সঙ্গে হালাল পণ্য হিসেবে পোল্ট্রি বা মুরগীর মাংস এবং ডিম রপ্তানির প্রচুর সম্ভাবনা রয়েছে।

কিন্তু হালাল পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে আমাদের বেশকিছু সমস্যা ও চ্যালেঞ্জ রয়েছে। ২০১১ সাল থেকে ইসলামিক ফাউন্ডেশন হালাল পণ্যের হালাল সনদ দেয়া শুরু করে। কিন্তু এই সনদ এখনো আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত নয়। এই সনদ আন্তর্জাতিকমানের করা এখন সময়ের দাবিতে পরিণত হয়েছে।

অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে ডিম ও মুরগির মাংস রপ্তানির বিপুল সম্ভাবনাও সৃষ্টি করেছে পোল্ট্রিখাত। এরই মধ্যে ২০২০ সাল নাগাদ পোল্ট্রি প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্য রপ্তানি করার লক্ষ্যস্থির করেছে এ খাতের ব্যবসায়ীরা। তবে, এ খাতে নতুন করে কর আরোপ ও কৃষির উপখাত হওয়া সত্ত্বে উচ্চ সুদের ঋণসহ বিভিন্ন বিষয় সম্ভাবনা বাস্তবায়নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। একই সঙ্গে সুযোগ কাজে লাগাতে সরকারি নীতি সহায়তা চান উদ্যোক্তারা।

হালাল পণ্যের অন্যতম খাত হতে পারে পোল্ট্রি: বাংলাদেশে আমদানি ও রপ্তানির মধ্যে যথেষ্ট ভারসাম্যহীনতা বিদ্যমান রয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের লক্ষ্যে রপ্তানি আয় বৃদ্ধির জন্য সরকারও যথেষ্ট আন্তরিক। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে উপযোগী ও সহজ খাত হতে পারে পোল্ট্রি শিল্প। যদি এ খাতে যথেষ্ট সহযোগিতা ও পৃষ্টপোষকতা প্রদান করা হয় তবে এ থেকে দেশে আমিষের চাহিদা পূরণের সঙ্গে সঙ্গে বিদেশে রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।

প্রতিনিয়তই পরিবর্তন হচ্ছে বিশ্ব অর্থনীতির হাল-চাল। বাড়ছে প্রতিযোগিতা। আগামী দিনের এই মেধাভিত্তিক অর্থনীতিতে সক্ষমতা মেলে ধরতে নিশ্চিত করতে হবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুস্বাস্থ্য। এজন্য বাড়াতে হবে পুষ্টির যোগান। সেক্ষেত্রে সবচেয়ে কম খরচে আমিষসহ অন্যান্য দরকারি উপাদানের যোগান দিতে পারে পোল্ট্রিখাত।

পোল্ট্রিকে রপ্তানিমুখী খাতে অন্তর্ভুক্ত করা জরুরী: পোল্ট্রি এখনো রপ্তানিমুখী খাত হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়নি। এ খাতের উদ্যোক্তারা শিল্প বিকাশের স্বার্থে ২০১৯ সালের মধ্যে পোল্ট্রিখাতকে রপ্তানিমুখী খাতে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানিয়েছেন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ইইউভুক্ত দেশগুলোতে গরুর মাংস থেকে তুলে ভর্তুকি নেওয়া হচ্ছে। মুরগির ওপর থেকেও ভর্তুকি তুলে নেওয়া হচ্ছে। এর ফলে ওইসব দেশে পোল্ট্রির উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে। ফলে নতুন করে রপ্তানি সম্ভাবনা তৈরি হবে ওসব বাজারে। বাংলাদেশের সামনে রয়েছে এই বিশাল বাজার ধরার। তাহলে তৈরি পোশাক খাতের মতো পোল্ট্রি শিল্পের মাধ্যমেও রাতারাতি বিপ্লব ঘটানো সম্ভব।

২০০৭ সাল পর্যন্ত দেশীয় চাহিদা পূরণ করেও বিদেশে রপ্তানি হয়েছে পোল্ট্রি পণ্য। ২০০৭ সালে মার্চ মাসে প্রথম বার্ড ফ্লু দেখা দেওয়ার ফলে দুই বছরে এই শিল্প খাতের ক্ষতি হয় ৪ হাজার ১৫০ কোটি টাকা। পরবর্তী দুই বছর এই অবস্থার কিছুটা উন্নতি হলেও ২০১১ সাল থেকে আবারও পোল্ট্রি শিল্প মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়ে।

পোল্ট্রি শিল্প অ্যাসোসিয়েশন সূত্রে জানা গেছে, ২০০৫ সালের আগেও দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রপ্তানি হতো ডিম। কিন্তু  ২০০৭ ও ২০০৯ সালে এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা বা বার্ড ফ্লুতে আক্রান্ত হওয়ায় পোলট্রি শিল্পে বিপর্যয় নেমে আসে। বার্ড ফ্লু আঘাত হানায় ওয়ার্ল্ড অর্গানাইজেশন ফর অ্যানিমেল হেলথের (ওআইই) শর্তের কারণে পোল্ট্রির রপ্তানি বন্ধ হয়ে যায়। বর্তমানে এ বিপর্যয় কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয়েছে এ খাতের উদ্যোক্তারা।

সংশ্লিষ্টরা জানান, নতুন আশা নিয়ে সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ২০২১ সালের মধ্যে বছরে ১ হাজার ২০০ কোটি ডিম ও ১০০ কোটি ব্রয়লার উৎপাদনের স্বপ্ন দেখছে এই শিল্প। একই সময়ের মধ্যে দেশে প্রতিদিন সাড়ে ৪ কোটি ডিম ও প্রায় ৪ হাজার টন মুরগির মাংসের প্রয়োজন হবে। বর্তমানে এর চাহিদা এবং উৎপাদন প্রায় সমান সমান।

এই চাহিদা পূরণ করতে এ খাতে কমপক্ষে ৫০ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ প্রয়োজন। এই বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে ব্যাংক ঋণের সুদ হার কমানো, বীমার আওতায় পোল্ট্রি খাতকে নিয়ে আসা ও সরকারি সহায়তা দেয়ার সুপারিশ এ খাত সংশ্লিষ্টদের। এখন দিনে উৎপাদন হয় প্রায় ২ কোটি ২০ লাখ থেকে ২৫ লাখ ডিম।

মাংস ও ডিম রপ্তানির মতো উৎপাদন রয়েছে দেশে: দেশে ধারাবাহিকভাবে প্রতি বছরই বাড়ছে ডিমের উৎপাদন। গত আট অর্থবছরে এ ধারাবাহিকতা অব্যাহত রয়েছে। বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ সেন্ট্রাল কাউন্সিলের (বিপিআইসিসি) তথ্য মতে, গত এক দশকে তিনগুণ বেড়েছে ডিমের উৎপাদন। দেশে ডিমের বাজারের আকার এখন সাড়ে ১১ হাজার কোটি টাকা।

সংস্থাটির হিসেবে, দেশে এখন বাণিজ্যিকভাবে প্রতিদিন গড়ে ৩ কোটি ৮০ লাখ ডিম উৎপাদন হয়। আর প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের হিসাবে, গৃহপালিত মুরগি, হাঁস ও কোয়েল পাখির ডিম হিসাবে ধরলে দৈনিক গড় উৎপাদন ৪ কোটি ৭১ লাখের বেশি হবে। তথ্য মতে, ২০০৭-০৮ অর্থবছরে যেখানে ৫৬৫ কোটি ডিম উৎপাদন হয়েছিল, সেখানে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে তা বেড়ে ১ হাজার ৫৫২ কোটি হয়েছে।

চলতি ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ডিম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১৬৬৫ কোটি। এর মধ্যে জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর- এই তিন মাসে ডিমের মোট ৪৩৩ দশমিক ৫৩ কোটি ডিম উৎপাদন হয়েছে। প্রতিটি ডিমের গড় দাম ৭ টাকা ধরে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে দেশে প্রায় ১০ হাজার ৪৫২ কোটি টাকার ডিম বাণিজ্য হয়। এই হিসাবে চলতি অর্থবছরে ডিম নিয়ে প্রায় ১১ হাজার ৬৫৫ কোটি টাকার ব্যবসা হবে।

এদিকে, হাউজহোল্ড ইনকাম অ্যান্ড এক্সপেন্ডিচার সার্ভ অনুসারে, ২০১০ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে দেশে গরুর মাংস খাওয়ার পরিমাণ যেখানে ১০ শতাংশ, মাছ খাওয়ার পরিমাণ যেখানে ২৬ শতাংশ বেড়েছে, সেখানে ডিম খাওয়ার পরিমাণ বেড়েছে ৮৮ শতাংশ। এই সময়ে ডিমের মাথাপিছু কনজাম্পশন ৭ দশমিক ২ গ্রাম থেকে বেড়ে ১৩ দশমিক ৫৮ গ্রাম।

প্রয়োজন নীতিসহায়তা: বিশ্বব্যাপী হালাল পণ্যের বিশাল বাজার রয়েছে। দিন দিন এটি বাড়ছে। উৎপাদন খাতে বাংলাদেশের যথেষ্ঠ সামর্থ্যও রয়েছে। এখন শুধু প্রয়োজন প্রয়োজনীয় ক্ষে্ত্রে সরকারি উদ্যোগ-পরিকল্পনা এবং নীতিসহায়তা। এরই মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাত বাংলাদেশে এ খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। বাজার উন্মুক্ত রয়েছে মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপসহ অন্যান্য দেশে।

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ অপার সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে প্রয়োজন বিশ্বমানের সনদ ও সরকারের নীতি সহায়তা। বিশেষত পণ্যের সনদ প্রদানের জন্য আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত প্রতিষ্ঠান স্থাপন, সনদ প্রদানের প্রক্রিয়া সহজীকরণ, প্রশিক্ষিত পরিদর্শক নিয়োগ জরুরী। একই সঙ্গে দক্ষ জনবল তৈরি এবং প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা উন্নয়ন, অবকাঠামো উন্নয়নে স্বল্প সুদে অর্থায়ন ও গ্লোবাল সাপ্লাই চেইনে হালাল পণ্যের অর্ন্তভুক্তিকরণে গুরুত্ব আরোপ করেন তারা।

বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ সেন্ট্রাল কাউন্সিলের (বিপিআইসিসি) সভাপতি মসিউর রহমান বলেন, হালাল পণ্যের উৎপাদন আরও জনপ্রিয় করতে প্রয়োজনীয় নীতিমালা প্রণয়ন ও সহযোগিতা, দক্ষ জনবল তৈরি ও প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা উন্নয়ন, হালাল সনদ প্রদানের প্রক্রিয়া সহজীকরণ এবং অবকাঠামো উন্নয়নে স্বল্পসুদে আর্থিক প্রণোদনা দেওয়া দরকার। তাহলে হালাল পণ্য রপ্তানির বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন সম্ভব।

তিনি আরো বলেন, অন্যান্য খাবারের মত পোল্ট্রি খাত তথা ডিমেরও বিজ্ঞাপন প্রয়োজন।  ব্যক্তিপর্যায়ে পোল্ট্রি পরিচালিত হলেও জাতীয় স্বার্থে এ খাতকে সহযোগিতা করা প্রয়োজন। প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পেলে এই খাতও তৈরি পোশাক এবং তথ্যপ্রযুক্তি খাতের মতো অন্যতম রাজস্ব আয় এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী খাত হবে। তাই এ কাজে সরকারের অন্যান্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থার পাশাপাশি তথ্য মন্ত্রণালয়কেও এগিয়ে আসতে হবে।

সামগ্রিক বিষয়ে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান কাজী মো. আমিনুল ইসলাম রাইজিংবিডিকে বলেন, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ পণ্য থেকে রপ্তানি আয়ের যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। বাংলাদেশ তৃতীয় রপ্তানি পণ্য হিসেবে খাদ্য প্রক্রিয়াজাত পণ্যের ওপর নির্ভর করছে। বিষয়টি সরকারের পরিকল্পনায় রয়েছে। বিশেষ করে হালাল পণ্য উৎপাদনে বেশি অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। এজন্য সরকারের ঘোষিত ১০০ অর্থনৈতিক জোনের মধ্যে হালাল পণ্যের জন্য আলাদা একটি অর্থনৈতিক অঞ্চল করার বিষয়টি পরিকল্পনায় রয়েছে।

তিনি বলেন, হালাল পণ্যের সনদের বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। এটি সমাধানে সরকারের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সব উদ্যোগ নেওয়া হবে। 

** আন্তর্জাতিক হালাল মার্কেটে বাংলাদেশের বিপুল সম্ভাবনা

** বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির অভাবে পাওয়া যাচ্ছে না শতভাগ সফলতা

** চিকিৎসাসেবার নাজুক পরিস্থিতি

** মাংস আর ডিমের মধ্যেই সীমাবদ্ধ পোল্ট্রির অবদান

 

 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/২৮ অক্টোবর ২০১৮/হাসান/এনএ

Walton Laptop
 
     
Marcel
Walton AC