ঢাকা, শনিবার, ১১ ফাল্গুন ১৪২৫, ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:
চূড়ান্ত পর্যায়ে আইন

ফসলের জমি কেনা যাবে না প্রতিষ্ঠানের নামে

হাসান মাহামুদ : রাইজিংবিডি ডট কম
 
     
প্রকাশ: ২০১৯-০২-০৩ ১২:৫১:৫৭ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৯-০২-১৫ ৬:৩১:১০ পিএম

হাসান মাহামুদ : প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ জমি চলে যাচ্ছে অকৃষি খাতে। শিল্পের আগ্রাসনসহ বিভিন্ন কারণে আশঙ্কাজনক হারে কমছে কৃষিজমির পরিমাণ।

এর মধ্যে আরেকটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে কৃষিজমির অযৌক্তিক ব্যবহার। পাশাপাশি রাতারাতি ভরাট হয়ে যাচ্ছে খাল-বিল, ডোবা-নালা।

মূলত অপরিকল্পিত নগরায়ন ও শিল্পায়নের কারণেই আশঙ্কাজনকভাবে কৃষি জমি কমে যাচ্ছে। এ অবস্থায় কৃষিজমির যৌক্তিক ব্যবহার নিশ্চিতে আইন হচ্ছে দেশে।

ভূমি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা ‌গেছে, এ আইনের খসড়া প্রায় চূড়ান্ত। এরই মধ্যে সংশ্লিষ্টদের মতামত গ্রহণ করা হয়েছে। মাঝে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মতামত গ্রহণের পর্যায়ে ছিল আইনের খসড়াটি।

নতুন মন্ত্রিসভা গঠনের পর আবারো এই আইন বাস্তবায়নের প্রতি জোর দেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে আইনটি প্রায় চূড়ান্ত। অনুমোদনের জন্য বর্তমানে এটি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠানোর পর্যায়ে রয়েছে। 

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সব ঠিক থাকলে আগামী দু’মাসের মধ্যেই এ আইন চূড়ান্ত অনুমোদন পেতে পারে।

কৃষি জমি সুরক্ষা ও ভূমি ব্যবহার আইনের আওতায়, সরকার দেশের সব জমির শ্রেণি নির্ধারণ করে দেবে। অর্থাৎ কোন এলাকার জমি কোন কাজে ব্যবহৃত হবে তা নির্ধারণ করে দেওয়া হবে।

সে ক্ষেত্রে কৃষি, মৎস্য, প্রাণিসম্পদ, আবাসন, নদী, সেচ, নিষ্কাশন, পুকুর, জলমহাল, মৎস্য এলাকা, বনাঞ্চল, সড়ক ও জনপথ এবং রেলপথ, হাটবাজার, বাণিজ্যিক ও শিল্প এলকা, চা, রাবার ও হর্টিকালচার এলাকা, উপকূলীয় অঞ্চল, পর্যটন এলাকা, চরাঞ্চল, পরিবেশগতভাবে বিপন্ন এলাকা এবং অন্যান্য অঞ্চল এ আইনের মাধ্যমে চিহ্নিত করে দেওয়া হবে।

দেশের সব জমির জন্য ভূমি জোনিং করা হবে। ভূমি জোনিং মানচিত্রে গ্রামের মৌজা, ইউনিয়নভিত্তিক ও পৌরসভার জন্য ওয়ার্ডভিত্তিক প্রস্তুত করা হবে। কোনো এলাকার ভূমির বৈশিষ্ট্য ও গুণাগুণ কী এ সংক্রান্ত তথ্য ভূমি জোনিং মানচিত্রে দেওয়া থাকবে।

ভূমি জোনিংয়ের মানচিত্র তৈরিতে মাঠ পর্যায়ে ভূমির বর্তমান ব্যবহারের যাবতীয় তথ্য সংগ্রহ, স্যাটালাইট ইমেজ বিশ্লেষণ, ডিজিটাল ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারে জেলা ও উপজেলা ভূমি প্রশাসনের সহায়তা নেওয়া হবে। সহায়তা নেওয়া হবে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের।

দেশের সব শ্রেণির ভূমি ব্যবহারে জাতীয়, বিভাগীয়, জেলা, উপজেলা এবং পৌর এলাকার জমি ব্যবহারে পৃথক কমিটি থাকবে। কমিটির অনুমোদন নিয়েই তা ব্যবহার করতে হবে।

এ বিষয়ে ভারপ্রাপ্ত ভূমি সচিব মো. মাকছুদুর রহমান পাটওয়ারী রাইজিংবিডিকে বলেন, আবাদি জমি অন্য কাজে ব্যবহার বন্ধের জন্য দেশে বলতে গে‌লে কার্যকর আইন নেই। এ জন্য ফসলি জমি রক্ষা চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ অবস্থায় ২০১১ সালে কৃষি জমি সুরক্ষা ও ভূমি ব্যবহারে একটি নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নেয় সরকার। পরে সেটিকেই আইনে রূপান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়।

সচিব বলেন, নতুন এই আইনটিকে ভূমি সংক্রান্ত অন্যান্য আইনের চেয়ে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।

আইনে বলা হয়েছে, ক্রমবর্ধমান চাহিদার চাপে আবাসন, শিল্প-কারখানা বা রাস্তাঘাট নির্মাণের জন্য প্রতিনিয়তই ভূমির প্রকৃতি ও শ্রেণিগত ব্যবহারের পরিবর্তন ঘটছে। এর ফলে দেশে কৃষিজমি, বনভূমি, টিলা, পাহাড় ও নীরাশয় বিনষ্ট হয়ে খাদ্যশস্য উৎপাদন হুমকির মুখে পড়ছে। ঘটছে পরিবেশের মারাত্মক বিপর্যয়।

অপরিকল্পিত উন্নয়ন রোধ করে ভূমির শ্রেণি বা প্রকৃতি ধরে রেখে পরিবেশ ও খাদ্যশস্য উৎপাদন অব্যাহত রাখা, কৃষিজমি ও কৃষিপ্রযুক্তির প্রয়োগিক সুবিধার সুরক্ষা ও ভূমির পরিকল্পিত ব্যবহার নিশ্চিত করাই আইন প্রণয়নের উদ্দেশ্য।

‘কৃষিজমি’ বলতে ফসলি জমি, বনভূমি, গোচারণ ভূমি, খড় উৎপাদনের ভূমি, পশুখাদ্য উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য ব্যবহৃত ভূমি, চা-বাগান, ব্যক্তিগত বনভূমি, ফলদ উদ্ভিদ, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উৎপাদনের জন্য ব্যবহৃত ভূমিকে উল্লেখ করা হয়েছে।

এছাড়া ফলফুল, শাকসবজি, মসলা, ডাল, তেল জাতীয় খাদ্য, ঔষধি, সুগন্ধি, প্রাকৃতিক রং, বাঁশ, বেত, হোগলা-গোলপাতা ও অন্যান্য কৃষিজাত দ্রব্য উৎপাদন করা হয়; এমন ভূমি, মাছ চাষের পাশাপাশি ফসল উৎপাদনের নীরাশয়- কৃষিজমির অন্তর্ভুক্ত হবে।

অপরাধ, বিচার ও দন্ড : কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান আইন ভঙ্গ করলে সর্বোচ্চ দুই বছরের সশ্রম কারাদন্ড এবং তিন লাখ টাকা অর্থদন্ড অথবা উভয় দন্ডে দন্ডিত করা হবে। থাকছে ভ্রাম্যমাণ আদালতের বিধান।

২০১৫ সালের আইনের খসড়ায় এ শাস্তি সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদন্ড ও সর্বনিম্ন এক বছরের সশ্রম কারাদন্ড এবং ৫০ লাখ টাকা অর্থদন্ড অথবা সর্বনিম্ন দুই বছরের সশ্রম কারাদন্ড অথবা ২০ লাখ টাকা অর্থদন্ড অথবা উভয় দন্ডের বিধান ছিল। নতুন আইনে শাস্তি কমছে।

আইনের অধীনে অপরাধ আমলযোগ্য, জামিন অযোগ্য ও আপসযোগ্য হবে এবং সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা সংশ্লিষ্ট যেকোনো বিভাগের কর্মকর্তা মামলা দায়ের করতে পারবেন। মামলাকারী অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন না করলে তাকে জবাবদিহির সম্মুখীন হতে হবে।

এই আইনের অধীনে বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে বিচার হবে। তবে জরুরী প্রয়োজনে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করতে পারবেন। এ বিষয়ে কোনো অভিযোগ থাকলে জনসাধারণ সরাসরি অভিযোগ বা মামলা দায়ের করতে পারবেন।

কৃষিজমি সুরক্ষা : আইনের মাধ্যমে কৃষিজমি সুরক্ষা করতে হবে এবং কোনোভাবেই তার ব্যবহারভিত্তিক শ্রেণি পরিবর্তন করা যাবে না। কৃষিজমি নষ্ট করে আবাসন, শিল্প-কারখানা, ইটভাটা বা অন্য কোনো অকৃষি স্থাপনা নির্মাণের উপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।

অনুর্বর, অকৃষি জমিতে আবাসন, বাড়িঘর, শিল্প-কারখানা স্থাপনের কথা বলা হয়। যেকোনো শিল্প-কারখানা, সরকারি-বেসরকারি অফিস ভবন, বাসস্থান এবং অন্যান্য স্থাপনা নির্মাণের ক্ষেত্রে ভূমির ঊর্ধ্বমুখী ব্যবহারকে গুরুত্ব দিতে হবে। এ জন্য থাকবে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা।

কৃষিজমি যে কেউ ক্রয়-বিক্রয় করতে পারলেও তা আবশ্যিকভাবে শুধু কৃষিকাজেই ব্যবহার করতে হবে। একাধিক ফসলি জমি সরকারি-বেসরকারি কোনো প্রতিষ্ঠানের জন্য কোনো অবস্থাতেই অধিগ্রহণ করা যাবে না। তবে আবাসিক উদ্দেশ্যে কৃষি জমি ক্রয় ও ব্যবহার সরকার নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। কৃষিজমি চিংড়ি মহাল হিসেবে ঘোষণা করাও যাবে না।

কৃষিজমি ছাড়া অন্য জমির সুরক্ষা : ভৌগোলিক অবস্থান ও প্রকৃতিগত বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী যেসব জমি বনভূমি, টিলা-পাহাড় শ্রেণির, নীরাভূমি, চা-বাগান, ফলের বাগান, রাবার বাগান ও বিশেষ ধরনের বাগান হিসেবে পরিচিত; তাতে যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়া ভূ-প্রকৃতিগত কোনো পরিবর্তন আনা যাবে না। এর ব্যত্যয় ঘটলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

অপচয় রোধে জমির অধিগ্রহণ ন্যূনতম পর্যায়ে রাখতে হবে এবং অধিগ্রহণকৃত জমির অপব্যবহার সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে। অধিগ্রহণকৃত জমি বেদখল থাকলে তা অনুসন্ধান করে মুক্ত করতে হবে।

ভূমির অপচয় রোধে জমি অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে একাধিক প্রতিষ্ঠানকে একই এলাকায় নিবিড়ভাবে স্থান সংকুলানের উপর জোর দেয়ার কথা বলা হয়েছে আইনে। কৃষি জমিতে পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর ফসল (যেমন- তামাক) উৎপাদনও করা যাবে না।

নীরাভূমির সুরক্ষা ও পুনরুদ্ধার : খাল-বিল, হাওর-বাঁওড় ও ঝিলসহ যেকোনো ধরনের সায়রাতমহালের বা নীরাভূমির কোনো শ্রেণি পরিবর্তন করা যাবে না। হাটবাজার, বালুমহাল, পাথরমহাল, বাগান মহাল, প্রত্মতাত্ত্বিক এলাকারও শ্রেণি পরিবর্তন ঘটানো যাবে না।

অন্যান্য ভূমি সুরক্ষা : নদ-নদী, বনভূমি, টিলা-পাহাড়, খেলার মাঠ, সড়ক ও জনপথ, রেললাইন ও তার সংলগ্ন ভূমির শ্রেণী পরিবর্তন করা যাবে না বলেও আইনের খসড়ায় বলা হয়েছে। তবে অপরিহার্য ক্ষেত্রে অনুমতি নিয়ে বনভূমি ও টিলা পাহাড় ব্যতীত কাঙ্খিত পরিবর্তন করা যাবে।

ভূমি জোনিং : সরকার ভূমির বিদ্যমান বহুমাত্রিক ব্যবহার, প্রকৃতিগত বৈশিষ্ট্য ও অন্তর্নিহিত ক্ষমতা এবং গুণাগুণ অনুযায়ী কৃষি, মৎস্য, পশুসম্পদ, বন, চিংড়ি চাষ, শিল্পাঞ্চল, পর্যটন, প্রত্মতাত্ত্বিক এলাকা এবং প্রাকৃতিক জীববৈচিত্র্য এলাকার ক্ষেত্রে ভূমির পরিকল্পিত ও সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সারা দেশে পর্যায়ক্রমে ভূমি জোনিংয়ের ব্যবস্থা করবে।

ভূমি জোনিং সরকারের একটি ‘পরিকল্পনা হাতিয়ার’ হিসেবে বিবেচনা করা হবে। যার মাধ্যমে জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে ভূমির বৈশিষ্ট্য ও ব্যবহারভিত্তিক উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে সহায়তা নেওয়া হবে।

ভূমি অধিগ্রহণ : অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে আন্তমন্ত্রণালয় যোগাযোগ এবং সমন্বয়ের বিধান অনুসরণ করা হবে। নতুন করে ভূমি অধিগ্রহণ করার আগে অধিগ্রহণকৃত জমি পূর্ণ ব্যবহার না করে অধিগ্রহণ করা যাবে না।

ভূমি জোনিং মানচিত্র : সব পৌরসভা, উপজেলা ও ইউনিয়নে ভূমির ব্যবহার ও গুণাগুণভিত্তিক এলাকা চিহ্নিত করে ভূমি জোনিং মানচিত্র প্রস্তুত করতে হবে। অধিক ঘনবসতিপূর্ণ এবং পরিবেশগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এলাকার মানচিত্র অগ্রাধিকার ভিত্তিতে আগে প্রস্তুত করার কথা বলা আছে।

দেশের সব জমির জন্য ভূমি জোনিং করতে হবে। ভূমি জোনিং মানচিত্র মৌজা বা ইউনিয়ন, ওয়ার্ডভিত্তিক করতে হবে। ভূমির বৈশিষ্ট্য ও গুণাগুণ সম্পর্কিত তথ্য ভূমি জোনিং মানচিত্রে উল্লেখ থাকবে। সকল ভূমি জোনিং মানচিত্র রঙিনভাবে মুদ্রিত হবে এবং তা প্রতিবেদনসহ ওয়েবসাইটে উন্মুক্ত রাখা হবে।




রাইজিংবিডি/ঢাকা/৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯/হাসান/এনএ

Walton Laptop