ঢাকা, মঙ্গলবার, ১ শ্রাবণ ১৪২৬, ১৬ জুলাই ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

‘এখন প্রয়োজন একটি কৃত্রিম পা’

মাকসুদুর রহমান : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-০৬-১৮ ৫:০৩:৪৫ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৯-০৬-২৩ ৬:৩৮:২৪ পিএম
‘এখন প্রয়োজন একটি কৃত্রিম পা’
Voice Control HD Smart LED

মাকসুদুর রহমান : আমার সব স্বপ্ন শেষ হয়ে গেছে। পা আর ফিরে পাবো না- এ কথা বলামাত্রই চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়লো পা হারানো পুলিশ কনস্টেবল পারভেজ মিয়ার।  কেঁদে কেঁদেই বললেন তিনি, এখন প্রয়োজন একটি কৃত্রিম পা। সেই পা যেন উন্নতমানের হয়; যাতে কিছুটা স্বস্তি মেলে।

রোববার রাতে জাতীয় অর্থোপেডিক ও পুনর্বাসন কেন্দ্র বা পঙ্গু হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, বেডে শুয়ে আছেন পারভেজ। কাটা ডান পা একটি বালিশের ওপর রেখে চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছেন। কণ্ঠস্বর শুনে চোখ খুলে আস্তে করে বললেন, আপনি কে ? প্রতিবেদকের পরিচয় নিশ্চিত হয়ে তিনি বলতে শুরু করেন, ‘আর কি বলবো ভাই। কপালে যা ছিল তাই হয়েছে। মেনে নেওয়া ছাড়া কি আর করার আছে। আমার সব স্বপ্ন শেষ হয়ে গেছে।’

কনস্টেবল পারভেজ বলেন, ‘অনেক স্বপ্ন নিয়ে বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীতে যোগদান করি। অভাবের সংসার। এ কারণে এই চাকরিকে পুঁজি করে অনেক স্বপ্ন দেখতে থাকি। আশা ছিল জাতিসংঘ শান্তি মিশনে যাওয়ার। সেখানে যেতে পারলে কিছু টাকা পাওয়া যেত। চাকরি জীবনের কিছু সঞ্চয় আর পেনশনের টাকা দিয়ে গ্রামের বাড়িতে একটি বাড়ি করার ইচ্ছে ছিলো। নিজের পরিবার এবং বাবা, মা, ভাই ও বোনকে সহায়তা করার ইচ্ছে ছিলো। কিন্তু পা হারিয়ে এখন এসব আর বাস্তবায়ন হবে না। কেননা, পরিবারে আমিই একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি।

রাইজিংবিডিকে পারভেজ বলেন, ‘এ পর্যন্ত পুলিশ বাহিনী থেকেই চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। বাহিনী থেকে খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। নগদ ২০ হাজার টাকাও দেওয়া হয়। যা অসুস্থ বাবা-মা’র চিকিৎসার জন্য দিতে হয়েছে। আমাকে কৃত্রিম পা লাগিয়ে দেওয়া হবে বলে পুলিশ থেকে বলা হয়েছে। পা যেন এমনভাবে লাগানো হয়, আমি চলতে পারি। এ জন্য প্রয়োজনে আমি প্রধানমন্ত্রীর সহযোগিতা কামনা করছি।’

তিনি বলেন, ‘কী পরিহাস! যে মানুষটার উছিলায় ৪০ জনের জীবন বাঁচল, আজ সে মানুষটাই পঙ্গু হয়ে গেল। ওই ঘটনার সময় কে ভেবেছিল আমার ভাগ্যে এমন পরিণতি লেখা আছে। আমরা গরিব মানুষ। পরিবারের সবাই আমার ওপর নির্ভরশীল। পরিবারে আমিই একটু পড়াশোনা করেছি। আমার পঙ্গুত্ব পরিবারের জন্য অন্ধকার ডেকে এনেছে। জানি না এক পা নিয়ে কীভাবে পুরো পরিবারের ভার বহন করব।’

একথা বলেই কান্নায় ভেঙে পড়েন পারভেজ।

বেডের পাশেই বসে ছিলেন ছোট ভাই মো. মহিউদ্দিন। তিনি বলেন, ‘পারভেজের ৯ বছরের একটি মেয়ে আছে। দুই ভাই দু’বোনের সঙ্গে আছেন বাবা-মাও। এখন আমরা চোখেমুখে অন্ধকার দেখছি। ভাইয়ের চাকরিটা যেন থাকে সেজন্য পুলিশ বাহিনীর কাছে জোর অনুরোধ করছি।’

অবশ্য চাকরির বিষয়ে কোন ধরনের সমস্যা হবে না বলে নিশ্চিত করেছেন পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) সোহেল রানা। সোমবার তিনি রাইজিংবিডিকে বলেন, ‘পুলিশ বাহিনী থেকে তার জন্য সব কিছু করা হচ্ছে। আগামীতেও এ ধারা অব্যাহত থাকবে। বসে থেকে করা যায়- এমন কাজে প্রয়োজনে তাকে নিয়োজিত করা হবে।’



পঙ্গু হাসপাতালে পারভেজের চিকিৎসার তত্ত্বাবধান করছেন প্রফেসর ডা. ওয়াহেদুর রহমান। তিনি রাইজিংবিডিকে বলেন, ‘অস্ত্রোপচার হলেও পারভেজের অবস্থা এখনো আশঙ্কামুক্ত নয়। পচন ধরায় অস্ত্রোপচার করে প্রথমে পারভেজের হাঁটুর নিচের অংশ কেটে ফেলা হয়েছে। অবস্থা খারাপ হওয়ায় হাঁটুর ওপরের অংশও কেটে ফেলা হয়েছে। আগামী ৩ সপ্তাহ পর তার পায়ের সেলাই খোলা হবে। বাম হাতেও আঘাত রয়েছে। এ কারণে আগামী সপ্তাহে হাতে অস্ত্রোপচার করতে হবে।’
উল্লেখ্য, ২৭ মে মুন্সিগঞ্জের জামালদি বাসস্ট্যান্ড এলাকায় পিকআপ ভ্যানের চাপায় থেঁতলে যায় পারভেজের ডান পা।

পারভেজ ২০১৭ সালের ৭ জুলাই থেকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে দায়িত্ব পালন করছিলেন। তার এই দুর্ঘটনার বেশ আগে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে দায়িত্ব পালনকালে গৌরীপুর বাসস্ট্যান্ড এলাকায় সড়ক থেকে একটি বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ডোবায় পড়ে যায়। তিনি ঘটনাস্থলে ছুটে যান। ময়লা আবর্জনায় ভরা ডোবা। সেখান থেকে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছিল। আশপাশে মানুষের ভিড় কিন্তু কেউই উদ্ধার কাজে নামছিলেন না। অন্যদিকে, বাসের ভেতরে আটকে পড়া মানুষের তখন বাঁচার আকুতি। নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তিনি একে একে আটকে পড়াদের বের করে আনেন। যা সে সময় ব্যাপক প্রশংসা পায় এবং ঝড় ওঠে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে।



রাইজিংবিডি/ঢাকা/১৮ জুন ২০১৯/মাকসুদ/শাহনেওয়াজ

Walton AC
ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন
       

Walton AC
Marcel Fridge