ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৪ চৈত্র ১৪২৩, ২৮ মার্চ ২০১৭
Risingbd
মার্চ
সর্বশেষ:

পিস প্যাগোডা, হনুমানের কাণ্ড!

ইয়াসিন : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৭-০৩-১০ ৮:৩৭:০১ এএম     ||     আপডেট: ২০১৭-০৩-১০ ১০:৫৯:১১ এএম

গল থেকে ইয়াসিন হাসান : সকাল থেকেই কোনো না কোনো কারণে মেজাজ খারাপ। এর মধ্যে আমার দুই রুমমেট খাবার পানি নিয়ে করছে ‘ঝগড়া’। অবশ্যই দুই জনেরই মুখেই হাসি। ঝগড়াও করছে হাসিমুখে। আজব এক চরিত্র। অবশ্য বন্ধুত্বের গভীরতা বেশি থাকলে হয়ত এ রকমটা হতে পারে।

সকাল ৮টার আগেই আমরা তিনজন বেরিয়ে গেলাম আমাদের হোটেল থেকে। ওয়ানাতুনার সেরা হোটেল ‘হোটেল বানানা’। ওখান থেকে একটা ডুগডুগি নিয়ে গেলাম রুমাসালা পাহাড়।

 


আমাদের দেশের সিএনজি অটোরিকশা মানে এখানকার ডুগডুগি। ভদ্রলোক ভাড়া চাইলেন ৫০০ রুপি। ৩০০-তে রাজি হলেন। আগেই বলে দিলেন পাহাড়ের আকাবাঁকা পথ বেয়ে ওপরে উঠতে হবে। দূরত্বও অনেক। যেতে যেতেই ভদ্রলোকের সঙ্গে কথা হলো। জানা গেল তার বাংলাদেশি দুই বন্ধু আছে। পরিচয় হয়েছে সৌদি আরবে। ওখানে তারা তিনজন কনস্ট্রাকশনের কাজ করতেন। দীর্ঘদিন কাজ করার পর এখন নিজ দেশে ফিরে ডুগডুগি চালাচ্ছেন।

 


গাড়িটা নিজেরই। সারা দিন চালালে আড়াই-তিন হাজার রূপি আয় হয়। সেটা দিয়েই চলে তার চারজনের পরিবার। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও যানজটমুক্ত রাস্তা পেরিয়ে আমরা ২০ মিনিটে পৌঁছে গেলাম রুমাসালা পাহাড়ে। রুমাসালা পাহাড়। অদ্ভুত সুন্দর একটি জায়গা। ভারত মহাসাগরের নীল জলরাশি দেখার সেরা মঞ্চ এ পাহাড়।

 


এ পাহাড়ের একটি ঘটনা শেয়ার করি। রামায়ণের খলনায়ক রাবণের দেশ এই শ্রীলঙ্কা। সীতাকে একবার ‘অপহরণ’ করে নিয়ে এসেছিল রাবণ। এখান থেকে রাম যুদ্ধ করে সীতাকে ফিরে এসেছিলেন বীরের বেশে। দুজনের লঙ্কাকাণ্ডে লক্ষ্মণের বুকে বিঁধে যায় ‘শক্তিশেল’। তাকে বাঁচাতে হনুমান হিমালয় থেকে আনতে যান চারটি ঔষুধি গাছ। গাছগুলোর নাম ছিল- মৃতসঞ্জীবনী, বিশল্যকরণী, সুভামাকরণী ও সন্ধানী। কিন্তু গাছের নাম ভুলে যাওয়ায় হনুমান কোনো উপায় না পেয়ে পুরো গন্ধমাদন পাহাড়টাই নিয়ে আসেন। ফেরার পথে পাহাড়ের এক টুকরো পড়ে যায়। সেখান থেকেই রুমাসালা পাহাড়।

 

 

পাহাড়ের চূড়ায় পিস প্যাগোডা। জাপানিদের তৈরি প্যাগোডাটি ২০০৫ সালে সাধারণ জনগণের জন্য খুলে দেওয়া হয়। এরপর প্রতিদিন দেশ-বিদেশের হাজারো পর্যটকের আনাগোনা হয় প্যাগোডায়। প্যাগোডাতে যাওয়ার আগেই দেখা মিলল হনুমানের। ডান হাতে গদা ও বাম হাতে পাহাড় নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে হনুমান।

 

 

সেখান থেকে গেলাম বৃত্তাকার আকৃতির প্যাগোডায়। প্যাগোডার উচ্চতায় ১৬২ ফিট। এর ডান পাশে বৌদ্ধের ঘর ও বাম পাশে প্রায় ১৫০ ফিটের একটি ঘণ্টা। প্রতি এক ঘণ্টা পরপর এ ঘণ্টায় একটি করে বেল বাজানো হয়। প্যাগোডায় বুদ্ধের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা বিভিন্ন সময়ের চারটি ‍মূর্তি জায়গা পেয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল প্রিন্স সিদ্ধার্থ ও পারিনিরভানার মূর্তি। প্রিন্স সিদ্ধার্থ, রাজা শুধোদানা ও রাণী মায়ার একমাত্র সন্তান। আড়াই বছর আগে হিমালয়ের লামবিনি পার্কের চূড়ায় জন্মগ্রহণ করেন। তার মূর্তিটি এক কথায় অসাধারণ। ডান হাতের আঙুল স্বর্গের দিকে চিহ্নিত করা, বাম হাতের আঙুল পৃথিবীকে চিহ্নিত করা। প্রশ্ন জাগছে কেন, উত্তর মিলল মূর্তির নিচে, ‘Above and below heaven, I am revered. The triple world is filled with suffering I shall relive it all.’

 

 

একটু এগিয়ে যেতেই দেখা মিলল পারিনিরভানার মূর্তি। ডান দিকে কাত হয়ে শুয়ে আছেন পারিনিরভানা। ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে জ্ঞান বিতরণ করেছেন পারিনিরভানা। প্যাগোডার বাইরে হাতের ডান দিকে বুদ্ধের ঘরে ঢুকতেই চোখ জুড়িয়ে গেল। বিভিন্ন রকমের ছোট-মাঝারি মূর্তি, বুদ্ধের ব্যবহৃত বিভিন্ন সরঞ্জামাদি ও আরও অনেক কিছু। ওখানে ছবি তুলতে মানা। অনুমতি চেয়েও মিলল না। তবে মূর্তির খুব কাছেই ইংরেজিতে লিখা, ‘Na Mu Myo Ho Ren Gen Hyo।’ অর্থ জানা গেল না। তবে প্যাগোডা রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা একজন বুঝিয়ে দিলেন, ‘ইটস ফর প্রেয়ার।’

সব ঘুরেফিরে ফেরার পালা। হঠাৎই মনে হল পিছনে কি ফেলে আসলাম? শঙ্কা সত্যি হল। সবুজের গালিচার ওপর গিয়ে হেঁটে গেলাম প্যাগোডার পিছনে। গিয়ে দেখা মিলল স্মৃতিচারণ স্তম্ভের। ২০০৪ সালের ২৬ ডিসেম্বর প্রশান্ত মহাসগর উপকূলজুড়ে আঘাত হানে সাগরতলে ভূমিকম্পের প্রভাবে সৃষ্ট সুনামি। এতে কয়েকটি দেশে মারা যায় প্রায় ২ লাখ ৮০ হাজার মানুষ। শ্রীলঙ্কায় নিহতদের জন্য প্যাগোডার পিছনে তৈরি করা হয়েছে স্তম্ভ। ওখানে লিখা আছে, ‘A memorial pillar to commemorate Tsunami victims in Sri Lanka. 26th December 2004.’ পুরো ৫ একরের জায়গায় ঘণ্টাখানেক ঘুরে আবারো ডুগডুতিতে আমরা। এবার গন্তব্য গল ক্রিকেট স্টেডিয়াম।

 

 

রাইজিংবিডি/গল (শ্রীলঙ্কা)/৯ মার্চ ২০১৭/ইয়াসিন/সাইফুল

Walton Laptop