ঢাকা, সোমবার, ১১ বৈশাখ ১৪২৪, ২৪ এপ্রিল ২০১৭
Risingbd
সর্বশেষ:

ক্যাসিনো আর স্বপ্ন ধরার দিন

শান্তা মারিয়া : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৭-০৪-০৩ ২:৪৮:৪৭ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৭-০৪-০৩ ২:৪৮:৪৭ পিএম

(লক্ষ্মণরেখার বাইরে : ৯ম পর্ব)

 

শান্তা মারিয়া : স্বপ্ন কি সত্যিই ধরা যায়? ড্রিম ক্যাচার নাম শুনেই চোখের পাতায় যেন ধরা দেয় স্বপ্ন। ২০০৬ সালে আমেরিকায় গিয়ে প্রথম শুনি ড্রিম ক্যাচারের নাম। ড্রিম ক্যাচার বস্তুটি দেখতে একটু অদ্ভুত ধরনের। সুতা বা কাপড়ের তৈরি বড় একটি বৃত্ত। তার নিচে ঝুলছে একটি বা কয়েকটি পাখির পালক। বৃত্তটির ভিতরেও রয়েছে সুতার নানা রকম নকশা। দেখতে মনে হয় মাকড়শার জালের মতো। উইলো হুপের ভিতরে এই বুনন। এটি ঝুলিয়ে রাখার জন্য রয়েছে সুতার দড়ি বা ফিতে। মোটামুটিভাবে এটাই হলো ড্রিম ক্যাচার। এগুলো বিশাল বড় আকার থেকে শুরু করে ছোট্ট হতে পারে। রেড ইন্ডিয়ান বা নেটিভ আমেরিকান জাতির বিভিন্ন গোত্রের সংস্কৃতি হলো ড্রিম ক্যাচার।

ওকলাহমা স্টেটে প্রচুর সংখ্যক রেড ইন্ডিয়ান বা আমেরিকান আদিবাসীদের বসবাস রয়েছে। তাই ওকলাহমার ঐতিহ্য অনেকটাই রেড ইন্ডিয়ান ঐতিহ্য। উপকথায় বলে, আসিবিকাশি হলেন স্পাইডার ওমেন। তিনি শিশুদের দেখভাল করেন। বলা যায় শিশুদের গার্ডিয়ান অ্যাঞ্জেল ধরনের এক দেবী। রেড ইন্ডিয়ান গোত্রগুলো যেহেতু আমেরিকার নানা স্থানে ছড়িয়ে পড়েছে তাই আসিবিকাশি সবার খোঁজখবর রাখতে পারেন না বা সবার কাছে পৌঁছাতে পারছেন না। আসিবিকাশিকে ডাকার জন্য শিশুদের মা, নানিরা এই ধরনের ড্রিম ক্যাচার তৈরি করে তাদের দোলনা বা খাটের কাছে ঝুলিয়ে রাখতেন। ড্রিম ক্যাচার দেখে আসিবিকাশি যেন বুঝতে পারেন যে, এখানে রেড ইন্ডিয়ান শিশু আছে। তিনি তাদের সুন্দর স্বপ্ন দেখান এবং ঘুমের মধ্যে অশুভ কোনো কিছু থেকে রক্ষা করেন। ড্রিম ক্যাচারের বুননটা তাই অনেকটা মাকড়শা জালের মতো। এটি প্রথমে ছিল ওজিবি গোত্রের উপকথা। পরে নেটিভ আমেরিকানদের সব গোত্রের মধ্যে ঐক্যের প্রতীক হিসেবে এই ড্রিম ক্যাচার ছড়িয়ে পড়ে। ওকলাহমায় দেখলাম ড্রিম ক্যাচারের আদলে তৈরি নানা রকম জিনিষ। শোপিস, কানের দুল, গলার হার সবকিছুতেই ড্রিম ক্যাচারের নকশা। আমি অনেকগুলো কিনেছিলাম। ভেবেছিলাম এগুলো রেড ইন্ডিয়ানদের হস্তশিল্পের নমুনা। ও মা, পরে দেখি অনেকগুলোর পিছনেই ছোট্ট করে লেখা মেড ইন চায়না।

ড্রিম ক্যাচার কিন্তু আমি চীনেও দেখেছি, নেপালের থামেলেও দেখেছি। জানি না ওগুলো কিভাবে ওখানকার বাজারে গেছে। নেপালেরটাও স্থানীয়ভাবে তৈরি, চীনেরটাও। সবগুলোই দেখলে রেড ইন্ডিয়ান সংস্কৃতির কথা মনে পড়ে যায়।

ওকলাহমায় প্রচুরসংখ্যক আদিবাসী আছেন। স্টেটের নাম ওকলাহমার অর্থ হলো ওকলা (লাল), হুমা (মানুষ)। তার মানে লালমানুষ। দক্ষিণ মধ্য আমেরিকার এই স্টেটে লালমানুষ বা আদিবাসী আমেরিকানদের আধিক্যের জন্যই এই নাম। চেরোকি, চোকতাও ইত্যাদি ট্রাইবের লোকজন বাস করে এখানে। একসময় খুব নিষ্ঠুরভাবে আদিবাসীদের দমন করা হয়েছিল। তাদের হত্যা করা হয়েছিল। তাড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল মরুভূমির দিকে। তাদের আহার্য বাইসনকেও ইচ্ছাকৃতভাবে মেরে ফেলা হয় পালে পালে। যাতে ট্রাইবাল মানুষ না খেয়ে মরে। বস্তুত এসব ইতিহাস পড়লে শ্বেতাঙ্গদের দিকে তাকাতে ইচ্ছা করে না। তাদের মুখে মানবতার বাণী শুনলেও হাসি পায়। ওকলাহমা ষাটের দশক পর্যন্ত যথেষ্ট বর্ণবাদী ছিল। কৃষ্ণাঙ্গ এবং রেড ইন্ডিয়ানদের সূর্যাস্তের পর শহরের বাইরে তাদের জন্য নির্ধারিত আবাসে চলে যেতে বাধ্য করা হতো। তাদের জন্য জলের কল ছিল আলাদা। এখন অবশ্য এসব জঘন্য নিয়মকানুন আর নেই।

আমরা কয়েকজন সাংবাদিক যখন ওকলাহমা স্টেট ইউনিভার্সিটির  একটা সংক্ষিপ্ত ফেলোশিপে অংশ নিতে যাই তখন সেখানে দারুণ শান্তিময় পরিবেশ দেখেছি। ওকলাহমায় ক্যাসিনো এবং জুয়াখেলা নিষিদ্ধ ছিল। তবে আদিবাসীদের পরিচালিত বেশ কয়েকটি  ক্যাসিনো রয়েছে। এগুলো তাদের বিশেষ রীতিনীতির অধিকারের মধ্যে পড়ে। এমনি একটি ক্যাসিনো দেখতে আমাদের নিয়ে যাওয়া হলো। ক্যাসিনোর নাম রাইজিং সান।

ক্যাসিনো কথাটি শুনলেই চোখে ভাসে জেমস বন্ড, রাশিয়ান রুলেট, তিন তাস, ক্যাবারে নাচ, মদের গ্লাস ইত্যাদি ইত্যাদি। অ্যাকশন মুভিতে সারাজীবন এসব দেখেছি। পড়েছিও মাসুদ রানার অভিযানে। ভয়ানক বদমাশদের জায়গা হলো ক্যাসিনো- এমন একটি ধারণা মনের ভিতর তৈরি হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু ওকলাহমার ক্যাসিনোতে ঢুকে ভয়ানক কিছু বা কাউকে চোখে পড়লো না। আলো ঝলমল বিশাল জায়গা। রাশিয়ান রুলেট, জ্যাকপট সেসব ঠিক আছে। কিন্তু যারা এগুলো খেলছে তাদের চেহারা নেহাত গোবেচারা ভদ্রলোকের। বেশিরভাগই একটু বয়স্ক নারী-পুরুষ। তাদের মুখে মেকআপও তেমন চড়া নয়, সাজসজ্জাও উগ্র নয়। এক জায়গায় স্টেজে গান হচ্ছে। তিনজন ওয়েস্টার্ন গায়ক। পোশাক ওয়েস্টার্ন মুভির মতো। মাথায় কাউবয় হ্যাট। কান্ট্রি সং হচ্ছে। চমৎকার গানের সুর। ধুমধাড়াক্কা নয় মোটেই। আমার মনে পড়লো প্রিয় গান ‘টেক মি হোম, কান্ট্রি রোডস’। জন ডেনভারের এই গানটি আমার চিরদিনের পছন্দের গানের তালিকায় রয়েছে। সেসঙ্গে স্কুলে পড়ার সময় বন্ধুমহলে আমাদের প্রিয় গান ‘জনি জনি প্লিজ ডোন্ট ক্রাই’।

ক্যাসিনো দেখছিলাম। বেশ অনেকগুলো ঘর। ঘর না বলে বড় বড় হলরুম বললেই যথার্থ হয়। এসব খেলায় আমার তেমন আগ্রহ নেই। এমনকি জ্যাকপটেও নয়। তাই বরং দেখছিলাম রেড ইন্ডিয়ানদের। ক্যাসিনোর ভিতরেই রয়েছে একটি দোকান। এই দোকানটারও পরিচালক রেড ইন্ডিয়ান। ওখানে রেড ইন্ডিয়ানদের ঐতিহ্যবাহী নানা রকম ছবি, বই, নানা রকম অলংকার, চাবির রিং, মগ ইত্যাদি রয়েছে। এই ক্যাসিনোর নাম লেখা শোপিসেরও অভাব নেই। আমিও কিনলাম কিছু।

ওকলাহমাতে আমাদের একটি স্টুডেন্টস পার্টিতে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সেখানে দুতিন জন রেড ইন্ডিয়ানের সঙ্গে আলাপ হয়। তারা বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি করেন। একজন লাইব্রেরিতে, অন্যজন অন্য এক বিভাগে। দুজনেই চেরোকি গোত্রের মানুষ। মহিলাটি লাইব্রেরিতে চাকরি করেন। তার নামটা ভুলে গেছি। বললেন ওরা মূল জনস্রোতে মিশে যাচ্ছেন ধীরে ধীরে। অনেক আগে নাকি তাদের এনক্লেভে থাকতে হতো। আজকাল সেসব বালাই নেই। তিনি বিশ্ববিদ্যালয় এলাকাতেই থাকেন। তার স্বামী একজন শ্বেতাঙ্গ আমেরিকান। মাঝে মাঝে রেড ইন্ডিয়ানরা কোনো অনুষ্ঠানে মিলিত হলে তাদের গোত্রের ঐতিহ্যবাহী নানা রকম আচার অনুষ্ঠান পালন করা হয়। রেইন ডান্সসহ বিভিন্ন চিত্তাকর্ষক অনুষ্ঠান হয়ে থাকে তখন। তবে এগুলো নেহাতই আনুষ্ঠানিকতা। ব্যক্তি জীবনে আর দশজন আমেরিকানের মতোই চলেন তারা। তার সঙ্গে কথা বলছিলাম আর কল্পনায় যেন দেখতে পাচ্ছিলাম প্রেইরির বুকে ঘোড়ার পিঠে ধাবমান রেড ইন্ডিয়ানদের। সামনে ছুটে চলেছে বাইসনের পাল। গোত্রের প্রধান তাঁবুর সামনে বসে আছেন সর্দার। গায়ে বিচিত্র নকশা করা পোশাক। ছায়ায় বসে মাদুর বুনছে কয়েকজন নারী। তাদের কালোচুলে লম্বা বেণী করা। গলায় পাখির পালকের গয়না। খেলা করছে কয়েকটি শিশু। প্রেইরির ঘাসবন থেকে ভেসে আসছে উতল হাওয়া। শান্তিময় পরিবেশ। নিশ্চয়ই এই মহাদেশে শ্বেতাঙ্গ দখলদাররা আসার অনেক আগের এই ছবি।

আমি তাকালাম আমার পাশে বসা নারীর দিকে। তার পরনে আধুনিক স্কার্ট আর টপস। তবু কালো চুল আর কালো চোখের দৃষ্টিতে আদিবাসীদের সেই ইতিহাস যেন উঁকি দিয়ে গেল। ড্রিম ক্যাচার ক্যাচ মি সাম সুইট ড্রিমস। টেক মি হোম, কান্ট্রি রোডস। আমি ফিরে যেতে চাই সেই সরল জীবনে।





রাইজিংবিডি/ঢাকা/৩ এপ্রিল ২০১৭/সাইফ

Walton Laptop