ঢাকা, মঙ্গলবার, ৯ শ্রাবণ ১৪২৪, ২৫ জুলাই ২০১৭
Risingbd
সর্বশেষ:

ওকলাহমা বিশ্ববিদ্যালয়ে || শান্তা মারিয়া

শান্তা মারিয়া : রাইজিংবিডি ডট কম
প্রকাশ: ২০১৭-০৪-১৬ ১১:৪২:০২ এএম     ||     আপডেট: ২০১৭-০৪-১৬ ১১:৪৮:২৩ এএম
ওকলাহমা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস

(লক্ষ্মণরেখার বাইরে ১১তম পর্ব)

বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস দেখেই চোখ জুড়িয়ে গেল। এমন পরিবেশ দেখলে মনে হয় আবার ভর্তি হয়ে যাই। ফিরে যাই মধুময় শিক্ষার্থী জীবনে। ওকলাহমা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেকগুলো কলেজ। একেকটি কলেজ একেকটি ফ্যাকালটি। গেলর্ড কলেজে রয়েছে ম্যাস কমিউনিকেশন অ্যান্ড জার্নালিজম বিভাগ। সেই বিভাগেই সংক্ষিপ্ত ফেলোশিপে এসেছি আমরা। আমেরিকা এসে পৌঁছানোর পরদিন সকালেই শুরু হলো ক্লাস। এমনিতেই রসাতলে (গ্লোবে দেখা যায় আমাদের দেশের নিচেই আমেরিকা। তাহলে রসাতল তো বলাই যায়!) চলে এসেছি। ঘুমের সময় ওলটপালট হয়ে গেছে। সম্ভবত সে কারণেই দু’ঘন্টা ক্লাসের পরই বেজায় ঘুম পাচ্ছিল। তবে দেখলাম ঘুম কাটানোর বেশ ভালো পদ্ধতি ক্লাসের ভিতরেই রয়েছে।

ক্লাসের একদিকে রয়েছে কফি আর কুকিজের ব্যবস্থা। ক্লাস নেওয়ার পদ্ধতিও চিত্তাকর্ষক। মূল বিষয়বস্তু হলো উইমেন লিডারশিপ ইন জার্নালিজম। এখানে প্রথমেই বিভিন্ন বস বা সম্পাদকের শ্রেণীবিচার। কারও বস বা সম্পাদক কড়া, কেউ ঠান্ডা মেজাজের, কেউ ক্রিটিকাল ইত্যাদি। যে দেবতা যে পূজায় তুষ্ট। তার জন্য তেমনি আয়োজন করতে হবে। প্রথমেই বুঝতে হবে তিনি কী চান? আমার চেনাজানা সম্পাদকদের কথা মনে হচ্ছিল, তোয়াবভাই, মতিভাই, শ্যামলদা, সারোয়ারভাই। যাহোক ওদের পড়ানোর পদ্ধতিই এমন যে আগ্রহ জাগে। আর গ্রুপ ওয়ার্ক, মাল্টিমিডিয়া প্রেজেনটেশন, নানা রকম প্রোজেক্ট বানানোর কাজ বিষয়গুলোকে সহজবোধ্য করে দেয়। ঝকঝকে ক্লাসরুম, প্রত্যেকের জন্য কম্পিউটার, আরও কত সুবিধা!

মনে মনে ভাবছিলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা। নব্বই দশকে কলাভবনে ক্লাস রুমের চরম সংকট। সবার আগে দৌড়ে গিয়ে রুম দখলের স্মৃতি মনে পড়লো। আর এখানে? এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা নিশ্চয়ই কোনোদিন ক্যাডার, টিয়ার গ্যাস, হরতাল, ধর্মঘটের নামও শোনেনি। সেশন জটের খপ্পরেও নিশ্চয়ই পড়েনি কখনও। হায় আমার দুঃখিনী জন্মভূমি। তবু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আমার অতি প্রিয়, অতি আপন।

ওকলাহমা গেলর্ড কলেজের সামনে


আমরা লাঞ্চ করলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাফেটেরিয়ায়। দারুণ ঝকঝকে। শিক্ষার্থীদের অনেকে এখানে পার্টটাইম চাকরি করে। নোটিশ বোর্ডে কয়েকটি জব অফারও দেখলাম। ডর্মেটরিগুলোও সবরকম সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন। ওকলাহমা স্টেট আয়তনে বাংলাদেশের চেয়ে বড়। সেই তুলনায় লোকসংখ্যা বিস্ময়করভাবে কম। পুরো স্টেটে ত্রিশ-চল্লিশ লাখের বেশি নয়।

প্রাকৃতিক গ্যাস আর তেলের রাজ্য। সেইসঙ্গে কৃষিকাজও হয় বেশ ভালোভাবেই। প্রেইরির একটা অংশ পড়েছে এই স্টেটে। প্রেইরি শুনলে মনে পড়ে লিটল হাউজ অন দ্য প্রেইরি সিরিজ, লরা ইঙ্গলস ওয়াইল্ডারের সেই বিখ্যাত বইগুলো। ছোটবেলায় পড়া তেপান্তরে ছোট্ট শহর লিটল হাউজ অন দ্য প্রেইরি অবশ্য সাউথ ড্যাকোটা স্টেটের ঘটনা। ওকলাহমা তার তিন স্টেট দক্ষিণে। মাঝে রয়ে গেছে নেব্রাসকা ও কানসাস। তবু প্রেইরি তো আছে। নামটাই যথেষ্ট।

শুনলাম আমাদের কলেজ যার ব্যক্তিগত দানে গড়ে উঠেছে সেই ধনকুবের গেলর্ড ছিলেন বিশাল দানবীর। নরম্যান শহরে তার দানকর্মের অনেক পরিচয় রয়েছে। কলেজ ভবনের সামনেই তার বিশাল ভাস্কর্য। ওকলাহমা বিশ্ববিদ্যালয় ওকলাহমা সিটি থেকে কিছুটা দূরে নরম্যান নামে শান্তিময় একটা ছোট শহরে অবস্থিত। নরম্যান বিশ্ববিদ্যালয় শহর। মূলত ছাত্র, শিক্ষক আর বিশ্ববিদ্যালয়সংশ্লিষ্ট মানুষজনই এখানে বাস করেন। এই ছোট শহরেও অবশ্য বড় বড় শপিংমলের অভাব নেই। টার্গেট, ওয়ালমার্ট-এর মতো সুপার চেইনশপগুলো তো আছেই। নরম্যান এতটাই শান্তিপূর্ণ যে এখানে অপরাধ ঘটে না বললেই চলে। দশবছরেও হয়তো কোনো খুনের ঘটনা ঘটেনি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের সঙ্গে আমাদের অনুষ্ঠানিক সাক্ষাৎ হলো আমাদের সম্মানে আয়োজিত এক লাঞ্চে। ভদ্রমহিলা দারুণ বিনয়ী। কথাও বলেন চমৎকারভাবে। এখানে একটা বিষয় আমার খুব ভালো লাগছে যে, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বললেই মনে একটা শ্রদ্ধার ভাব জাগে। কারণ তাদের কথা শুনলেই বোঝা যায় এরা যেমন প্রচুর পড়াশোনা করেন তেমনি সংযত ও বিনয়ী। ম্যাস কমিউনিকেশনের যে শিক্ষকরা আমাদের ক্লাস নিলেন তারাও এমন। বলতে গেলে সারাদিন গবেষণা ও বিদ্যাচর্চার মধ্যেই থাকেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের একটা স্যুভেনির শপে গিয়েও বেশ মজা পেলাম। জেমস জয়েস, অ্যাডগার অ্যালেন পো’সহ বিখ্যাত লেখকদের ছোট্ট ছোট্ট্ প্রতিকৃতি। তার মধ্যে ম্যাগনেট লাগানো। যাতে ফ্রিজে বা স্টিল ক্যাবিনেটে আটকে রাখা যায়। আর ওকলাহমা লেখা মগ, কফিপট, পেপারওয়েটসহ নানা রকম স্যুভেনির তো রয়েছে। কিনেছিলাম বেশ’কটি। কয়েকটি এখনও রয়ে গেছে ধুলোপড়া চেহারায়। তার মধ্যে একটি ছিল মাঝারি আকৃতির সফট টয়েজ স্নুপি। এই স্নুপি হলো গ্র্যাজুয়েট স্নুপি। তার পরনে অভিষেকের পোশাক। হাতে গ্র্যাজুয়েশন সার্টিফিকেট।


সাংবাদিকতা বিভাগের ছাত্রছাত্রীরা একটা দৈনিক পত্রিকা প্রকাশ করে। এই পত্রিকায় তারাই কাজ করে। এখানে কাজ করার মাধ্যমে তারা হাতে-কলমে সাংবাদিকতা শেখে। সেই পত্রিকায় আমাদের সাক্ষাৎকার ও ছবি ছাপা হলো। ফলে পুরো বিভাগ আমাদের বিষয়ে জানতে পারলো। একদিন বিভাগের শিক্ষার্থীদের একটি বিশেষ সান্ধ্য আয়োজনেও গেলাম। সেখানেও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলাপ পরিচয় ঘটলো। আমেরিকানরা বেশিরভাগই খুব আত্মকেন্দ্রিক। নিজের দেশের বাইরে অনেক কিছুই তারা জানে না। ওদের মধ্যে অনেকেই বাংলাদেশের নাম শোনেনি। বাংলাদেশ বিষয়ে কিছুই জানে না। তবে আমাদের বিষয়ে তাদের দারুণ কৌতূহল। বিশেষ করে শাড়ি এবং কপালের টিপ প্রসঙ্গে। এ বিষয়টি নিয়ে বলতে আমি খুব মজা পাই। সেদিন দশজনের মধ্যে একমাত্র আমিই ছিলাম শাড়ি পরা। ব্যাগে একপাতা টিপও ছিল। উপস্থিত ছেলেমেয়ে অনেকেই আমার কাছ থেকে টিপ নিয়ে কপালে দিয়েছিল।

বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরি ছিল বিশাল। সেখানে বইয়ের সংগ্রহ দেখে চোখ ছানাবড়া হয়ে যায়। তবে ওকলাহমা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার সবচেয়ে প্রিয় ছিল এর বিশাল সবুজ ক্যাম্পাস। একটা বিষয় খুব অবাক লাগতো যে এত সুন্দর সবুজ ঘাস কিন্তু কেউ ঘাসে বসে না। বসার জন্য আলাদা বেঞ্চ আছে। কেউ ঘাসের উপর দিয়ে চলেও না। সরু পথ আছে ঘাসের ভিতর দিয়ে বা একপাশ দিয়ে। সবাই সেই পথ ধরে চলাচল করে। প্রথমে এর কারণ না বুঝলেও পরে বুঝেছি ঘাস যেন নষ্ট না হয় বা দলে না যায় সেজন্যই কেউ ঘাসের উপর দিয়ে চলে না বা ওতে বসে না।

গাছের ছায়ায় বেঞ্চে বসে সেই সবুজ ঘাসে ছাওয়া মাঠের দিকে তাকিয়ে থাকতে দারুণ ভালো লাগতো। অন্য রকম এক প্রশান্তিতে ভরে উঠতো মন। আরেকটি জিনিস খুব পছন্দনীয় ছিল। সেটা হলো সকালবেলা ক্লাসে ঢুকতেই নাকে ভেসে আসা কফির সুবাস। সতেজ করা সেই কফির কাপ হাতে নিয়ে শুরু হতো দিনের পড়াশোনা।




রাইজিংবিডি/ঢাকা/১৬ এপ্রিল ২০১৭/তারা

Walton Laptop