ঢাকা, শুক্রবার, ১ পৌষ ১৪২৪, ১৫ ডিসেম্বর ২০১৭
Risingbd
সর্বশেষ:

ওম মণি পদ্মে হুম

শান্তা মারিয়া : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৭-০৫-২৯ ২:০১:৩৯ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৭-০৫-২৯ ৪:৫৪:৪৬ পিএম
স্বয়ম্ভূনাথ মন্দির

(লক্ষ্মণরেখার বাইরে-১৭)

শান্তা মারিয়া: সকালে আর সন্ধ্যায় তার ভিন্ন রূপ। তবে দুই রূপই হৃদয় হরণ করার জন্য যথেষ্ট। বলছি স্বয়ম্ভূ স্তূপের কথা। কাঠমান্ডুর সবচেয়ে বিখ্যাত দুই স্থাপনা। পশুপতিনাথের মন্দির ও স্বয়ম্ভূ স্তূপ। একই শহরে শিব ও বুদ্ধের সহাবস্থান। দুটিতেই পর্যটকদের ভিড়। স্বয়ম্ভূনাথ স্তূপ না দেখলে নেপাল যাওয়ার কোনো মানে হয় না।

২০০৮ সালে স্বয়ম্ভূনাথে গিয়েছিলাম ভোরবেলা। সকাল সাড়ে ছয়টায়। কারণ ওইদিনই দুপুরের ফ্লাইটে ঢাকা ফিরতে হবে আমাদের। আর ২০১৬ সালে স্বয়ম্ভূনাথ গিয়েছি সন্ধ্যায়। যখন সব পাখি ঘরে ফেরে। সকালে কুয়াশা ঘেরা মন্দিরের রূপ, ভোরের আলো, প্রভাতের স্নিগ্ধতা মনের ভেতর অনির্বচনীয় আনন্দের সৃষ্টি করে। প্রশান্তিতে ভরে যায় মন। আর সন্ধ্যায় দূর থেকে দেখা যায় কাঠমান্ডু উপত্যকায় জ্বলে উঠছে একটার পর একটা আলো। স্তূপে জ্বলে সন্ধ্যাদীপ।

 

ভূমিকম্পের পর স্বয়ম্ভূনাথের একাংশ


স্বয়ম্ভূ স্তূপ মূল শহর থেকে কিছুটা দূরে অবস্থিত। কাঠমান্ডু থেকে দুই কিলোমিটার পশ্চিমে বিষ্ণুমতী নদীর তীরে এর অবস্থান। একদিকে কাঠমান্ডু উপত্যকা অন্যদিকে হিমালয়ের বিভিন্ন শৃংগ দেখা যায়। মূল শহর থেকে গাড়িতে আধঘণ্টার মতো সময় লাগে।

তিন হাজার বছরের প্রাচীন এই বৌদ্ধস্তূপের দৃষ্টিনন্দন স্থাপত্য, প্রত্নতাত্ত্বিক মূল্য ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আাকর্ষণে দেশবিদেশ থেকে অসংখ্য পর্যটক এখানে আসেন। পাহাড়ের ধাপে ধাপে উঠে গেছে সিঁড়ি। স্তূপে পৌঁছানোর দুটি পথ। পুরনো পথটি দিয়ে যেতে হয় পায়ে হেঁটে। এই পথ দিয়ে প্রবেশদ্বার থেকে ৩৬৫ ধাপ সিঁড়ি ভেঙে মূল স্তূপে পৌঁছাতে হয়। নতুন প্রবেশ পথ দিয়ে গাড়িতে মূল স্তূপ চত্বরের কাছাকাছি যাওয়া যায়। এই পথটিও খুব সুন্দর। পাহাড়ের চারপাশ দিয়ে ঘুরে ঘুরে উপরে উঠে গেছে। তীর্থযাত্রীরা পাহাড়ের নিচ থেকেই সিঁড়ি ভেঙে ওঠেন। তবে পর্যটকরা পাহাড়ের মাঝামাঝিতে মূল অংশ পর্যন্ত গাড়ি দিয়ে আসেন। আমিও গাড়ি দিয়েই গিয়েছিলাম। প্রথমবার ছিলাম মাত্র তিনজন। আমি, মাহমুদ সেলিম ভাই ও শাহীন ভাই।

 

মন্দিরে বানরের দেখা মেলে


দ্বিতীয়বার বেশ বড় দল। নেটজ বাংলাদেশের হাবীব মুনির ও শহীদুল ভাই সুবর্ণা, হেকস-এর অনীক আসাদ ভাই এবং অন্য কয়েকটি সংগঠনের ইউকে মং মারমা, মৌসুমী আপা, পল্লীশ্রীর শামসুন নাহার আপাসহ অনেকেই। এই স্তূপ থেকে পুরো কাঠমান্ডু উপত্যকার অসাধারণ সুন্দর দৃশ্য দেখা যায়। অনেক ধাপ সিঁড়ি ভেঙে উঠতে হয় মূল স্থাপনায়। স্বয়ম্ভূনাথ স্তূপের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে অনেক পৌরাণিক কাহিনি। বলা হয়ে থাকে পুরো স্থানটি একসময় ছিল বিশাল হ্রদ। বোধিস্বত্ব মঞ্জুশ্রী এখানে আসার পর হ্রদের পানিতে একটি বিশাল পদ্মফুল ফোটে। পদ্মফূলটি হয়ে ওঠে স্তূপ, মৃণাল হয় পাহাড় আর লেকের পানি অন্যদিকে প্রবাহিত হয়ে চলে যায়। সৃষ্টি হয় কাঠমান্ডু উপত্যকা। নিজে থেকে মানে স্বয়ং আবির্ভূত হয়েছেন বলে এর নাম স্বয়ম্ভূনাথ। পুরাণ অনুযায়ী পুরো স্তূপটি একসময় স্ফটিকের তৈরি ছিল।  এখনও এই স্তূপ আর মন্দিরের কারুকার্য দেখে অবাক হতে  হয়। মূলত বজ্রযানপন্থী বৌদ্ধদের কাছে পরম পবিত্র তীর্থ হলেও অন্যপন্থী বৌদ্ধদের কাছেও এটি অনেক গুরুত্ব বহন করে। প্রতিদিন শত শত বৌদ্ধ পূণ্যার্থী সিঁড়ি ভেঙে পাহাড়ের পূবদিক থেকে স্তূপ প্রদক্ষিণ শুরু করেন।


সবচেয়ে উঁচুতে অবস্থিত স্তূপের সবচেয়ে সুন্দর ও গুরুত্বপূর্ণ অংশ একটি বিশাল স্থাপনা। মূল স্তূপে রয়েছে একটি গম্বুজাকৃতির কাঠামো। এর উপরে ঘনক আকৃতির আরেকটি কাঠামো। এই ঘনকের সবদিকেই আঁকা রয়েছে বিশাল চোখ। এই চোখ সিদ্ধার্থ গৌতম বুদ্ধের। এই চোখ যেন করুণায় সিক্ত। যেন এই চোখের মাধ্যমে মহামানব সিদ্ধার্থ করুণা ও আশীর্বাদ বর্ষণ করছেন মানবের প্রতি। মূল স্তূপে আরও রয়েছে পাঁচ কোণাকৃতির একটা তোরণ। এই তোরণে রয়েছে ১৩টি স্তর। কারণ বুদ্ধত্ব অর্জন করতে হলে ১৩টি ধাপ অতিক্রম করতে হয়। আর চারদিকে পঞ্চবুদ্ধের ছবি খোদাই করা আছে। এই পঞ্চবুদ্ধ তন্ত্রযানের প্রতীক। এই পঞ্চবুদ্ধের নাম হলো বৈরোচন, অক্ষভয়, রত্নসম্ভব, অমিতাভ এবং অমোঘসিদ্ধি।

 

পশুপতিনাথ মন্দিরের বাইরে ভক্তবৃন্দ


পঞ্চম শতাব্দিতে রাজা ব্রজদেব এই বৌদ্ধস্তূপের মূল অংশ তৈরি করেন। এই রাজা ব্রজদেব ছিলেন রাজা মাবের পূর্বপুরুষ। আবার অনেকে বলেন সম্রাট অশোক খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতাব্দিতে এখানে এসেছিলেন। তখন তিনি একটি উপাসনালয় নির্মাণ করেন। সেটি পরে ধ্বংস হয়ে যায়। সেই উপসনালয়ের জায়গাতেই স্তূপ গড়ে ওঠে। এখানে নাকি একসময় লিচ্ছবিদের গণরাজ্যের জনপদ ছিল। সেটি গৌতম বুদ্ধের সময়কার বা তারও আগে। শুধু বৌদ্ধ রাজাদের কাছেই যে এ স্থান পরম পবিত্র ছিল তাই নয়, হিন্দু রাজারাও স্বয়ম্ভূ স্তূপে শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন। সপ্তদশ শতকে রাজা প্রতাপ মল্ল এই স্তূপে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। তখন তিনি এই স্তূপের অনেক সংস্কারও করেন। ১৫শ’বছর ধরে স্বয়ম্ভূ স্তূপ এলাকায় ১৫ বার সংস্কার কাজ হয়েছে। ২০১৬ সালে গিয়ে দেখলাম ভূমিকম্পের ফলে বেশ ক্ষতি হয়েছে জায়গাটির। সেগুলোর সংস্কার কাজও দ্রুত চলছে।

স্বয়ম্ভূ চত্বরে রয়েছে আরও অনেক দৃষ্টিনন্দন স্থাপনা। বৌদ্ধ ধর্মের পুরাণকাহিনি অনুসারে এসব স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে। এগুলোর পুরাতাত্বিক ও নন্দনতাত্বিক মূল্য অসাধারণ। বিভিন্ন স্থাপনার সামনে ভক্তরা নিবেদন করছেন ধূপকাঠি। বড় বড় জপযন্ত্র বা প্রেয়ার হুইল রয়েছে পুরো স্তূপে। এগুলোর উপরে খোদাই করা রয়েছে মহামন্ত্র ওম মণি পদ্মে হুম। তীর্থযাত্রীরা ও ভক্তরা সেই প্রেয়ার হুইল ঘুরাচ্ছেন। প্রেয়ার হুইল ঘুরলেও সৃষ্টি হয় এক ধরনের গুঞ্জনধ্বনি। বৌদ্ধ ভক্তদের হাতেও রয়েছে ছোট ছোট কাঠের বা মেটালের তৈরি জপযন্ত্র। তারা জপযন্ত্র ঘুরাচ্ছেন আর আবৃত্তি করছেন তাদের মহামন্ত্র ওম মণি পদ্মে হুম। মনে হচ্ছে পুরো উপত্যকা থেকেই যেন প্রার্থনার একটি সুর ভেসে বেড়াচ্ছে। এখানে তিব্বতি উপাসনালয়, আর একটি মন্দির রয়েছে। আরও আছে অসংখ্য গাছ। মন্দিরটির নাম ‘মাংকি টেম্পল’।

 

লেখিকার (ডান থেকে দ্বিতীয়) ভ্রমণসঙ্গী


স্তূপ এলাকায় প্রচুর বানর রয়েছে। আমি পুরান ঢাকায় একসময় বানরের উৎপাত কম দেখিনি। এখানেও বানর দেখে একটু ভয় লাগে ঠিকই। বলা তো যায় না যদি কামড়ে দেয়। বৌদ্ধ ও হিন্দুদের অবশ্য বিশ্বাস বানরগুলো পবিত্র। তীর্থযাত্রী ও পর্যটকরা ওদের অনেক খাবার দেয়। সকালবেলায় একটি বানর আমার দিকে তাড়া করে এসেছিল। পরে একজন ইউরোপীয় পর্যটক আমার সাহায্যে এগিয়ে আসেন। বানরটি অবশ্য কামড় দেয়নি। তারপরও বেশ ভয় পেয়েছিলাম বৈকি। বানর মন্দির ছাড়াও এখানে রয়েছে একটি বিশাল বজ্র এবং স্তূপ চত্বরে প্রবেশের মুখেই রয়েছে বিশাল সিংহমূর্তি। পর্যটকদের জন্য একটি জাদুঘর, গ্রন্থাগার ও খাবার জায়গা রয়েছে। আর সুভ্যেনির বিক্রির জন্য কয়েকটা দোকান ও হকার তো রয়েছেই। স্বয়ম্ভূ স্তূপ ইউনেসকো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থাপনার তালিকায় রয়েছে। একে নেপালের ঐক্যের প্রতীকও বলা হয়।

২০০৮ সালের এক ভোরবেলা স্বয়ম্ভূ স্তূপে ভ্রমণ আমার মনের উপর বিশাল প্রভাব বিস্তার করেছিল। সেদিন দুপুরের ফ্লাইটে ঢাকায় ফেরার পথেই লিখেছিলাম কবিতা ‘ওম মণি পদ্মে হুম’। পরের বার স্বয়ম্ভূ স্তূপ থেকে ফেরার পথে সেই কবিতাটি আমার সহযাত্রীদের শোনালাম। তখন কাঠমান্ডু উপত্যকাজুড়ে নেমে আসছে সন্ধ্যার প্রাচীন কুয়াশা।   

 

 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/২৯ মে ২০১৭/তারা

Walton
 
   
Marcel