ঢাকা, শুক্রবার, ১ পৌষ ১৪২৪, ১৫ ডিসেম্বর ২০১৭
Risingbd
সর্বশেষ:

পনেরশ’ মাইলের চরিত্রগুলি

ফেরদৌস জামান : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৭-০৬-০২ ৯:৫১:৪৬ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৭-০৬-০২ ১০:১৩:১৩ পিএম

(চর থেকে চিরসবুজের ডাকে : ৭ম কিস্তি)
ফেরদৌস জামান : সাজেক রাঙ্গামাটি জেলার বাঘাইছড়ি উপজেলার একটি ইউনিয়ন। তাপমাত্রা কমে একটু শীত শীত অনুভূত হচ্ছে। লুসাই, বম এবং ত্রিপুরা নৃতাত্ত্বিক জাতি-গোষ্ঠীর বসবাস এখানে। সাজেকের উচ্চতা নিয়ে রয়েছে মতভেদ, কেউ বলে আঠারশ ফুট তো কেউ বলে একুশ ফুট।

ইদানিং নতুন আর একটি বিতর্কের অবতারণা হয়েছে-  সাজেক আসলেই উপত্যকা কি না? প্রতিক্রিয়ায় একেকজন একেক ধরনের মন্তব্য করছেন কিন্তু তার্কিকরা এখনও প্রকৃত সমাধান পেয়েছেন বলে মনে হয় না। একাধিক পাড়া নিয়ে নিজ বৈচিত্র্য আর সৌন্দর্যে নয়নাভিরাম সাজেক। লুসাইদের সম্বন্ধে জানতে অনেক আগ্রহ বোধ করলাম। সে জন্য তাদের সাথে থাকতে পারলে অন্তত কিছু ধারণা মিলতো। ভাবনা যা কাজ তাই, আট জনে পরামর্শ করে আজ রাতে কোনো লুসাই পরিবারের আতিথিয়েতার স্বাদ নিতে বেশ খানিকক্ষণ প্রচেষ্টা চালানো হল। পাহাড়িরা এক কথার মানুষ, মুখ দিয়ে যা বলে তা বেদবাক্য সম। দরদামে পর্তা না পরায় যৎকালে তৎবিবেচনা নীতিতে প্রত্যাবর্তণ করতে হল। প্রতিটি বাড়িতে দু’একটি করে অতিরিক্ত ঘর রয়েছে, পর্যটকদের থাকার জন্য। কেউ কেউ তুলনামূলক উন্নত কটেজ বানিয়ে রেখেছে, অভিযাত্রা সুলভ ভ্রমণ পরিকল্পনায় যা একেবারেই বেমানান। করার বোধহয় আর কিছু থাকল না কারণ সাজেক এখন রীতিমতন একটি পর্যটন কেন্দ্র। এমনও একাধিক দলের সাক্ষাৎ মিলল, যারা মধুচন্দ্রিমা উদযাপনে এসেছে। রয়েছে খাবারের দোকান, যাকে আমরা হোটেল বলে থাকি। এ ছাড়া রয়েছে ক্যান্টিন-ক্যাফেটেরিয়া-হালফ্যাশনের শহুরে পর্যটকরা বাদ্যযন্ত্র, গিটার সহযোগে সন্ধ্যার পর জমিয়ে তোলে সংগীতে আসর, সাথে চলে চা-কফি। দৃষ্টিনন্দন দামি হোটেলও রয়েছে। রয়েছে সেনাবাহিনীর উদ্যোগে ও তত্বাবধানে একটি বহুতল ভবন, ভ্রমণ বরাদ্দ অর্থাৎ বাজেটের স্বাস্থ্যটা যদি বেশি হয়ে থাকে তাহলে মিলে যায় আয়েশি থাকা-খাওয়ার সুবন্দোবস্ত।

 



শেষমেষ আমাদের থাকার ব্যবস্থা হল এক ত্রিপুরা পরিবারের সাথে। ইসমাইল আর দলের সদস্য নাঈমকে এর জন্য ধন্যবাদ না দিলেই নয়, সবই তাদের কৃতিত্ব। বাড়ির পেছনের অংশে পাহাড়ের খাদের ওপর ছড়ানো মাচা, বসলে প্রাণটা যেমন জুড়িয়ে যায় আবার পরেক্ষণে কষ্টে বুকের মধ্যে হু হু করে ওঠে। চোখের সামনে মিজোরামের পর্বতশ্রেণি, কি অপরূপ সাজে বহু ছড়িয়ে দিয়ে রয়েছে। চাইলেও পা বাড়িয়ে অভিযাত্রী সুলভ এক জোড়া চোখকে মুগ্ধ করতে ওখানে নেওয়া যায় না! ইতিহাসে দৃষ্টি ফেরালে দেখা যায় এক নেহরুর জন্ম না হলে আজ ভারতবর্ষের ইতিহাস এমন করে লিখতে হত না। ওদিকে ভারতবর্ষকে যে চোখেই দেখল না ব্রিটিশ সরকার সেই রেডক্লিফকে সুদূর বিলেত থেকে ডেকে এনে নিয়োগ করল ভারত বিভাজনের জন্য গঠিত বাউন্ডারি কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে। প্রিয় মাতৃভূমির বুকের ওপর দিয়ে একটি সড়ল রেখা টেনে দিয়ে বলা হল, এই নে এটা তোর ধর্ম আর ওটা তার ধর্ম। কাবাব-শারাব খাওয়া অবাঙালি পাকিস্তানি নেতৃত্বের চরম অবহেলাও কি আজ আমাদের এই বুক চাপড়ানো কান্নার জন্য দায়ী নয়? আর অবাস্তব দিবাস্বপ্নে বিভোর মাথামোটা বাঙালি নেতৃত্বের কথা তো বলাই বাহুল্য।

সন্ধ্যার আগ দিয়ে সকলে মিলে উপত্যকার ঝকঝকে তকতকে পথটা ধরে হাঁটতে থাকলাম মনের সুখে। প্রসস্ত রাস্তা, দুই পাশে রঙিন ইটের ফুটপাথ, কিছু দূর পরপর বসার জায়গা; কি চমৎকার সাজেকের আয়োজন! প্রথমটি পেরিয়ে দ্বিতীয় হেলিপ্যাডটি বসার জন্য উপযুক্ত একটি জায়গা। কিন্তু সম্মুখে ঐ অভিশাপের রেখা। পরিহাস করে বলতে ইচ্ছা করে ওই মাথামোটা বাঙালি নেতৃত্ব যদি টের পেত তাদের পরবর্তী প্রজন্ম পাইকারি হারে অভিযাত্রী হয়ে উঠবে তাহলে নিশ্চই ভারতবর্ষ ভাগাভাড়ির প্রশ্নে শক্ত একটা অবস্থান নিয়ে বসতো।

রাতের আঁধার ঢেকে নিল চারপাশটা। বইতে শুরু করল শীতল বাতাস। ভরাট চাঁদটিও উঠে এলো মাথার ওপর। জ্বলজ্বলে চাঁদ মেঘ আর কুয়াশার আড়ালে এই হারিয়ে যায় তো এই হেসে ওঠে। হেলিপ্যাডের নিরবতায় আবারও সুর বেসুরে বেজে উঠল, গাঁজার নৌকা পাহাড়তলি যায়, ও মিরাবাই.......।

 



গল্প আর গানে গানে কেটে গেল কয়েক ঘণ্টা। জড়তার জাল ছিড়ে নিজেদের মধ্যে সম্পর্কটাও পৌঁছে গেল অনেক দূর। তবে হবু-পুরোকৌশলী তুরিণের সংগীত পিপাশু হৃদয় যেন শেষ পর্যন্ত অপূর্ণই থেকে গেল, আসর ছেড়ে উঠতে গিয়েও আর খানিকটা বসতে চায়। ঘরে ফিরে দেখি খাবার রান্না হয়ে গেছে, চলছে অপেক্ষা। আর সব খাবারের মধ্যে স্থানীয়  বিশেষ শাক ভাজি খেয়ে সকলেই মুগ্ধ। মুরগীর মাংশে সকলেই চালিয়ে নিল কিন্তু বগুড়ার ছেলে নাঈম পাহাড়িদের ঝালে নিজেকে কিছুতেই মানিয়ে নিতে পারল না। বেচারি, শেষে সাদা ভাত খেয়েই উঠে পড়ল। খাবার শেষে আবারও সুজিতকে সাথে নিয়ে বেরিয়ে পরলাম, পথটা ধরে আর একটু হাঁটব বলে। রাস্তার পাশে বসার জায়গাটা পেয়ে আরাম করে বসে আছি অমনি সামনে এসে মোটরসাইকেল থামিয়ে দাঁড়াল এক উদভ্রান্তের মত যুবক। গায়ে পরে গল্প করতে চায়। ঘরে তৈরি পানিয় চু পান করা প্রায় প্রতিটি পাহাড়ি নৃতাত্ত্বিক জাতী-গোষ্ঠীর সংস্কৃতি কিন্তু সাজেকে সেনা বাহিনী কর্তৃক তা নিষিদ্ধ। যুবকটির শরীর থেকে ভুরভুর করে পানিয়ের গন্ধ ভেসে আসছে। প্রথমে কথা বলতে বিরক্ত বোধ করলেও খানিক পর ভালোই লাগল। পনের থেকে বিশ মিনিটের আলাপচারিতায় জানা গেল, সে সাজেকে বেড়াতে এসেছে। বাড়ি এখানে হলেও সেই ছোটবেলা থেকেই ঐ মিজোরামের এমনই কোনো এক পাহাড়ে থাকে।

ঘরে ফিরে দেখি ছয় বন্ধুতে মিলে মজার মজার গল্পে মাতিয়ে তুলেছে। পাশের ঘরটায় আমাদের দুজনের থাকার ব্যাবস্থা। ওপারেই পায়খানা ঘর। মাঝে মাত্র একটি চেগারের দেয়াল। পরিপাটি হলেও যেকোনো  ধরনের শব্দ ধরে রাখতে চেগার দেয়ালটি একেবারেই অনুপযোগী। ঘুমিয়ে পরা দরকার পরের দিন আরোহণে যাব সাজেকের সর্বোচ্চ পাহাড়চূড়া কমলক এবং সম্ভব হলে নিচের ঝরনা দেখতে। রাতের ঘুম হল বটে তবে তা ভেঙে ভেঙে। বিশেষ ঘরটি বিছানার পাশে হওয়ায় কিছুক্ষণ বিরতির পরপর প্রায় সারা রাত ধরেই তার ভেতরে বাজতে থাকল ঠুস-ঠাস ধরনের শব্দ, যা পাহাড়ি মরিচে রান্না করা ঝাল তরকারির গুনাগুনের ফজিলত হয়ে থাকতে পারে। মাঝ রাতে একবার ঘুম থেকে উঠে দেখি পাশের ঘরে কেউ নেই, দরজার পাশে পায়ের জুতা-স্যান্ডেলগুলিও নেই। বাড়ির সম্মুখেই রয়েছে মাঝাড়ি একটি বট গাছ, তার গোড়ালি পূজা-প্রার্থনার জন্য বাঁধাই করা। তাতে বসে মনের সুখে মাতিয়ে তুলেছে গল্পের আসর। ভোরে উঠে কমলক পাহাড়ে আরোহণের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে হেলিপ্যাডের পর সেনা ক্যাম্প ঠিক তার পর থেকেই শুরু হয়েছে কমলকের ট্রেইল। এক থেকে সোয়া ঘণ্টায় গিয়ে সকলেই আরোহণ করি সর্বোচ্চ পাহাড়ে। মাঝে চায়ের দোকানটিতে ছোট্ট একটি বিরতি। উপর থেকে চারদিকটা আরো বিস্তৃত। সাজেক উপত্যকা যেন একটুরো বসতি মাত্র। পাখির দৃষ্টিতে সাজেক দেখার এ এক চমৎকার জায়গা। চূড়ার ওপর মাত্র দুই তিনটি বাড়ি। বাড়ির সামনে বসেছে ফলের দোকান। পাকা কলা, পেঁপে আর জাম্বুরা। পরিশ্রম যথেষ্ট হয়েছে, শুতরাং এবার সকলেরই কলা খাওয়া উচিৎ। ফেরার পথে আবারও চায়ের দোকানে সংক্ষিপ্ত বিরতি। পথে দেখা হয় সত্তুর জন বিজিবি জওয়ানের একটি দলের সাথে। লাইন ধরে এগিয়ে চলছে দূর সীমান্তের ক্যাম্পে। টানা চার দিনের পথ, মাত্র প্রথম দিন শুরু। তাদের মাঝ থেকে একজন জানায় অল্প দিনের মধ্যে রাস্তার কাজ শুরু হবে। এগিয়ে নেওয়া হবে তাদের পায়ে হাটা অর্ধেক অর্থাৎ দুই দিনের পথ যত দূর পর্যন্ত। তখন নাকি পর্যটকরা আরো বেশি সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারবে।

 



ফেরার সময় হল, এ যাত্রায় ঝরনা আর দেখা হল না। গাড়ি চালক ইসমাইল নিজ থেকেই গাড়ি থামিয়ে দিল-হাজারাছড়া ঝরনা দর্শনের জন্য। দশ নম্বর ঝরনা বলে পরিচিত হাজারাছড়ায় এখন প্রচুর মানুষের যাতায়াত। দৃষ্টিনন্দন ঝরনাটি দেখতে ছয় বন্ধুর বেজায় আগ্রহ হল এবং বায়না ধরে বসল, সাথে আমাদেরকেও যেতে হবে। প্রায় ষাট ফুট উঁচু থেকে ঝরে পরা ঝরনার জল আর তারুণ্যের উচ্ছ্বাস  একাকার হয়ে গেল। দিঘীনালায় ফিরে বিচ্ছেদের পর্ব। আমরা দুইজন এক পথের তারা ছয় জন অন্য পথের পথিক। খানিকটা আবেগঘন বিদায় হল অদূর ভবিষ্যতের জন্য এক স্বপ্ন রচনার মধ্য দিয়ে- আবারও একসাথে ভ্রমণ করব!



রাইজিংবিডি/ঢাকা/২ জুন ২০১৭/সাইফ

Walton
 
   
Marcel