ঢাকা, রবিবার, ২ পৌষ ১৪২৫, ১৬ ডিসেম্বর ২০১৮
Risingbd
সর্বশেষ:

মোনালিসার চোখ: ২য় পর্ব

শিহাব শাহরিয়ার : রাইজিংবিডি ডট কম
 
     
প্রকাশ: ২০১৭-১০-২৩ ১২:৩৭:১৭ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৭-১০-২৩ ২:১১:১৫ পিএম

শিহাব শাহরিয়ার: পরদিন আমরা বেরিয়ে পড়লাম প্যারিসের দর্শনীয় স্থান ঘুরে দেখার জন্য। প্রথমেই গেলাম প্যারিসের যে মাঠে ২০১৪ সালের বিশ্বকাপ ফুটবল ফাইনাল হয়েছিল, সেটি দেখতে; ভিতরে গিয়ে তো আর দেখার সুযোগ নেই, বাইরে থেকে যতটুকু দেখা যায়। উন্নত দেশের স্টেডিয়ামের আশেপাশে বা প্রবেশ পথ বা অন্যান্য অবকাঠামো যা হওয়া দরকার, তার কোনো কমতি নেই। স্টেডিয়ামের যে পাশটায় আমরা ঘুরলাম, সেখানে বৃক্ষশোভিত একটি চমৎকার লেক রয়েছে। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। তখন বিকেলের দারুণ রোদ ফুটে আছে প্রকৃতিতে। আসলে এই দেখা দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানোর মতো। যাক, সেখান থেকে বেরিয়ে গেলাম ট্রাকোডা, শাতলি, গার দ্যু নর্দ, সেইন্ট মিশেল, সেইন্ট লাজা, শনজোলজি, লা দিফোন্স, অপেরা, পমপিডো ও প্যারিস গেট দেখতে। এর কয়েকটি স্থান ঝটিকা ভঙ্গিতে দেখে সন্ধ্যায় গেলাম সান নদীর পাড়ে।

প্যারিসকে আষ্ঠেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে সিন নদী। সেই নদীর উপর বিভিন্ন স্থানে আছে শৈল্পিক ৩৭টি ব্রিজ। পায়ে হাঁটার জন্যে নির্ধারিত সুন্দর ছিমছাম এই ব্রিজের রেলিংয়ের বেশ কয়েকটিতে চোখে পড়বে ‘লাভ প্যাডলক’ নামে এক বিশেষ ধরনের তালা। এই তালাগুলো প্রেমিক অথবা প্রেমিকা যেকোনো কেউ আরেকজনের নাম বা নামের প্রথম অক্ষর খচিত করে এই ব্রিজগুলোর রেলিংয়ে বেঁধে রাখেন এবং এর চাবি ফেলে দেন সিন নদীতে। প্রেমিক প্রেমিকার ভালোবাসা প্রকাশের অনন্য এই রীতি প্যারিসকে খ্যাতি দিয়েছে ভালোবাসার শহরে। প্রেমিক প্রেমিকার ভালোবাসা প্রকাশের অনন্য এই রীতি-চিহ্ন স্বচক্ষে দেখে এক অন্য রকম অনুভূতি হলো। নদীর পাড়ে দাঁড়িয়েই দেখলাম বড় বড় নৌকা, জাহাজে করে ভ্রমণপিয়াসীরা সন্ধ্যার আলো-আঁধারিতে ঘুরে বেড়াচ্ছে, খাচ্ছে-দাচ্ছে, গান-বাজনা করছে। লন্ডনের টেমস নদীর মতো মূলত এই সান নদীকে ঘিরেই নানা বয়েসি পর্যটকরা ঘুরে বেড়ান। এই ব্রিজের পাড়েই দেখা হলো কয়েকজন বাঙালির সঙ্গে। আলাপ হলো। আলাপ শেষে বেশ আগ্রহ করে আমাদের নিয়ে গেলেন একটি রেস্টুরেন্টে। অফার দিলেন হার্ড ড্রিংকসের। আমি খাই না দেখে আমাকে দেয়া হলো জুস। ভালোই লাগল তাদের আপ্যায়ণ। রাত হয়ে গেছে, ঐ দিনের দেখা শেষ হলো।
 


পরদিন। কী দেখতে যাবো? আইফেল টাওয়ার, নোত্র্ দাম গির্জা, শঁজেলিজে সড়ক, আর্ক দ্য ত্রিয়োম্ফ, বাজিলিক দ্যু সক্রে ক্যর, লেজাভালিদ্, পন্তেওঁ, গ্রঁদ আর্শ, পালে গার্নিয়ে, ল্যুভ জাদুঘর, ম্যুজে দর্সে, ম্যুজে নাসিওনাল দার মোদের্ন, প্রেসিডেন্টের বাসভবন, এলিজি প্যালেস, এনভারস এ মোমার্থ, নোপোলিয়নস্ টোম, পার্লামেন্ট হাউস, কনকর্ড টাওয়ার, গিমে মিউজিয়াম? আর ল্যুভ মিউজিয়াম ও আইফেল টাওয়ার না দেখে কি প্যারিস ভ্রমণের কোনো তৃপ্তি আছে? যাক বেরিয়ে পরলাম। রৌদ্রজ্জ্বল সকাল। আমরা প্যারিসের পথে পথে হাঁটছি। ভাবতেই ভাল লাগছে। বলতেই হবে যে, দুই হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী প্যারিস শহর এখনও অপূর্ব সুন্দর। এটি পৃথিবীর কোনো শহরের সাথে তুলনা না করেই বলতে হবে, এতো ব্যস্ততম শহর অথচ পরিষ্কার ও পরিচ্ছন্ন যেন শিল্পীর আঁকায় উদ্ভাসিত। শহরে এতো লোক কিন্তু লোকজট নেই, কারণ অধিকাংশ মানুষ পাতাল রেলে চলাচল করে। দশ লক্ষ মানুষের এই নান্দনিক শহরে প্রতি বছর প্রায় তিন কোটি পর্যটক আসে, দেখে আর আনন্দ-স্মৃতি নিয়ে ফিরে যায়। ওখানে গিয়ে জানলাম, ফ্রান্সের লোকেরা ফুল খুব ভালোবাসে। তারা জন্মদিন, বিয়ে ও মৃত্যুতেও ফুলের উপহার দিয়ে সম্মান জানায়। দেখলাম ফুলের নানা সমারোহ। প্যারিস রেস্টুরেন্ট, ক্যাফে, ফ্যাশান, পারফিউম আর মিউজিয়ামের শহর। যারা আসবেন প্যারিসে, দেখবেন সারা শহরে রাস্তার পাশে হোটেল, রেস্টুরেন্ট, বার ও নাইট ক্লাবে ঠাসা। ওরা বিশেষ করে সাপ্তাহিক বন্ধের দিন শনিবার ও রবিবার সারা রাত পার্টি দেয়, খাওয়া-দাওয়া করে, আনন্দ করে। আমরা একটা বাঙালি রেস্টুরেন্টে ঢুকলাম নাস্তা খাওয়ার জন্যে। দেখলাম সেখানে সিঙ্গারা, রুটি-পরোটা, ভাত, খিচুড়ি সবই আছে। আমরা আনন্দে খেলাম বাঙালি নাস্তা। তারপর ছুটলাম দর্শনীয় স্থান দেখার জন্য। মনে পড়ল, কবি সুনীল গাঙ্গুলির কথা, এই প্যারিস, এই ফ্রান্স সম্পর্কে, এই দেশের শিল্প-সাহিত্য সম্পর্কে কি অসাধারণ বয়ান করেছেন। আমার পক্ষে তাঁর মতো সময় নিয়ে নিবিড়ভাবে দেখা ও লেখা সম্ভব নয়! আমি তো মাত্র তিন দিনের অতিথি। যাক আজ দ্বিতীয় দিন, দোলন ও তারা আমাদের ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখাচ্ছে প্যারিস শহরের দর্শনীয় স্থানগুলো, কৃতজ্ঞতা জানাই এই দুই বাঙালি তরুণকে।

সূর্যের আলোভরা দিন আজ। ভালই লাগছে। হাঁটতে হাঁটতে আমরা এবার চললাম আইফেল টাওয়ার দিকে। আপনারা সবাই জানেন, ফরাসি লা তু ইফেল যা বাংলায় আইফেল টাওয়ার নামে ফ্রান্সের সর্বাধিক পরিচিত প্রতীক। এটি ৩২০ মিটার অর্থাৎ ১০৫০ ফুট উচ্চতার একটি লোহার শৈল্পিক কাঠামো। আইফেল টাওয়ার ১৮৮৯ সাল থেকে পরবর্তী চল্লিশ বছর পৃথিবীর সর্বোচ্চ টাওয়ার হিসেবে খ্যাত ছিল। ১৯৩০ সালে যুক্তরাষ্ট্রে Chrysler Building নির্মাণ হবার পর মানুষ নির্মিত এই টাওয়ারের খ্যাতি হ্রাস পায়। এটি নির্মাণ করেন গুস্তাভ আইফেল। তিনশ শ্রমিকের মাধ্যমে ১৮,০৩৮ খণ্ড লোহার ছোট-বড় বিভিন্ন আকৃতির কাঠামো জোড়া দিয়ে এই দীর্ঘ টাওয়ার তৈরি করা হয়। দুপুর গড়িয়ে যাবার প্রাক্কালে স্বপ্নের এই টাওয়ারের কাছে এসে পৌঁছুলাম। টাওয়ারটির প্রবেশ পথ সমতল থেকে নিচে। সাবওয়ে থেকে নেমেই তাকালাম টাওয়ারের দিকে। আমাদের মতো পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের অসংখ্য মানুষ এই টাওয়ার ঘিরে রয়েছে। আমরা টাওয়ারে ওঠার জন্য নিচের দিকে গেলাম। টিকিট কেটে উঠতে হবে, বিশাল লাইন। সিকিউরিটি শেষ করে লাইনে গিয়ে দাঁড়ালাম। ভ্যাপসা গরম আর দীর্ঘ লাইন, কিছুটা খারাপ লাগছিল। অবশেষে টিকিট কাটতে পারলাম এবং লিফট পেলাম। তখন সন্ধ্যা হয়ে গেছে। লিফট উঠতে থাকল। আমার উপরে উঠতে ভীষণ ভয়। এখানে কম ভয় পাচ্ছি, কারণ আগের বছর মালয়েশিয়াতে গিয়ে কুয়ালালামপুর টাওয়ারে উঠে ভয় অনেকটা দূর হয়েছে। ধীরে ধীরে দুই স্তরে সর্বোচ্চ চূড়ায় উঠলাম। তখন রাতের প্যারিস কৃত্রিম আলোয় ফুঠে উঠেছে। উপর থেকে সান নদীর দুই পাড়ের রাতের প্যারিসকে দেখে দারুণ লাগছে। কিছুটা বিমান থেকে দেখার মতই। ঘণ্টা খানেক সময় উপরে দাঁড়িয়ে, ঘুরে ঘুরে প্যারিসের সৌন্দর্য পান করে নেমে এলাম ভূমিতে। তারপর টাওয়ারকে বিদায় জানালাম।
 


আমার বহুদিনের কাঙ্ক্ষিত স্বপ্ন ল্যুভ মিউজিয়াম দেখা, সেই উদ্দেশ্যে বের হলাম, পরের দিন। বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের একজন কর্মী হিসেবেই তো বটেই, পাশাপাশি পৃথিবীর যে কোনো দেশেই গেলে সেই দেশের জাদুঘর দেখা আমার পরিকল্পনার মধ্যে থাকে। আর ল্যুভ মিউজিয়াম? সেটি দেখার ইচ্ছা, সেটি তো স্বপ্ন দেখার মতো। বলা যেতে পারে এই ল্যুভ মিউজিয়াম দেখার জন্যই আমার প্যারিস আসা। মনে মনে পুলকিত হচ্ছিলাম যে, আর অল্পক্ষণের মধ্যেই প্রবেশ করবো স্বপ্নের ল্যুভ মিউজিয়ামে? আমাদের গাইড তারা ও দোলন জানাল, পুরো প্যারিস শহরে আছে মোট ১৭৩টি মিউজিয়াম। বিশ্বজুড়ে এই শহরের খ্যাতিও আছে মিউজিয়ামের শহর হিসেবে। এর মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত ও বড় মিউজিয়ামটি ল্যুভ। যেখানে সংরক্ষিত আছে লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির অমর কীর্তি ‘মোনালিসা’। শুধু কি মোনালিসা? আরো আছে বিশ্বখ্যাত সব চিত্রকর আর কলাকুশলীদের অমর ৩,৮০,০০০টি কীর্তি। এই অমর কীর্তির টানেই বোধহয় সারা পৃথিবী থেকে প্রতি বছর ৯ মিলিয়নের অধিক সৌন্দর্যপিপাসু ছুটে আসেন। ল্যুভের প্রতিটি শিল্পকর্মে দেখতে যদি আপনি ৫ সেকেন্ড ব্যয় করেন, তবে পুরো মিউজিয়ামের সবকিছু দেখতে লেগে যাবে ১০০ দিনের বেশি। প্যারিসজুড়ে ১৭২টি মিউজিয়াম বাকি থেকেই যাবে! তাহলে? মাত্র অর্ধেক দিনে ল্যুভ দেখা? বাইরে থেকে তাকিয়েই অভিভূত হলাম ল্যুভের বহিরাঙ্গন দেখে। কি বিশাল, কি অসাধারণ স্থাপত্য। এখানে রয়েছে সারা পৃথিবীর সবচেয়ে বিস্ময়কর ও মহামূল্যবান চিত্রকলা এবং ভাস্কর্য। ল্যুভের ইতিহাসটা মোটামুটি এরকম-

সান নদীর পাড়ে ১২০০ সালে নির্মিত যে ভবনকে ঘিরে এটি প্রথমে গড়ে ওঠে তা ছিল ফরাসি সম্রাট দ্বিতীয় ফিলিপের রাজকীয় দুর্গ ও প্রাসাদ। শিল্প সংগ্রহশালা হিসেবে ল্যুভের সার্বিক নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হতে সময় লাগে মোট ২০০ বছর। ল্যুভ হচ্ছে নানা ভবনের এক বিশাল সমাহার। ১৫৪৬ সালে এর পশ্চিম দিকের ভবনের কাজ শুরু হয় সম্রাট প্রথম ফ্রান্সিসের নির্দেশে। শুরুতে এতে কেবল বিভিন্ন রাজকীয় দ্রব্যসামগ্রী প্রদর্শনের জন্য রাখা হতো। সম্প্রসারিত ভবনগুলোর কাজ শুরু হয় ১৬২৪ সালে সম্রাট ত্রয়োদশ লুইয়ের আমলে। শিল্প সংগ্রহশালা হিসেবে ল্যুভের ভবনগুলোর সামগ্রিক নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হয় সম্রাট তৃতীয় নেপোলিয়নের আমলে। ল্যুভের স্বর্ণযুগ সম্রাট প্রথম নেপোলিয়নের শাসনামল। তার নেতৃত্বে সপ্তদশ শতাব্দীজুড়ে সমগ্র ইউরোপে ফ্রান্সের প্রাধান্য বিস্তৃত হলে ল্যুভের সংগ্রহসম্ভার নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পায়। কিন্তু তার পতনের পর এসবের অনেক কিছুই বিজিত দেশগুলোকে আবার ফেরত দেওয়া হয়। ফলে ফরাসি দেশপ্রেমিক ও বিশ্বের শিল্পানুরাগী ব্যক্তিদের দানে ল্যুভ ক্রমেই সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে। ১৮৪৮ সালে ল্যুভ রাষ্ট্রের সম্পত্তিতে পরিণত হয়। বর্তমানে এতে ছয়টি প্রশাসনিক বিভাগসহ পৃথক গ্যালারিতে গ্রিক, রোমান, মিসরীয় ও প্রাচ্য দেশীয় অসংখ্য শিল্পনিদর্শন রয়েছে। এছাড়া মধ্যযুগ, রেনেসাঁস এবং আধুনিককালেরও বহু বিখ্যাত শিল্পী ও ভাস্করের শিল্প এবং ভাস্কর্যকর্ম রয়েছে। বিশ্বনন্দিত শিল্পীর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য রেম্বান্ট, রুবেন্স, লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি ও টিশিয়ানের নাম। দ্য ভিঞ্চির বিশ্ববিখ্যাত শিল্পকর্ম ‘মোনালিসা' রয়েছে এখানেই। তখন দুপুরের পূর্ব মুহূর্ত। টিকিট কেটে ঢুকলাম ল্যুভে। আমার দেখার প্রধান আকর্ষণ মোনালিসার চোখ। দিনের আলো আর কৃত্রিম আলোর সমন্বয়ে বিশাল বিল্ডিঙের এই মিউজিয়ামটির চরিত্রই আলাদা। খোলামেলা, উঁচু ছাদসহ এক একটা গ্যালারি বেশ সুন্দর। শুরুতেই চিত্রকলার সমারোহ। শিল্পের এই শহরের বিখ্যাত সব চিত্রকরদের সেরা সেরা ছবি দিয়ে গ্যালারিগুলো উপস্থাপন বা সাজানো হয়েছে। কয়েকটি গ্যালারির পরেই পেয়ে গেলাম সেই কাঙ্ক্ষিত গ্যালারি যেখানে নিস্তব্ধ দেয়ালের গায়ে ফটো ফ্রেমে নীরবে তাকিয়ে আছেন মোনালিসা।
 


আহা! এই সেই মোনালিসা, যাকে দেখার জন্য আমার মতো কোটি কোটি দর্শক কাঙ্ক্ষিত থাকেন। গ্যালারিটি ছোট কিন্তু দর্শকে ঠাসা। ওখানে গিয়ে কে আর আগে মোনালিসার কাছে যাবে, সেই নিয়ে হুলস্থুল, উত্তেজনা, ভীড়। সিকিউরিটিও ছবিটির চারপাশে ঘিরে আছে। দর্শকরা ব্যারিকেডের পাশে দাঁড়িয়ে ছবি তুলছে, সেলফি করছে, ভিডিও করছে। আমিও গেলাম কাছে, তাকিয়ে তাকিয়ে দেখলাম পৃথিবীখ্যাত মোনালিসার ছবিটি, যেটির রিপ্রডাকশন কপি ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছি, কিন্তু আজ মূল ছবিটির দেখার সৌভাগ্য হলো। বাংলাদেশের যারা আগে দেখে গেছেন, তাদের কাছে বর্ণনা শুনেছি, মনে হলো এই সরাসরি দেখা সত্যি আনন্দের। তারপর অনেকগুলো ছবি তুললাম, দোলন ফেসবুকে সরাসরি করল, আমার সাক্ষাৎকার নিলো মোনলিসার সামনে দাঁড়িয়ে, বললাম মোনালিসা, ল্যুভ ও আমাদের জাতীয় জাদুঘর নিয়ে কিছু কথা। পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের হাজার হাজার দর্শক প্রতিদিন এখানে ভীড় করে, আজও যার চিত্র দেখলাম। এরপর এক এক করে দেখতে থাকলাম চিত্রকলার গ্যালারিগুলো। কিন্তু দেখা আর শেষ হয় না। শেষ হবার নয় একদিনে, একশ দিন হলে সম্ভব। তবে ঐ দিন বন্ধের আগ পর্যন্ত যতটা গ্যালারি দেখা গেল, ততটা দেখলাম। থাকুক না অতৃপ্তি, অনেকটা তো দেখা হলো। সবশেষে দেখলাম ওদের স্যুভিনির শপ, ছোট্ট, তবে সুন্দর। কিছু ক্রয় করা সম্ভব হলো না, কারণ প্রচুর দাম। ল্যুভ থেকে বেরিয়ে সন্ধ্যার আলোয় আবারো প্যারিসের পথে নামলাম।
 


মাইকেল মধুসূদন দত্ত যে ভার্সাই নগরীতে বসে জন্মভূমিকে নিয়ে লিখেছিলন, বাংলা সাহিত্যে শ্রেষ্ঠ চতুর্দশপদী, সেই নগরীতে সময়ের অভাবে আর যাওয়া হলো না। যাওয়া হলো না সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর কাছে, নভেরার কাছে, শাহাবুদ্দীনের কাছে, দেখা হলো না গিমে মিউজিয়াম, দেখা হলো না আলেস পর্বত, কেনা হলো না বিশ্বের সবচেয়ে মনোমুগ্ধকর পারফিউম, ওঠা হলো না দ্রুততম বুলেট ট্রেনে, দেখা হলো না ভ্যান গগ, বোদলেয়ারের সঙ্গে, তাতে কি, সতের কোটি বাঙালির এই এক নাদান, প্যারিসের পথে পা তো রাখতে পারলাম, মন্দ কি!  

লেখক অস্কার ওয়াইল্ড কি মোনালিসার চোখের প্রেমে পড়েছিলেন? মোনালিসার প্যারিসকে কি তিনি খুবই ভালবেসে ছিলেন, সেকারণেই কি মজা করে বলেছিলেন, মারা যাবার আগে আমেরিকানরা প্যারিসের মতো স্বর্গ পেলেই খুশি। প্যারিস প্রকৃত অর্থেই আপাদমস্তক শান্তির শহর। এই শান্তির শহরে তিন দিন কাটিয়ে পরদিন ছুটলাম সুইজারল্যান্ডের সুন্দরী জুরিখের দিকে।




রাইজিংবিডি/ঢাকা/২৩ অক্টোবর ২০১৭/তারা

Walton Laptop
 
     

সংশ্লিষ্ট খবর:

Marcel
Walton AC