ঢাকা, বুধবার, ২৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৪, ১৩ ডিসেম্বর ২০১৭
Risingbd
সর্বশেষ:

মাধবকুণ্ডের ইতিহাস বলি

কাজী আশরাফ : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৭-১২-০৬ ১০:৪১:০৮ এএম     ||     আপডেট: ২০১৭-১২-০৬ ১০:৪৮:৩৯ এএম

কাজী আশরাফ: এখানে টিলার শরীর বেয়ে ঝপঝপ শব্দে পানি গড়িয়ে পড়ে। পাথুরে টিলার ওপর দিয়ে দ্রুত নেমে আসা পানির সেই শব্দ দূর থেকেই শোনা যায়। মন উতলা হয় সেই শব্দের উৎস খুঁজতে। সত্যি বলতে সেই ঝরনাই এখানকার প্রধান আকর্ষণ। কিন্তু প্রকৃতিপ্রেমীরা তার চেয়েও আরো বেশি কিছু দেখতে পাবেন মাধবকুণ্ডে।

কুণ্ডের ডান পাশে পাহাড়ের গায়ে একটি গুহা অনেকেরই দৃষ্টি এড়িয়ে যেতে পারে। কারণ সবাই তখন ঝরনার পানিতে অবগাহনে মগ্ন থাকে। স্থানীয় ভাষায় একে ‘কাব’ বলে। গুহাটি প্রাকৃতিকভাবে তৈরি হলেও এটি দূর থেকে কৃত্রিম বলে মনে হতে পারে, যেন পাথর কেটে বা খোদাই করে এটি বানানো হয়েছে। জায়গাটি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে পরিপূর্ণ। সবুজ অরণ্যে ঘেরা পরিবেশ, উঁচু থেকে নেমে আসছে ঝরনার জলরাশি, আছড়ে পড়ছে সমতলে। ভেবে অবাক হতে হয়, এই জলরাশির উৎস কোথায়? উত্তর মেলে না। যেখানে পানি পড়ছে সেখানে তৈরি হয়েছে  ছোটখাটো একটা পুকুর। পুকুর উপচে পানি সাপের মতো এঁকেবেঁকে এবং দ্রুত গতিতে ছুটে চলেছে অজানায়। এই সর্পিল খাল বেয়ে যে কারো চলে যেতে ইচ্ছে করবে। সেদিকে তাকিয়ে মন চলে যাবে অতীতে। জানতে ইচ্ছে হবে মাধবকুণ্ডের ইতিহাস।

শ্রীহট্ট রাজা গঙ্গাধ্বজ ওরফে গোবর্ধন ওই অঞ্চলের শেষ হিন্দু রাজা ছিলেন। তিনি গৌর গোবিন্দের বংশধর। শোনা যায়, একবার রাজা পাথারিয়া পাহাড়ে ভ্রমণে বের হন। তখন তিনি এই কুণ্ডের পাশে একটি বিশ্রামাগার নির্মাণের কাজ শুরু করেন। মাটি কাটতে গিয়ে এক ধ্যানমগ্ন সন্ন্যাসীর দেখা পান তিনি। এরপর রাজা সন্ন্যাসীর আরাধনা করলে তিনি আদেশ দেন ওই কুণ্ডে তাকে বিসর্জন দেয়ার। তবে শর্ত হলো, মধুকৃষ্ণা ত্রয়োদশীতে কাজটি করতে হবে। রাজা এই নির্দেশ পালন করেন। সন্ন্যাসীকে যখন কুণ্ডে বিসর্জন দেওয়া হচ্ছিল তখন কুণ্ডের গভীর থেকে তিন বার ‘মাধব’ দৈববাণী শোনা যায়। এরপর থেকেই এলাকাটির নাম হয় মাধবকুণ্ড। এই কুণ্ডে উল্লেখিত তিথিতে হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা পিণ্ড দান করেন। 
 


অন্য তথ্য অনুযায়ী জানা যায়, মহাদেব বা শিবের অন্য নাম মাধব। তার নামানুসারে ভক্তরা এর নাম রাখেন মাধবকুণ্ড। এখানে একটি শিব মন্দিরও রয়েছে।

মাধবকুণ্ড মৌলভীবাজার জেলার বড়লেখা উপজেলায় অবস্থিত। ঢাকা থেকে আসার পথটা বেশ চিত্তাকর্ষক এবং আনন্দদায়ক। বাস অথবা ট্রেন- দুভাবেই আসা যাবে। বাহনের জানালা দিয়ে তাকালে চোখে পড়বে প্রকৃতিঘেরা রাস্তার দুপাশে সবুজ গাছ, চা-বাগান আর ছোট-বড় অনেক খাল। বাহন যখন কাঁঠালতলি পাড় হবে প্রকৃতি বদলাতে শুরু করবে। এখান থেকেই শুরু চা-বাগান। পাহাড় কেটে বানানো হয়েছে পথ। আবার কখনও দেখে অবাক হবেন পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে দুটি পাহাড়। একটি শেষ হতে না হতেই আরেকটির শুরু। প্রকৃতির এই বৈচিত্রের সঙ্গে মিলবে বিচিত্র মানুষ। গারো, হাজং ছোট ছোট পল্লী তৈরি করে আলাদা বসবাস করছে সেখানে। 
 


কখনও দেখবেন পাহাড় কেটে কেটে সিঁড়ি বানানো হয়েছে। খাড়া পথ উঠে গেছে উপরে। পাহাড়ের গায়ে ছোট ছোট ঘড়বাড়ি। মনে হবে ওখানে যারা বাস করে তারা বুঝি সকালে দুয়ার খুলেই হাত দিয়ে আকাশ স্পর্শ করে। শুরু হয় পাহাড়িদের দিন। রেলগাড়ি মোটামুটি সমতলে চললেও বাস চলে যায় পাহাড়ের উঁচুনিচু পথে। মনটা অজানা আনন্দে ভরে উঠবে। এভাবেই আপনি এক সময় পৌঁছে যাবেন মাধবকুণ্ড। এখানে বলে রাখি সিলেট থেকে মাধবকুণ্ডের দূরত্ব কম নয়। প্রায় তিন ঘণ্টার পথ। যে কারণে আপনাকে মৌলভীবাজারের কুলাউড়া নামতে হবে। রাতে থাকতে চাইলে এখানেই ব্যবস্থা করতে হবে। কারণ মাধবকুণ্ডে থাকার কোনো ব্যবস্থা নেই।

যাই হোক, মাধবকুণ্ডে এসে আপনি প্রকৃতির অপার সান্নিধ্য পাবেন। জলপ্রপাতের পানি যে খাল বেয়ে চলে যাচ্ছে সেখানে মিলবে ছোট-বড় হাজারো পাথর। তাছাড়া পাহাড় কেটে মাধবকুণ্ডে নামার পথটা বেশ চমৎকার। সব মিলিয়ে মন ভালো করে দেয়ার মতো পরিবেশ। তাছাড়া ঘুরতে ঘুরতে ক্লান্ত হয়ে গেলে মিলবে রেস্তোরাঁ। পাওয়া যাবে নানা পদের খাবার। সত্যি বলতে প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা এই জলপ্রপাত বাংলাদেশের সৌন্দর্য আরো বাড়িয়ে তুলেছে। যে কারণে মাধবকুণ্ডে পর্যটকের ভিড় লেগে থাকে বারো মাস। বর্ষায় ঝরনার সৌন্দর্য বেড়ে যায় কয়েকগুন। তবে সে সময় যাওয়ার পথটা ঝুঁকিপূর্ণ থাকে। ফলে এই শীত হলো মাধবকুণ্ডে যাওয়ার উপযুক্ত সময়।



রাইজিংবিডি/ঢাকা/৬ ডিসেম্বর ২০১৭/তারা

Walton
 
   
Marcel