ঢাকা, বুধবার, ২৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৪, ১৩ ডিসেম্বর ২০১৭
Risingbd
সর্বশেষ:

সকালের স্নিগ্ধ আভায় সুন্দরবন

তাইফুর রহমান তমাল : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৭-১২-০৭ ৪:৪৪:০৭ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৭-১২-০৭ ৪:৪৪:০৭ পিএম

তাইফুর রহমান তমাল: আমরা এসেছি ৫ দিনের জন্য ‘সুন্দরবন স্টাডি’ ট্যুরে। প্রথম দিন আমরা যখন কচিখালি পৌঁছলাম তখন সূর্য সবে মাত্র কিরণ ছড়াতে শুরু করেছে। মার্চ মাসের সকাল। সূর্যের বেশ তেজ। আমরা দুটি দলে বিভক্ত হয়ে লঞ্চ থেকে নেমেছি। নেমেই বুঝতে পারলাম রাস্তা সুবিধার না। যেতে যেতে হাঁটু পর্যন্ত কাদায় পা ডুবে যাচ্ছিল। এরপরও আমরা লাইন ধরে চলছি কচিখালি জেটির দিকে। কচিখালি জেটি পেরিয়ে উপরে উঠলে প্রথমেই বন কার্যালয়। এখান থেকে সোজা দক্ষিণে চলে গেছে ছনবন। মাঝে মিঠা জলের পুকুর। পরবর্তী দল না আসা পর্যন্ত আমরা কচিখালি রেস্ট হাউজের পাশের পুকুরে হাত-পা ধুয়ে নিলাম।

ছন বনের শেষ সীমানা ঠেকেছে সমুদ্র সৈকতে। বনের পশ্চিম পাশে ঘন জঙ্গল। কচিখালি জেটির উত্তর পাশে নদীর চরে দেখা মিলল বন মোরগ। একটি নয়, বেশ কয়েকটি দল বেঁধে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তাছাড়া এখানে আরো দেখা মিলল হরিণ, শূকর, বানর ইত্যাদি। এখান থেকে সামান্য উত্তরে ছোট্ট একটি খাল বনের বুক চিরে সোজা পশ্চিমে চলে গেছে। কথা বলে জানা গেল, সারা বছরই খালে টলটলে স্বচ্ছ জল থাকে। নানা রকম পাখিরও দেখা মিলল এখানে। খাল থেকে বেরিয়ে কিছুটা উত্তরে নদীর চরে শীতের সময় নাকি দেখা যায় লোনা জলের কুমির। আমরা অপেক্ষা করছিলাম। দ্বিতীয় দলটি আসতে খুব বেশি সময় লাগল না। আমরা সারিবদ্ধ হয়ে হাঁটতে লাগলাম ছন বনের ভিতর দিয়ে। আমাদের দেখে হরিনের দল ছুটে পালাতে লাগল গভীর বনে। গাইড ওবায়দুল হক ও জসিমউদ্দীন আমদের পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন। গাইড ডলার মাহমুদ প্রয়োজনীয় তথ্য দিচ্ছিলেন। সেগুলো শুনে আমাদের শরীরে শিহরণ জাগছিল।

 


যাই হোক, প্রকৃতি কত সুন্দর সাজে সেজেছে না দেখলে বোঝানো সম্ভব নয়। এখানে যারা দায়িত্বে আছেন, তাদের মানসিকতা কোমল, প্রকৃতির মতোই। পর্যটকরা অভিভূত। সদালাপী প্রকৃতিপ্রেমী কচিখালি অভয়ারণ্যের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জনাব সুলতান মাহমুদ টিটুর সঙ্গে কথা প্রসঙ্গে জানতে পারলাম এই অভয়ারণ্যের আয়তন ১৪,৭৩৪ হেক্টর। পূর্ব-দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর, উত্তর-পশ্চিমে ঘন বন। বন সুন্দরী, কেওড়া, গেওয়া বৃক্ষে সমৃদ্ধ। বনের মধ্যে চিত্রা হরিণ, শূকর, বানর, বন মোরগসহ বিভিন্ন প্রজাতির পাখি, সাপ, বাঘ এবং পাশে বয়ে যাওয়া কচিখালি নদী ও খালে রয়েছে কুমির। বনের মধ্যে চিত্রা হরিণের ছড়াছড়ি। বাঘ নাকি দিনের দুটি সময়ে বেশি শিকার করে। সকাল ৯টা এবং বিকাল ৪টায়। অর্থাৎ সকাল এবং বিকালের নাস্তা। কচিখালিতে সাবেক প্রধান বন সংরক্ষক গোলাম হাবিব নিজে বারো একর জায়গার ওপর নারিকেল বাগান সৃজন করেছিলেন। সত্যিই বিরল প্রকৃতিপ্রেমের পরিচয় দিয়েছেন তিনি। সারিবদ্ধভাবে তালগাছও রয়েছে প্রচুর। সব মিলিয়ে কচিখালি অনিন্দ্য সুন্দর।

এই সুন্দরের মাঝেও রয়েছে দুঃখ। তীব্র পানীয় জলের অভাব। বন কর্মকর্তা, কর্মচারী, পর্যটক, কোস্টগার্ড, জেলে, বাওয়ালি এবং বনের পশু-প্রাণীর জন্য পানি পাওয়া বেশ কষ্ট। মিঠা পানির দুটি পুকুর আছে কিন্তু সেগুলো অপরিষ্কার। এজন্য তারা বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করে পান করেন। এছাড়া সোলার এর মাধ্যমেও পানি বিশুদ্ধ করে পান করা হয়। সুন্দরবন স্টাডিতে এসে প্রথম হরিণ দেখলাম কচিখালিতে। বেশ বড় হরিণের ঝাঁক। কচিখালি মংলা থেকে প্রায় ১০০ কি.মি. দূরে অবস্থিত। এটি কটকার পাশাপাশি অন্যতম আকর্ষণীয় স্থান। পথের পাশে ঘন অরণ্যে দেখা যায় বাঘ, হরিণ, শূকর, বানর, বিষধর সাপ ইত্যাদি। চলতে গেলে সাধারনত একটু ভয় লাগে। কিন্তু দুঃসাহসী পর্যটকদের জন্য জায়গাটি রোমাঞ্চকর। হঠাৎ চোখে পড়ল মৌচাক। পাশেই কোস্ট গার্ডের রশিদুল ইসলাম কি যেনো খুজঁছিলেন। জানতে চাইতেই অবলীলায় বলে দিলেন- বাঘের পায়ের ছাপ খুঁজছি। শুনেই কৌতূহলী হলাম। একটু ভয়ও পাচ্ছিলাম। তিনি অভয় দিয়ে জানালেন, তারা প্রায়ই এ পথে চলাচল করে। কিন্তু কয়েকদিন আগে এখানে একটি হরিণকে বাঘ তাড়া করেছিল। তাই বাঘের পায়ের চিহ্ন খুঁজছিল সে। তবে তিনি এই বলে সাবধান করে দিলেন, যদি পায়ের ছাপ বেশি পাই তবে এ পথে চলাচল নিরাপদ হবে না। শুনে এবার সত্যি ভয় পেলাম। এখানে নাকি বাঘের আনাগোনা বেশি।

 


যেভাবে যাবেন: ঢাকা থেকে খুলনা বাসে বা ট্রেনে যেতে পারেন। এরপর খুলনা কিংবা মংলা থেকে নৌপথে সুন্দরবনের গহীন অরণ্যে প্রবেশ করা যায়। মংলার অদূরে ঢাইনমারীতে রয়েছে বন বিভাগের কার্যালয়। সেখান থেকে সুন্দরবনে প্রবেশের আনুষঙ্গিকতা সারতে হয়। পর্যটকদের জনপ্রতি ৫০ টাকা, বিদেশি পর্যটকদের জন্য ৭০০ টাকা এবং ছোট ও বড় লঞ্চের জন্য আলাদা আলাদা ফি দিতে হয়। পর্যটকদের সঙ্গে ভিডিও ক্যামেরা থাকলে অতিরিক্ত একশ টাকা বন বিভাগকে দিতে হয়। প্যাকেজ ট্যুরে গেলে এসব ঝামেলা পর্যটকদের পোহাতে হয় না। ট্যুরিজম লিমিটেডের লোকজনই আনুষঙ্গিকতা সেরে নেন। ট্যুরিজম কর্তৃপক্ষকে শুধু নির্ধারিত তিন থেকে পাঁচ হাজার টাকা পরিশোধ করলেই তিন রাত দুই দিন সুন্দরবনে ভ্রমণ ও থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করে দেবে। সরকারিভাবে থাকতে চাইলে রয়েছে কটকা ও কচিখালি গেস্ট হাউস। ৬ জন থাকা যাবে। ভাড়া ৩ হাজার টাকা। তবে  বাগেরহাটের ডিএফও’র কাছ থেকে নিশ্চিত হয়ে নিতে হবে।

 

 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/৭ ডিসেম্বর ২০১৭/তারা

Walton
 
   
Marcel