ঢাকা, বুধবার, ১১ মাঘ ১৪২৪, ২৪ জানুয়ারি ২০১৮
Risingbd
সর্বশেষ:

থাইল্যান্ড কি পড়শি রাষ্ট্র নয়?

ফেরদৌস জামান : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৮-০১-০২ ৪:২০:২৭ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৮-০১-০৪ ৩:২৫:২৫ পিএম

(ভিয়েতনামের পথে: চতুর্থ পর্ব)

ফেরদৌস জামান: ঝকঝকে তকতকে পরিষ্কার হোটেল- হাউস অব ফায়া থাই। কোথাও এক টুকরো ময়লা নেই। অফিস কক্ষে টেবিলসহ এক সেট সোফা, ঠিক তার পরে বেশ কয়েকটা চেয়ার পাতা খাবার টেবিল। ফিজ, মাইক্রোওভেন, তাকের উপর সাজানো কিছু বিস্কুট ও ক্যান্ডির বয়াম। এসব পেরিয়ে একটা সু-র‌্যাক। সেখানে হোটেলগুলোতে জুতা পায়ে প্রবেশের নিয়ম নেই।

আনুষ্ঠানিকতা ও বিল পরিশোধ শেষে ব্যবস্থাপক নিজেই ঘর দেখিয়ে দিতে নিয়ে গেলেন চার তালায়। দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করতেই এসির কড়কড়া ঠান্ডায় শরীর-মন চাঙ্গা হয়ে গেল। হালকা আলো জ্বলছে, দুই দেয়ালের সাথে চারটা দুই তালা বিছানা। সম্মুখ পর্দা টানানো। প্রায় প্রতিটা বিছানাতেই লোক আছে কিন্তু সাড়াশব্দ নেই। দরজার বাইরে লকারে ব্যাগ রেখে কেবল অতি প্রয়োজনীয় জিনিসগুলোই নিতে হলো। একটা প্রশান্তির গোসল সেরে খাবার অনুসন্ধানে নিচে নেমে দেখি টেবিলে বসা চার-পাঁচ জন তরুণ তখনও গল্পগুজবে মত্ত। সাথে চলছে কার্ডস খেলা। ওদিকে বাইরে প্রবল বর্ষণ চলমান। ব্যবস্থাপক সাফ জানিয়ে দিলেন এই রাত বারোটা-একটার সময় বাইরে ডিনার পাওয়া যাবে না, তার মধ্যে বৃষ্টি। বয়ামের বিস্কুট দেখে মনে হলো, কয়েকটা পেলে রাত ঠিক পার করে দেয়া যেত। কিন্তু তা সম্ভব নয়। কারণ ভাষাগত প্রতিবন্ধকতা তো রয়েছেই। এরা ইংরেজি জানে না বললেই চলে। তা না হলে ইনিয়ে-বিনিয়ে আশপাশ ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে ঠিকই বোঝাতে পারতাম যে আপাতত বয়ামের ঢাকনাটা খুললেই সমস্যা সমাধান হতে পারে।



দুই-এক কথায় আলাপ হয় টেবিলে বসা তরুণদের সাথে। তারা সকলে মিলে এখন নিকটেই রেস্টুরেন্টে খেতে যাবে। ডিনার নয় বরং মধ্যরাতের আনন্দ ভোজ। মজা করে সকলে মিলে কিছু বিশেষ পদের স্বাদ নেয়া তাদের উদ্দেশ্য। আমাদের পরিস্থিতি তারা অনুমান করতে পেরেছে এবং কোনো সমস্যা না থাকলে মধ্যরাতের ভোজে সঙ্গী হতে আহ্বানও করেছে। এমন সুযোগ হাতছাড়া করা ঠিক হবে না ভেবে আগে পিছে না তাকিয়ে সাদরে সম্মত হলাম। মানুষ সাতজন কিন্তু ছাতা তিনটা। তাতে কি, তারুণ্যের উচ্ছ্বাসে সেই ঝমঝম বৃষ্টি ঠেলে রেস্টুরেন্ট পর্যন্ত ছাতা ভাগাভাগি করে যেতে সমস্যা হলো না। অনেক লোক খাচ্ছে। ভেতরে ঢুকেই মনে হলো, কাছেই এমন একটা খাবার জায়গা থাকতে হোস্টেল ব্যবস্থাপক কেন বললেন, খাবার পাওয়া যাবে না? একে তো বৃষ্টি তার উপর  বাংলাদেশি, তাই হয়তো তিনি ধরে নিয়েছিলেন এত কষ্ট করে গিয়ে মধ্য রাতের এই সমস্ত খাবারে আমাদের পোষাবে না।

অল্প সময়ের মধ্যে তরুণ দলের সাথে খাতির জমে উঠল। প্রথম থেকেই লক্ষ করলাম শুধু চাইনিজ ছেলেটা বাদে বাকী সকলেই মেয়েলি স্বভাবের। কথা বলা এবং অঙ্গভঙ্গি মেয়েলি। প্রত্যেকেই তাদের আচরণগত নিজ নিজ এই ধরন বা অবস্থান অনেক ভালোবাসে। খাবার পরিবেশনের আগে জনে জনে একটা করে ঠান্ডা পানির বোতল দেয়া হলো। সাথে পাইপ এবং গ্লাস। এদের মধ্যে যার নাম ফার্স্ট, সে তো বলেছিল পেঁপে বা এমন কিছু একটা খাবে কিন্তু পানি নিয়ে ব্যস্ততা কেন? চলছে কথাবার্তা। ফার্স্টকে তার বন্ধুরা কথার মাঝে বেশ কয়েকবার লিঙ্গের ক্ষেত্রে ‘শী’ বলে সম্বোধন করছে। পরে জানতে পারলাম সে প্রত্যাশা করে সকলেই তাকে শী বলেই সম্বোধন করুক এবং জানুক। একে একে পরিবেশিত হলো সম তুম, স্কুইড ম্যাসিউ এবং তুম প্লা ক্রব। প্রায় এক ঘণ্টা ধরে চললো খাবার আড্ডা। সম তুম হলো সরু ও লম্বা করে কাটা মশলাদার এবং টক-মিষ্টি স্বাদের কাঁচা পেঁপে সালাদ। তারা ভেবেছিল কঁচি ভুট্টার ফালির সাথে রান্না করা স্কুইডের পদটা আমরা খেতে পারব না। পরবর্তীতে যখন দেখল খেতে পারলাম তাতে সকলের আনন্দের সীমা নেই। সব শেষে পরিবেশিত হলো তুম প্লা ক্রব। ছোট ছোট মাছ ভাজার সাথে সালাদ মেশানো। মুখে দিলে সর্বপ্রথম অনুভূত হয় ভাজা মাছের কুড়মুড়ে স্বাদ। অতি চমৎকার এই পদটা পরবর্তীতে আর কোথাও চোখে পরেনি।

চাইনিজ ছেলেটা বাদে অন্য সকলেই থাইল্যান্ডের বিভিন্ন প্রদেশ থেকে আগত। ছুটি কাটাতে এসেছে ব্যাংককে। কিন্তু একই ধরনের এই তরুণরা কীভাবে একত্র হলো, পূর্বের পরিচিত কি না, কত দিন হলো এখানে অবস্থান করছে? শেষ পর্যন্ত এসব প্রশ্নের উত্তর জানা হয়নি। রেস্টুরেন্টে খাবার পরিবেশনকারী সকলেই মেয়ে। প্রতিটা পদ জনে জনে নয় বরং একটা করে এবং লম্বা টেবিলের মাঝে রাখা। সেখান থেকে যে যার মতো আলাদা প্লেটে তুলে নিচ্ছে অথবা পরিবেশিত প্লেট থেকে সরাসরি কাঁটা চামচ দিয়ে তুলে নিয়ে মুখে পুরে দিচ্ছে। নতুন কোনো খাবার পেলে তা পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে খেতে বা উপভোগ করতে আমরা দুজনেই কম বেশি পারদর্শী। তাছাড়া, ভ্রমণে আমাদের মানসিক প্রস্তুতিটা সেভাবেই স্থির করা থাকে। প্রতিটা খাবারের স্বাদ ও বৈচিত্রতায় আমরা যখন মুগ্ধ তখন তারা নিজ থেকেই আমাদের দিকে বেশি বেশি এগিয়ে দিচ্ছে। আড্ডার একমাত্র মেয়ে সদস্যের উৎসাহে পরিবেশনকারীকে ডেকে প্রতিটা পদ আরও একটা করে দিতে বলা হলো। সাথে মুরগির মাংসের নতুন আরেক পদ। মাঝে ভাতও পরিবেশিত হয়েছে তবে তার পরিমাণ দুই ছটাকের বেশি হবে না। তারা ভাত খুব কম খায় এবং সামান্য ভাতটুকুই পাঁচজনে ভাগ করে খেয়ে নিল। অনেকক্ষণ ধরে খাওয়া চলমান। দেখা গেল ওরা পাঁচজনে যা খেল তার প্রায় সম পরিমাণ খেলাম আমরা দুজনে। সর্বসাকুল্যে বিল হলো পাঁচ বা সাড়ে পাঁচশ বাথ।



ব্যাগ থেকে দুইশ বাথের দুইটা নোট দিয়ে আমরাও তাতে শরিক হলাম। আমরা যেমন তাদেরকে পেয়ে অনেক খুশি, তাদের ক্ষেত্রেও ঠিক একই ঘটনা ঘটল। বাংলাদেশের মানুষের সাথে জীবনে প্রথম পরিচিত হতে পারা যে, তাদের নিকট সম্পূর্ণ নতুন এক অভিজ্ঞতা তা তাদের উচ্ছ্বাস দেখেই অনুমান করা যায়।

বাইরে বৃষ্টি ঠিক আগের গতিতেই ঝড়ছে। হঠাৎ এমন কয়জন বন্ধু পেয়ে তাদের সাথে কাটানো সময়টা ছিল দারুণ এক অভিজ্ঞতা। হোটেল খোঁজাখুঁজির সমস্ত ক্লান্তি শরীর থেকে নেমে গেল। স্থান, কাল এবং পাত্র বিবেচনায় এত মনমুগ্ধকর একটা সময় অতিবাহিত হলো যে, এমন আড্ডাতে সারাটা রাতই পার করে দেয়া যেতে পারে কিন্তু আমাদের ঘুমানো দরকার। কারণ পরের দিন সকালে দূরবর্তী প্রদেশ মে হং সন-এর বাস। সুবর্ণভূমি বিমানবন্দর থেকে শুরু করে মাঝ রাতের খাবার আসর; এটুকু অভিজ্ঞতার মাঝ দিয়ে বুঝে নিতে পারলাম যে, থাইল্যান্ডের পুরোটা সময়জুড়ে এই ভাষাগত জটিলতার কারণে ভোগান্তি পোহাতে হবে। হায় ভাষা, একেক দেশে একেক রূপ! অতীতে পরিব্রাজকগণ এক দেশ থেকে আরেক দেশ ঘুরেছেন, মিশেছেন বিচিত্র রকম জনপদের মানুষের সাথে। এই জটিল পৃথিবীর এত সব ভাষাভাষি মানুষের সাথে কীভাবে যোগাযোগ করেছেন, ভাবতে গেলে বিস্ময় লাগে!

অথচ, শত বছর পর এই আধুনিক যুগেও আমরা হিমশিম খাচ্ছি। এইতো মাঝখানে একটা মাত্র দেশ মিয়ানমার, তারপরই থাইল্যান্ড। একে কি পড়শি রাষ্ট্র বলব না? কিন্তু ভাষাগত জটিলতা যেন এই প্রাণবন্ত আর মধুর আড্ডার অনেক কিছু থেকেই আজীবনের জন্য বঞ্চিত করে রাখল। এই পরিস্থিতিতে কেবলই মনে হলো, ইউরোপের সাম্রাজ্যবাদীরা নিজেদের মধ্যে কাড়াকাড়ি করতে করতে এই শ্যামদেশকে শেষ পর্যন্ত কেউই নিতে পারলি না। মাঝখান থেকে রয়ে গেল ইংরেজিতে অদক্ষ একটা দেশ! তুলতুলে কম্বল আর আরামদায়ক মেট্রেস পাতা বিছানা পেয়ে শরীর মহাশয়কে ছেড়ে দেয়া মাত্র তলিয়ে গেলাম এক নিরবচ্ছিন্ন ঘুমের দেশে! (চলবে)



রাইজিংবিডি/ঢাকা/২ জানুয়ারি ২০১৮/তারা

Walton
 
   
Marcel