ঢাকা, শুক্রবার, ৬ আশ্বিন ১৪২৫, ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮
Risingbd
সর্বশেষ:

ঘরে ঢুকেই দেখি বিছানায় দুই রমণী

ফেরদৌস জামান : রাইজিংবিডি ডট কম
 
     
প্রকাশ: ২০১৮-০৬-২১ ১২:০৬:১৪ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৮-০৮-২৫ ৫:৫৩:৩৮ পিএম

(ভিয়েতনামের পথে : ২৯তম পর্ব)

 

ফেরদৌস জামান: রোদ কামার অপেক্ষায় মন্দিরের আশপাশেই ঘোরাঘুরি করছিলাম। হোস্টেলে ফিরতে ফিরতে বিকেল পেরিয়ে প্রায় সন্ধ্যা। ঘরে ঢুকতেই নাকে এক বিকট ধাক্কা লাগল! অপর দুই বিছানায় দুই রমণী। একজন কানে এয়ার ফোন গুজে বসে আছে, দ্বিতীয় জন উপুর হয়ে শুয়ে। ধাক্কার উৎস অনুসন্ধানে আবিষ্কৃত হলো পায়াখানার দরজা খোলা। বাহির থেকে কেউ এসে ঘর অন্ধকার করে রেখে যাবে, তা হতে পারে না। কাজটা নিঃসন্দেহে তাদের। নতুন অতিথি, অল্পক্ষণ আগে এসে উঠেছে। প্রথমে পায়াখানার উন্মুক্ত দরজা বন্ধ করে তারপর আলাপ পরিচয় এবং কুশলাদি জিজ্ঞাসা। উপরের জন কানাডিয়ান এবং নিচের জন ইতালি থেকে আগত। লম্বা সময় নিয়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ঘুরছে। সদ্যই পার্শ্ববর্তী দেশ লাওস থেকে চিয়াং মাই ঢুকেছে।

বাহির থেকে ঘরে আসার আগে ভেবে রাখলাম কিছুক্ষণ বিশ্রাম করে রাতের বাজারের দিকে পা বাড়াব। কিন্তু ঘরের মধ্যে যে পরিস্থিতি নিচের ডাইনিংই এ পর্যায়ের ভরসা। পরের দিনের ভ্রমণ পরিকল্পনায় একটু  চোখ বুলিয়ে নিয়ে বাজারের উদ্দেশ্যে বের হলাম। গেস্টহাউজ থেকে প্রধান সড়কের মোড় অর্থাৎ মানি এক্সচেঞ্জ দোকানের পাশে আসলে বাম দিকে ছিল থাপায়া গেটের পথ। ঠিক তার বিপরিত দিকে শুক্রবারের রাতের বাজার। দশ থেকে পনের মিনিট এগিয়ে গেলে বাজারের পথ শুরু। এখান থেকেই  আমেজের আভাস। ধীরে ধীরে প্রবেশ করছি জনস্রোতে। রাস্তায় যানবাহণের সীমিত এবং নিয়ন্ত্রিত চলাচল আর ফুটপাথে পথচারী ও দর্শনার্থী। ফুটপাথের পাশ দিয়ে একটির পর একটি অস্থায়ী দোকান। সমস্ত দোকানের পণ্য উপহার বা সংগ্রহের জন্য একেকটি উপযুক্ত সামগ্রী। ইলেক্ট্রনিক্স পণ্যের প্রায় শতভাগ চাইনিজ। অন্যান্য যে সমস্ত জিনিস রয়েছে বিশেষ করে হস্তশিল্পজাত পণ্যের সবই স্থানীয়। প্রধান সড়ক থেকে বেরিয়ে গেছে বাজারে অনেকগুলি শাখা পথ। আমরাও মিশে গেলাম আলো ঝলমলে বাজারের শাখায় প্রশাখায়। এত বড় বাজার যে মনোযোগ দিয়ে দেখতে থাকলে এক দিনে অসম্ভব। ব্যাংককের শনিবার বাজার দেখার সুযোগ মিলেছিল কাকতালীয়ভাবে। সন্ধ্যায় মে হং সন যাওয়ার বাস ছাড়বে তাই আগে ভাগেই টার্মিনালে হাজির থাকতে হয়েছিল। সুতরাং, রাতের বর্ণিল রূপ পর্যবেক্ষণের সুযোগ হাত ছাড়া করতে হয়েছিল। এখানে এসে সেই অপূর্ণতা পূর্ণ হলো।

দর্শনার্থী বা ক্রেতার অধিকাংশই বিদেশি পর্যটক। যেন সারা পৃথিবীর মানুষের মিলন মেলা। এইতো পতাকার দোকান! যে জিনিসটি আমি সবখানে গিয়েই খুঁজে বের করার চেষ্টা করি। ব্যাংককের বাজার থেকে থাইল্যান্ডের পতাকা কেনা হয়েছিল। এখানকার পতাকাগুলি আরও সুন্দর ও দৃষ্টিনন্দন। অতএব, সংগ্রহ করার লোভ সংবরণ করতে পারলাম না। ছোট ছোট পতাকা ব্যাগের শরীরে শেলাই করে লাগিয়ে রাখতাম। এখন আর লাগানো হয় না তবে সংগ্রহেই আনন্দ। আবহাওয়া গরম হওয়ায় ঠান্ডা জাতীয় খাবার বা পানিয়ের চাহিদা সর্বাপেক্ষা বেশি। হাতে হাতে ফলের শরবত অথবা আইসক্রিম। যে গরম পরেছে ঠান্ডা কিছু একাটা খাওয়া যেতে পারে। খাবার খোঁজা চলমান। দিশেহারা হবার মতো পরিস্থিতি কারণ এত সব খাবারের পসরা কোনটি ছেড়ে কোনটি খাই তা ঠিক করা মুশকিল। পেছন থেকে কেউ যেন ডাকল। এই অচেনা জায়গায় কে ডাকবে? ফিরে তাকিয়ে সুজিত বলে, দাদা সেই দোকানদার। হ্যাঁ, তাই তো দুপুরে মন্দিরের পাশে দেখা হয়েছিল। সাদা কাপড়ে বিভিন্ন কারুকাজের শার্ট তার দোকানের পণ্য। দুপুরে অনেক চেষ্টা করেও একটা অন্তত গছিয়ে দিতে ব্যর্থ হয়েছে। এবার আর হাত ছাড়া করতে চান না। যেন কত দিনের চেনা। কয়েক ঘণ্টা আগে মন্দিরে, এখন আবার এখানে? বলে অস্থায়ী দোকান, যত দোকান দেখছেন তার প্রায় সবই আজ এখানে তো কাল অন্যখানে। অর্থাৎ চিয়াম মাই-এ সপ্তাহের শুক্র থেকে রবি তিন দিন তিনটি আলাদা জায়গায় এমন রাতের বাজার বসে- ফ্রাইডে নাইট বাজার, স্যাটারডে নাইট বাজার এবং সানডে নাইট বাজার। দোকানগুলিও স্থানান্তরিত হয়ে প্রতিটি বাজারে অংশগ্রহণ করে।
 

 


রাস্তা পার হয়ে প্রবেশ করলাম বাজারের অন্য অংশে। উঁচু ছাউনির নিচে শত শত দোকান। এখানে হস্তশিপ্পজাত পণ্যের প্রাধান্য বিশেষভাবে লক্ষণীয়। বিভিন্ন ধারার শিল্পীগণ দোকানে বসেই তাদের পণ্য তৈরি করছেন। সাবান দিয়ে তৈরি শিল্প কর্ম দেখে থমকে গেলাম। সুক্ষ্ম মাথার ছুরি দিয়ে সাবান কেটে কেটে তৈরি করছেন সুদৃশ্য ফুল। পাঁপড়িগুলি এতটাই মশৃণ, দেখে মনে হবে সদ্য গাছ থেকে ছিড়ে আনা। কাগজ কেটে বানানো শিল্প কর্ম থেকেও চোখ ফেরানো দুস্কর। স্থানীয় নিত্য ব্যবহার্য গৃহস্থলির প্রতিটি জিনিসে শিল্পের ছোঁয়া। যেমন- চপস্টিক, এটি তাদের দৈনন্দিন জীবন তথা সংস্কৃতির অত্যান্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি উপাদান। তাতেও কোন না কোন কারুকাজের সংযোজন- স্টিকের গোড়ালীর অংশে যুক্ত হয়েছে মানুষের হাত, পা, মাথা অথবা জীবজন্তুর অঙ্গপ্রত্যঙ্গের আদল। বিভিন্ন রং ও ধরণের কাঠের এই চপস্টিকের মাঝ থেকে নেহায়েতই সংগ্রহের উদ্দেশ্যে একজোড়া না কিনে পারলাম না। ডাব বা নারিকেল নিয়ে তাদের উৎসাহ যে অত্যাধিক তা আসার পর থেকেই দেখে আসছি এবং একাধিক জায়গায় উল্লেখও করেছি। ডাবের মাঝখান থেকে বের করে আনা সাদা ধবধবে আস্ত কচি নারিকেল, পাতলা ও মসৃণ ব্লেড দিয়ে দীর্ঘক্ষণের প্রচেষ্টায় বিশেষ কায়দায় বের করে আনা বস্তুটি একটি অভিজাত খাদ্য পণ্য। চড়া দামের এই খাদ্য পরিবেশন হয় বাটিতে করে। আস্ত গোল নারিকেলের শাঁস, ঠিক মাথায় একটি ফুটা আর তাতে নল ঢুকিয়ে খুশিতে আত্মহারা ক্রেতা হাঁটছে আর মিষ্টি পানি পান করছে। দূর থেকে দেখে মনে হবে হাতে করে কেউ বৃহৎ আকারের একটি মুক্ত দানা বয়ে নিয়ে যাচ্ছে। নারিকেল আখ্যান এখানেই শেষ নয়, এর মালা দিয়ে তৈরি করা হয়েছে চমৎকার সব শিল্প কর্ম। ঘষেমেজে পরিষ্কার করা মালার পিঠ যেমন দর্শনীয় তেমনি ভেতরে বসানো হয়েছে ঝিনুকের ঝকঝকে টুরো। রঙ্গিন পটভূমিতে বসানো ঝিনুক টুকরোর কারুকাজের কি অর্থ বুঝায় জানি না তবে সংগ্রহের জন্য এমন সুন্দর জিনিস আর হতে পারে না।
 


ভারি খাবারের জন্য রয়েছে আলাদা একটি চত্বর। অনেক দোকান আর তাতে বহু পদের সমারহ। মাছ, মাংস এবং সবজির বিভিন্ন পদসহ স্থানীয় অন্যান্য খাবার। বোধহয় হেন পদ নেই যা এখানে মিলবে না। আন্তর্জাতিক চেইন দোকানের সংখ্যাও কম নয়। নামকরা প্রায় সব দোকানের শাখা আছে। প্রতিটি দোকানেই দুচারটি পদ মূল্যছাড়ে বিক্রি চলছে। ঠান্ডা কিছু খেতে চেয়েছিলাম সেই কতক্ষণ আগে। বার্গার কিং এর সামনে আইসক্রীমের বিজ্ঞাপন দেখে লোভ সংবরণ করা সত্যিই কঠিন  হয়ে দাঁড়াল। সারা দিনে যেন উপযুক্ত একটি খাবার খেলাম- আইসক্রীমের উপর দিয়ে চকোলেটের খয়েরি প্রলেপ ঢেলে দেয়া। মুখ ছোঁয়াতেই সারা শরীর শিরশির করে উঠল! এখন গেস্টহাউজে ফিরতে হবে। রাতে ভালো ঘুম দরকার কারণ আগামীকালের গন্তব্য অনেক দূরবর্তী জায়গা। কীভাবে যেতে হবে তা এখনও পরিষ্কার নয়। নগরীর মধ্যে অথবা স্বল্প দূরত্বে চলাচলের জন্য এখানকার বহুল প্রচলিত বাহণ ‘টুকটুক’। আমাদের দেশে যেমন স্কুটার বা সিএনজিচালিত অটোরিকশা। পথচারী দেখলে বা কাউকে দাঁড়ানো দেখলেই কাছে এসে বলবে না যে, কোথায় যেতে চান বরং কয়েকবার টুকটুক শব্দটি  উচ্চারণ করবে। এই জিনিস দেখা, সেই জিনিস দেখা, এমন করতে করতে বাজার থেকে বেরিয়ে প্রধান সড়কে আসতে আরও অনেকটা সময় পেরিয়ে গেল। একটির পর একটি টুকটুক এসে বলে, টুকটুক টুকটুক!  (চলবে)




রাইজিংবিডি/ঢাকা/২১ জুন ২০১৮/তারা

Walton Laptop
 
     
Walton