ঢাকা, শুক্রবার, ৬ আশ্বিন ১৪২৫, ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮
Risingbd
সর্বশেষ:

প্রচণ্ড গরমে গ্র্যান্ড ক্যানিয়নের শীতল জলে

ফেরদৌস জামান : রাইজিংবিডি ডট কম
 
     
প্রকাশ: ২০১৮-০৬-২৪ ৮:৩৭:১৯ এএম     ||     আপডেট: ২০১৮-০৬-২৪ ১:১৬:৫০ পিএম

(ভিয়েতনামের পথে : ৩০তম পর্ব)

ফেরদৌস জামান: রাস্তায় বের হতেই টুকটুক এসে হাজির। গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন যাতায়াত ভাড়া শুনে মাথায় হাত! আপাতত হাঁটছি। পরপর আরও দুইটি টুকটুক নিয়ে যেতে চাইল। মানচিত্র মেলে ধরে পথের দূরত্ব দেখিয়ে বলে ভাড়া যা চেয়েছে এর নিচে কেউ নিয়ে যেতে পারবে না। আগের দিন  ভাড়ার স্কুটি খুঁজেছি তাও পাইনি। পেলেও যেত কিনা সন্দেহ আছে। সাধারণ যানবাহণের খবর বের করতে গিয়েও পেরেশান হয়ে গেছি। বাকি থাকে বাইসাইকেল। এতে ব্যর্থ হলে পায়েই ভরসা।

পথের ধারে কিছু সাইকেল দাঁড় করে রাখা। জানতে চাইলে বলা হলো, ভাড়ায় দেয়ার জন্য। মাত্র গোটাপাঁচেক সাইকেল। এর মাঝ থেকে দুইটি পছন্দ হলো। শর্ত খুবই সহজ, শুধু পাসপোর্টের ফটোকপি জমা দিলেই হলো। ভাড়াও আমাদের নাগালে মধ্যে- প্রতিটি একশ করে। একটু চালিয়ে দেখা দরকার। সমস্যা বাঁধল এখানেই, চালাতে গিয়ে দেখা গেল ব্রেক দুর্বল। বাকিগুলোর অবস্থা এর চেয়ে ভালো নয়। পাহাড়ি পথে কমজোর সাইকেল নিয়ে যাওয়া উচিৎ হবে না। অন্য দোকানে খোঁজ করলে শর্তে না মেলায় হেঁটেই রওনা হতে হলো। পথে যদি কোন ব্যবস্থা হয় তাহলে ভালো অন্যথায় মনবলেই ভরসা। কিছুদূর পর দেখা মিললো চিয়াং মাই বেষ্টনী প্রাচীরের কিছুটা ভগ্নাংশ। আসল প্রাচীরের শুধু এতটুকুই দৃশ্যমান বা টিকে আছে। অনুমান করা যায় এতেও সংস্কার পরেছে। প্রাচীরকে কোনোমতে ধরে রাখা হয়েছে। শুরুতেই সতর্ক বার্তায় উপরে আরোহণে নিষেধাজ্ঞা জারিকরণ বিজ্ঞপ্তি। প্রাচীরের পাশ দিয়ে ফুটপাত আর তাতে পথচারী আমরা মাত্র দুজন। একাধিক রাস্তার মোড় দেখলেই কাউকে জিজ্ঞেস করার প্রয়োজন বোধ করছি। সেক্ষেত্রে, আগেই ঠিক করে রাখতে হচ্ছে কি বলে সাহায্য প্রার্থনা করব এবং কোন মানুষটি উপযুক্ত হতে পারে তা অনেকের মাঝ থেকে এক দেখায় আন্দাজ করে নিতে হবে। এই যেমন যার চেহারা একটু গুরুগম্ভির, দাঁড়িয়ে থাকা বা হাঁটায় ব্যক্তিত্বের প্রকাশ অথচ, মুখে এক ধরনের মিষ্টি মিষ্টি ভাব। এক কথায় দুনিয়াদারি এবং চারপাশের খবরাদী রাখে দেখতে এমন। ‘এক্সকিউজ মি’ বলে শুধুমাত্র দুইটি শব্দের জিজ্ঞাসা ছুরে মারা- গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন? যদি জানা থাকে তাহলে দেখিয়ে দিচ্ছে কোন পথে যেতে হবে। সাথে দুএকটি কথাও বলছে, যা বোঝা আমাদের সাধ্যের অতীত।
 

 


শহর ছেড়ে চলে এসেছি মহাসড়কে। কতদূর এসেছি জানি না তবে দুই ঘণ্টা পেরিয়ে গেছে। প্রচণ্ড রোদ, কিছুক্ষণ পরপর পানির পিপাসায় গলা শুকিয়ে আসছে। আশপাশে কোন খাবারের দোকান চোখে পরে না। পথে কিছু কলা কিনেছিলাম, আপাতত পানি আর তাতেই চলে যাচ্ছে। সামনে গাছের নিচে এক রেস্টুরেন্ট। বাইরে মুরগির মাংস এবং মাছ পোড়ানো হচ্ছে। গন্ধ ছড়িয়েছে চমৎকার! আরও কতটা পথ যেতে হবে তার ঠিকঠিকানা নেই। অনিশ্চয়তার এই পথে শক্তি সঞ্চয়ের লক্ষ্যে এক টুকরো করে মুরগির মাংস খাওয়া যেতে পারে। তারপর পেট ভরে পানি পান করলে অনেকটা পথ চালিয়ে নেয়া যাবে। দুটো চেয়ার টেনে বসতেই মুখের সামনে গ্লাস ভরে বরফ টুকরো পরিবেশিত হলো। মাংসে ঝাল না থাকলেও লবণের স্বাদটা পরিমাণ মত ছিল। খাওয়ার পর শরীর ছেড়ে দিতে চাইলে তাকে প্রশ্রয় না দিয়ে আবারও ফুটপাত ধরে হাঁটছি। সোজা মহাসড়কের দুই-আড়াই কিলোমিটার পর্যন্ত দেখা যায় কিন্তু কোন মানুষের চিহ্ন নেই। মাঝে শুধু এতটুকু জানতে পেরেছি হংডং পর্যন্ত যেতে হবে। চলে এলাম হংডং শহরের মুখে। আশপাশে কাউকে না দেখে পাশেই পাঠাগারে প্রবেশ করলাম। এখানে নিশ্চয় কাউকে না কাউকে পাওয়া যাবে, যে আমাদের সঠিক পথের দিশা দিতে পারবে। থাইল্যান্ডে আজ এক সপ্তাহের উপর হতে চললো, দেখা হলো অনেক জায়গা। কিন্তু পাঠাগার চোখে পড়ল এই প্রথম। ফুল পাতাবাহার গাছের উঠান পেরিয়ে ভেতরে ঢুকলে একজন এগিয়ে এসে জানালেন, চলে এসেছি অনেক দূর। আবারও পেছনের দিকে যেতে হবে।  প্রায় পৌনে এক কিলোমিটার হাঁটার পর এক বিরাণ পাথারে কটকটে রোদের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে প্রথমে ম্যাকডোনাল্ডস এবং তার কিছু দূর পর কেএফসির দুটি রেস্টুরেন্ট। এক্ষুণই ঠান্ডা পানি না খেতে পারলে যে কোন সময় ঠাস করে পরে যেতে পারি। দুজনে একটি করে আইসক্রিম তার আগে ভরা দুই গ্লাস করে বরফ মেশানো পানি। প্রশান্তির শীতল ধারা পৌঁছে গেল শিরায় শিরায়!
 

 

বাকি পথটুকু ফিরে আসতে ট্যাক্সি পেয়ে গেলাম। চৌরাস্তার মোড়ে এসে পাঠাগার থেকে পাওয়া তথ্য মোতাবেক বামে মোড় নিতে হলো। ঐ দূরে আকাশের যেখানে শেষ, সে পর্যন্ত চলে গেছে এই রাস্তা। কয়েক কিলোমিটার পর রাস্তার প্রান্ত মিশে গেছে অন্য দিক থেকে আসা আর এক সড়কে। গাড়িঘোড়া বলতে অনেকক্ষণ পরপর শুধু ট্রাক, লরি এবং দু’একটি ট্যাক্সি। ট্যাক্সি মানে পেছনে টানা দুই বেঞ্চের আসনওয়ালা বাহণ। আবার বামে মোড় নিতে হলো হংডং যাওয়ার সময় মানচিত্রে কোন স্পষ্ট দিশা পাইনি তবে এখন সঠিক পথেই আছি কিন্তু গন্তব্য কতদূর তা পরিষ্কার নয়। রোদের তীব্রতা বেড়ে এমন পর্যায়ে এসে দাঁড়াল, সাক্ষাত মরুভূমি। মাথার উপর থেকে সূর্য আর পায়ের নিচ থেকে তাপ ছেড়ে দিচ্ছে পিচ ঢালা কালো পথ। সড়কের উপর খেলে যাচ্ছে টলটলে মরিচিকা। দু’পাশে তেমন কোনো বৃক্ষও নেই যার নিচে খানিকক্ষণ দাঁড়াব। পানির মজুদ শেষ। বোতল ভরে নেয়ার কোনো ব্যবস্থা পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। অনুমান বলছে যেদিকে এগিয়ে যাচ্ছি তা যেন পুনরায় হংডং এর দিকে নিয়ে যাচ্ছে। দুই কি তিন কিলোমিটারের একটি অর্ধ-বৃত্তাকার মোড় পেরিয়ে আবারও চলছি সোজা তবে এবার চোখের সামনে দৃশ্যমান হয়েছে পর্বতের প্রাচীর। তার দূরত্ব কমপক্ষে সাত/আট কিলোমিটার হবে। সূর্য এখন মাথার ঠিক উপরে। ঘরবাড়ি না হয় নাই থাকল কোথাও দু’দন্ড দাঁড়াবার মত ছোট্ট নীড়টুকুও কি থাকবে না! সাইকেল ভাড়া করার সময় ভেবেছিলাম পাহাড়ি পথ মাড়িয়ে গিরিখাতে যেতে হবে। অথচ, এখন পর্যন্ত যতটা এলাম তার সবটুকুই সমতল। সম্মুখে দৃশ্যমান হলো পাহার সারি। গিরিখাত তার মধ্যেই হয়ে থাকবে। কিন্তু সে পর্যন্ত যে আমরা পায়ে হেঁটে যেতে পারব না তা নিশ্চিত।

হঠাৎ এক দোকন পেয়ে গেলাম। একাকি দোকানদার নারী গালে হাত দিয়ে বসে আছে। কিছু ফল যেমন জাম্বুরা, কলা আরও কি যেন। সাথে স্টিকি রাইস, এসবই তার খাবার দোকান বা রেস্টুরেন্টের পণ্য। এই বিশেষ প্রণালীর ভাত কি দিয়ে খাওয়া হয় তা জানি না। নিশ্চয় আলু, পটলের ঝোল দিয়ে নয়? তবে পাইতে চাকা করে কাটা পাকা আমের সাথে খেতে দেখেছিলাম। আমাদের দেখে তিনি ‘কাপন খাপ’ বলে সাদরে আমন্ত্রণ জানিয়েই এক গ্লাস করে বরফ পরিবেশন করলেন। তারপর এক বোতল পানি। থাইল্যান্ডে এই প্রথম এত বড় পানির বোতল দেখলাম- দেড় লিটারের কম নয়! পাকা কলাগুলি লোভনীয়। এত আদর আর যত্ন করে বসতে দিলেন তার দোকন থেকে কিছু অন্তত খাওয়া উচিৎ। বৃত্তান্ত শুনে এবার স্বয়ং তিনি নিজে আমাদের সাহায্যের জন্য উদ্যোগী হলেন। দূরে কোন ট্যাক্সি দেখলেই রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে ইশারা করলেন। এক দুই করে তৃতীয় কি চতুর্থ ট্যাক্সিটি দাঁড়াল। ভদ্র মহিলার সই করে দেয়া একশ বাথে নিয়ে যেতে রাজি হলো। অবাক হয়ে গেলাম তিনি আমাদের কাছ থেকে পানির দাম রাখলেনই না। হাত এবং মুখ ইশারায় যা বললেন তাতে বুঝলাম, এটা আমার পক্ষ থেকে তোমাদের জন্য উপহার ছিল।
 


ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে কোথায় য়ে নিয়ে এলো তা জানি না। একটি চওড়া প্রবেশদ্বারের সামনে এসে বলল, নামেন, এটাই গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন। একি, গিরিখাতের আবার দরজা কেন! পাই ক্যানিয়নে তো এমন কোন কিছু ছিল না। দরজা দেখেই বুঝে নেয়া সারা, ভেতরের কায়কারবার ঠিক কি হয়ে থাকবে। দরজার সাথে টিকিট কাউন্টার। জনপ্রতি একশ বাথ প্রবেশ মূল্য। ভেতরে প্রবেশ করে চোখের সামনে বিশাল দুইটি পুকুর তার মধ্যে আবার দুই ভাগ। একভাগ একশ এবং অপর অংশে প্রবেশ মূল্য আরও বেশি। লাল উঁচু দেয়ালের পুকুর। ঐ প্রান্তে দেয়ালের উপর বড় করে লেখা গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন। অ্যারিজোনার গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন দেখার সুযোগ এখনও হয়ে ওঠেনি তবে তা বোধহয় এর চেয়ে অধিক চিত্তাকর্ষক আর বিস্ময়কর হবে না!  মুখের সামনে জিপলাইনের বেজ। তারে ঝুলে পুকুরের এপাশ থেকে ওপাশ তারপর পুনরায় এপাশের বেজে ফিরে আসা। এর জন্য গুনতে হয় মাত্র ছয়শ বাথ। মনের মধ্যে এতই সুখ আর আনন্দ অনুভূত হলো যে, আমার তো মনে হচ্ছে কমপক্ষে পাঁচশ বার এপাড় ওপাড় করি। আগে যদি জানতাম প্রকৃতিকে দোয়ালের মধ্যে বন্ধ করে সব কর্তৃত্ব কারবার চলমান তাহলে আজকের দিনের পরিকল্পনা অন্যভাবে সাজাতে পারতাম! প্রকৃতির খেয়ালে গড়ে ওঠা সুন্দর জায়গাটিতে ট্রাক, বুলডোজার লাগিয়ে কি সব ভরাট আর সমতল করার কাজ চলে। ওদিকে পুকুরের নীল পানিতে ভেসে থাকা বিভিন্ন উপকরণ নিয়ে কয়েকজন অর্ধ-উলঙ্গ মানুষ ভাসছে আর বাঁশের ভেলায় শুয়ে রৌদ্রস্নান করছে। পাশেই প্রায় ত্রিশ ফুট উঁচু থেকে পানিতে লাফ দেয়ার ব্যবস্থা। দুইজন লোক দাঁড়িয়ে আছে কিন্তু লাফ দেয়ার কেউ নেই। সারাদিনে সূর্য আর কালো পথ থেকে যে পরিমাণ উত্তাপ শরীরে ঢুকেছে তাতে একক্ষুণই পানিতে একটা ঝাপ না দিলে যে কোন কিছুর ঘর্ষণে আগুন জ্বলে উঠতে পারে। একটা ঝাপ দিলাম এবং শীতল হয়ে দড়ি বেয়ে উপরে উঠে এলাম। গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন দেখা শেষ এবং  আমরা যার পর নেই ধন্য।  (চলবে)




রাইজিংবিডি/ঢাকা/২৪ জুন ২০১৮/তারা

Walton Laptop
 
     
Walton