ঢাকা, মঙ্গলবার, ৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৫, ২০ নভেম্বর ২০১৮
Risingbd
সর্বশেষ:

কে ভাঙাবে ওর অভিমান

ফেরদৌস জামান : রাইজিংবিডি ডট কম
 
     
প্রকাশ: ২০১৮-০৮-২০ ১:০১:১১ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৮-১১-১৪ ২:০৫:৩৭ পিএম

(ভিয়েতনামের পথে: ৩৭তম পর্ব)

ফেরদৌস জামান: বেলা দুই কি আড়াইটার মধ্যে ফিরে এলাম ব্যাংকক। চাতুচক টার্মিনালে না গিয়ে নেমে পরলাম মো চিৎ স্টেশনে। এখান থেকেই পরবর্তী গন্তব্য ওয়াট পো-এর বাস। ব্যাংককের বিখ্যাত মন্দির ওয়াট পো হবে এই দেশে দেখা সর্বশেষ জায়গা। বাসের জন্য অপেক্ষায় আছি। ঠিক কোন বাসে যেতে হবে  জেনে নিতে পেরিয়ে গেল অনেকটা সময়। অবশেষে বাস চলে এলো। সারা দিন বৃষ্টি হলেও গরমের মাত্রা বেশ উপরের দিকে। ঠান্ডা বাস, ওঠার সাথে সাথে শরীরজুড়ে এক তরিৎ পরিবর্তন! এখানকার বাস কন্ডাক্টরদের হাতে দেড় ফুট আন্দাজ মুখ আটকানো একটি নল থাকে। নলের ভেতরে প্যাঁচানো থাকে বিভিন্ন গন্তব্যের টিকিট এবং পয়সা রাখার একটি আলাদা খোপ। কব্জা লাগানো নল আড়াআড়ি খোলা-মেলা করা যায়। ভাড়া আদায়ের ফাঁকে ফাঁকে কন্ডাক্টর সামান্য ঝাকুনি দিয়ে পয়সার ঝনঝন শব্দ তুলে চলেন।

কোথায় নামলাম ঠিক জানি না। ওয়াট মো যেতে এই পথেই এগোতে হবে। কিছু দূর পর রাস্তাটি গিয়ে মিশে গেছে বড় রাস্তায়। চত্বরের অপর পাশ দিয়ে বড় রাস্তায় গাড়িঘোরার চলাচলে সীমাবদ্ধতা। আগামীকাল রাজার শেষকৃত্তানুষ্ঠান। সে উপলক্ষে শোকের কালো পোশাকি স্বেচ্ছাসেবকদের ব্যাপক জমায়েত। কোনো দিশা করতে না পারায় উল্টো পথে বেশ খানিকটা চলে এসেছি। এক ইন্ডিয়ান দম্পতির সহযোগিতায় সঠিক পথে ফিরে এলাম। জানতে পারলাম ওয়াট মো আজ বন্ধ অথবা যাওয়া যাবে না। স্বেচ্ছাসেবীদের পাশাপাশি অল্প সংখ্যক পুলিশও মোতায়েন করা হয়েছে। রাস্তার ধারে রাজার ছরি সংবলিত মঠ ও সৌধ ফুলে ফুলে সাজানো। বোধহয় রাজপ্রাসাদ এদিকেই হবে। ফুল, পাতাবাহারে সজ্জিত রাস্তা, ভাস্কর্য এবং মঠ সমূহের সুউচ্চ চূড়া দেখে তেমটিই মনে হয়। ফুটপাথে মানুষের চলাচল স্বাভাবিক তবে বেশ ডিড়। ওয়াট মো না যেতে পারলেও চারপাশের আয়োজন আর সাধারণ মানুষের আগ্রহ দেখে এই এলাকায় আরও কিছুটা সময় অতিবাহিত করার ইচ্ছা হলো। মানুষের দৃষ্টি ঐ আকর্ষণীয় রাস্তার শেষ প্রান্তের দিকে। কেন এত আগ্রহ? রাজপ্রাসাদ কি ওদিকে? না কি বিশেষ কেউ আসছে যাকে দেখার জন্য ঘার টানটান করে তাকিয়ে থাকা? কিসের জন্য প্রতীক্ষা তার হদিস করতে না পারার অস্বস্তি নিয়ে ফিরতি পথে পা বাড়ালাম। পথে একটি বড় হোটেল তার নিচে বড় রেস্টুরেন্ট। খোলা আকাশের নিচে চমৎকার বসার ব্যবস্থা। শারীরিক অসুস্থতার কারণে আইসক্রীম খাওয়ায় নিষেধাজ্ঞা থাকলেও এখানে এসে তা পালন করা যাচ্ছে না। কয়েক দিনে যে পরিমাণ আইসক্রীম খাওয়া হয়েছে; গত সাত-আট বছরে বোধহয় তার অর্ধেকটাও খাওয়া হয়নি। বসে থাকতে বেশ ভালো লাগছে। সন্ধ্যা নেমে এলো। আর বেশিক্ষণ বসে থাকা ঠিক হবে না। বেশ খানিকটা পথ হোঁটে যাওয়ার পর বাসস্ট্যান্ড। গরমের মাত্রা আরও বেড়ে গেল। পাশেই শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত দোকান। দুজনে পালাক্রমে শরীর ঠান্ডা করে বাসস্ট্যান্ডে এসে দাঁড়াচ্ছি। বাস আসে, বাস যায় কিন্তু আমাদের গন্তব্যের কোনো বাস আসে না। প্রায় এক ঘণ্টা পর মো চিৎ-এর বাস এলো।
 


আজ রাতের পরিকল্পনায় ভিন্নতা থাকছে, কোনো হোস্টেল বা গেস্টহাউজ নয়, বিমান বন্দরে রাত্রিযাপন। দেশ থেকে এসে অবতরণ করেছিলাম সূবর্ণভূমি বিমানবন্দরে, আর বিদায় নেব ডন মং থেকে। চাতুচক বাস টার্মিনালে এসে ব্যাগ ছাড়িয়ে ডন মং যেতে ট্যাক্সি নিতে হবে। সার ধরে দাঁড়িয়ে আছে ট্যাক্সি। গোলাপি, সবুজ ইত্যাদি রং। রং ভেদে প্রতিটির ভাড়া আলাদা। হাতের অর্থকড়ি শেষ পর্যায়ে। ভাড়া মিটিয়ে কিছু থাকে কি না সন্দেহ। এখানে আর নতুন করে ডলার ভাঙানোর ইচ্ছা নেই। আকাশজুড়ে ঝুম বৃষ্টি নেমে এলো। এই পরিস্থিতিতে আর রং দেখে ট্যাক্সি পরখ করার ফুরসত নেই। তিন থেকে চারটি দেখার পর দেড়-দুইশ বাথেই মিলে গেল। বৃষ্টির অঝোর ধারা আর সোডিয়ামের ফ্যাকাসে আলোর পড়ত ঠেলে এগিয়ে চলছি বিমান বন্দরের দিকে। বিদায় চাতুচক, বিদায় মো চিৎ! বৃষ্টি এখনও চলমান, সাথে নিকোশ কালো আকাশে অনবরত বিদ্যুৎ রেখার সুস্পষ্ট আঁকিবুকি। কড়াৎ কড়াৎ ডাকে কেঁপে উঠছে সব কিছু। টার্মিনালে ঢুকে একটা চক্কর দিয়ে নিলাম- কোথায় আসন পাতলে ভালো হবে। সুবিধাজনক ফাঁকা জায়গাগুলি আমাদের মতো বেশ কয়েকটি দলে পূর্ণ। ব্যাগকে বালিশ বানিয়ে কেউ শুয়ে পরেছে, তো কেউ প্রস্তুতি নিচ্ছে। আবার অনেকেই জটলা বেঁধে গল্পগুজোব জমিয়ে তুলেছে। এদের কারোরই উদ্দেশ্য আমাদের মতো নয়, দু’চার ঘণ্টা পর ফ্লাইট তাই আগেভাগেই এসে পরেছে। চাইলেই এমন যে কোনো আসরে যুক্ত হওয়া যায় কিন্তু এখন আর সে ইচ্ছা নেই। তারচেয়ে বরং এসব দেখে বেড়াতেই ভালো লাগছে। ঘুরতে ঘুরতে এমন এক জায়গা নির্বাচন করলাম যেখান থেকে পায়খানা ও প্রস্রাবখানা নিকটে। তাছাড়া কয়েক কদম হাঁটলেই খাবারের দোকান। অধিকন্তু, মানুষের ভিড় অপেক্ষাকৃত কম।
 


পাশাপাশি তিনটি করে বসার জায়গাকে একত্রে বিছানা হিসেবে নির্ধারণ করলাম। আশপাশে একই কায়দায় আরও কয়েকজন শুয়ে পরেছে। আমাদের অবশ্য ঠিক এখনই শুয়ে পরার পরিকল্পনা নেই। এমন ব্যস্ত একটি দিন পার করার পর মনের মধ্যে এক ধরনের সফলতার আনন্দ বয়ে যাচ্ছে। ওয়াট মো দেখতে পারিনি তাতে কি? সেখানে যাওয়া-আসা এবং ছোট ছোট দু’একটি অভিজ্ঞতা এই বা কম কি? তাছাড়া, আমরা তো এখানে আলেকজান্ডার বা চেঙ্গিস হতে আসিনি- আপাতত এসবই দুজনের আলোচনার বিষয়বস্তু। মাঝে মধ্যে দোকান থেকে আইসক্রীম অথবা বরফ কুচি দেয়া কফি এনে খাওয়া হচ্ছে। অনেকটা সময় পেরিয়ে গেছে, বোধহয় রাত এগার কি বারোটা হবে। আশপাশের আসনগুলির কেউ-ই আমাদের মতো দির্ঘস্থায়ী আসন পাতেনি। তবুও দু’একজন যারা বসে আছে বা পাশেই দেয়ালে হেলান দিয়ে আছে তাদের যে কোনো কারও সাথে কথা বলার ইচ্ছা হলো। সেটা আড্ডায় রূপ নিলেও সমস্যা নেই কিন্তু এমন একজনকেও পেলাম না যার কানের ফুটো দুটি অবসর। প্রত্যেকের কানে গুজে দেয়া ইয়ার ফোন আর হাতের মধ্যে মোবাইল ফোন সেট। রাত এখন আরও গভীর। বিমান বন্দরের ভেতরের পরিবেশেও নেমে এসেছে নীরবতা। যার ফ্লাইটের সময় হচ্ছে সে-ই কেবল সুরসুর করে উঠে বিদায় নিচ্ছে। এখন একটি চক্কর মারা যায়। অর্ধেকেরও বেশি মানুষ ঘুমিয়ে পরেছে। যারাও জেগে আছে তাদের মাঝে কেউ কেউ বসে বসে টুপছে। নিরিবিলি জায়গা দেখে কেউবা প্রেমালাপ জমিয়ে তুলেছে। জায়গায় ফিরে দেখি সকলেই সজাগ, ফাঁকা জায়গাগুলির আট-দশটায় এসে জুগেছে নতুন অতিথি। তাদের শোরগোল আর উল্লাস ধ্বনি পুরো টার্মিনালের কোণায় কোণায় পৌঁছে যাচ্ছে। এমন সাইরেন ধ্বনি কার উপকারে এলো আর কার অপকারে তাতে কোনো ভ্রক্ষেপ নেই। ঠিক এই পরিস্থিতিতে আমার মন নতুন এক গবেষণামূলক ভাবনায় নিয়োজিত হলো- কথা বেশি বলা বাঙালির স্বভাব, তেল-গিরিজবিহীন বাগযন্ত্র খামাখা বন্ধ থাকবে তা আমরা ভাবতেও পারি না। তবে এই যন্ত্রের যথেচ্ছ ব্যবহারে ওস্তাদ কারা, আমরা না কি সীমান্ত রেখার ওপারের আমাদের স্বজাতিগণ!
 


আকাশে এখনও বিদ্যুতের চমক। বৃষ্টি ঝরছে আঝোরে। গত কয়েক দিন রাত কেটেছে ছোট ছোট ঘরে। আজ ঠাঁই করে নিয়েছি ফুটবল খেলার মাঠের সমান এই ঘরে। শত শত মানুষ,  প্রত্যেকের ভাবনা আলাদা। গন্তব্যও নানান জায়গা। এমন একটি মানুষ খুঁজে পাওয়া যাবে না যার ভাবনার সাথে এই ছাদের নিচের অন্য আর এক জনের ভাবনার মিল আছে। চারপাশের এত এত বৈচিত্রময় মানুষ, তাদের মাঝে ছোট্ট এই জায়গাটিতে শুয়ে আছি। চোখের দুই পাতা কখন এক হয়েছে টের পাইনি। আর এক দফা শোরগোলে চোখজোড়া মেলে দেখি ঘড়ির কাঁটা সাতটা ছুঁইছুঁই। অনেক ক্ষুধা পেয়েছে। গতকাল সারাদিন নানান জায়গায় ঘোরাঘুরি আর গভীর রাত ধরে এই বিশাল ছাদের নিচে ক্ষণে ক্ষণে হাঁটাহাঁটি; সমস্ত পরিশ্রম আর ক্লান্তি এক হয়ে ক্ষুধায় রূপ নিয়েছে। আজ সাথে পাউরুটি-মাখন নেই, খেতে হবে অন্য কিছু। কয়েক দিনে অভ্যাস এমন হয়ে গেছে যেন জীবনের বাকি দিনগুলিতে এই পাউরুটি-মাখন ছাড়া অন্য কিছু খেতেই পারব না। বিমানের কাউন্টারে ব্যাগ জমা দিয়ে বোর্ডিং পাস নিয়ে ঢুকে পরলাম ভেতরের ঘরটায়। আকাশের কান্না এখনও থামেনি। কে ভাঙাবে ওর অভিমান! এ দেশের মাটিতে যেদিন প্রথম পা রাখি সেদিনও বৃষ্টি, আজ বিদায় বেলাতেও বৃষ্টি। মাঝের দিনগুলিতে খুঁজে খুঁজে কুড়িয়ে নেয়া সমস্ত স্মৃতি আর অভিজ্ঞতা মুঠোবন্দী করে বিদায় নিলাম। (চলবে)




রাইজিংবিডি/ঢাকা/২০ আগস্ট ২০১৮/তারা

Walton Laptop
 
     
Marcel
Walton AC