ঢাকা, বুধবার, ৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৫, ২১ নভেম্বর ২০১৮
Risingbd
সর্বশেষ:

জয় করতে নয়, ক্ষমা চাইতে আসবো চূড়ায়

ইকরামুল হাসান শাকিল : রাইজিংবিডি ডট কম
 
     
প্রকাশ: ২০১৮-০৯-০৫ ১:০২:১৪ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৮-০৯-০৫ ১:৪১:০২ পিএম
কঠিন খাড়া দেয়াল জুমারিং করছি

(কাঞ্চনজঙ্ঘার সোনালী আলোয়: শেষ পর্ব)

ইকরামুল হাসান শাকিল: উপরের দিকে তাকিয়ে দেখি মুহিত ভাই ও বিপ্লব ভাই ঝুলে আছে। এক পা, দু’পা করে স্টেপ দিয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে দম নিচ্ছে। আমারও একই অবস্থা। নিচে শামীম ভাই ও নূর ভাইও একইভাবে ঝুলে আছে।

খাড়া বরফের দেয়ালে উঠে বরফের খাঁজে এসে বসলাম। সবার হৃদস্পন্দন বুকের পাজরকে দ্রুত আঘাত করছে। কথা বলাই কষ্ট হচ্ছে। দম পাচ্ছি না। আমরা কিছু সময় এখানে বসে বিশ্রাম নিলাম। পানি, চকলেট খেলাম।  পেটে খাবার নেই। শরীরের শক্তিও শেষ। এক পা এগোনোর পর আরেক পা দেয়ার শক্তি থাকে না। চকলেট খেয়ে শরীরে একটু হলেও শক্তি পাওয়া গেলো। সেই শক্তি পুঁজি করে আবার আরোহণ শুরু করলাম। প্রথমে বিপ্লব ভাই, তারপর মুহিত ভাই, আমি, শামীম ভাই ও নূর ভাই দড়িতে ঝুলে জুমারিং করছি। রোদের তাপমাত্রাও অনেক বেশি। যেহেতু বরফের মধ্যে আছি সেহেতু রোদের তাপ তেমন টের পাচ্ছি না। তবে এটা বুঝতে দেরি হলো না যে সানবার্ন হচ্ছি। কিছু সময় পর নিচের দিকে তাকিয়ে দেখি শামীম ভাই ও নূর ভাই নেই। ভয় পেয়ে গেলাম। আমি দাঁড়িয়ে তাদের খুঁজতে থাকলাম। কিন্তু দেখতে পাচ্ছি না। না দেখাটাই স্বাভাবিক। কারণ আমি যে জায়গায় দাঁড়িয়ে আছি তার নিচে ওভার হ্যাং দেয়াল। দা কিপা উঠে এলো আমার কাছে। তার কাছে জানতে পারলাম শামীম ভাই ও নূর ভাই আর উপরে আসবেন না। তারা নিচে নেমে যাচ্ছেন।

শামীম ভাই শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছেন। বমি হয়েছে। জুমারিং করার মতো শক্তি পাচ্ছিলেন না। তার থেকে বড় কথা তার আইস বুট ফেটে ভেতরে বরফ ঢুকে যাচ্ছিল। তাই নূর ভাই তাকে নিয়ে নিচে নেমে আসেন। যদি তখন না নেমে আসতেন তাহলে শামীম ভাইয়ের শারীরিক অবস্থা আরো খারাপ হতো। তখন দলে বড় ধরনের সমস্যা হতো। এমনকি সামিট করাও অসম্ভব হয়ে যাবে। সেকথা মাথায় নিয়ে নূর ভাই নিজে সামিটে না গিয়ে তাকে নিয়ে নেমে এসেছেন। যদিও নূর ভাইও শারীরিকভাবে বেশ দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন।
 

সামিটের শেষ ভয়ংকর বিপজ্জনক সরু নাইফ রিজ


দুই শেরপাসহ আমরা তিন জন সামিটের উদ্দেশ্যে আরোহণ করছি। সকাল দশটা বেঁজে গেছে। আমরা এখনো সামিট থেকে প্রায় ৪০০ ফুট নিচে আছি। শেরপারা যদিও বলেছিলো সকাল ৮টার মধ্যেই সামিট হয়ে যাবে। কিন্তু তা আর হলো না।

বিপ্লব ভাই একসময় মুহিত ভাইকে বললেন, মুহিত ভাই এবারও কি সামিট না করেই ফিরে যাবো? তিনি মানসিকভাবে একটু দুর্বল হয়ে গিয়েছিলেন। মুহিত ভাই কোনো উত্তর না দিয়ে উপরের দিকে উঠতে লাগলেন। একসময় যখন চূড়া আমাদের খুব কাছে তখন আবার সেই বিপ্লব ভাই বললেন, আজ আর সামিট না করে ফিরবো না। আমাদের শরীরের শক্তি শেষ। এখন শুধু মনের শক্তিতেই এগিয়ে চলছি। সামিটের খুব কাছে আমরা দড়িতে ঝুলছি। এক নির্বাক আনন্দ আমাদের হাতছানি দিচ্ছে। আমি তখন ভাবলাম আল্লাহ যদি চায় আজ সামিট করেই ফিরবো। দেশের লাল সবুজের পতাকা ওড়াবই। সামিটের ২০ থেকে ২৫ ফুট নিচ থেকে হাতের বামে যেতে হবে। এই ২০ ফুট রাস্তা খুবই বিপজ্জনক। সরু নাইফ রিজ। মনে হচ্ছে যেকোন মুহূর্তে ভেঙে পরতে পারে।
 

মাউন্ট কেয়াজো-রি শিখরে পতাকা হাতে লেখক


নেপালি সময় সকাল ১১.২৯ মিনিটে বিপ্লব ভাই প্রথম ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের হয়ে বিজয়ী পদচিহ্ন ফেললেন। তারপর একে একে মুহিত ভাই ও আমি উঠে আসি চূড়ায়। দুই শেরপাসহ আমরা তিনজন দাঁড়িয়ে আছি আকাশ ছুঁয়ে কেয়াজো-রির শিখরে। জীবনের প্রথম কোনো পর্বতের চূড়ায় পা রাখার আনন্দের  সুখ পেলাম। মনের অজান্তেই চোখের কোণে পানি জমে উঠল। এটা আসলে স্বপ্ন জয়ের বহিঃপ্রকাশ। বাকশূন্য হয়ে শুধু চারপাশ দেখছি। সকল কষ্ট মুহূর্তেই ভুলে গেলাম। আবার মনে পড়লো সেই সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কথা- ‘একেবারে চূড়ায়, মাথার খুব কাছে আকাশ, নিচে বিপুলা পৃথিবী, চরাচরে তীব্র নির্জনতা। আমার কণ্ঠস্বর সেখানে কেউ শুনতে পাবে না। আমি শুধু দশদিককে উদ্দেশ্য করে বলবো, প্রত্যেক মানুষই অহঙ্কারী, এখানে আমি একা, এখানে আমার কোনো অহঙ্কার নেই। এখানে জয়ী হবার বদলে ক্ষমা চাইতে ভালো লাগে।’

মাউন্ট কেয়াজো-রি এর চূড়া খুবই সরু। দাঁড়ানোর মতো তেমন জায়গা নেই। আমরা আমাদের কোমরের হার্নেসের সাথে ফিক্সড দড়ির সাথে অ্যাঙ্কার করে আগ-পিছ করে দাঁড়িয়ে আছি। কারণ একত্রে দাঁড়ানোও যাচ্ছে না। কিলি পেম্বা শেরপা আমাদের ছবি তুললেন। আমাদের পৃষ্ঠপোষক কোম্পানি বার্জার পেইন্টস, এপেক্স ফুটওয়্যার, জনতা ব্যাংক, শাহ সিমেন্ট ও বিজিএমইএ-এর লোগো নিয়ে ছবি তুললাম। এবং আমাদের বিএমটিসি ও লাল সবুজের পতাকা নিয়ে ছবি তুললাম। আকাশ পবিষ্কার তাই চারপাশের অপরূপ সৌন্দর্য দেখতে একটুও কষ্ট হলো না। মুহিত ভাই আমাদের দূরে মাউন্ট এভারেস্টসহ বেশ কয়েকটি পর্বত দেখালেন।
 

এাউন্ট কেয়াজো-রি শিখরে দেশের পতাকা হাতে তিন পর্বতারোহী


বাতাস বইছে। মেঘ উড়ছে। রোদও শরীর পোড়াচ্ছে। কঠিন ও ভয়ঙ্কর সুন্দরে দু’চোখ ভরে গেলো এবং সকল ক্লান্তি দূর হয়ে গেলো। প্রায় আধ ঘণ্টা কেয়াজো-রির শিখরে থাকার পর আমরা ফেরার পথ ধরলাম। ডিসেন্ডারের মাধ্যমে দড়ি দিয়ে র‌্যাপেল ডাউন করে নেমে এলাম কোলে। সেখানে নূর ভাই ও শামীম ভাই আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল। আমরা এখানে কিছু সময় বিশ্রাম নিলাম। আমাদের তিনজনের সাথে খাবার ছিল না। খাবার নূর ভাইয়ের কাছে। পেট ক্ষুধায় পুড়ে যাচ্ছে। শরীরে শক্তিও শেষের চরম পর্যায়ে। শরীর কাঁপছিলো ক্ষুধায়। তাই এখানে খেজুর, বাদাম, ম্যাংগোবার খেলাম। খাবার শেষে আবার নামা শুরু করলাম।

সন্ধ্যা ৫টার সময় আমরা হাইক্যাম্পে ফিরে এলাম। তাবুর ভেতরে ঢুকেই স্লিপিং ব্যাগের ভিতরে ঢুকে পড়লাম। দু’দিন হয়ে গেলো চা, স্যুপ, চকলেট ছাড়া আর কোনো খাবার কপালে জুটছে না। শরীর খুব ক্লান্ত। কিলি পেম্বা শেরপা আমাদের তাবুতে এসে গরম একমগ করে স্যুপ দিয়ে গেলেন। বরফ গলিয়ে পানি গরম করে এক মুঠো ভুট্টা দিয়ে স্যুপ। লবণ মরিচ কিছুই নেই। পৃথিবীর সেরা অখাদ্যের একটি খাচ্ছি। ক্ষুধায় শরীর কাঁপছে তবু গলা দিয়ে খাবার নামছে না। তারপরও খেতে হলো। না খেলে সকালে আবার নিচে নামার শক্তিও থাকবে না। স্যুপ খেয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম।

সৃষ্টির অপার সৌন্দর্য এই পর্বত। এর রূপ দেখে তৃপ্তি পাওয়া মনুষ্যজীবনে সম্ভব না। এখানে আছে ভয়ঙ্কর সৌন্দর্য। যার টানে মৃত্যু ভয়কে তুচ্ছ করে মানুষ ছুটে যায় তার বুকে পদচিহ্ন ফেলে। মেঘে ভেসে আলিঙ্গন করে স্বপ্নবাজ মানুষগুলো শ্বেত-শুভ্র পুতপবিত্র পর্বত। হে পর্বত, তোমাকে জয় করতে নয়, ক্ষমা চাইতে বারবার ছুটে আসবো চূড়ায়। (শেষ)

 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮/তারা

Walton Laptop
 
     
Marcel
Walton AC