ঢাকা, শুক্রবার, ২ অগ্রহায়ণ ১৪২৫, ১৬ নভেম্বর ২০১৮
Risingbd
সর্বশেষ:

শান্ত সোমেশ্বরীর জলে নীলের নাচন

গাজী মুনছুর আজিজ : রাইজিংবিডি ডট কম
 
     
প্রকাশ: ২০১৮-১১-০৫ ৪:৫৬:১১ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৮-১১-০৫ ৪:৫৬:১১ পিএম

গাজী মুনছুর আজিজ: প্রথম দেখাতেই মুগ্ধ হলাম সোমেশ্বরী নদীর সৌন্দর্যে। নীলাকাশ, শান্ত নদী আর পাহাড় মিলে সত্যিই অনন্য! এ অনন্য ছুঁতেই নভেম্বরের এক সকালে হাজির হই নেত্রকোণার সুসং দুর্গাপুরের বিরিশিরিতে। সঙ্গে আছেন কবিবন্ধু রাসেল মাহমুদ ও এসএম মিজান। দুর্গাপুর বাজারের এক হোটেলে সবজি দিয়ে গরম ভাত খেয়ে শুরু করি বিরিশিরির সারাদিন। বাজার থেকেই দিনব্যাপী রিকশা ভাড়া নেই। রিকশা চালক মোতালেব বয়সে তরুণ। হাসিখুশি মোতালেব আমাদের নিয়ে যাত্রা করে বিরিশিরির নানা ঐতিহ্য দর্শনে।

প্রথমে আসি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর কালচারাল একাডেমিতে। সরকারি এই প্রতিষ্ঠান মূলত এখানকার উপজাতীদের সংস্কৃতি চর্চা কেন্দ্র। একাডেমিতে উপজাতীদের বিভিন্ন নিদর্শনের একটি জাদুঘর আছে। দর্শনীর বিনিময় দশ টাকা। খোলা থাকে রবি থেকে বৃহস্পতি সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত। একাডেমি থেকে বেরিয়ে চলে এলাম বিরিশিরি বধ্যভূমিতে। সোমেশ্বরীর তীরে এই বধ্যভূমিতে মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের স্মরণে একটি স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা হয়েছে। বধ্যভূমি দেখে নদীর পাড় ধরে হাঁটতে শুরু করি খেয়া পারের দিকে। সোমেশ্বরীর একপাশে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে সবুজ পাহাড়। অন্যপাশে লোকালয়। এরই মাঝ দিয়ে বয়ে চলেছে নদী। নদীর ঢেউ নেই। পানি স্বচ্ছ কাঁচের মতো। নদীর দুইপাড়ে কিছুটা বালুচর। মাঝখানে কোথাও হাঁটু সমান, কোথাও কোমর সমান, আবার কোথাও পানি একদম নেই। পানির রং অনেকটা নীল। ঠিক নীল নয়, আকাশের নীলের সঙ্গে মিলেছে, তাই নীল মনে হয়। সব মিলিয়ে ছবির মতো। আর যে পাহাড় উঁচু হয়ে দাঁড়িয়ে তা, বাংলাদেশ-ভারত সীমানা প্রাচীর। ভারতের মেঘালয়ের গারো পাহাড় থেকে নেমে এসেছে এই সোমেশ্বরী। আদি নাম সমসাঙ্গ। নদীটির তলদেশে রয়েছে কয়লার খনি। স্থানীয়রা সারাদিন নদীতে নৌকায় করে কয়লা সংগ্রহ করেন। এছাড়া নদী থেকে স্থানীয়রা প্রচুর বালু ও পাথরও সংগ্রহ করেন।



রিকশাসহ খেয়া নৌকায় সোমেশ্বরী পাড় হয়ে আসি তিরিবাজার। তারপর চলতে শুরু করি বিজয়পুর চীনা মাটির পাহাড়ের উদ্দেশ্যে। তবে রাস্তা মোটেই ভালো নয়। তাই সোমেশ্বরীর পাড় ধরে কখনও হেঁটে, কখনও রিকশায় চলছি। বেশ কিছুটা পথ চলার পর আসি কুল্লাগড়া মন্দির। মন্দিরটি নির্মিত নান্দনিক কারুকার্যে। নবান্নের আগমনে বিরিশিরি গ্রামের মাঠগুলো যেনো হেসে উঠেছে সোনালি ফসলে। পাকা ধানের শীষগুলো হালকা বাতাসে দোল খায়, যেনো আনন্দের নাচন। কিছু কিছু মাঠে দেখি কৃষক ধান কাটছেন। কেউ কেউ কাটাধান নিয়ে ফিরছেন বাড়িতে। পথের দু’পাশে ফসল ভরা মাঠ আর কৃষকের এমন হাসিমাখা মুখ দেখতে দেখতে এগিয়ে চলছি। বেশ কিছুক্ষণ পথ পাড়ি দেওয়ার পর আসি টঙ্ক ও কৃষক আন্দোলনের পথিকৃত নেত্রী হাজংমাতা শহীদ রাশিমণির স্মৃতিসৌধে। ১৯৪৬ সালের ৩১ জানুয়ারি রাশিমণি হাজং ও তার সহযোদ্ধা সুরেন্দ্র হাজং বহেড়াতলীতে শহীদ হন। তাদের স্মৃতির উদ্দেশ্যে নির্মিত এ স্মৃতিসৌধ। একটু বিশ্রাম নিয়ে আবার রিকশায় উঠি।



বিজয়পুরের পথটা এমন, যে মাঝেমধ্যে হাঁটা নয়, বরং মাঝেমধ্যে রিকশায় উঠতে হয়। পথের এমন করুণ অবস্থা দেখে মনে মনে ভাবি, রিকশা না আনাই ভালো ছিল। অবশেষে আমাদের রিকশা যখন বিজয়পুর পাহাড়ের কাছাকাছি, তখন আমাদের রিকশার পেছন পেছন একটি শিশু এগিয়ে এলো। আমরা রিকশা থেকে নেমে তাকে জিজ্ঞাসা করলাম- তুমি কে? তার সোজা উত্তর- আমি গাইড। তার মুখে ‘গাইড’ শব্দটি শুনে কিছুটা অবাক হই। কারণ, এখানে তেমন কিছু নেই যে, গাইডের সাহায্যে দেখতে হবে। তবু তাকে সঙ্গে নেই, তার গাইডসুলভ পেশাদার কথার জন্য। গাইড মোশাররফ আমাদের নিয়ে চলল বিজয়পুর চীনা মাটির পাহাড় দেখানোর জন্য।

চীনা মাটির পাহাড়ে যাওয়ার কিছুটা আগে আমরা আরেকটি পাহাড়ে উঠি। মোশাররফ বলল, এর নাম কোহিনূর। কোহিনূরের চূড়ায় উঠে বিজয়পুর দেখি পাখির চোখে। এমন দৃশ্য দেখে মুহূর্তেই ভুলে যাই কষ্ট করে আসা পথের কথা। কোহিনূরের চূড়ায় একটি পাথর দেখিয়ে মোশাররফ বলল, এটি নাকি জীবন্ত। ছোটবেলায় সে এ পাথর ছোট দেখেছে, আস্তে আস্তে এটি বড় হয়েছে। তার কথার সত্যতা যাচাই করার প্রয়োজন নেই। কারণ সে আমাদের গাইড। কোহিনূর থেকে নেমে আসি প্রত্যাশিত সেই চীনা মাটির পাহাড় আর নীল পানির কাছে।



মূলত এ পাহাড় চীনা মাটির খনি। ছোট বড় টিলা-পাহাড় আর সমতলভূমি মিলে প্রায় ১৫.৫ কিলোমিটার দীর্ঘ ও ৬০০ মিটার প্রস্থ এ খনিজ পাহাড়। ১৯৫৭ সালে খনিজ সম্পদ উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী পাহাড়ে সাদামাটির পরিমাণ ছিল ২৪ লাখ ৭০ হাজার মেট্রিক টন, যা বাংলাদেশের ৩০০ বছরের চাহিদা পূরণ করতে পারবে। পাহাড়গুলোর রং অধিকাংশ সাদা। কোথাও লালচে ভাব। পাহাড় থেকে সাদামাটি তোলায় কোথাও কোথাও হ্রদের সৃষ্টি হয়েছে। এ হ্রদের পানির রং অনেকটা নীল। এ কারণে হ্রদের পানিকে স্থানীয়রা ‘নীলপানি’ বলেন। চারপাশের সাদা পাহাড়ের মধ্যখানে হ্রদের স্বচ্ছ পানি এবং আকাশের নীল রঙের সঙ্গে মিশে ছোট্ট এ  হ্রদের পানি আসলেই নীল মনে হয়। এই দৃশ্য অসাধারণ! বাণিজ্যিকভাবে এখনও এসব পাহাড় থেকে চীনামাটি বা সাদামাটি সংগ্রহ করা হচ্ছে।

চীনা মাটির পাহাড়ের কাছেই একটি পাহাড়ে সুরঙ্গ ভবন আছে। আমরা অবশ্য সেখানে প্রবেশ করিনি। সামনে থেকেই দেখেছি। মোশাররফ জানাল এটি নাকি একাত্তরের সময়কার, এখানে নাকি মুক্তিযোদ্ধাদের একটি ক্যাম্প ছিল। সব দেখে মোশাররফকে বিদায় জানিয়ে আবার উঠি রিকশায়। এবার গন্তব্য রাণীখং মিশন। উচুঁ টিলার উপর ১৯১২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় সাধু যোসেফের ধর্মপল্লী। এখানে একটি স্কুলও আছে।



পরের গন্তব্য বিজয়পুর বিজিবি ক্যাম্প। মাঝে বিরতি দেই টি-স্টলে। দু’পাশে বনায়ন করা এখানকার পথগুলো যেন সবুজ সুরঙ্গ। মাঝে-মধ্যে দেখা মেলে গারো আদিবাসীদের। তারা কেউ পিঠে ঝুড়ি বেঁধে, কেউ কোলে বাচ্চা বেঁধে চলছে যে যার গন্তব্যে। দেখতে ভালোই লাগছে। সোমেশ্বরী পাড়ে টিলার চূড়ায় বিজয়পুর ক্যাম্পটির পাশে একটি অবকাশ কেন্দ্রের মতো আছে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এ অবকাশ কেন্দ্রের বৈঠকখানায় বসে খাই ঝালমুড়ি আর আচার। কিছুটা সময় বেশ ভালোই কাটাল এখানে। তারপর আবার ছুট। এবার আমাদের রিকশাচালক কাম গাইড নিয়ে এলো গারো পাহাড়ের চূড়ায়। চূড়ায় উঠতে রাসেল আর মিজান ভাইয়ের দম রীতিমতো যায়-আসে অবস্থা। চূড়ায় একটি পর্যবেক্ষণ টাওয়ার আছে, সেখানে দাঁড়িয়ে বিজিবি সীমান্ত পাহারা দেয়। এখান থেকে ফেরার পথে খেয়া পার হয়ে শিবগঞ্জ বাজারে চলে এলাম। দেখলাম দুর্গাপুর রাজবাড়ি। তারপর কমলা রানী দিঘি বা সাগর দিঘি। অবশ্য আগের চেহারায় নেই এই দিঘি। তারপর আবার দুর্গাপুর বাজার। তখন সন্ধ্যা নামছে। বাজারের লাকী হোটেলে ভাত খেয়ে ধরি ঢাকার পথ।

ছবি : লেখক




রাইজিংবিডি/ঢাকা/৫ নভেম্বর ২০১৮/তারা

Walton Laptop
 
     
Marcel
Walton AC