ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৫, ১৩ ডিসেম্বর ২০১৮
Risingbd
সর্বশেষ:

পূর্ণিমায় মণিপুরি রাসনৃত্য

গাজী মুনছুর আজিজ : রাইজিংবিডি ডট কম
 
     
প্রকাশ: ২০১৮-১১-২৪ ৩:৫১:৩৪ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৮-১১-২৪ ৩:৫১:৩৪ পিএম

গাজী মুনছুর আজিজ: পরিষ্কার আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ। চাঁদের আলো ছড়িয়ে পড়ছে গোটা মাঠে। মাঠের এককোণে গোলাকার মণ্ডপ। সেই মণ্ডপের মাঝখানে চলছে রাসনৃত্য। রাসলীলা উপলক্ষে কার্তিক মাসের পূর্ণিমা রাতে মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জের আদমপুরের তেতইগাঁও মণিপুরি কেন্দ্রীয় মণ্ডপে বসে এ রাসনৃত্যের আসর। রাসপূর্ণিমার এ রাসনৃত্য মণিপুরি সম্প্রদায়ের প্রধান বার্ষিক উৎসব। স্থানীয় বন্ধুদের আমন্ত্রণে একাধিক বছর রাসলীলার এ উৎসবে যোগ দিই এবং সারারাত জেগে রাসনৃত্য দেখি।

তেতইগাঁও ছাড়াও বাংলাদেশে রাসনৃত্যের সবচেয়ে বড় আসর বসে কমলগঞ্জের মাধপপুর জোড়া মণ্ডপে। ইতিহাসের পাতা থেকে জানা যায় মণিপুরি রাজ্যের বাইরে ১৮৪২ সালে মাধপপুর জোড়া মণ্ডপেই প্রথম রাসলীলার সূত্রপাত হয়। সেই থেকে এখনও প্রতি বছর এখানে রাসনৃত্যের আসর বসে। তবে তেতইগাঁওয়ে রাসনৃত্যের আসর বসে তিন দশক ধরে।

রাসনৃত্যের মণ্ডপটি সাজানো কাগজের ফুল ও কাপড় দিয়ে। মণ্ডপের চারপাশে কৃতিম আলো জ্বলছে। আর মণ্ডপ ঘিরে বসে আছেন নানা বয়সের নারী-পুরুষ। তাদের সবার চোখ মণ্ডপের মাঝখানে নৃত্যরতদের প্রতি। নৃত্য করছে ১৫ থেকে ২০ জনের মণিপুরি কুমারি মেয়ে। মণ্ডপের এককোণে বসে ৫ থেকে ৬ জন বৃদ্ধ নারী-পুরুষ বিশেষ বাজনা ও গান গাইছেন। সে গান ও বাজনার তালেই চলে এ নৃত্য।
 


নৃত্য দেখছেন যারা, তারা মাঝেমধ্যে নৃত্যশিল্পীদের উদ্দেশে বাতাসাসহ শুকনা মিষ্টি জাতীয় খাবার ছুড়ে দেন। কেউ কেউ নৃত্যশিল্পীদের প্রণাম করে নগদ টাকাও দেন। কেউ আবার টাকার মালা বানিয়ে নৃত্যশিল্পীদের গলায় পরিয়ে দিয়ে আসেন। এ নৃত্য চলে সারারাত।

রাসলীলা উৎসবের শুরুটা হয় গোষ্ঠলীলা বা রাখাল নৃত্য দিয়ে। একই মণ্ডপে এ নৃত্য হয় সকালে। যারা রাখাল নৃত্য করে তারা প্রথমে মণ্ডপে গোল হয়ে গোপী ভোজন করে। গোপী ভোজন হলো- বিভিন্ন সবজি দিয়ে রান্না করা তরকারি ও ভাত। এ খাবার খেয়েই রাখাল নৃত্য শুরু করে শিল্পীরা। সকালে শুরু হয়ে রাখাল নৃত্য একটানা চলে বিকাল পর্যন্ত। মণিপুরি শিশু-কিশোর এ নৃত্য পরিবেশন করে। যারা নৃত্য করে তারা এক ধরণের বিশেষ পোশাক পরে। ঝলমলে এ বিশেষ পোশাকের নাম ‘পলয়’। পোশাকের পরিকল্পনা করেছিলেন রাজা ভাগ্যচন্দ্র। রাখাল নৃত্যের মূল বিষয়বস্তু হলো- কৃষ্ণ ও তার সাথীদের নিয়ে। গোলাকার মণ্ডপে কখনও একক, কখনও দ্বৈত এবং কখনও দল বেঁধে এ নৃত্য পরিবেশিত হয়। রাখাল নৃত্যের পাশাপাশি দিনভর চলতে থাকে মণিপুরিদের নিজস্ব সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড।

সন্ধ্যার পর শুরু হয় রাসপূর্ণিমার রাসলীলার রাসনৃত্য। রাসনৃত্য পরিবেশন করে মণিপুরি কুমারি মেয়েরা। রাসনৃত্যের সময়ও পলয় পড়া হয়। পলয় পোশাকের মাথার উপরি ভাগের নাম ‘কোকুতম্বি’। পোশাকের মুখের উপর পাতলা স্বচ্ছ আবরণ থাকে। তার নাম ‘মাইমুখ’। গায়ে থাকে সোনালি ও রূপালি চুমকির কারুকাজের ঘন সবুজ ভেলভেটের ব্লাউজ। পরনে থাকে ঘন সবুজ রঙের পেটিকোট, যা শক্ত বক্রম দ্বারা গোলাকৃতি ও ভাঁজমুক্ত করা হয় এবং অজস্র চুমকি ও ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আয়না দ্বারা কারুকাজ করা, যা সামান্য আলোতেও ঝলমল করে ওঠে। পলয়ের এ অংশের নাম ‘কুমিন’। এছাড়া জরির কারুকাজ করা পেশোয়ান খাওন, খবাংনপ পলয়ের অংশ। এছাড়া পলয়ের সঙ্গে কলথা, খবাংচিক, খুঁজিসহ ইত্যাদি স্বর্ণালংকারও নৃত্যশিল্পীরা পরেন।
 


রাস নৃত্যের মূল বিষয়বস্তু হলো- রাধা ও তার সখাদের নিয়ে। এ নৃত্যে রাধা-কৃষ্ণের প্রেমের শুরু, মান-অভিমান এবং শেষে মিলন দেখানো হয়। মহারাজ ভাগ্যচন্দ্র ১৭৮৯ সালে ভারতের মণিপুর রাজ্যে রাসপুর্ণিমায় রাসলীলার প্রবর্তন করেন। তিনি স্বপ্নে দেখতে পান রাধা ও কৃষ্ণের রাসলীলা। তারপর তিনি স্বপ্নের আলোকেই উপস্থাপন করেন রাসলীলার রাসনৃত্য। তিনি কয়েকজন কুমারি মেয়ে দিয়ে স্বপ্নের মতো রাসলীলা করালেন। তার নিজ কন্যা কুমারী বিশ্বাবতীকে শ্রীরাধা এবং মন্দিরের শ্রীগোবিন্দকে শ্রীকৃষ্ণের ভূমিকায় অবতীর্ণ করে রাসলীলা করেন এবং তিনি নিজেই ওই রাসে মৃদঙ্গবাদক ছিলেন। তাতে তিনি নিজস্ব তাল ব্যবহার করেন। তার সেই তালই এখন পর্যন্ত চলছে। মহারাজ ভাগ্যচন্দ্র কেবল রাসলীলা প্রবর্তনই করেননি, রাসলীলায় বিভিন্ন আঙ্গিক পদ্ধতির বিষয়ে বইও লিখেছেন। তার তিরোধানের পর মহারাজ চন্দ্রকীর্তি এ উৎসবকে আরও বেশি জনপ্রিয় করার জন্য কাজ করেন এবং উৎসবকে মণিপুরিদের মাঝে ছড়িয়ে দেন।

রস থেকেই রাস শব্দের উৎপত্তি। রাস হচ্ছে শ্রীকৃষ্ণের সর্বোত্তম মধুর রস। আর লীলা মানে খেলা। অর্থাৎ রাসলীলার মানে শ্রীকৃষ্ণ, শ্রীরাধা ও তাদের সখা-সাথীদের লীলাখেলা। মণিপুরি সমাজে রাসনত্যৃ আবার ছয়টি ভাগে ভাগ করা। এগুলো- মহারাস, বসন্তরাস, নিত্যরাস, কুঞ্জরাস, গোপীরাস ও উদখুলরাস। এর মধ্যে মহারাস হচ্ছে বিশেষ বৈশিষ্ট্যপূর্ণ। রাসলীলা উপলক্ষে মণিপুরিরা বিভিন্ন সবজি, ডাল, গাছের লতা-পাতা দিয়ে উতি, পাকাউরা, সৈবুম, ইরোলবা নামের বিশেষ খাবার তৈরি করেন। মণ্ডপে সবাই একসঙ্গে বসে কলাপাতায় এ খাবার খান। এছাড়া মণিপুরি মেয়েরা রাসলীলা উপলক্ষে নিজেদের তাঁতে বোনা শাড়ি পরেন। এসব শাড়ির নকশা হয় কালো রঙের পাড় এবং সবুজ, খয়েরি, ছাইসহ বিভিন্ন রঙের লম্বা চেকের মাধ্যমে। পুরুষরা পরেন সাদা ধুতি ও পাঞ্জাবি, আর গলায় থাকে ওড়না।

রাসলীলা উপলক্ষে মণ্ডপ প্রাঙ্গণে গ্রামীণ পণ্যের মেলা বসে। এছাড়া অনুষ্ঠিত হয় আলোচনা সভা, গুণিজন সংবর্ধনা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এ অনুষ্ঠানে মণিপুরিরা তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি-তলোয়ার নৃত্য, মশাল নৃত্য, মার্শাল আর্ট, নাচ, ঢোলক নৃত্যসহ বিভিন্ন নাচ-গান পরিবেশন করেন। মণিুপরি সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব হামোম তনুবাবু বলেন, মণিপুরিদের হলেও এখন রাস উৎসবে যোগ দেন স্থানীয় শ্রেণী পেশার সব ধর্মের মানুষ। এছাড়া উৎসবে অংশ নিতে দেশের বিভিন্ন স্থানসহ ভারত থেকেও সংস্কৃতিপ্রেমীরা ছুটে আসেন প্রতি বছর।
 


বাংলাদেশে মণিপুরি সম্প্রদায়ের অধিকাংশ বসবাস করছেন মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলায়। এছাড়া সিলেট ও মৌলভীবাজারের বিভিন্ন এলাকায়ও রয়েছে মণিপুরিদের বসবাস। বাংলাদেশে মণিপুরি সম্প্রদায়ের বসবাস ২০০ বছরের বেশি সময় ধরে। এদেশে তাদের সংখ্যা প্রায় ২৫ হাজার। ভারতের মণিপুর রাজ্য থেকে তারা আসেন বাংলাদেশে। মণিপুরিদের তিনটি গোত্র রয়েছে। এগুলো হলো- মৈতেই, বিষ্ণপ্রিয়া এবং মৈতেই পাঙ্গাল। বিষ্ণপ্রিয়া ও মৈতেই গোত্রের লোকেরা সনাতন ধর্মে বিশ্বাসী। এরা গৌড়ীয় বৈষ্ণব সম্প্রদায়ভুক্ত। এছাড়া মৈতেই পাঙ্গালরা ইসলাম ধর্মে বিশ্বাসী। তবে সব মণিপুরিদেরই প্রধান বার্ষিক উৎসব রাসপূর্ণিমায় রাসলীলা।

১৯২৬ সালের নভেম্বর মাসে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সিলেটের মাছিমপুর ভ্রমণে এলে তার সম্মানে মণিপুরি রাসনৃত্যের আয়োজন করা হয়। কবিগুরু এ নৃত্যের ভাবরস দেখে বেশ অভিভুত হন। পরে তিনি ত্রিপুরা রাজ বীরেন্দ্র কিশোর মাণিক্যের সঙ্গে যোগাযোগ করে বুদ্ধিমন্ত সিংহকে মণিপুরি নৃত্যের শিক্ষক হিসেবে শান্তি নিকেতনে নিয়োগ করে মণিপুরি নৃত্যকে আন্তর্জাতিক অঙ্গণে পরিচিত করে তোলেন। ২৩ নভেম্বর থেকে মাধবপুরে ১৭৬তম এবং আদমপুরে ৩৩তম এবারের রাসলীলা অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

ছবি : লেখক

 

 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/২৪ নভেম্বর ২০১৮/তারা

Walton Laptop
 
     
Marcel
Walton AC