ঢাকা, বুধবার, ১১ বৈশাখ ১৪২৬, ২৪ এপ্রিল ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

অপরূপ জলধারায় আকাশ ঢেলেছে নীল

ইকরামুল হাসান শাকিল : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-০১-২২ ৫:০৬:১৮ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৯-০১-২২ ৫:০৬:১৮ পিএম

সকালে ঘুম থেকে উঠেই নামরুং-এর চারপাশ দেখে মুগ্ধ হলাম! যদিও দুর্গম অঞ্চল তারপরও একটি ব্যয়বহুল কটেজ চোখে পড়লো। অনেকটা হোটেলের মতো। এখানে বরফের অস্তিত্ব না থাকলেও হাড় কাঁপানো শীত আছে। আমরা শীতের পোশাক বের করে পরে নিলাম। সকালের খাবার খেয়ে আজকের যাত্রা শুরু হলো। নামরুং থেকে বেরিয়ে কিছুদূর হাঁটার পরেই শুরু হলো চড়াই। কিছুটা উঠে আসার পর শীতের পোশাক খুলে ফেলতে হলো। কিছুটা দূর থেকে ভেসে এলো বৌদ্ধ গোম্ফা থেকে গম্ভীর প্রার্থনার সুর। বুঝতে পারলাম সামনে জনপদ আছে। একটি গেইট পার হলাম। তিব্বতে প্রতিটি গ্রামে ঢুকতে প্রথমে এরকম গেইট পার হতে হয়। আমরা লিহি নামক একটি তিব্বতিয়ান গ্রামে প্রবেশ করলাম। ওদের রীতি অনুযায়ী প্রার্থনা পতাকা উড়ছে। রাস্তার পাশের প্রেয়ার হুইলও ঘুরিয়ে দিলাম। এখানে চা বিরতি দেয়া হলো।

গরম চা-পান শেষে আবার পথে নামতে হলো। তিন হাজার মিটার উপরে প্রাকৃতিক ভূ-বৈচিত্র্যের চিহ্ন এখন স্পষ্ট চোখে পড়ছে। গাছপালা কমে আসছে। চারপাশে বিরাণ ও রুক্ষ। হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ চোখের সামনে দেখা দিলো বরফে মোড়ানো পর্বত। গাইডের কল্যাণে জানতে পারলাম এর নাম নাইকে পর্বত। পর্বত আবার দৃষ্টির আড়ালে চলে গেলো অন্য একটি পাহাড়ের ওপাশে। ঘণ্টাখানেক  হাঁটার পর সামনে সেই দূরে আকাশ ছুঁয়ে দাঁড়িয়ে থাকা মানাসলু পর্বত দেখা দিলো। এটি বিশ্বের অষ্টম উচ্চতম পর্বত শিখর। আমাদের উত্তেজনা আরো বেরে গেলো! ঝটপট ক্যামেরার শাটার পড়ছে। আমরা সবাই ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে মানাসলুর সঙ্গে নিজেদের ফ্রেম বন্দি করে নিলাম।



আমাদের আজকের গন্তব্য সামাগাঁও। এটি মানাসলুর পায়ের কাছে। দূর থেকে মুহিত ভাই আমাদের সামাগাঁও দেখাচ্ছিলেন। যদিও মেঘের কারণে ততটা দেখা যাচ্ছিলো না। চারপাশে সহচর পর্বতদের সঙ্গে নিয়ে বুক টান করে দাঁড়িয়ে আছে রাজসিক ভঙ্গিতে। পৃথিবীতে মাত্র ১৪টি আট হাজার মিটার উচ্চতার পর্বত আছে।  তার মধ্যে মানাসলু একটি। আর বেশ কয়েকটি আট হাজার মিটারি পর্বতকে কেন্দ্র করে পরিক্রমা পথ আছে। সেই পরিক্রমা পথকে সার্কিট বলে। যেমন অন্নপূর্ণা সার্কিট,  ধওলাগিরি সার্কিট; তেমনি মানাসলুকেও কেন্দ্র করে মানাসলু সার্কিট। এর চারপাশ ঘিরে ট্রেক করা যায়। আমাদের এই অভিযানের সাথে মানাসলু সার্কিট ট্রেকিং করাও একটি উদ্দেশ্য। তবে অন্নপূর্ণা সার্কিট ট্রেকিং যতটা জনপ্রিয় মানাসলু ততটা নয়। যদিও এর প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য কোনো অংশেই কম নয়। বৈচিত্র্যের অন্যতম কারণ হলো এর ট্রেকিং শুরু হয় মাত্র ৬২৫ মিটার উচ্চতা থেকে।  সর্বোচ্চ উচ্চতা ৫ হাজার ১০৬ মিটারের লারকে পাস। যে কারণে হিমালয়ের মানুষ, প্রাণী, আবহাওয়ার উচ্চতার স্তর অনুযায়ী পরিবর্তনের বিষয়গুলো খুব ভালো অনুভব করা যায়।

মানাসলুর শ্বেতশুভ্র আকাশ ছোঁয়া পর্বত শিখর দেখতে দেখতে এগিয়ে চলেছি। আমাদের গাইড জানালেন, সামনে লোহ নামক একটি গ্রামে দুপুরের খাবার বিরতি দিবেন। মাল্লা আগে চলে গেলেন খাবার প্রস্তুত করতে। আর আমাদের সঙ্গে রয়ে গেলেন তাশি শেরপা। আমরা দুপুরের মধ্যেই লোহতে পৌঁছে গেলাম। এই গ্রামটি অনেক সুন্দর এবং বেশ বড়। এখানে কৃষি জমিও আছে। চারপাশে পাহাড়ে ঘেরা বিশাল এক ভ্যালিতে এই গ্রাম। এখানে অনেক লজ রয়েছে এবং প্রতিটা লজই রঙিন ও সাজানো। এক সিঁড়ি উচ্চতায় লজের খাবার টেবিল। সেখানে মিষ্টি রোদে খেতে বসেছি। মানাসলুর অসাধারণ স্বর্গীয় দৃশ্য দেখতে দেখতে দুপুরের খাবার খেলাম। আমাদের সাথে ইউরোপিয় কয়েকজন ট্রেকারও খেতে বসেছে। তাদের সাথে বেশ আড্ডা জমে উঠলো। তারা আজ এখানেই থাকবে। এসেছে লারকে পাস বা মানাসলু সার্কিট ট্রেকিং করতে। আজকের খাবার মেনুতে আছে মহিষের মাংস, মাশরুমের সবজি, ডাল। খাবার শেষে করেই ভরা পেটে আবার হাঁটা শুরু। লোহ থেকে কিছুটা পথ আসার পর থেকেই শুরু হলো চড়াই। কখনো খাড়া চড়াই আবার কখনো কম। এভাবেই এগিয়ে চলছি। একটি ভুতুরে বনের ভিতরে ঢুকে গেলাম। গাছগুলো দৈত্যাকৃতির বড় বড়, গাছের গায়ে মস ফার্ন জাতীয় পরগাছায় ভরপুর। ধীরে ধীরে কচ্ছপ গতিতে একটা সময় হাঁপাতে হাঁপাতে উঠে এলাম শায়লা গ্রামে। চারপাশে উঁচু উঁচু পাহাড় পর্বত দিয়ে ঘেরা এই শায়লা। আমাদের বিথীর আরেক নাম শায়লা। তাই নিজের নামে এখানে গ্রামের নাম দেখে আনন্দে লাঁফাতে শুরু করল। তার সাথে আমরাও তাল দিলাম। এখানে বেশি সময় দাঁড়ালাম না। এখনো অনেক পথ বাকি। তাই সামাগাঁওয়ের উদ্দেশ্যে এগিয়ে চললাম।



একটা সাস্পেনশন ব্রিজ পার হয়ে দূর থেকে মেঘের ভিতর দিয়ে সামাগাঁও দেখতে পেলাম। তারপরেও ঘণ্টাখানেকের পথ। শীতে শরীর জমে আসছে। এখন আর চড়াই নাই। লম্বা এক মাঠে চলে এলাম। মাঠের ঐপ্রান্তে সামাগাঁও। প্রথমে একটি স্কুল পেলাম। স্কুল মাঠে ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা খেলছে। যাইহোক, অবশেষে সামাগাঁও পৌঁছালাম। এখানে আমাদের আবাস গুরঙ লজ। সন্ধ্যার মধ্যেই আমরা ডাইনিং রুমে চলে এলাম। যেহেতু শীতের দেশে আছি তাই ফেদার জ্যাকেটও পরতে হলো। ডাইনিং রুমে হিটারে আগুন জ্বলছে। হিটার ঘিরে অনেকেই বসে আছে, আবার অনেকেই তাস খেলছে, বই পড়ছে। আমি হিটারের কাছে গিয়ে বসে শরীরটাকে উষ্ণ করে নিলাম। সামাগাঁও-এর উচ্চতা ৩ হাজার ৫২০ মিটার। তাই অ্যাক্লেমাটাইজেশনের জন্য একদিন এখানে থাকতে হবে। আজ আমাদের বিশ্রামের দিন। পর্বতে বিশ্রাম বলতে শুয়ে বসে থাকা নয়। শুধুমাত্র উপরে চলে না গিয়ে একই স্থানে অবস্থান করা। আজ আমরা মানাসলু বেসক্যাম্পের দিকে যাবো। এই বেস ক্যাম্পের উচ্চতা ৪ হাজার ৯শ মিটার। তবে আমরা এতো উঠবো না। কিছুদূর পর্যন্ত ট্রেকিং করে আবার এখানেই ফিরে আসবো। সামাগাঁও-এর চারপাশ বরফে ঢাকা। দক্ষিণে নাদী চুলি, হিমাল চুলি, সিমনাঙ পর্বত শিখর। উত্তর-পশ্চিমে নাইকে। আর ঠিক পশ্চিমে মানাসলু। মুহিত ভাইয়ের নির্দেশে আমার ব্যাগে কিছু শুকনো খাবার ও পানি নিয়ে বেরিয়ে পরলাম মানাসলু বেসক্যাম্পের উদ্দেশ্যে। সকাল থেকেই সূর্য অস্তিত্ব জানান দিলো বেশ তেজ নিয়ে। রৌদ্রজ্জ্বল একটি চমৎকার দিন। আমরা সামাগাঁও থেকে বেরিয়ে সমতল মাঠ পেরিয়ে এখন চড়াইয়ের ঢালে বসে বিশ্রাম নিচ্ছি। গতকালই একজন জাপানিজ মানাসলু সামিট করেছে এসেই খবরটি শুনেছি। একটা অভিযান সফল হলে চারপাশ উৎসবমুখর থাকে। সেটা রাতেই টের পেয়েছি। আজ একটি অভিযাত্রী দল নেমে আসছে। তাদের সাথে দেখা হয়ে গেলো। যদিও তারা শুধুমাত্র বেসক্যাম্প ট্রেকিংয়ে এসেছে। তাদের কাছে পুনরায় সেই জাপানিজ পর্বতারোহীর সামিটের খবর পেলাম।

আরো কিছুটা চড়াই উঠে এসে আমাদের চোখ কপালে উঠে গেলো। এর কারণ পান্না সবুজ জলের মায়াবি লেক বীরেন্দ্র তাল। এই বীরেন্দ্র তালের কথা গতকাল থেকেই মুহিত ভাই ও নুর ভাইয়ের কাছে শুনছি। এখন সেই লেকের পাশে দাঁড়িয়ে আছি। উপর থেকে দেখছি কি এক অপরূপ জলধারা যেখানে আকাশ তার সমস্ত নীল ঢেলে দিয়েছে। ৩ হাজার ৪৫০ মিটার উচ্চতার এই লেক মানাসলুর গ্লেশিয়ার থেকেই উৎপত্তি। গ্লেশিয়ারের বরফ গলা জল প্রথমে এই লেকেই এসে পরে। এখান থেকে ছোট জলধারা দিয়ে এসে মিশে যায় বুড়িগন্ধাকীর স্রোতে। মুহিত ভাই ঘোষণা দিলেন, যে এই লেকে ডুব দিতে পারবে তাকে একশো ডলার পুরস্কার দেয়া হবে। প্রথমে আমি আর সানভি ভাই ডুব দেয়ার কথা ভেবেছি। কিন্তু যখন দেখলাম লেকের জলে বরফ ভাসছে তখন আর ডুব দেয়ার সাহস হলো না। এখানে ডুব দিলে ফ্রস্টবাইটে যে অঙ্গহানি ঘটার আশঙ্কা রয়েছে সেটা বুঝতে খুব একটা জ্ঞানী না হলেও চলবে।



আকাশ এতো নীল হতে পারে, না দেখলে ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব না। ছিটেফোঁটা মেঘও নেই আকাশে। আবহাওয়া এতো ভালো যে মানাসলু তার পুরো রূপ আমাদের উজার করে দেখাচ্ছে। মুহিত ভাই বললেন এর আগের দুইবার এরকম পরিষ্কার আকাশ, ও এতো ভালো আবহাওয়া পাননি। সেসময় এই মানাসলু এতো পরিষ্কারভাবে দেখেননি। নুর ভাই জিপিএস দেখে জানালেন আমরা চার হাজার মিটার উচ্চতায় চলে এসেছি। তাই এখানেই থামার সিদ্ধান্ত নেয় হলো। আমরা আর উপরে উঠছি না। এখান থেকেই নেমে যাবো। এবার মানাসলু বেসক্যাম্পে আর যাওয়া হবে না, তবে আবার ফিরে আসবো এই মানাসলুতে কোন এক অভিযানে সেই স্বপ্ন জমিয়ে রাখলাম। বেশ কিছু সময় এখানে বসে মুহিত ভাইয়ের কাছে মানাসলু আরোহনের অভিজ্ঞতা শুনলাম। এটা আমদের কাছে কতো বড় প্রাপ্তি তা বলে বুঝাতে পারবো না। ২০১১ সালে তিনি বিশ্বের অষ্টম উচ্চতার এই শিখরে উড়িয়েছিলেন লাল-সবুজের পতাকা। আজ সানভি ভাইয়ের জন্যও বিশেষ একটি দিন। কারণ এটিই তার সর্বোচ্চ উচ্চতায় আসা। যদিও এর আগে সান্দাকফু ট্রেকিং করেছিলেন। গরম পানি আর সাথে আনা শুকনো খাবার খেয়ে আবার ফিরতি পথে নামা শুরু করলাম। সামাগাঁও নেমে দুপুরের খাবার খেয়ে লজের সবুজ ঘাস আর গাঁদাফুলের মাঝে মিষ্টি রোদে বসে আড্ডা দিলাম। এখান থেকে মানসলু যেন হাতছোঁয়া দূরত্বে। সামাগাঁও হয়তো এ অঞ্চলের সবচেয়ে বড় ও আধুনিক সুবিধাসমৃদ্ধ গ্রাম। আমাদের গাইড তাশির মাধ্যমে জানতে পারলাম এখানে প্রায় ২৫৭ ঘর মানুষ থাকে। এদের বেশিরভাগই তিব্বতি জাতিগোষ্ঠির মানুষ। কিন্তু  এখানে যারা হোটেল লজ চালায় তাদের মধ্যে অধিকাংশই গুরঙ জাতিগোষ্ঠীর মানুষ। তিব্বতিদের শারীরিক গঠন, চেহারা, বাড়ি-ঘর পোশাক দেখলেই চেনা যায়। এদের বেশিরভাগের পেশা পশুপালন।  সামাগাঁওয়ে প্রচুর ইয়াকের পাল চোখে পড়ে। আর তিব্বতি নারীরা সেসবের বিষ্ঠা সংগ্রহ করে জ্বালানির জন্য। বিকেলে গ্রামটি ঘুরে দেখে সন্ধ্যায় ডাইনিং রুমে এসে বসলাম। (চলবে)

ছবি: কাজী বিপ্লব




রাইজিংবিডি/ঢাকা/২২ জানুয়ারি ২০১৯/তারা

Walton Laptop
     
Walton AC
Marcel Fridge