ঢাকা, শনিবার, ১১ ফাল্গুন ১৪২৫, ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

জানি না আদৌ ফিরে আসবো কিনা

ইকরামুল হাসান শাকিল : রাইজিংবিডি ডট কম
 
     
প্রকাশ: ২০১৯-০১-৩০ ২:৩৫:৩০ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৯-০১-৩০ ৩:০৪:৩০ পিএম

দুপুরের মধ্যেই আমরা ৫ হাজার ৮৬ মিটার উচ্চতার লারকে বেসক্যাম্পে এসে পৌঁছলাম। আমরা আসার আগেই মাল্লা ও পোর্টাররা চলে এসেছে। গতবছর ঠিক রাস্তার অপর পাশে বেসক্যাম্প করা হয়েছিলো। কিন্তু এ বছর সেখানে পানি নেই বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে রাস্তার এপাশে। আমাদের সঙ্গে আরো একজন শেরপা লারকে পাসের বিপরীতে ভীমতাং থেকে বেসক্যাম্পে এসে যোগ দিয়েছেন। নাম নিমা শেরপা। তিনিও অভিযানের তাঁবুসহ কিছু টেকনিক্যাল সরঞ্জাম এবং খাবার-দাবার নিয়ে এসেছেন।

ছোট একটি জলাধারের পশেই বেসক্যাম্প স্থাপন করা হলো। গাইড ও পোর্টাররা তাঁবু টাঙানোর কাজে লেগে গেলেন। সঙ্গে আনা শুকনো খাবার আর পানি খেয়ে কিছুটা বিশ্রাম নিলাম। এখানে মোট চারটে তাঁবু লাগানো হলো। আমাদের জন্য তিনটি আর গাইডদের জন্য একটি। আমরা তাঁবুর ভিতরে আমাদের ব্যাগপ্যাক রেখে এক তাঁবুর ভিতরে আড্ডা দিচ্ছি। এমন সময় তাশি শেরপা আমাদের জন্য দুপুরের খাবার নিয়ে এলেন। খাবার দেখে ক্ষুধা আরো বেড়ে গেলো! আজকের মেন্যু বিরিয়ানি; রেডিমেট তৈরি। শুধু গরম পানি দিলেই তৈরি হয়ে যায় এই বিরিয়ানি। মসলা প্যাকেটেই থাকে। কিন্তু যে পরিমাণ খাবার এখন আমাদের প্রয়োজন তার তিন ভাগের একভাগ খেতে পারছি। কারণ এখানে বেশি পরিমাণ খাবার রান্না করা যায় না। শুধু বেঁচে থাকার জন্য যতটুকু খাবার না-খেলেই নয় ততটুকুই খেয়ে নিলাম। দেখতে দেখতে সূর্য পশ্চিমে পর্বতের আড়ালে চলে গেলো। অন্যদিকে মেঘে ছেঁয়ে গেলো আকাশ। তাপমাত্রা নেমে গেলো প্রায় শূন্যের কাছাকাছি। সন্ধ্যা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমরা সেই ম্যাকারনি দিয়ে ডিনার করে নিলাম। চোখ বন্ধ রেখে খেয়ে নিলাম বলাই ভালো। যে তাঁবুতে নুর ভাই ও বিপ্লব ভাই, সেই তাঁবুতে আমরা সবাই কিছু সময় আড্ডা দিলাম। তারপর যে যার তাঁবুতে গিয়ে স্লিপিং ব্যাগের জিপার খুলে ভিতরে ঢুকে গেলাম। আমি আর সানভি ভাই একই তাঁবুতে। কিছু সময় দু’জন গল্প করে ঘুমিয়ে পড়লাম। হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেলো ঝড়ের তাণ্ডবে। সন্ধ্যা রাতেও বাতাস ছিলো অনেক, তবে ঝড় ছিলো না। কিন্তু এখন প্রচণ্ড ঝড় হচ্ছে বাইরে। সাথে তুষারপাত! মনে হচ্ছে আমাদেরসহ তাঁবু উড়িয়ে নিয়ে যাবে। আমি সানভি ভাইকে ডেকে তুললাম। তারপর দু’জন তাঁবু ধরে রাখলাম প্রাণপণে। ঝড়ের তেজে তাবু বেঁকে যাচ্ছিল। আমরাও সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে ধরে থাকলাম যাতে উড়ে না যায়। উড়ে গেলেই সর্বনাশ। শেষ রাতের দিকে ঝড় থামলো।
 


রাতে আর ঘুম হলো না। মাথার নিচে নেই বালিশ, ম্যাট্রেসের নিচের অংশ এবড়ো-থেবড়ো হওয়ার কারণে অস্বস্তিকর অবস্থা। ঝড়ের তাণ্ডব নিয়ে সারারাত এপাশ-ওপাশ করে কাটাতে হলো। ভোরে আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে তাঁবুর চেইন খুলে বাইরে বের হয়ে এলাম। আকাশ পরিষ্কার, নেই মেঘের কোনো চিহ্ন, এমনকি তুষারপাতও নেই। তবে চারপাশ সাদা হয়ে বরফে ঢেকে আছে। আজ আমরা এখানেই থাকবো। বিশ্রামের দিন। ব্রেকফাস্ট শেষে মাল্লা, তাশি ও নিমা টেকনিক্যাল জিনিসপত্র নিয়ে উপরে চলে গেলো। আজ তারা হাইক্যাম্পের রোড ওপেন করবে, হাইক্যাম্প তৈরি করবে এবং জিনিসপত্র রেখে আসবে। বেসক্যাম্পের ঠিক দক্ষিণে ছোট-বড় পাথরের মোরেইনের উপর দিয়ে ঘণ্টাখানেক হেঁটে কিছুটা নিচে নেমে এসে শুরু হয়েছে হাই ক্যাম্পে যাওয়ার চড়াই। অনেকটা পথ এখান থেকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। ক্যাম্প থেকে আমরা তাদের ধীরে ধীরে উপরের দিকে এগিয়ে যাওয়া দেখছি। হাইক্যাম্পের আগে একটি ভয়ঙ্কর খাড়া বরফের ঢালে দড়ি লাগাচ্ছে। হাইক্যাম্পটি একটি কোলের মাঝে অবস্থিত। চারপাশে পাথুরে দেয়াল দিয়ে ঘেরা। শুধু সামনের দিকটি খোলা। দিন যত বাড়ছে আকাশে মেঘ ছেয়ে যাচ্ছে। একটা সময় মেঘে পুনরায় আকাশ ঢেকে গেলো। ঠিক গতকালের মতো। আমরা আর তাদের দেখতে পারছি না। বেসক্যাম্পেও শুরু হয়ে গেলো তুষারপাত। আমরা তাঁবুর ভিতর বসে অপেক্ষা করছি কখন তারা ফিরবে।

তুষারপাত আর মেঘের হোয়াইট-আউটের ভিতর থেকে একটা সময় গাইড তিনজনকে দেখতে পেলাম। তারা হাইক্যাম্প থেকে ফিরে আসছে। তাদের উপর দিয়ে বেশ ধকল গেছে দেখেই বুঝতে পারছিলাম। মাল্লা আমাদের তাঁবুতে এলেন। আমরা সবাই এক তাঁবুতেই ছিলাম। তিনি জানালেন, উপরে খাড়া ঢালে রোপ ফিক্সড করে এসেছেন। হাইক্যাম্প স্থাপনও করা হয়েছে। তাদের বর্ণনা থেকে বোঝা গেলো বেশ বিপজ্জনক জায়গায় হাইক্যাম্প। উপর থেকে পাথর পড়ার ভয় রয়েছে। হিডেন ও ওপেন ক্রেভাসও আছে এবং প্রায় হাঁটু পর্যন্ত তুষার জমেছে। আবহাওয়া এখন পুরোপুরি খারাপ। তবে সিদ্ধান্ত হলো সকালে যদি আবহাওয়া ভালো হয় তাহলে হাইক্যাম্পের উদ্দেশ্যে বের হবো আমরা।
 


সন্ধ্যার দিকে ভয়ঙ্কর ঝড়ো বাতাস শুরু হয়ে গেলো। তুষারপাতের মাত্রাও বেড়েছে। নুর ভাইদের তাঁবুতে আমরা সবাই মূল অভিযান নিয়ে আলোচনা করছি। মাল্লাও আমাদের সঙ্গে যোগ দিলেন। ক্লাইম্বিংয়ের পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হলো। আগামীকাল সকালে আবহাওয়া ভালো থাকলে আমরা হাইক্যাম্প চলে যাবো এবং রাতেই হাইক্যাম্প থেকে সামিট পুশ করবো। মাল্লা গতবছর লারকে সামিট করেছে। উপরের রুটের ব্যাপারে তার ধারণা আছে। আমরা তাড়াতাড়ি রাতের খাবার শেষ করে যারযার তাঁবুতে ঢুকে গেলাম। কিন্তু ঘুম আসছে না। ঝড়ের তেজ যেন বেড়েই চলছে। এক পর্যায়ে মনে হলো ঝড়ো বাতাস তাঁবুসহ আমাদের উড়িয়ে নেবে। ব্লিজার্ডও শুরু হয়ে গেছে। বুকটা কাঁপিয়ে তুললো পাশের পর্বতের গাঁ থেকে ভেসে আসা অ্যাভেলাঞ্জের ভয়াবহ গর্জন। নানান দুশ্চিন্তা মাথায় এসে ভর করলো। শেষ পর্যন্ত মাঝরাতের দিকে থামলো সেই ঝড়ের তাণ্ডব। তবুও ঘুম এলো না।
 


নুর ভাইয়ের ডাকে তাঁবু থেকে বের হলাম। চমৎকার এক রৌদ্রজ্জ্বল সকাল। তবে চারপাশে প্রায় গোঁড়ালি পর্যন্ত বরফ জমে গেছে। আকাশে মেঘের ছিটেফোঁটা নেই। বাতাসও নেই তেমন। এতো সুন্দর একটা সকাল দেখবো ভাবতেও পারিনি। মনটা আনন্দে ভরে উঠলো। ব্যাকপ্যাক গুঁছিয়ে নিলাম। রাতেই যেহেতু সামিট পুশ তাই যে জিনিসপত্রগুলো প্রয়োজন সে সবই শুধু নিলাম। অতিরিক্ত কিছুই নিলাম না। এখানেই রেখে যাচ্ছি। তারপরও দেখা গেলো সব কিছু গোছগাছের পর আমাদের একেক জনের ব্যাকপ্যাকের ওজন দাঁড়িয়েছে প্রায় বারো থেকে পনেরো কেজি। অবশ্য এ নিয়ে আমাদের কারও দুশ্চিন্তা নেই। আবহাওয়া ভালো হয়ে গেছে সেটি বড় ব্যাপার। যে স্বপ্নকে আকড়ে এই দুর্গম পর্বতে এসেছি, সেই পর্বতের মূল অভিযান শুরু হচ্ছে আজ। এক অনিশ্চয়তার উদ্দেশে পা বাড়াবো। জানি না আদৌ ফিরে আসবো কিনা? তবু এক ভয়ঙ্কর সৌন্দর্যের দিকে মৃত্যুকে উপেক্ষা করে এগিয়ে যাওয়ার তাড়না আগ্নেয়গিরির লাভার মতো তাড়া দিচ্ছে। সকালের নাস্তা সেরে আমরা পাঁচজন ও তিনজন ক্লাইম্বিং গাইড বেরিয়ে পরলাম হাইক্যাম্পের উদ্দেশ্যে। বেসক্যাম্পে রয়ে গেলো সানভি ভাই ও একজন পোর্টার। তাদের দুজনকে রেখে আমরা ছোট-বড় পাথরের উপর দিয়ে এগিয়ে চলছি। (চলবে)

ছবি: কাজী বিপ্লব

 

 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/৩০ জানুয়ারি ২০১৯/তারা

Walton Laptop
 
     
Marcel
Walton AC