ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৬ আষাঢ় ১৪২৬, ২০ জুন ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

ঈদের ছুটিতে উপকূলের দ্বীপে

গাজী মুনছুর আজিজ : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-০৬-১২ ৪:০১:১৯ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৯-০৬-১২ ৪:০৫:৩৯ পিএম
Walton AC 10% Discount

গাজী মুনছুর আজিজ: বাংলাদেশকে বলা হয় ব-দ্বীপ। বঙ্গোপসাগরের কোল ঘেঁষে দেশের উপকূলীয় অঞ্চল ভোলা, নোয়াখালী, বরিশাল, কক্সবাজারসহ এর আশপাশে রয়েছে বেশ কিছু দ্বীপাঞ্চল। সেখানে আছে মানুষের বাস। আবার কিছু দ্বীপে গেলে দেখা যাবে শুধুই পাখি। এসব দ্বীপের কোনো কোনোটি প্যারাবনে ভরা। আবার কিছু দ্বীপে নতুন করে বনায়ন করা হয়েছে। বনগুলো নানা প্রজাতির জীববৈচিত্র্যে ভরপুর। শুধু জীববৈচিত্র্য নয়, উপকূলের এসব দ্বীপের মানুষের জীবন-যাপনও অন্যরকম। তাদের খাবারে আছে বৈচিত্র্য। যারা পাখি-প্রকৃতি ভালোবাসেন তারা ঘুরে আসতে পারেন দেশের এসব দ্বীপগুলো থেকে। তবে দ্বীপ ভ্রমণে গেলে অবশ্যই শতভাগ পরিবেশবান্ধব হওয়া বাঞ্ছনীয়। অর্থাৎ দ্বীপ অঞ্চলে গেলে, বিশেষ করে দ্বীপের চরগুলোতে যেখানে পাখির বসবাস থাকে, সেখানে গেলে শব্দদূষণ বা হৈচৈ করা থেকে বিরত থাকুন। সম্ভব হলে পুরো ভ্রমণে প্লাস্টিক বর্জন করুন। অন্যদিকে পাখি-প্রকৃতিকে কোনো রকম বিরক্ত করা থেকে বিরত থাকুন। উপকূলীয় অঞ্চলে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য ছোট বড় দ্বীপ। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর এসব দ্বীপের কয়েকটি হলো-

হরিণের দেশ নিঝুম দ্বীপ : নোয়াখালীর হাতিয়ার সাবেক জাহাজমারা ইউনিয়ন এবং বর্তমানের ১১নং ইউনিয়ন নিয়ে নিঝুম দ্বীপ। দ্বীপের চারপাশে মেঘনা নদী। তার পাশেই বঙ্গোপসাগর। দ্বীপের আয়তন ১৬ হাজার ৩৫২ হেক্টর। বিশাল ম্যানগ্রোভ বন নিয়ে গড়ে ওঠা নিঝুম দ্বীপের প্রধান গাছ হলো- কেওড়া, গেওয়া ও বাইন। এছাড়া বিভিন্ন প্রজাতির গাছও রয়েছে। নিঝুম দ্বীপ বনবিট কর্মকর্তা জানান, ১৯৭৭ সালে প্রথম এ বনে ২০টি হরিণ, ৪টি বানর এবং ১টি অজগর সাপ ছাড়া হয়। এর মধ্যে দুটি হরিণ ছাড়ার কিছু দিনের মাথায় মারা যায়। বাকি ১৮টি হরিণ থেকে বেড়ে এখন বনে প্রায় ২০ হাজার হরিণ আছে। বানরও আছে বেশ কিছু। বনের গাছে গাছে অনেক মৌচাক দেখা যায়। আরও আছে বিভিন্ন প্রজাতির আবাসিক ও পরিযায়ী পাখির বাস। শীতের সময় এ দ্বীপের চারপাশে নানা প্রজাতির পরিযায়ী পাখি দেখা যায়। যা দ্বীপের অন্যতম আকর্ষণ।



২০০১ সালে নিঝুম দ্বীপকে জাতীয় উদ্যান হিসেবে ঘোষণা করা হয়। বন অধিদফতর নিঝুম দ্বীপকে নতুনভাবে বনায়নও করে। নিঝুম দ্বীপ বাংলাদেশের একমাত্র সংরক্ষিত বন, যেখানে কোনো মাংসাশী প্রাণী নেই। গ্রীষ্মকালীণ উদ্ভিদে পরিপূর্ণ নিঝুম দ্বীপ অনেকটা দেখতে সুন্দরবনের মতো। নিঝুম দ্বীপ বনের ভেতর দিয়ে ছোট ছোট নদী ও খাল বয়ে গেছে। এর আশপাশে বল্লারচর, কামলারচর, ওসমানচর, মুড়িচর, দমারচরসহ আরও কয়েকটি চর রয়েছে। এর কিছু চরে মানুষের বসবাস রয়েছে। আবার কিছু চরে এখনও মানুষের বসতি নেই। দ্বীপের চারপাশেই মেঘনা নদী। এর পাশেই বঙ্গোপসাগর। এখানকার সূর্যাস্ত ও সূর্যোদয় দুটোই দারুণ!

১৯৫৭ সালের দিকে নিঝুম দ্বীপের যাত্রা শুরু। তখন ওসমান আলী রাখাল নামে একজন এই দ্বীপে মহিষ চরাতেন। অনেকের মতে, তার হাত ধরেই এখানে বসবাস করতে আসেন হাবিবুল্লাহ কোম্পানিসহ তার পরিবার। তখন মাত্র ৭-৮টি পরিবার নিয়েই এ দ্বীপে মানুষের বসবাস শুরু হয়। সত্তরের গোর্কিতে এ দ্বীপের অনেক মানুষ মারা যায়। তারপরও যারা বেঁচে যান তারা পুনরায় গড়ে তোলেন বসতবাড়ি। তখনও এ দ্বীপের নাম রাখা হয়নি। ১৯৭৫ সালে দ্বীপের প্রথম নাম দেয়া হয় ‘চর ওসমান’। তারপর তৎকালীণ হাতিয়ার সংসদ সদস্য এবং সংস্কৃতি ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিরুল ইসলাম ১৯৭৭ সালে দ্বীপের নাম রাখেন ‘নিঝুম দ্বীপ’। ১৯৮৮-৮৯ সালে দ্বীপের জন্য প্রথম সরকারি কাগজপত্র তৈরি হয়। তখন সরকার এখানে ৯টি গুচ্ছগ্রাম গড়ে তোলে। বর্তমানে এখানে ৪৯৮টি পরিবারের জন্য বসতভিটা, কৃষি জমি, পুকুরসহ ধর্মীয় উপাসনালয় রয়েছে। এখানকার বাজারসহ বিভিন্ন বাড়িতে অনেকে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার করেন। নিঝুম দ্বীপে যে বাজার রয়েছে, স্থানীয়রা এই বাজারকে আবদুর রশিদ বাজার বা নামার বাজার নামে চেনেন। তবে এ বাজারের প্রকৃত নাম নিঝুম দ্বীপ বাজার। বাজারে ৪০ থেকে ৫০টি দোকান রয়েছে। বাজারটি সন্ধ্যার দিকে জমে ওঠে। পানি আর অরণ্যেঘেরা নিঝুম দ্বীপে বর্তমানে প্রায় ৩৫ হাজার লোকের বসবাস। এখানে আবদুর রশিদ বাজার বা নামার বাজারকে কেন্দ্র করেই দ্বীপবাসীর জীবন-জীবিকা গড়ে উঠেছে। অধিবাসীদের বেশিরভাগ জেলে ও কৃষক।



যাতায়াত : ঢাকা সদরঘাট থেকে বিভিন্ন লঞ্চ বিকেল সাড়ে ৪টায় ছেড়ে যায় হাতিয়ার তমরুদ্দিনের উদ্দেশে। লঞ্চ থেকে তমরুদ্দিন নেমে ট্রলারে নিঝুম দ্বীপ যাওয়া যাবে। এছাড়া ঢাকার সায়দাবাদ থেকে বাসে নোয়াখালীর সোনাপুর। সেখান থেকে সিএনজি বা অটোরিকশা, লোকাল বাস, সি ট্রাকসহ বিভিন্ন মাধ্যমে নিঝুম দ্বীপ পৌঁছানো যাবে। নিঝুম দ্বীপে থাকার জন্য রয়েছে অবকাশ পর্যটন লিমিটেডের নিঝুম রিসোর্ট। থাকার পাশাপাশি এখানে খাবার ব্যবস্থাও আছে। এছাড়াও নিঝুম দ্বীপ বাজারে থাকা-খাওয়ার জন্য রয়েছে আরও কিছু হোটেল। এছাড়া হাতিয়া শহরে বা এর আশপাশেও থাকা-খাওয়ার জন্য আছে হংকং হোটেল, ধানসিঁড়ি, মোহনা, সম্রাট, প্রিন্সসহ বিভিন্ন হোটেল।

সোনাদিয়া দ্বীপ : সোনাদিয়া দ্বীপ কক্সবাজার জেলার মহেশখালী উপজেলার বঙ্গোপসাগরে জেগে ওঠা বিচ্ছিন্ন একটি দ্বীপ। অল্পসংখ্যক মানুষের বাস এখানে। তবে এখানকার অন্যতম আকর্ষণ- নানা প্রজাতির পরিযায়ী সৈকত পাখি। এর মধ্যে অন্যতম চামচঠুঁটো বাটান; যা পৃথিবীতে মহাবিপন্ন বলে বিবেচিত। কক্সবাজার থেকে মহেষখালী হয়ে প্রথমে অটোরিকশায় তারপর ট্রলারে বা হেঁটে যাওয়া যাবে সোনাদিয়া। তবে এখানে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা নেই।



দমারচর : দমারচর নোয়াখালী জেলার হাতিয়া উপজেলার দক্ষিণে জাহাজমারা-মোক্তারিয়া চ্যানেল নামক মেঘনা নদীর মোহনায় জেগে ওঠা একটি চর। অনেক প্রজাতির সামুদ্রিক পাখি দেখা গেলেও এখানকার অন্যতম বাসিন্দা দেশি-গাঙচষা। পাখি বিশেষজ্ঞদের মতে, শীত মৌসুমে প্রতি বছর এখানে সবচেয়ে বেশি দেশি গাঙচষা দেখা যায় এবং বাংলাদেশে এটাই তাদের বৃহৎ বিচরণভূমি। এই চরে মানুষের বসতি নেই। হাতিয়ার জাহাজমারা থেকে ট্রলারে এখানে আসা যাবে। আর থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে জাহাজমারা বাজারে।

চর শাহজালাল : ভোলার চরফ্যাশনের মেঘনা নদীর মোহনায় জেগে ওঠা এ চরের বয়স প্রায় ২০ বছর। এখানেও মানুষের বসতি নেই। প্রতিবছর শীত মৌসুমে এই চরে একসঙ্গে প্রায় ৫০ প্রজাতির বেশি হাজার হাজার পাখি দেখা যায়। উপকূলের অন্য কাদাচরে একসঙ্গে এতো বেশি পাখি খুব কমই দেখা যায়। এর মধ্যে অনেক দুর্লভ, বিপন্ন পাখিও রয়েছে।

ঢাকা থেকে লঞ্চে ভোলায়, তারপর সেখান থেকে ট্রলারে যাওয়া যাবে এই চরে। এখানে থাকা-খাওয়ার জন্য তাঁবু ও খাবার সঙ্গে করে নিয়ে যেতে হবে।



মনপুরা ও চর কুকরি-মুকরি : মনপুরা দ্বীপের অবস্থান ভোলায়। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এ দ্বীপটিও মেঘনার মোহনায় ও বঙ্গোপসাগরের কোল ঘেঁষা। এখানকার বনাঞ্চলেও হরিণসহ নানা প্রজাতির গাছগাছালি, আবাসিক ও পরিযায়ী পাখি রয়েছে। এ দ্বীপের পাশেই রয়েছে চর কুকরি-মুকরি দ্বীপ। এ দ্বীপেও আছে হরিণ,পাখিসহ নানা প্রজাতির জীববৈচিত্র।

চরফ্যাশন ও জ্যাকব ওয়াচ টাওয়ার : দৃষ্টিনন্দন জ্যাকব ওয়াচ টাওয়ারের অবস্থান ভোলার জেলা শহর থেকে ৭০ কিলোমিটার দূরে চরফ্যাশন উপজেলায়। মূলত প্রকৃতিপ্রেমী ও ভ্রমণপিপাসুদের তৃষ্ণা মেটাতেই এই টাওয়ার নির্মাণ। ১৬তলা বিশিষ্ট প্রায় ২২৫ ফুট উচ্চতার এ ওয়াচ টাওয়ার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সবচেয়ে উঁচু ওয়াচ টাওয়ার হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। প্রায় ১ একর জায়গা জুড়ে এ টাওয়ার নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে চরফ্যাশন পৌরসভা। এর নকশা করেছেন স্থপতি কামরুজ্জামান লিটন। এ বছরের ২৪ জানুয়ারি রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ এর উদ্বোধন করেন। এ টাওয়ারে দাঁড়িয়ে বাইনোকুলার দিয়ে পাখির চোখে দেখা যাবে আশপাশের প্রায় ১০০ বর্গ কিলোমিটার এলাকার দর্শনীয় নানা স্থান। এর মধ্যে আছে সংরক্ষিত বনাঞ্চল চর কুকরি-মুকরি, তারুয়া সৈকত, মনপুরার চর পিয়াল, হাতিয়ার নিঝুম দ্বীপসহ বঙ্গোপসাগরের বিশাল নীল জলরাশি।

২০১৩ সালে শুরু হওয়া এ টাওয়ার নির্মাণে মূল উদ্যোক্তা বন ও পরিবেশ উপমন্ত্রী এবং সংসদ সদস্য আবদুল্লাহ আল ইসলাম জ্যাকব। ভূমির উপর থেকে টাওয়ারের ওপরে অবস্থিত গম্বুজ আকৃতির ওয়াচ পয়েন্ট পর্যন্ত চারদিকে অ্যালুমিনিয়ামের ওপর রয়েছে ৫ মিলিমিটার ব্যাসের স্বচ্ছ কাঁচ। চূড়ায় ওঠার জন্য সিঁড়ির পাশাপাশি আছে ক্যাপসুল লিফট। টাওয়ারে ওঠার টিকিট প্রতিজন ১০০ টাকা। টাওয়ার সংলগ্ন এলাকায় আরও আছে বিশ্রামাগার, প্রাথমিক চিকিৎসা কেন্দ্র, রেস্টুরেন্ট, সুইমিংপুল, ফ্যাশন স্কয়ার ও শিশুপার্ক।




রাইজিংবিডি/ঢাকা/১২ জুন ২০১৯/তারা

Walton AC
     
Walton AC
Marcel Fridge