Risingbd Online Bangla News Portal

ঢাকা     বৃহস্পতিবার   ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২১ ||  আশ্বিন ৮ ১৪২৮ ||  ১৪ সফর ১৪৪৩

স্কুলঘর বিক্রি করে ঋণ পরিশোধ

আবু কাওছার আহমেদ || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৩:২০, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২১   আপডেট: ১৩:৪০, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২১
স্কুলঘর বিক্রি করে ঋণ পরিশোধ

স্কুল প্রাঙ্গণে সবজি চাষ

করোনাভাইরাসের কারণে দেড় বছরের অধিক সময় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় দুই শতাধিক কিন্ডার গার্ডেন স্কুল বন্ধ হয়েছে। এতে অন্তত সাড়ে চার হাজার শিক্ষক কর্মহীন হয়েছেন।

করোনায় প্রতিষ্ঠানের আয় বন্ধ থাকলেও ব্যয় অব্যাহত থাকায় এসব প্রতিষ্ঠান বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছেন স্কুল কর্তৃপক্ষ। এদের মধ্যে কেউ কেউ স্কুল ঘর বিক্রি করে ঋণ পরিশোধ করেছেন। আবার অনেক শিক্ষক পেশা বদল করে অন্য পেশায় চলে গেছেন।

বুধবার (১৫ সেপ্টেম্বর) সকালে টাঙ্গাইল জেলা কিন্ডার গার্ডেন অ্যাসোসিয়েশন সমন্বয় কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক আবির আহামেদ বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

আবির আহামেদ জানান, জেলার ৮১৯টি কিন্ডার গার্ডেনের মধ্যে করোনাভাইরাসের কারণে ২০২টি বন্ধ হয়েছে। এর মধ্যে টাঙ্গাইল সদর উপজেলায় ৮৬টির মধ্যে ১৩টি, দেলদুয়ারে ৪৯টির মধ্যে ১৩ টি, মির্জাপুরে ১১০টির মধ্যে ৩৫টি, সখীপুরে ১১০টির মধ্যে ২৯টি, বাসাইলে ৪৯টির মধ্যে ১০টি, কালিহাতীতে ৮১টির মধ্যে ২৮টি, মধুপুরে ৫৯টির মধ্যে ১২টি, ঘাটাইলে ৯৪টির মধ্যে ২৪টি, ধনবাড়ীতে ৬০টির মধ্যে ১৩টি, গোপালপুরে ৩০টির মধ্যে ৪টি, নাগরপুরে ৫৬টির মধ্যে ১৪ টি ও ভূঞাপুরে ৩৫টির মধ্যে ৭টি কিন্ডার গার্ডেন বন্ধ হয়েছে। এসব কিন্ডার গার্ডেনের ১১ হাজার ৪৩৬ জন শিক্ষকের মধ্যে ৪ হাজার ৫৮৬ জন শিক্ষক বেকার হয়ে পড়েছেন।

সরেজমিন বন্ধ হওয়া কয়েকটি স্কুল ঘুরে দেখা যায়, স্কুল প্রাঙ্গণে সবজি চাষ করা হচ্ছে। এর মধ্যে টাঙ্গাইল সদর উপজেলার পিচুরিয়া গ্রামে হাবিব প্রি-ক্যাডেট স্কুল। প্রতিষ্ঠানটি ২০১৩ সালে ৬০ শিক্ষার্থী নিয়ে যাত্রা শুরু করে। এ প্রতিষ্ঠানে ৯ শিক্ষক চাকরি করতেন। দিন যতই যাচ্ছিলো এই প্রতিষ্ঠানের ততই উন্নতি হচ্ছিল। ২০২০ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত এ স্কুলে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিলো ১২০ জন। এ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের যেমন লেখা পড়ার মান বাড়তে থাকে ঠিক তেমনি শিক্ষকরাও এ প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে পরিবার নিয়ে মোটামুটি চলছিলেন। কিন্তু করোনাভাইরাসের কারণে দেড় বছর প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় প্রথম দিকে প্রতিষ্ঠানের মালিক ঋণগ্রস্ত হলেও পরবর্তীতে স্কুলের তিনটি টিনের ঘর বিক্রি করে ঋণ পরিশোধ করতে হয়েছে। শিক্ষকরাও বেকার হয়েছেন। এই প্রতিষ্ঠান প্রাঙ্গণে এখন সবজি চাষ করা হচ্ছে। হাবিব প্রি-ক্যাডেট স্কুলের মতো টাঙ্গাইল শহরের আকুর টাকুর পাড়া এলাকার কর্ডোভা রেসিডেন্সিয়াল মডেল স্কুলেও গিয়ে একই চিত্র দেখা যায়। প্রতিষ্ঠানটি পাঁচতলা একটি ভবন ভাড়া নিয়ে সাত বছর আগে যাত্রা শুরু করে। কিন্তু করোনাভাইরাসের কারণে বন্ধ হয়েছে। ওই ভবন বর্তমানে আবাসিক হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

হাবিব প্রি-ক্যাডেট স্কুলের শিক্ষক শুকুর মাহমুদ বলেন,  ‘এই স্কুলে চাকরি করে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে ভালই চলতাম। কিন্তু করোনায় স্কুল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আমার চলতে খুব কষ্ট হচ্ছে। সরকার থেকে বেরসকারি শিক্ষকদের প্রণোদনা দিলে আমাদের অনেক উপকার হতো।’

হাবিব প্রি-ক্যাডেট স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক হাবিবুর রহমান বলেন, ‘করোনার কারণে আয় রোজগার না থাকায় ঋণগ্রস্ত হয়ে প্রথম দিকে শিক্ষকদের বেতন দিতে হয়েছে। করোনার প্রকোপ দীর্ঘ হওয়ায় স্কুলের তিনটি টিনের ঘর বিক্রি করে দিয়েছি। শিক্ষকরাও বেকার হয়ে গেছেন। স্কুলের জায়গায় এখন সবজির চাষ করা হচ্ছে। করোনাভাইরাসের কারণে অনেকেই প্রণোদনা পেলেও প্রি-ক্যাডেট এবং বেরসকারি শিক্ষকরা কোনো সহযোগিতা পায়নি। ফলে এদের মানববেতর জীবন যাপন করতে হচ্ছে।’

কর্ডোভা রেসিডেন্সিয়াল মডেল স্কুলের প্রধান শিক্ষক শাহিন আল মাসুদ বলেন, ‘২০১৪ সালে একটি ভবন ভাড়া নিয়ে স্কুলটি যাত্রা শুরু করে। কয়েক বছর ভালভাবে চললেও করোনাভাইরাসে কারণে বন্ধ হয়ে গেছে। স্কুল খুলতে না পারায় এক দিকে শিক্ষকদের বেতন দিতে না পারায় ১৮ শিক্ষক বেকার হয়েছেন। অপরদিকে, ভাড়া নিতে না পারায় মালিকের চাপে ভবন ছেড়ে দিতে হয়েছে। পরে আড়াই শতাধিক শিক্ষার্থীও অন্যত্র চলে গেছে।’

জেলা কিন্ডার গার্ডেন অ্যাসোসিয়েশন সমস্বয় কমিটির আহ্বায়ক অ‌্যাডভোকেট নাসির আহমেদ শাহিন জানান, করোনাকালে বেরসকারি কিন্ডার গার্ডেন স্কুলগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দুই শতাধিক স্কুল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সাড়ে চার হাজার উচ্চ শিক্ষিত শিক্ষক বেকার হয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছে। জেলার সরকারি স্কুলগুলোর চেয়ে কিন্ডার গার্ডেনে পড়াশোনার মান ও ফলাফলও ভাল হয়। এজন্য কিন্ডার গার্ডেনকে রক্ষা করতে সরকারের সার্বিক সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আবদুল আজিজ জানান, স্কুল খোলার পরে কতগুলো কিন্ডার গার্ডেন স্কুল বন্ধ এবং চালু আছে তা বিষয়ে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসারদের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহের কাজ চলছে। কয়েক দিনের মধ্যেই জেলায় কতগুলো কিন্ডার গার্ডেন বন্ধ হয়েছে তা জানা যাবে।

টাঙ্গাইল/বুলাকী

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়