ঢাকা     বুধবার   ০৫ অক্টোবর ২০২২ ||  আশ্বিন ২০ ১৪২৯ ||  ০৮ রবিউল আউয়াল ১৪১৪

অর্থের অভাবে বাড়ানো যাচ্ছে না সরকারি ব্যয়

কেএমএ হাসনাত || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ০৯:৫৫, ৬ আগস্ট ২০২২   আপডেট: ০৯:৫৭, ৬ আগস্ট ২০২২
অর্থের অভাবে বাড়ানো যাচ্ছে না সরকারি ব্যয়

রাশিয়া-ইউক্রেনের যুদ্ধের কারণে অর্থনৈতিক মন্দার মুখোমুখি পুরো বিশ্ব। এ অবস্থায় দেশের অর্থনৈতিক গতিধারা অব্যাহত রাখতে ইতোমধ্যে আইএমএফসহ অন্যান্য ঋণদাতা সংস্থাগুলোর সঙ্গে আলোচনা চলছে। এরই মধ্যে আইএমএফ’র কাছে ঋণ চাওয়া হয়েছে। ভর্তুকি কমাতে শুক্রবার রাত থেকে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে। এতে সরকারের আইএমএফ’র ঋণের বিপরীতে সংস্থাটির দেওয়া শর্ত পূরণ করতেই দাম বাড়ানো হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।

সূত্র জানায়, অর্থাভাবে সরকারি ব্যয় কাঙ্ক্ষিত হারে বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না। এমনকি গেল অর্থবছরের চেয়ে চলতি অর্থবছরে জিডিপির শতাংশ হিসেবে সরকারি ব্যয় (বাজেট) ২ শতাংশ কমে গেছে। খোদ অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে বলা হয়েছে, ‘জিডিপি’র (মোট দেশজ উৎপাদন) শতকরা হিসেবে বাংলাদেশে সরকারি ব্যয় বর্তমানে কিছু উন্নয়নশীল ও উদীয়মান অর্থনীতির তুলনায় কম।

২০২১ সালে যেখানে বাংলাদেশে সরকারি ব্যয় ছিল জিডিপির ১৩ শতাংশ; সেখানে ভারত, মালয়েশিয়া ও ভিয়েতনামে তা ছিল যথাক্রমে ২৮ দশমিক ৮ শতাংশ, ২২.৩ শতাংশ ও ২০.৪ শতাংশ। তাছাড়া উন্নত অর্থনীতিতে সরকারি ব্যয় বাংলাদেশের চেয়ে অনেক বেশি। আগামীতে সরকারি ব্যয় বাড়ানোই বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছে অর্থ মন্ত্রণালয়। আর এ জন্য রাজস্ব বা আয় বাড়ানোর কোনও বিকল্প নেই। কিন্তু বিদ্যমান পরিস্থিতিতে আয় বাড়ানোর কাজটি কতখানি সফল হবে তা নিয়ে রীতিমতো শঙ্কা রয়েছে।

অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে বলা হয়েছে, সরকারের প্রেক্ষিত পরিকল্পনা ২০৪১ ও অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় জিডিপির শতাংশ হিসেবে সরকারি ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি এবং গুণগত ও মানসম্পন্ন সরকারি সেবা নিশ্চিত করার লক্ষে মৌলিক সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিষেবা খাতগুলোতে ব্যয় বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। তবে সীমিত সম্পদ ব্যবহার করে সরকারি ব্যয়ের আকার বৃদ্ধি এবং একই সাথে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ সরকারের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। 

এদিকে অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সদ্য বিদায়ী ২০২১-২২ অর্থবছরে মূল বাজেটের আকার ছিল জিডিপির শতাংশ হিসেবে ১৭ দশমিক ৫ শতাংশ। কিন্তু চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরে তা কমে হয়েছে ১৫ দশমিক ৫ শতাংশ।

এ বিষয়ে অর্থ বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা অনুযায়ী যদি বাজেট তৈরি করা হতো তাহলে চলতি অর্থবছরে বাজেটের আকার অবশ্যই তা সাত লাখ কোটি টাকার বেশি হতো। কিন্তু তা করা সম্ভব হয়নি। শেষমেশ বাজেটের আকার ছয় কোটি ৭৮ লাখ ২৪ কোটি টাকায় গিয়ে ঠেকানো গেছে। এর অন্যতম কারণ সম্পদের স্বল্পতা। একদিকে অভ্যন্তরীণ সম্পদ আশানুরূপ আহরণ করা সম্ভব হচ্ছে না, অন্যদিকে বিদেশি সাহায্য কাঙ্ক্ষিত হারে আসছে না। বিশেষ করে গত দুই বছরে করোনার কারণে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য অনেকটা স্থবির হয়ে পড়েছিল। এর ফলে রাজস্ব আদায়ে এক ধরনের স্থবিরতা দেখা দেয়। ফলে আয় ভালো না হওয়ার কারণে সরকারের পক্ষে ব্যয়ও বেশি করা সম্ভব হয়নি।

সরকারের আয় যে আশানুরূপ বাড়ছে না, তার প্রমাণ পাওয়া যায় জিডিপির শতাংশ হিসেবে এনবিআরের অবদান বছরের পর বছর ধরে সাড়ে ৭ থেকে ৯ শতাংশের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। যেমন, ২০২০-২১ অর্থবছরে জিডিপির শতাংশে এনবিআর অংশ ছিল সাড়ে ৭ ভাগ। ২০২১-২২ অর্থবছরে এটি প্রাক্কলন করা হয়েছিল ৯ দশমিক ৫ ভাগ। কিন্তু পরে তা সংশোধন করে আট দশমিক ৩ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়। একইভাবে চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরে এই হার ধরা হয়েছে ৮ দশমিক ৩ শতাংশ, পরবর্তী ২০২৩-২৪ ও ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রাক্কলন করা হয়েছে যথাক্রমে ৮ দশমিক ৮ শতাংশ ও ৯ শতাংশ। তবে প্রাক্কলন যাই করা হোক না কেন বিদ্যমান পরিস্থিতিতে এই হার অর্জন করা দুরূহ হয়ে পড়বে।

এদিকে, অর্থ বিভাগ ও আইএমএফ সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, ২০২১ সালে বেশ কয়েকটি দেশে সরকারি ব্যয় জিডিপির শতাংশে ২০ ভাগের ওপরে ছিল। এর মধ্যে ফ্রান্সের ৫৭ শতাংশ, সুইডেন ৪৯ দশমিক ৪ শতাংশ, যুক্তরাজ্য ৪১ দশমিক ৭ শতাংশ, অস্ট্রেলিয়া ৩৯ শতাংশ, যুক্তরাষ্ট্র ৩৬ শতাংশ ৮ শতাংশ, চীন ৩৩ দশমিক ৭ শতাংশ, ভারত ২৮ দশমিক ৮ শতাংশ, মালয়েশিয়া ২২ দশমিক ৩ শতাংশ এবং ভিয়েতমান ২০ দশমিক ৪ শতাংশ।

এ অবস্থায় সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, মধ্য মেয়াদে সরকারি ব্যয় আগামীতে সাড়ে ১৫ শতাংশের ওপরে নিয়ে যাওয়া হবে। এ বিষয়ে অর্থ বিভাগ থেকে বলা হয়, ‘সরকার ক্রমান্বয়ে জিডিপির শতাংশ হারে ব্যয় বৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। উদাহরণস্বরূপ, ২০২০-২১ অর্থবছরে সরকারি ব্যয় ছিল জিডিপির ১৩ শতাংশ, যা ২০২১-২২ অর্থবছরে (সংশোধিত বাজেটে) ১৪ দশমিক ৯ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।’ দাবি করা হয়েছে, ‘সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনা সংস্কার কার্যক্রমের সফল বাস্তবায়নের ফলেই তা সম্ভব হয়েছে।’

সূত্র জানায়, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের জন্য বিদেশ থেকে অতি প্রয়োজনীয় ছাড়া কম প্রয়োজনীয় পণ্য আমদানি বন্ধসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়াও আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্যদ্রব্যের দাম বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার।

সূত্র জানায়, গত জুন মাসেই জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছিল। কিন্তু উচ্চপর্যায় থেকে গ্রিন সিগন্যাল না পাওয়ায় তখন দাম বাড়ানো হয়নি। তেল আমদানিতে বৈদেশিক মুদ্রার একটি বড় অংশ ব্যয় করতে হয়। জনগণকে জ্বালানি ব্যবহারে মিতব্যয়ী হওয়া এবং পার্শ্ববর্তী দেশে পাচার রোধেই দাম বাড়ানো হয়েছে।  

ঢাকা/এনএইচ

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়