ঢাকা     শনিবার   ১৫ আগস্ট ২০২০ ||  শ্রাবণ ৩১ ১৪২৭ ||  ২৪ জ্বিলহজ্জ ১৪৪১

সাক্ষাৎকার

আমরা দ্রুত মানুষের বাহবা পেতে চাচ্ছি: প্রিন্স মাহমুদ

আমিনুল ইসলাম শান্ত || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১২:২২, ২ আগস্ট ২০২০  
আমরা দ্রুত মানুষের বাহবা পেতে চাচ্ছি: প্রিন্স মাহমুদ

প্রিন্স মাহমুদ

একটা সময় ছিল প্রতি ঈদে গানের নতুন অ্যালবাম মুক্তি পেত। সাগ্রহে অপেক্ষায় থাকতেন শ্রোতা। দেশের ব্যান্ড সংগীতের সেই স্বর্ণ-সময়ে প্রিন্স মাহমুদ ছিলেন গানের নেপথ্য কারিগর। তাঁর কথা ও সুরে গান মানেই ভিন্ন আবেদন। তারুণ্যে মাতোয়ারা গানপাগল অসংখ্য শ্রোতার কাছে প্রিন্স মাহমুদ প্রিয় একটি নাম, ভালো লাগার এক সংগীত ব্যক্তিত্ব। ঈদ উপলক্ষ্যে প্রিন্স মাহমুদের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আমিনুল ইসলাম শান্ত।

রাইজিংবিডি: মনে আছে নিশ্চয়ই, আশি বা নব্বই দশকের কথা। প্রতি ঈদে সলো কিংবা মিক্সড অ্যালবাম রিলিজ হতো। গায়ককে ছাপিয়ে গীতিকার, সুরকার প্রিন্স মাহমুদ তখন তুমুল জনপ্রিয়। এখন ঈদে আপনার সেই সরব উপস্থিতি চোখে পড়ে না।

প্রিন্স মাহমুদ: এটা সময়ের হিসাব। জীবনের পুরোটা সময় একভাবে যায় না। কাজের চাহিদা থাকলেও, একটা বয়সে এসে কাজের ইচ্ছা কমে যায়। আমি আমার মতো করে কাজ করছি। তাছাড়া আমি আমার মতো করেই অ্যালবামের কাজ গুছিয়ে করি। অন্য কারো ইচ্ছা বা চাহিদায় করি না। অ্যালবামটি যিনি প্রকাশ করবেন, তিনি শুধু মার্কেটিং করেন। আমার গান আমার মতো হবে, যেভাবে চাইবো সেভাবে হবে। দু’একটি কাজ হয়তো অন্যের ইচ্ছায় করতে হয়; বাকিগুলো সব আমার মতো করেই করি। যেমন আজম খান, হাসান, জেমস, আইয়ূব বাচ্চুর জন্য গান তৈরি করেছি। আমি গানগুলো নির্বাচন করে দিতাম কে কোন গান গাইবেন। আমার অ্যালবামের ব্যাপারে কেউ কখনো কোনো কথা বলতেন না। 

রাইজিংবিডি: অ্যালবাম প্রকাশের ক্ষেত্রে আপনার ধারাবাহিকতা ছিল। যদিও গত বছর আপনার কোনো অ্যালবাম প্রকাশিত হয়নি। 

প্রিন্স মাহমুদ: সবসময় আসলে ভালো থাকা যায় না। যে কারণে গত বছর অ্যালবাম রিলিজ হয়নি। তবে একটি গান রিলিজ করেছিলাম। ‘বিশ্বাস’ শিরোনামে গানটি গেয়েছিল মিনার। গানটি কমার্শিয়াল না হলেও ভালো ছিল। আগেই বলেছি, সময়ের সঙ্গে অনেক কিছু বদলে যায়। বিশেষ করে গত দুই বছরে অনেক বেশি বদলে গেছে।

রাইজিংবিডি: গত ঈদুল ফিতরেও কিন্তু আপনার কোনো গান মুক্তি পায়নি!

প্রিন্স মাহমুদ: হ্যাঁ। তবে ঈদুল আজহায় নতুন গান আসছে। গানটি হয়তো শ্রোতাপ্রিয়ও হবে। 

রাইজিংবিডি: একসময় ঈদ এলেই গানের বাজার জমে উঠতো। নতুন গানের ক্যাসেট কিংবা সিডি রিলিজ হতো, শ্রোতাদের মধ্যেও এ নিয়ে উন্মাদনা ছিল। 

প্রিন্স মাহমুদ: এই সময়ে যারা গানের শ্রোতা তারা আসলে এভাবে চিন্তা করেন না। তারা ইউটিউব থেকে গান শুনছেন। তাছাড়া ভালো-খারাপ ব্যাপারটা আপেক্ষিক। আপনি হয়তো পুরোনো গান নিয়ে ভাবছেন কিন্তু এ সময়ের ছেলেমেয়েরা সেভাবে ভাবছে না।

রাইজিংবিডি: ক্যাসেড থেকে সিডি। গান এখন ইন্টারনেট নির্ভর। ক্লিক করলেই শোনা যাচ্ছে পছন্দের গান। এতে কি গানের বাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে?

প্রিন্স মাহমুদ: এটা সময় বলবে। ২০-২২ বছর বয়সে যখন কাজে ঢুকেছি, তখনো গানের বাজারে নেতিবাচক প্রভাব ছিল। সময়ের সঙ্গে বিষয়টি আমরা আরো বেশি উপলব্ধি করতে পারবো।

রাইজিংবিডি: বর্তমান সময়ের গান কি সময়ের দাবি পূরণ করতে পারছে?

প্রিন্স মাহমুদ: কেমন একটি সময় যেন চলে এসেছে! আমরা কেউ-ই বোধহয় সেরকম গান তৈরি করতে পারছি না যা সময়ের দাবি পূরণ করতে পারে। এটা আমারও প্রশ্ন। কারণটা আমি নিজেও খুঁজে পাচ্ছি না। আমার মনে হয়, যে গানটি এই সময়ের জন্য দরকার সেই গানটি হচ্ছে না। ৫-৭ বছর আগেও সময়ের দাবিটা পূরণ হয়েছে। বিশেষ করে ২০১০ সালের পর থেকে একটু খারাপ অবস্থা শুরু হয়েছে। গত ২ বছর ধরে গান যে কোন দিকে যাচ্ছে- বুঝে উঠতে পারছি না। শ্রোতা কী চাচ্ছেন ধরতে কষ্ট হচ্ছে! কাজের মধ্যে আছি, দেখি কি হয়!

রাইজিংবিডি: আপনার ‘বাবা’, ‘মা’ কিংবা ‘বাংলাদেশ’ গান এখনো মানুষের মুখে মুখে। নিকট অতীতে যেসব গান তৈরি হয়েছে সেগুলো দীর্ঘ সময় কেন মানুষের মনে টিকে থাকছে না?

প্রিন্স মাহমুদ: আসলে মানুষের দেখার চোখ, শোনার কান চারদিকে ছড়িয়ে গেছে। এখন মানুষ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ব্যস্ত। আমরা নির্দিষ্ট একটি বিষয় নিয়ে পড়ে থাকতাম। কিন্তু এখন সেটা হয় না। খেয়াল করে দেখবেন, টিভি দেখার সময় একের পর এক চ্যানেল পরিবর্তন করছি। আবার ফেইসবুকে ঢুকে কিছুক্ষণ থেকে বের হয়ে যাচ্ছি। অর্থাৎ স্থিরতা নেই। এটা সবার ক্ষেত্রেই সত্য। আমার ফোন বন্ধ থাকছে। অনেকে আমাকে ফোনে পাচ্ছেন না। আসলে নিজের ভেতরে স্থিরতা আনার জন্য এটা করছি। তারপরও হয়ে উঠছে না। একটি বিষয়ে মোহাচ্ছন্ন থাকতে এখন কেউ-ই পারছি না। কিছু একটা সৃষ্টি করতে হলে পুরোপুরি মনোযোগ সে বিষয়ে দিতে হবে। সেই বিষয়ে ভাবতে হবে। কিন্তু এখন এই ভাবনাটা অল্প সময়ের জন্য হচ্ছে। আর আমরা খুব তাড়াতাড়ি মানুষের বাহবা পেতে চাচ্ছি। এজন্য মনের মতো গান তৈরি হচ্ছে না। 

রাইজিংবিডি: আপনার অনেক শ্রোতাপ্রিয় গান অন্যরা অনুমতি না নিয়ে বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করছেন। এ বিষয়ে কিছু ভেবেছেন?

প্রিন্স মাহমুদ: ঈদের পরে আমি আমার মতো করে পদক্ষেপ নেবো।

রাইজিংবিডি: আপনি এক সময় একাধিক ব্যান্ডের ভোকালিস্ট ছিলেন। বর্তমান ব্যান্ড সংগীত চর্চার বিষয়ে আপনার ভাবনা জানতে চাই।

প্রিন্স মাহমুদ: এখনো কিছু ব্যান্ড আছে, যারা ভালো গান করছে। এমন দু’একটি দল চোখে পড়ে। আসলে গানের সবকিছু একটু অন্যরকম হয়ে গেছে। নতুন কিছু রক ঘরানার দল আছে যারা ভালো করছে। হয়তো তাদের গান আমরা ওভাবে শুনতে পারছি না। ওদের গান ব্যক্তিগতভাবে আমার পছন্দ। হয়তো সবার ভালো লাগবে না। তারা গানের কথা নিয়ে বিশেষভাবে ভাবছে, মিউজিক নিয়ে ভাবছে। এসব বিষয় আমার ভালো লাগে।

রাইজিংবিডি: আপনি আগে সুর করে তারপর পছন্দমতো গানের কথা বসান।

প্রিন্স মাহমুদ: হ্যাঁ। আমি আগে সুর করি, তারপর গান লিখি। সুর তৈরি করে একটু একটু করে গান লিখতে থাকি। আমার মনে হয় না এতে কোনো গান কারো খারাপ লাগে! এ ব্যাপারে আমি সফল। আমার মনে হয়, সুরের উপর কথা বসালে আরোপিত মনে হয় না। তবে পদ্ধতিটা কঠিন। কিন্তু আমার জন্য সহজ। হয়তো এই কৌশল কোনো না কোনোভাবে পেয়ে গেছি। এভাবে কাজ করতে আমি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি।

রাইজিংবিডি: ক্যারিয়ারের এ পর্যায়ে আপনার কি মনে হয়- জীবনের সেরা গানটি লিখে ফেলেছেন?

প্রিন্স মাহমুদ: হয়তো পেরেছি! এ ব্যাপারে আমি দ্বিধান্বিত। হয়তো ভবিষ্যতে সেরা গান আসবে। এ বিষয়ে মানুষকে দ্বিধায় রাখতে চাচ্ছি না। এখনো ভেতরে তাড়না আছে- সেই গান তৈরি করতে হবে যা সময়ের পরিবর্তন আনবে। এ ধরনের গান করতে পেরেছি বলে মনে হয় না। তবে আরো ৩০ বছর সংগীত নিয়ে কাজ করতে চাই। এটা হবেই এমন নয়। যদি সুস্থ থাকি তবে করবো।

রাইজিংবিডি: করোনার কারণে অনেক সংগীতশিল্পী ও মিউজিশিয়ান অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছেন।

প্রিন্স মাহমুদ: সবাই এই সংকটে পড়েছেন। যারা মধ্যবিত্ত তাদের সমস্যা অনেক বেশি। প্রথম দিকে ভেবেছিলাম- যারা নিম্ন আয়ের তাদের কী হবে? কিন্তু এখন দেখছি, তাদের তেমন সমস্যা হচ্ছে না। সমস্যা হচ্ছে মধ্যবিত্ত বা নিম্ন মধ্যবিত্তের। এখন মধ্যবিত্তরাই সংকটে পড়েছেন। সামনে কী সময় আসছে তা কেউ জানি না। তবে আশা করি, এই দুঃসময় কেটে যাবে। এই সময়টা বেশিদিন থাকবে না। এখন দাঁতে দাঁত কামড়ে সহ্য করে থাকতে হবে। ভেঙে পড়লে চলবে না। মিউজিশিয়ানরা একটু নরম মনের মানুষ। বাইরে থেকে যতটা শক্ত মনে হয়, তারা ভেতরে অতটা শক্ত নয়। অধিকাংশ শিল্পীর মন নরম। আশা করছি, এই সংকট দ্রুত কাটিয়ে উঠবো।

রাইজিংবিডি: ভক্তদের উদ্দেশ্যে কিছু বলুন।

প্রিন্স মাহমুদ: আমরা এই দুঃসময় কাটিয়ে উঠবো। আরো কিছু দিন সহ্য করতে হবে এবং নিরাপদে থাকতে হবে। এমনকি এরই মধ্যে কাজ করে যেতে হবে। কার কি অবস্থা জানি না। তবে সবার জন্য ভালোবাসা, সহানুভূতি রইলো। যার অবস্থা ভালো সে যেন কষ্টে থাকা মানুষটির পাশে দাঁড়ান। 

রাইজিংবিডি: ঘুম থেকে উঠে যদি দেখেন করোনা নেই, তবে প্রথমে কোথায় যেতে চাইবেন?

প্রিন্স মাহমুদ: এভাবে করোনা চলে যাওয়ার সম্ভাবনা নেই। তারপরও বলি, প্রথমে ঘুরতে যাবো খুলনা। আমার শহরে যাই না অনেক দিন।

রাইজিংবিডি: ঘরবন্দি জীবনে নতুন কোনো আত্মপলদ্ধি?

প্রিন্স মাহমুদ: কয়েক দিন আগে আমার শরীর খারাপ হয়েছিল। হঠাৎ আজব উপলদ্ধি হলো। মনে হচ্ছিল— এই পৃথিবীতে আমি থাকবো না! এই জীবন থেমে যাবে ভাবতেই চোখ ভিজে যাচ্ছিল। আমার হালকা জ্বর ছিল তখন। জানি না জ্বরের জন্য এমন হচ্ছিল কিনা, তবে প্রায়ই চোখে পানি চলে আসছিল। আমরা আসলে বাঁচতে চাই। সবকিছুর মধ্যে আলোর রেখা দেখি। শরীর যখন খারাপ ছিল, তখনো কিন্তু আলোই দেখতে পাচ্ছিলাম। আলোর রেখা সবসময় চোখের সামনেই থাকে।

 

ঢাকা/তারা

রাইজিং বিডি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়