ঢাকা, রবিবার, ৩০ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, ১৫ ডিসেম্বর ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

কারমাইকেল কলেজ রংপুর বিভাগে প্রথম

: রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৬-০৫-২২ ৮:১৫:২১ এএম     ||     আপডেট: ২০১৬-০৯-০৫ ৩:১২:১১ এএম

নজরুল মৃধা, রংপুর : এ বছরই শতবর্ষে পা রাখা কারমাইকেল কলেজ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কলেজ র‌্যাংকিংয়ে রংপুর বিভাগে প্রথম স্থান লাভ করেছে।

অধ্যক্ষ প্রফেসর বিনতে হুসাইন নাসরিন বানু কলেজের এ অর্জনকে আগামীতে ধরে রেখে দেশসেরা কলেজ হিসেবে স্বীকৃতি পেতে চান।

তিনি জানান, নানাবিধ সমস্যা নিয়ে এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এ অঞ্চলে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে রয়েছে। কারমাইকেলের রয়েছে অতীতের সোনালি ঐতিহ্য। এই ঐতিহ্যকে লালন করে তিনি আরো সামনের দিকে এগিয়ে যেতে চান।

সমস্যাগুলো তুলে ধরে তিনি বলেন, কলেজের অবকাঠামোগত সমস্যা অনেক। শ্রেণিকক্ষের অভাবে  ৩২ হাজার শিক্ষার্থীকে পাঠ দেওয়া হচ্ছে মাত্র ৫০টি কক্ষে। তাই  অনার্সের ১৮টি এবং মাস্টার্সের ১৪টি বিভাগে পাঠদান দিতে হয় পালাক্রমে। শিক্ষক সংকটও প্রকট। ৩০০ জন শিক্ষকের বিপরীতে রয়েছে ১৮০ জন। দীর্ঘ কলেজ ক্যাম্পাসে কোনো পাকা রাস্তা নেই। এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্ত পর্যন্ত যেতে হয় পায়ে হেঁটে। বাউন্ডারি দেয়াল না থাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থাও নাজুক।

ভূমিকম্পঝুঁকিতে থাকা পুরনো ছাত্রাবাস তিনটির একটি পরিত্যক্ত এবং অপর দুটি বন্ধ রয়েছে। পরিবহন সংকটও চরমে। বিপুল সংখ্যক ছাত্রছাত্রীর জন্য রয়েছে মাত্র তিনটি বাস। তারপরও কলেজটি অতীতের সুনাম ধরে রাখার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করছে। চার বছর আগে এখানে একাদশ শ্রেণি চালু হয়েছে। এর ফলাফল অন্যান্য শিক্ষ প্রতিষ্ঠানের চেয়ে অনেক ভালো।

ব্রিটিশ শাসনামলে তৎকালীন বাংলার গভর্নর লর্ড ব্যারেন কারমাইকেল ১৯১৬ সালে কলেজটি প্রতিষ্ঠা করেন।

জানা যায়, রংপুর অঞ্চলের বিখ্যাত কুন্ডির জমিদার শিক্ষানুরাগী মৃত্যঞ্জয় রায় চৌধুরী রংপুরে একটি প্রথম শ্রেণির কলেজ প্রতিষ্ঠার  জন্য ১২৫ বিঘা জমি দান করেন। কিন্তু সরকারি অনুমোদন না পাওয়ায় তা বাস্তবায়ন করতে পারেননি তিনি। তবে তারপরও তিনি চেষ্টা অব্যাহত রাখেন এবং অন্য জমিদার, বিত্তবান ব্যক্তিবর্গ এবং শিক্ষানুরাগীদের উদ্বুদ্ধ করতে থাকেন।


১৯১৩ সালে তৎকালীন অবিভক্ত বাংলার গভর্নর লর্ড থমাস ডেভিড ব্যারন কারমাইকেল রংপুর এলে তাকে নাগরিক সংবর্ধনা দেওয়া হয়। ওই সংবর্ধনা অনুষ্ঠানেই এ অঞ্চলে একটি প্রথম শ্রেণির কলেজ প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়ে সহযোগিতার জন্য অনুরোধ করা হয় গভর্নরকে। তিনি রংপুরের সেই নাগরিক সংবর্ধনায় সবার অনুরোধের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করেন।

অনুষ্ঠানে লর্ড বলেন, একটি প্রথম শ্রেণির কলেজ প্রতিষ্ঠা করতে প্রাথমিক পর্যায়ে তিন লাখ টাকার প্রয়োজন। তার কথার ওপর ভিত্তি করে ১৯১৩-১৪ সালে রংপুর জেলা কালেক্টর জে.এন গুপ্ত কলেজ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সক্রিয়ভাবে উদ্যোগী হন। কলেজ প্রতিষ্ঠার জন্য তহবিল সংগ্রহের জন্য তিনি রংপুর অঞ্চলের রাজা, জমিদার, বিত্তবান ও শিক্ষানুরাগীদের নিয়ে সভা ডাকেন। তার এই উদ্যোগে সাড়া দিয়ে অর্থ প্রদান করেন শীর্ষস্থানীয় জমিদাররা। সভায় টেপার জমিদার এক লাখ টাকা প্রদান করেন। তার এই দানকে স্মরণীয় করে রাখার জন্যই কারমাইকেল কলেজের মূল ভবনের মাঝের হলঘরটির নামকরণ করা হয় তার নামানুসারে।

এছাড়া কলেজ প্রতিষ্ঠার জন্য যারা অর্থ ও জমি দান করেছিলেন তাদের সবার নাম পাথরে খোদাই করে লেখা আছে। ২৮ জন দাতার মধ্যে সর্বপ্রথম নামটিই হলো অন্নদা মোহন রায় চৌধুরী বাহাদুর। আরো যারা দান করেছেন তারা হলেন- কুন্ডি, কাশিমবাজার, রাধাবল্লভ, ধর্মপুর, মন্থনা, তুষভান্ডার, মহীপুর’র পাঙ্গা, কুড়িগ্রাম, খোলাহাটি, রসুলপুর অঞ্চলের জমিদার, জোতদারসহ বিত্তবান ও বিদ্যানুরাগী ব্যক্তিরা। তারা ৩০০ একর জমিতে কলেজ ভবন নির্মাণের জন্য টাকা সংগ্রহ করেন। ৬১০ ফুট লম্বা ও ৬০ ফুট প্রশস্ত কলেজ ভবন যা বর্তমান বাংলা বিভাগ জমিদারি স্থাপত্যের এক অনন্য নিদর্শন। যা বাংলার সমৃদ্ধিশালী ইতিহাস মোঘলীয় নির্মাণশৈলীকে মনে করিয়ে দেয়।


প্রথমে কারমাইকেল কলেজকে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ১৯১৭ সালে কলা বিভাগে উচ্চ মাধ্যমিক ও স্নাতক চালু করা হয়। উচ্চ মাধ্যমিক বিজ্ঞান ১৯২২ সালে ও বিজ্ঞান বিভাগে স্নাতক ১৯২৫ সাল থেকে শুরু হয়। ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত এটি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ছিল।  দেশ বিভাগের পর ১৯৪৭ সাল থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ১৯৫৩ সালে নতুনভাবে স্থাপিত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন করা হয়। যা ১৯৯২ সাল পর্যন্ত বলবৎ ছিল। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়   প্রতিষ্ঠার পর কারমাইকেল কলেজ ১৯৯২ সাল থেকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়।

এই কলেজের দুজন প্রাক্তন ছাত্র বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হয়েছেন। তারা হলেন- আবু সাদাত মো. সায়েম এবং হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। আরো রয়েছেন প্রাক্তন সেনাপ্রধান প্রয়াত জেনারেল মুস্তাফিজার রহমান, গণপরিষদের প্রথম স্পিকার আব্দুল হামিদ, প্রখ্যাত বাম রাজনীতিবিদ কমরেড মনি কৃষ্ণ সেন, শহীদ জননী জাহানারা ইমাম, কথাসাহিত্যিক অধ্যাপক সুফী মোতাহার হোসেন, আনিসুল হক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব আসাদুজ্জামান নূর, কাজী মো. ইলিয়াস, শিল্পপতি আনিসুল হক, ভাষাসৈনিক তবিবুর রহমান প্রধান, আনিছল হক পেয়রা, চারণ সাংবাদিক মোনাজাত উদ্দিনসহ প্রমুখখ


রাইজিংবিডি/রংপুর/২২ মে ২০১৬/নজরুল মৃধা/মুশফিক

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন