RisingBD Online Bangla News Portal

ঢাকা     বৃহস্পতিবার   ২২ অক্টোবর ২০২০ ||  কার্তিক ৭ ১৪২৭ ||  ০৫ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

ক্যান্সার নিরাময়ে নোবেলজয়ী ফর্মুলা আসছে বাংলাদেশে

হাসান মাহামুদ || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১০:০১, ২৫ ডিসেম্বর ২০১৯   আপডেট: ০৫:২২, ৩১ আগস্ট ২০২০
ক্যান্সার নিরাময়ে নোবেলজয়ী ফর্মুলা আসছে বাংলাদেশে

বর্তমান বিশ্বে যে কয়েকটি রোগকে প্রাণঘাতী হিসেবে চিহ্নিত ক‌রা হয়, তার মধ্যে ক্যান্সার অন্যতম। সঠিক সময়ে নির্ণয় কিংবা সঠিক চিকিৎসার অভাবে বিশ্বে প্রতিবছর লাখ লাখ মানুষ ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে প্রাণ হারাচ্ছেন। ক্যান্সারের নতুন ও কার্যকরী চিকিৎসা পদ্ধতি নিয়ে তাই বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে প্রতিনিয়ত গবেষণা হচ্ছে। মানবদেহের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা কাজে লাগিয়ে ক্যান্সার চিকিৎসার নতুন পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন দুজন চিকিৎসাবিজ্ঞানী- যুক্তরাষ্ট্রের জেমস পি অ্যালিসন ও জাপানের তাসুকু হোনজো এই উদ্ভাবনের জন্য ২০১৮ সালে তারা চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পান নোবেলবিজয়ী সেই ফর্মুলা নিয়ে গবেষণা করে ক্যান্সার চিকিৎসায় উদ্ভাবিত হয় ইমিউনোথেরাপি পদ্ধতি।

আমেরিকার বিখ্যাত রোজেল পার্ক কম্প্রিহেনসিভ ক্যান্সার সেন্টারের সিনিয়র সায়েন্টিস্ট ডা. এস এন এম নাজমুল হাসান খান গবেষণা করছেন এই থেরাপি নিয়ে। কাজ করছেন ডেভেলপিং ক্যান্সার ট্রিটমেন্ট নিয়ে। শুধু এসবেই নিজের দায়িত্ব শেষ করেননি তিনি, বাংলাদেশে যাতে এই কার্যকরী চিকিৎসাপদ্ধতি চালু করা করা যায়, তা নিয়েও কাজ করছেন। ক‌্যান্সার চিকিৎসায় ইমিউনোথেরাপির কার্যকারিতা, নিজের বহুমুখী গবেষণা এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার বিষয়ে রাইজিংবিডির সঙ্গে কথা বলেন এই আন্তর্জাতিক খ‌্যাতিসম্পন্ন গবেষক। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন হাসান মাহামুদ

রাইজিংবিডি : শুরুতেই জানতে চাচ্ছি, ক্যান্সার কী?

ডা. এস এন এম নাজমুল হাসান খান : সংক্ষেপে বলতে গেলে- মানুষের শরীরের কোষ বা সেলের অস্বাভাবিক বৃদ্ধিই ক্যান্সার। এ অস্বাভাবিক বৃদ্ধির ফলে একটি সেল থেকে অনেকগুলো সেল বৃহদাকারে জন্ম নিয়ে হতে পারে ক্যান্সার। মূলত ক্যান্সার অনিয়ন্ত্রিত কোষ বিভাজন সংক্রান্ত রোগসমূহের সমষ্টি। এখনো পর্যন্ত এই রোগে মৃত্যুর হার অনেক বেশি। কারণ, প্রাথমিক অবস্থায় ক্যান্সার রোগ সহজে ধরা পড়ে না বা নির্ণয়ে ব্যর্থ হই। ফলে শেষ পর্যায়ে গিয়ে ভালো কোনো চিকিৎসা দেয়া সম্ভব হয় না।

রাইজিংবিডি : গত কয়েক বছরে ক্যান্সারের নতুন কী কী চিকিৎসাপদ্ধতি চালু সম্ভব হয়েছে?

ডা. এস এন এম নাজমুল হাসান খান : আমাদের দেশে গত কয়েক বছরে নতুন চিকিৎসাপদ্ধতি হয়তো আসেনি, তবে পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে ক্যান্সারের নতুন কিছু চিকিৎসাপদ্ধতি চালু হয়েছে। প্রচলিত চিকিৎসা পদ্ধতি তো আছেই। নতুন চিকিৎসাপদ্ধতির মধ‌্যে আছে- অপারেশন, কেমোথেরাপি, রেডিওথেরাপি ইত্যাদি। এছাড়াও বেশকিছু আধুনিক চিকিৎসাপদ্ধতি প্রক্রিয়াধীন, যেমন: ইমিউনোথেরাপি, পার্সোনালাইজড মেডিসিন ইত্যাদি। ইমিউনোথেরাপি হলো শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে ক্যান্সার সেল প্রতিরোধ বা হত্যা করা। এছাড়া, ইমিউনোথেরাপির সহায়তায় পার্সোনালাইজড মেডিসিন নামক উদ্ভাবন। এর মাধ্যমে আমরা সহজেই বুঝতে পারি, রোগীর শরীরে কোন ধরনের জেনেটিক ত্রুটির ফলে এটি হচ্ছে এবং কোন চিকিৎসা ওই ব্যক্তির জন্য কার্যকর হবে।

রাইজিংবিডি : মানবদেহের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা কাজে লাগিয়ে ক্যান্সার চিকিৎসার নতুন পদ্ধতি উদ্ভাবনের কথা বলছেন আপনিবিষয়টি বিস্তারিতভাবে বলুন

ডা. এস এন এম নাজমুল হাসান খান : ক্যান্সার চিকিৎসার ক্ষেত্রে আমি কাজ করছি ইমিউনোথেরাপি নিয়ে। ইমিউনোথেরাপি ও পার্সোনালাইজড মেডিসিন হচ্ছে ক্যান্সার নিরাময়ে একটি নতুন চিকিৎসা ব্যবস্থা। এর মাধ্যমে শরীরের ইমিউন সিস্টেমকে অ‌্যাক্টিভেট করে ক্যান্সার সেলকে ধ্বংস করা হয়, কিংবা ক্যান্সার সেলকে নিয়ন্ত্রণ করা হয়, যাতে শরীরে ক্যান্সার আর বাড়তে না পারে। অর্থাৎ, ইমিউনোথেরাপি চিকিৎসা পদ্ধতি শুরুতেই ক্যান্সার সেলের গ্রোথকে কমিয়ে দেয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ক্যান্সার সেলকে ধ্বংস করে। প্রতিরোধ ব্যবস্থা নেয়ার পর প্রতিকারমূলক চিকিৎসার মাধ্যমে ক্যান্সার নিরাময় করা হয়। রক্তের পরীক্ষার মাধ্যমে বায়োমার্কার চেক করে আমরা নির্ণয় করতে পারব তার ওভারিয়ান ক্যান্সার সম্পর্কে। পাশাপাশি আরো জানা যাবে, তাকে এখন কোন পর্যায়ের চিকিৎসা প্রদান করা যেতে পারে। এসব হচ্ছে ইমিউনোথেরাপি চিকিৎসাব্যবস্থার মূল কনসেপ্ট।  ইমিউনোথেরাপির সবচেয়ে ভালো বিষয় হচ্ছে- এই চিকিৎসা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াহীন।

রাইজিংবিডি : ক্যান্সার চিকিৎসায় নোবেলবিজয়ী যে কনসেপ্ট নিয়ে আপনি কাজ করেছেন, সে সম্পর্কে একটু বলুন।

ডা. এস এন এম নাজমুল হাসান খান: জেমস পি অ্যালিসন ও তাসুকু হোনজো মানবদেহের নিজস্ব রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে উদ্দীপ্ত করে ক্যান্সার কোষকে প্রতিহত করার জন্য ‘ইমিউন চেকপয়েন্ট থেরাপি’ ব্যবহারের বিভিন্ন পন্থা দেখিয়েছেন। এজন্য ২০১৮ সালে চিকিৎসা বিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পান তারা। দুজন বিজ্ঞানীর আবিষ্কার করা এ পদ্ধতিটি খুবই কার্যকরী। দেখা গেছে, প্রচলিত চিকিৎসা ব্যবস্থার চেয়ে ‘ইমিউন চেকপয়েন্ট থেরাপি’ পদ্ধতিটি রোগীর বেঁচে থাকার সম্ভাবনা ২০ থেকে ৩০ শতাংশ বাড়িয়ে দিচ্ছে। আমেরিকা এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশে এই চিকিৎসা পদ্ধতি এখন অনেক বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে।

রাইজিংবিডি : আপনি প্রাথমিক পর্যায়েই ক্যান্সার নির্ণয়ের কথা বলছেন। ‌এটি কীভাবে করা যায়?

ডা. এস এন এম নাজমুল হাসান খান : ক্যান্সার নির্ণয়ে বেশকিছু টুলস বা যন্ত্রপাতি রয়েছে, যার মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়ার সুযোগ রয়েছে ক্যান্সার হয়েছে কি না। এছাড়া, নতুন সংযোজিত সিস্টেমও রয়েছে, যেমন: জেনেরিক টেস্টিং। এর মাধ্যমেও জানতে পারবেন, ক্যান্সার হয়েছে কি না। নানা কারণে ক্যান্সার হতে পারে, যেমন: জেনেটিক বা বংশগত, পরিবেশগত, ভাইরাসগত, খাদ্যাভ্যাসগত এবং রাসায়নিক পদার্থের সংস্পর্শে আসার কারণে। সুতরাং আমাদের উচিৎ যথাসম্ভব ক্যান্সার হওয়ার কারণগুলো এড়িয়ে চলা। ব্রেস্ট ক্যান্সার থেকে রক্ষার জন্য রয়েছে সেলফ এক্সাম, মেমোগ্রাফি, স্কিন টেস্ট ইত্যাদি। যদি আমরা এগুলো নিয়মিত গুরুত্বের সাথে মেনে চলি, তাহলে এ মরণব্যাধি থেকে আমরা অনেকাংশে মুক্তি পেতে পারি। আমরা যদি প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করতে পারি যে ক্যান্সার হয়েছে, তাহলে নিরাময় অনেকটা সম্ভব। তবে স্টেজ-৩, ৪ এ চলে গেলে তখন আসলে অধিকাংশ সময়ই করার তেমন কিছুই থাকে না। এজন্য দরকার জনসচেতনতা। রোগাক্রান্ত হয়ে গেলে, অবশ্যই ক্যান্সার চিকিৎসকদের সাথে পরামর্শের মাধ্যমে চিকিৎসা চালিয়ে যেতে হবে।

রাইজিংবিডি : বাংলাদেশের বাস্তবতায় ক্যান্সার চিকিৎসায় ইমিউনোথেরাপি কীভাবে শুরু ক‌রা যায়, এটি কতটা ব্যয়বহুল?

ডা. এস এন এম নাজমুল হাসান খান : জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মাধ্যমে ভ্যাকসিন প্রক্রিয়াজাতের বিষয়টা নিঃসন্দেহে ব্যয়বহুল। তবে তা ধরাছোঁয়ার বাইরে নয়। প্রথম যখন কোনো চিকিৎসা পদ্ধতি চালু হয়, তখন এর জিনিসপত্র খুব ব্যয়বহুল থাকে। তবে আমার মনে হয়, এর চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে ক্রমেই এর ব্যয় কমে যাবে।  সরকারিভাবে এই চিকিৎসাপদ্ধতি নিয়ে কাজ করলে তাড়াতাড়ি বাস্তবায়ন সম্ভব। ত‌বে এই চিকিৎসাপদ্ধতি প্রবর্তনে বিভিন্ন উপকরণের পাশাপাশি দক্ষ চিকিৎসক, বায়োলজিস্ট প্রয়োজন। এজন্য দেশে এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে দেশের বাইরে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

রাইজিংবিডি : বর্তমানে বাংলাদেশে প্রচলিত ক্যান্সার চিকিৎসা নিয়ে আপনার মূল্যায়ন কী?

ডা. এস এন এম নাজমুল হাসান খান: ক্যান্সার চিকিৎসার ক্ষেত্রে সবচেয়ে জরুরি হচ্ছে প্রতিরোধ ব্যবস্থা। এক্ষেত্রে জনসচেতনতা বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই। আমাদের দেশের সচেতনতা এখনো পুরোপুরি উন্নত পর্যায়ে যায়নি। চিকিৎসার ক্ষেত্রে আমাদের‌ এখানে নিরাময়ের ওপর জোর দেয়া হয়। কিন্তু ক্যান্সার চিকিৎসায় প্রাথমিক পর্যায়ের চিকিৎসা হচ্ছে সবচেয়ে কার্যকরী। ক্যান্সারের প্রাথমিক পর্যায়ে ডায়াগনোসিস করা গেলে, প্রাথমিক পর্যায়ে চিকিৎসা শুরু করা গেলে, দেশের যেসব প্রচলিত চিকিৎসা ব্যবস্থা রয়েছে এগুলো দিয়ে ক্যান্সার নিরাময় করা অনেকাংশেই সম্ভব।  তবে এটি খুব বেশি সহজলভ্য নয় দেশের সর্বত্র।  এটি নি‌য়ে কাজ করা যেতে পারে।

রাইজিংবিডি : দেশে এই চিকিৎসা চালুর বিষয়ে আপনার কো‌নো পরিকল্পনা রয়েছে কি?

ডা. এস এন এম নাজমুল হাসান খান : আমি চাই বাংলা‌দেশের সব মানুষ সঠিক ক্যান্সার চিকিৎসা গ্রহণ করুক। আর সে লক্ষ্যেই এখানে একটি সেন্টার ফর পার্সোনালাইজড মেডিসিন এবং ইমিউনোথেরাপি চালু করার লক্ষ্যে কাজ করছি আমি। যাতে উন্নত বিশ্বের সর্বাধুনিক প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে সঠিক ক্যান্সার চিকিৎসা নিশ্চিত করা যায়। নিউইয়র্কের টেকনলোজিকে বাংলাদেশে সমন্বয়ের মাধ্যমে যুগান্তকারী সাফল্য অর্জিত হবে বলে আমি মনে করি।

ক্যান্সার আক্রান্ত রোগীর মৃত্যুর অন্যতম কারণ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া। সুতরাং এ রোগ থেকে বাঁচতে হলে অবশ্যই আমাদেরকে প্রচলিত থেরাপি– সার্জারি, কেমোথেরাপি, রেডিওথেরাপি থেকে বেরিয়ে এসে উন্নত চিকিৎসা গ্রহণ করতে হবে।

রাইজিংবিডি : আপনার কাজ এবং গবেষণা সম্পর্কে জানতে চাই।

ডা. এস এন এম নাজমুল হাসান খান : আমার কাজগুলো সাধারণত প্রি-ক্লিনিক্যাল। প্রি-ক্লিনিক্যাল বলতে আমি চামড়ার বিভিন্ন মডেল সিস্টেমের কাজ করে যাচ্ছি। সেই সাথে রয়েছে রক্তের সেলের ক্যান্সার বিষয়ে কাজ। এছাড়া, মেলানোমা নামক এক ধরনের স্কিন ক্যান্সার নিয়েও আমি কাজ করেছি। গত পাঁচ বছর ধরে আমি যুক্ত আছি ওভারিয়ান ক্যান্সার সম্পর্কিত কাজের সাথে। এ রোগে মৃত্যুর হার খুবই বেশি এবং এর কোনো চিকিৎসা এখন পর্যন্ত আবিষ্কার হয়নি। এ রোগে মৃত্যুর প্রধান কারণ, রোগীরা চূড়ান্ত পর্যায়ে ডাক্তারের কাছে আসেন। রোগ নির্ণয় বিলম্বিত হওয়ায়, চিকিৎসাও অসম্ভব হয়ে পড়ে। আর প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ নির্ণয়ের জন্য প্রয়োজন স্ক্রিনিং টুলস, কিন্তু সেটা এখনো আবিষ্কৃত হয়নি। তবে সেই টুলস ডেভেলপ করা আমার কাজ। এছাড়া, ওভারিয়ান ক্যান্সার নিরাময়ে ইমিউনোথেরাপির কাজটিও আমি বর্তমানে করে যাচ্ছি।


ঢাকা/হাসান/রফিক

রাইজিংবিডি.কম

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়