ঢাকা, রবিবার, ৭ আশ্বিন ১৪২৬, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

ঘোষণা || সেলিনা হোসেন

: রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৫-০৭-১০ ৭:১১:৩০ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৬-০৯-০৫ ৩:০৯:০৫ এএম

প্রায় পঁয়ত্রিশ বছর একসঙ্গে কাটিয়ে দুজনের ভালো-মন্দের হিসেবের ধারণায় সময়টি ভালোই গেছে বলে দুজনে ভাবার চেষ্টা করে। যদিও জাকিয়া খাতুন দাম্পত্য জীবনের এই দীর্ঘ সময় থেকে খানিকটুকু আলাদা করে রাখে, যেটুকু তার জন্য মোটেই ভালো সময় ছিল না। আশরাফুল আলমের পরকীয়া প্রেমের কারণে। মহিলা বিদেশ চলে যাওয়াতে সম্পর্ক বেশিদূর এগোয়নি। আর আশরাফুল আলম জাকিয়া খাতুনকে এমন ধারণায় ঘায়েল করার চেষ্টা করেছে যে, পুরুষ মানুষের এসব একটু-আধটু থাকে। এ নিয়ে স্ত্রী বেশি বাড়াবাড়ি করলে সংসারে অশান্তি হয়।

জাকিয়া খাতুনের জ্বলে ওঠা চোখ সংসারের শান্তির বাসনায় নিভে যায়। সংসার মানে তো কতগুলো ঘর, দুই ছেলে, এক মেয়ে এবং স্বামীর সঙ্গে একটি বিছানা। স্বামীর সবকিছু মেনে নেয়া স্ত্রীর উচিত কি অনুচিত এ নিয়ে জাকিয়া খাতুন এখনও দ্বিধান্বিত, কিন্তু ওই যে ছেলেমেয়ে, তাদের ভাবিষ্যত এবং সুখ-শান্তি ইত্যাদি ধারণায় বোকাসোকা, সরল জাকিয়া খাতুন ক্যাতকেতে আবেগে ক্রমাগত তলাতে থাকে। এই তার দোষ। ছেলেমেয়ে তো একটা বিশেষ সময়ের পরে নিজেদের দেখভাল নিজেরাই করবে, এত চিন্তার কী আছে, এটুকু জাকিয়া খাতুন বুঝতে চায় না, মেনে নেওয়াও কঠিন। সে মনে করে ছেলেমেয়ে বাবা-মা মরে যাওয়ার আগের মুহূর্ত পর্যন্ত তাদের পাখার নিচে থাকবে। আবারও এই পানসে ধারণা, যেটা আশরাফুল আলমের নানা কূটচালের সহায়ক বলে সে এটাকে প্রশ্রয় দিয়ে আনন্দেই থাকে।  

পঁয়ত্রিশতম বিবাহবার্ষিকীতে ছেলেমেয়েদের নিয়ে ঘরোয়া অনুষ্ঠানের এক ফাঁকে আশরাফুল আলম বলে, আমাদের দিনগুলো তো ভালোই গেল, নাকি?
জাকিয়া খাতুন চুপ করে থাকে। যেন আশরাফুল আলমের কথা শুনতে পায়নি কিংবা শুনতে পেলেও জবাব দেওয়ার প্রয়োজন মনে করে না। যে মুখগুলো ওর দিকে তাকিয়ে আছে সে মুখগুলো খুব অচেনা, ওরা ওর প্রত্যাশা পূরণে অক্ষম। কেমন করে এতকাল ও এদের জন্য সংসার রক্ষা করল? আশরাফুল আলম প্রথমে বলে, কী হয়েছে?
জাকিয়া খাতুন চুপ।
বড় ছেলে সৌম মায়ের ঘাড়ে হাত রেখে মায়ের মুখটা নিজের দিকে ঘুরিয়ে বলে, কী হয়েছে তোমার?
ছেলের বৌ নন্দিতা দু’পা এগিয়ে এসে বলে, মা কী হয়েছে? বলেন মা কী হয়েছে?
জাকিয়া খাতুন চুপ।
পেছন থেকে ছোট ছেলে শুভ চেঁচিয়ে বলে, তুমি কথা বলছ না কেন মা? এমন চুপ থাকা তো তোমার স্বভাব না। আমরা তো দেখেছি তুমি কথা বলতে ভালোবাসো।
শুভর এ কথায় মৃদু হাসির রোল ওঠে। কিন্তু ওদের এসব কথা এবং হাসিতে জাকিয়া খাতুনের ভাবান্তর হয় না। নিশ্চুপই থাকে।

এবার কাছে এসে খেঁকিয়ে কথা বলে অর্পিতা। যেন জাকিয়া খাতুন ওর মা নয়, কন্যা। মায়ের মুখের ওপর আঙুল নাড়িয়ে বলে, মা এটা একদমই ঠিক নয় যে তুমি আমাদের সঙ্গে এমন আচরণ করবে। হয় তোমার কী হয়েছে তা আমাদের বলবে, আর যদি না বলবে-
জাকিয়া খাতুন হাত উঁচিয়ে চিৎকার করে বলে, থামো। আমার পঁয়ত্রিশ বছরের সংসার শূন্য। একটা কচিমুখ জড়িয়ে ধরতে পারব না বলেই কি আমি এই সংসার আগলে বসে আছি? আমি তোমাদের কাছ থেকে বাচ্চা চাই।
বাচ্চা! অস্ফুট ধ্বনি জাগে আশরাফুল আলমের কণ্ঠে। সৌম আর নন্দিতা নিজেদের ঘরে চলে যায়। অর্পিতা চেয়ারে ঠেস দিয়ে কঠিন মুখে দাঁড়িয়ে থাকে। শুভ চেঁচিয়ে বলে, আমার কাছ থেকে বাচ্চা-ফাচ্চা চেও না। আমি তো ঘোষণাই দিয়ে দিয়েছি যে আমি বিয়ে করব না। বিয়ে আমার পোষাবে না।
থাম শুভ। আশরাফুল আলম চেঁচিয়ে বলে। তোদের হয়েছে কী? এমন অবাস্তব কথা চেঁচিয়ে বলার কী যুক্তি আছে?
এটাই বাস্তব বাবা। তোমরা আমার ওপর প্রেসার তৈরি করবে না।
বাজে কথা বলো না। যাও নিজের ঘরে যাও।

শুভ চলে যায়। বাকি থাকে অর্পিতা। ও সোজাসুজি মায়ের দিকে তাকিয়ে আছে। দৃষ্টি নড়ে না। জাকিয়া খাতুনও মেয়ের দিকে তাকিয়ে আছে। স্ত্রীকে মেয়ের দিকে ওভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে আশরাফুল আলম মৃদু স্বরে বলে, ওর প্রসঙ্গটা থাক জাকিয়া। আমরা তো জানি একটা কিছু না পাওয়ার দুঃখ আমাদের দুজনকে মিইয়ে থাকার পথে ঠেলে দিচ্ছে। সব কিছু ভাগ্যের ওপর ছেড়ে দাও।
আমি ছেড়ে দিতে পারব না। আমার সংসারে বাচ্চা চাই। এমন মরুভূমির মতো খাঁ-খাঁ সংসার কি একটা সংসার!
জাকিয়া মুখ ঝামটে কথা বলে। তারপর তীব্র ভাষায় বলে, আমি অর্পিতার আবার বিয়ে দেব। ডাক্তার তো বলেনি যে ওর বাচ্চা হবে না। বলেছে ওর কোনো সমস্যা নেই।
আমার বিষয়টি আমাকে ভাবতে দাও। তুমি মাথা ঘামিয়ো না মা।

অর্পিতা নিজের ঘরে চলে যায়। বসে থাকে আশরাফুল আলম আর জাকিয়া খাতুন। ওরা দাম্পত্য জীবনের পঁয়ত্রিশ বছর নির্বিঘ্নে কাটিয়েছে বলে যখন ভাবছে, ঠিক তখনই দুজনে সামনের দিনগুলো নিয়ে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত। ওদের হিসেবে সংসারের যে ধারণা তা মিলছে না বলে মানতেও পারছে না। তিন ছেলেমেয়ের এক ডজন সন্তান নিয়ে সংসারের পরিপূর্ণ রূপের আদল ওরা দেখতে চায়। দুজনের বয়সই তো পেরিয়েছে। আর কত অপেক্ষা!
অর্পিতা পানি খাওয়ার অজুহাতে আবার ফিরে আসে বাবা-মায়ের সামনে। দেখতে পায় দুজনে নিশ্চুপ বসে আছে। রান্নাঘরে ঢুকে বোতল থেকে গ্লাসে পানি ঢালে। ইচ্ছে করে সময় কাটায়, ভাবে বাবা-মায়ের দু’একটি টুকরো কথা শুনতে পাবে, কিন্তু চারদিকে কোথাও কোনো শব্দ নেই। অর্পিতা শব্দ করে দু’গ্লাস পানি ঢালে। আসলে ও শব্দ করতে চায় কিন্তু যে শব্দ তৈরি করলে বাড়ি ভরে যাবে তেমন শব্দ শুধু গ্লাসে পানি ঢেলে তৈরি করা যায় না। ওই ধরনের শব্দ তো ওর বুকের ভেতরে জমা হয়ে আছে, শুধু ও চিৎকার করলেই হয়। কিন্তু এই মুহূর্তে অমন বিশাল চিৎকার করার ইচ্ছে ওর নেই। ও বাবা-মায়ের জন্য দু’গ্লাস পানি হাতে নেয়। ভাবে, ওদের পানি খাওয়া দরকার। ওদের ভীষণ তৃষ্ণা- শিশুর হাসি, শিশুর কান্না, কলকণ্ঠ ইত্যাদির জন্য। অর্পিতা বিড়বিড় করে কিছু একটা বলার চেষ্টা করে, কিন্তু বুকের ভেতর থেকে শব্দ বের হয় না। আশ্চর্য, তাহলে বিপুল তৃষ্ণা কি ওর বুকের ভেতরেও জমে আছে? ও দুপদাপ পা ফেলে বাবা-মাকে দু’গ্লাস পানি দিয়ে বলে, খাও।

পানি?
হ্যাঁ, পানিই তো খাবে।
জাকিয়া খাতুন হাত বাড়িয়ে বলে, দাও। আশরাফুল আলম কিছু না বলে হাত বাড়ায়। দুজনে এক চুমুকে গ্লাস শেষ করে না। থেমে থেমে খায়। অর্পিতা সামনের চেয়ারে বসে। বলে, তোমার এমন অদ্ভুত ইচ্ছার কথা শুনে আমি খুব বিরক্ত বোধ করছি।  
অদ্ভূত ইচ্ছা? দুজনেই একসঙ্গে উচ্চারণ করে। জাকিয়া খাতুন আরও বলে, এটা আমার স্বাভাবিক ইচ্ছা না?
মোটেই না। তুমি আমাদের মানবাধিকার লঙ্ঘন করে কথা বলছ মা।
মানবাধিকার? সেটা আবার কী?
আশরাফুল আলম মৃদু হেসে স্ত্রীর দিকে তাকায়। অর্পিতা হাসিতে ভেঙে পড়ে। তুমুল হাসি উচ্চকিত হতে থাকে। ঘর ভরে যায়। সৌম আর নন্দিতা নিজেদের ঘরের দরজায় এসে দাঁড়ায়। হাসির কারণ বোঝার চেষ্টা করে। শুভ সরাসরি অর্পিতার সামনে দাঁড়ায়। আঙুল নাচিয়ে বলে, এসব পাগলামির মানে হয় না। থাম বলছি অর্পিতা, নইলে-
কী করবি তুই আমার? তুই আমাকে থামানোর কে?

শুভ কথা বাড়ায় না। ঝামেলা করার ইচ্ছা নেই। নিজের ঘরে ফিরে যায়। ও দরজা বন্ধ করে দিয়ে নোরা জোনসের গানে মনোযোগী হয়। নোরা ওর প্রিয় শিল্পী। সৌম ও নন্দিতা দাঁড়িয়েই আছে। অর্পিতা ক্রুদ্ধ ভঙ্গিতে মায়ের দিকে তাকিয়ে আছে। তখন শুভ হাট করে দরজা খুলে দেয়। উঁচু ভলিউমে ছেড়ে দেয়া নোরা জোনসের সুরেলা কণ্ঠ ঠাণ্ডা বাতাসের মতো প্রবাহিত হয় ঘরে। শুধু পুড়ে যায় অর্পিতার ভেতরটা। গান ওর হৃদয় স্পর্শ করে না। ও দেখে মা ওর দিকে তাকিয়ে আছে। অর্পিতা মনে করে এই মুহূর্তে বল এখন ওর কোটে। ও অনায়াসে ওটাকে গড়াতে পারে নিজের জীবনের পতিত মাঠটার ওপর দিয়ে। নারী-পুরুষের সম্পর্ককে পুরুষতান্ত্রিক ধারণায় ক্ষেত্র ও বীজের সঙ্গে তুলনা করা হয়। নারী ক্ষেত্র, পুরুষ বপন করে বীজ। উৎপন্ন হয় ফসল। কিন্তু পুরুষ বুঝতে পারে না যে নারীর একটি বাড়তি শক্তি আছে। নারী ইচ্ছা করে নিজেকে বীজমুক্ত করতে পারে। বীজ রক্ষা করা এবং বীজ প্রত্যাখান করা দুই-ই নারীর ক্ষমতার আওতায় পড়ে। হাঃ পুরুষ! অর্পিতা বড় করে শ্বাস ছেড়ে উড়িয়ে দেয় ছয় বছরের যাপিত সংসার জীবন। মাস ছয়েক আগে ওর ঘর ভেঙেছে। ও নিজের সংসার ছেড়ে মায়ের কাছে এসে উঠেছে। এই ছয় বছরে ওর কোনো বাচ্চা হয়নি। ডাক্তারের কণ্ঠ ভেসে আসে। বলছে, আপনাদের দুজনার কারও কোনো সমস্যা নেই। অপেক্ষা করুন। ভবিষ্যতে বাচ্চা হলে হতে পারে। এই রহস্য ব্যাখ্যার অতীত।

দুজনের সামনে ডাক্তারের মুখটা একটা বিকৃত মানুষের মুখের আকার ধারণ করেছিল। সেই আকারের কোনো স্পষ্ট ধারণা ওদের সামনে ছিল না। দুজনেই দুজনের হাত দৃঢ়ভাবে ধরে বেরিয়ে এসেছিল। কিন্তু অরূপের চেহারাটা বদলাতে বেশি দিন সময় লাগেনি। কয়েক মাস যেতেই স্পষ্ট ভাষায় গলার রাশ টেনে বলল, আমার বাচ্চা চাই। আমি অপেক্ষা করতে পারব না।
অপেক্ষা করতে পারবে না বললেই হলো। কীভাবে সমাধান হবে? চাইলেই তো আর বাচ্চা হচ্ছে না।
অর্পিতার কণ্ঠে ঝাঁঝ ছিল। ওর নিজেরও তো বাচ্চার জন্য কষ্ট আছে, সেটা অরূপ কিছুদিন ধরে উপেক্ষা করছে দেখে ওর মেজাজ খিঁচড়ে ছিল। কিন্তু ওর মেজাজের তোয়াক্কা না করে অরূপ অদ্ভুত রসিকতায় চোখটা কুঁচকে নাকের বাঁশি ফুলিয়ে বলেছিল, ইচ্ছে করলেই সমাধান আছে।
আছে? অর্পিতার চোখ জ্বলে উঠেছিল। আবারও নিদারুণ উপেক্ষায় ঝলসে উঠেছিল অরূপের চোখ। অদ্ভুত শান্ত, স্বাভাবিক কণ্ঠে বলেছিল, আমাদের তো কোনো সমস্যা নেই। তাহলে আমি অন্যত্র চেষ্টা করে দেখি। তুমিও তাই করতে পারো। তুমিও অন্য কাউকে পছন্দ করে বিয়ে করো অর্পিতা।
তুমি কি পছন্দ করে ফেলেছ?

অরূপ হা-হা করে হাসতে হাসতে স্থান ত্যাগ করেছিল, ওর প্রশ্নের জবাব দেয়নি। অর্পিতা ওর পিছু পিছু শোবার ঘর পর্যন্ত গিয়েছিল। বলেছিল, আমি মাত্র একদিন আগে জেনেছি যে তুমি রুমানার প্রেমে পড়েছ। তোমার মুখ থেকে বিষয়টা শুনব বলে আমি জিজ্ঞেস করিনি। অপেক্ষা করেছি তুমি কখন মুখ খোলো তা দেখার জন্য। কিন্তু কৌশলটা চমৎকার নিয়েছ। সেজন্য অভিনন্দন। তবে সঙ্গে এটাও বলি যে, এভাবে অজুহাত দেখিয়ে কাজ হাসিল করো না। সত্য বলার সৎ সাহস রাখো।
উপদেশ দিচ্ছ?
হ্যাঁ দিচ্ছি। যেমন তুমি আমাকে উপদেশ দিচ্ছ, তেমন।
অরূপ আবার একই ভঙ্গিতে হাসতে হাসতে বলেছিল, বেশ তো খেলা জমেছে। চলো খেলি। দেখি কে হারে কে জেতে।
তোমার সঙ্গে মাঠে নামার ইচ্ছে আমার নেই। তুমি যাকে নিয়ে মাঠে নেমেছ তার সঙ্গেই খেলো।

পরদিন সংসার ছেড়ে মায়ের সামনে এসে দাঁড়িয়েছিল অর্পিতা। জাকিয়া খাতুন ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে বলেছিল, তুই কি একা এলি? জামাই কই?
হ্যাঁ, একাই এলাম। যেখান থেকে এসেছি সেখানে আর ফিরতে না হলে একাই তো আসতে হয় মা।
মানে?
মানে কি তোমাকে স্কুল খুলে বোঝাতে হবে? সোজা কথাটা বোঝ না?
কী করেছিস?
বাচ্চা বিয়াতে পারিনি।
মায়ের মুখের ওপর উত্তরটা ছুঁড়ে সোজা নিজের ঘরে গিয়ে দরজ বন্ধ করেছিল অর্পিতা। একটুক্ষণ পর শুনতে পেয়েছিল জাকিয়া খাতুনের কান্না। অর্পিতা পাত্তা দেয়নি। মেয়ের ঘর ভাঙলে মা তো কাঁদবেই, কাঁদাই তো স্বাভাবিক, কাঁদুক, কেঁদেকেটে নিজে নিজে থামবে। দীর্ঘশ্বাস ফেলবে, কপাল চাপড়াবে, কত কি! কিন্তু পরক্ষণে নিজেকে ভীষণ ধমকেছিল নিজের ভুল চিন্তার জন্য। মেয়ের মা হলে তাকে কাঁদতে হবে কেন? আর যদি কাঁদেই তবে সে কান্না স্বাভাবিক হবে কেন? অরূপের মাতো কাঁদবে না। বরং খুশি হয়ে বলবে, বাঁজা মেয়েটাকে বিদায় করে ভালো করেছিস বাবা। এবার একটি ভালো মেয়ে ঘরে নিয়ে আয়। সেই মা আগে থেকে কি করে বুঝবে যে মেয়েটি ভালো? তার ছেলে মেয়েটির ক্ষেত্রে বীজ বপন করলেই ফসল ফলবে? হাঃ মেয়ের মায়েদের যেমন শেখাতে হবে, ছেলের মায়েদেরও তেমন শেখাতে হবে। হাঃ কয়শ’ বছর লাগবে! পাঁচশ’ বছর কি? তারও বেশি হতে পারে। কারণ এরও বেশি সময় ধরে পুরুষরা নারীদের বিরুদ্ধে এত কিছু শিখিয়েছে যে সেখান থেকে তাদের বের করে আনা সহজ কাজ নয়।

অলংকরণ : অপূর্ব খন্দকার


অর্পিতা দ্রুত নিজের অতীত থেকে ফিরে আসে। মায়ের চোখে চোখ রেখে বলে, এই মুহূর্তে সৌম আর নন্দিতাই তোমার একমাত্র ভরসা। অপেক্ষায় থেকে দেখো যে ওরা তোমার জন্য কি করতে পারে।
এ কথা শুনে সৌম আর নন্দিতা ঘরে ঢুকে যায়। শুভর ঘরের ক্যাসেট প্লেয়ারের ভল্যুম কমেছে। আশরাফুল আলম ফোন ধরার জন্য উঠে যায়। জাকিয়া খাতুন উঠতে গেলে অর্পিতা চেঁচিয়ে বলে, কেউ কোথাও যাবে না। আমি সবাইকে নিয়ে বাইরে খেতে যাব। হ্যাপি অ্যানিভার্সারি বাবা ও মা।
বাড়িটা ঝিম মেরে গেছে। কেউ সাড়া দেয় না। সবাই জানে অর্পিতা যা করতে চেয়েছে সেটা ও করবে। কেউই ছাড় পাবে না। একই সঙ্গে সবাই অনুভব করে এই ঘরে আর কোনো গান নেই। শুভ বোধহয় যন্ত্রটি বন্ধ করে দিয়েছে। অর্পিতা বিড়বিড় করে বলে, সুর সবার ভেতরে ঢোকে না, কখনো সেটা বাতাসে মিশে মিলিয়ে যায়। এই বাড়িতে বাস করা মানুষগুলোর বুকের ভেতর এখন সুর নেই। পুরো বাড়িজুড়ে ভেসে বেড়াচ্ছে তরকারির গন্ধ। বুয়া রাঁধছে, ওর রান্নার হাত দারুণ। নোরা জোনসের কণ্ঠের সঙ্গে কি বুয়ার রান্নার তুলনা হতে পারে?

দুজনের দক্ষতা কি একই ধরনের? অর্পিতা মৃদু হাসে। কখনো এসবের উত্তর মেলে না। সমীকরণ ঘটানো সহজ নয়। ও দেখতে পায় জাকিয়া খাতুন রান্নাঘরে ঢুকছে। আশরাফুল বলছে, আমাকে এক কাপ চা দিও। জাকিয়া খাতুন কিছু বলে না। আশরাফুল আলমের দিকে তাকায় না। কিন্তু আশরাফুল আলমের কাছে এক কাপ চা ঠিকই পৌঁছে যাবে। এভাবেই দুজনে সংসার করেছে। অর্পিতার মনে হয়, ভালোই কাটিয়েছে ওরা। যদিও মায়ের কাছ থেকে পুরুষের বাড়তি সুযোগ নিতে বাবা ছাড়েনি। মা ক্ষমা না করলে ওরা তিনজনে ভাঙা পরিবারের সন্তান হয়ে যেত। বাবার পরকীয়া বিষয়ে দুজনের ঝগড়া তো ওরা তিন ভাইবোন কান খাড়া রেখে শুনত। অর্পিতার মনে হয় ওর আবার ভীষণ হাসি পাচ্ছে- গলা ফাটানো হাসি। ও হা-হা করে হাসতে হাসতে  নিজের ঘরে যায়। কেউ কারো ঘর থেকে বেরিয়ে আসে না। অর্পিতা নিজের ঘরের দরজা বন্ধ করে।  

সকালে নন্দিতা অফিসে যাওয়ার আগে অর্পিতা ওর হাত ধরে টেনে নিজের ঘরে নিয়ে বসে বলে, তোমাদের বিয়ের তো তিন বছর হয়ে গেল। তোমরা মায়ের ইচ্ছেটা পূরণ করতে পারো।
শুধু মায়ের ইচ্ছে কেন, আমি বাচ্চা চাই অর্পিতা। কিন্তু হচ্ছে না। ছ’মাস ধরে কন্ট্রাসেপটিভ ব্যবহার ছেড়ে দিয়েছি।   
অর্পিতা শুকনো মুখে বলে, তোমার জীবনেও কি আমার মতো নাটক হবে কি-না?
নন্দিতা হাত উল্টে ভ্রু কুঁচকে বলে, কে জানে!
তোমরা ডাক্তার দেখাওনি? দেখিয়েছ?
না। ভাবছি দেখাব।
সৌম রাজি?
হ্যাঁ, সকালে মায়ের কথা শুনে আমাকে বলেছে আজই ডাক্তারের সঙ্গে একটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট করবে।
বাহ, চমৎকার! তোমাদের জীবনে ফুল ফুটুক। আমরা তোমাদের দিকে চেয়ে আছি।
অর্পিতা নন্দিতাকে জড়িয়ে ধরে। দুজনের গভীর আলিঙ্গনে দুজনেই অনুভব করে, নারীই শক্তি। ক্ষেত্র অনুর্বর হলে বীজ যেমন ফসল ফলাতে পারে না, তেমনি ক্ষেত্রেরও সাধ্য আছে বীজ ছুঁড়ে ফেলার। আহ, কী শান্তি! নন্দিতা বের হওয়ার সময় জিজ্ঞেস করে, অফিসে যাবে না?
না, আজ মায়ের সঙ্গে থাকব। ছুটি নিয়েছি। দেখো আমরা তিনজন নারী একটি সম্পর্ক আঁকড়ে এখানে জড়ো হয়েছি।
আমরা ভালো থাকতে চাইলে থাকতে পারি। বাধা কোথায়?
অর্পিতা মৃদু হেসে বলে, বাধা অনেক। তবে সম্পর্ক জিইয়ে রাখার দায়িত্ব আমাদের ঘাড়ে বেশি বর্তায়। আমরা খেসারত বেশি দেই।
পরে আলোচনা হবে।

নন্দিতা দ্রুত বেরিয়ে যায়। নারী বিষয়ক আলোচনায় ও তেমন আগ্রহ বোধ করে না। অর্পিতার ধারণা ও এখনো লক্ষণরেখার ভেতরে আটকা পড়ে আছে। ওকে বাইরে আনা যাবে এমন কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। ও হাত উল্টিয়ে শ্রাগ করে, তারপর রান্নাঘর থেকে এক কাপ চা নিয়ে আবার নিজের ঘরে আস, সঙ্গে পত্রিকা। পত্রিকাটির লিড নিউজ পড়ে শেষ করার আগেই শুভ উঁকি দিয়ে বলে, মাঝের পৃষ্ঠায় যা একটা ইন্টারেস্টিং নিউজ আছে।
কেমন? বলে ফ্যাল।
খবরের পাতায় আছে সাবেক আর্চ বিশপ জর্জ ক্যারি-
কী করেছেন তিনি?
শুভ হো হো করে হাসতে হাসতে বলে, বলেছেন প্রিন্স চার্লস ও কামিলা পার্কারের বিয়ে করা উচিত।
বেশ মজা তো! বিয়ের আর বাকি কী?
হেসে গড়িয়ে পড়ে অর্পিতা। হাসতে হাসতে বলে, কিছুই বাকি নেই। শুধু একটা বাচ্চা হলে বলবে অবৈধ  সন্তান।
সেজন্যই তো বিয়ে নামক ইনস্টিটিউশনকে আমি ঘেন্না করি। ওর মধ্যে আমি ঢুকতে পারব না।
বাচ্চা চাস না?
বেশি খায়েশ হলে একটা অবৈধ নিয়ে নেব।
হ্যাঁ, যা বলেছিস। কোনো মেয়েই তোর অবৈধ বাচ্চা বিয়ানোর জন্য বসে নেই।
না বিয়ালে না বিয়াবে। দরকার নেই।
শুভ দুপদাপ পা ফেলে চলে যায়। অর্পিতা পত্রিকার মাঝের পৃষ্ঠা খুলে চার্লস আর কামিলার ছবি দেখে। দুজনের বয়স হয়েছে। আর্চ বিশপ কামিলার পক্ষে ওকালতিতে নেমেছেন। অর্পিতা বিড়বিড়িয়ে বলে, তুমি ডায়নার সংসার ভেঙেছ কামিলা। এখন বিয়ের পক্ষে কথা বলার জন্য লোকজন জোগাড় করছ। রাজকুমার তোমাকে যে বুড়ো আঙুল দেখাচ্ছে সেটাও হজম করে যাচ্ছ। বেশ আছ ভেজা বেড়াল কামিলা। এমন ভাব করছ যেন ভাজা মাছটি উল্টে খেতে শেখোনি। ভেজা বেড়াল কামিলা লেজ উঠিয়ে লাফ দিতে শেখো, পরের হাঁড়িতে নাক ঢুকিয়ো না কেবল। ঝনঝন করে বেজে ওঠে রেকর্ড, তুমি নিজের চরকায় তেল দাও অর্পিতা, ও চমকে ওঠে।

কামিলা ওকে ধমকাচ্ছে। তুমি কে যে আমাকে উপদেশ দিচ্ছ? তোমার স্বামীর কথা একবার ভাব? সে কি প্রিন্স চার্লসের চেয়ে আলাদা আচরণ করেছে? সেও তো তোমাকে মেঘনা নদীর প্রবল ঢেউয়ে ডিঙি নৌকায় তুলে দিয়ে নিজে সটকে পড়েছে। উঠেছে ময়ূরপঙ্খী নায়ে। হা-হা অর্পিতা তুমি আমাকে ভেজা বেড়াল বানিয়েছ। আমি মোটেই ভেজা বেড়াল নই। প্রিন্স রাজসিংহাসনের উত্তরাধিকারী। হা-হা করে হেসে ওঠে অর্পিতা, তোমার আশায় গুড়ে বাড়ি কামিলা, তোমার কপালে রাজসিংহাসনের ভাগ নেই। অর্পিতার হাসি শুনে জাকিয়া খাতুন ঘরে ঢোকে।
হাসছিস যে?
তোমার জন্য সুখবর আছে মা। সৌম আর নন্দিতা ডাক্তারের কাছে যাবে। শিগগিরই তুমি একটা বাচ্চা পাবে তোমার সংসারে।
ওরা তো পরীক্ষার জন্য যাবে। আগে পরীক্ষাটা শেষ হোক।
ও বাব্বা তুমি দেখাছি বুদ্ধিমতী হয়ে যাচ্ছ মা!
জাকিয়া খাতুন নিঃশব্দে মেয়ের দিকে তাকিয়ে থাকে। চোখ বড়, গোলাকার, কালো মণি ছটফট করে না, ওটা স্থির। অর্পিতা এই প্রথম আবিষ্কার করে যে ওর মায়ের চেহারাটা ভোঁতা, চ্যাপ্টা, ধবধবে ফর্সা গায়ের রং উজ্জ্বল নয়, ফ্যাকাসে দেখায়- তাতে কোনো জৌলুস নেই। তুব মা বেশ তৃপ্ত চেহারা নিয়ে হাসিমুখে দিনযাপন করে, স্বামীর সঙ্গে সম্পর্কের জটিলতা তাকে খুব পীড়িত করে বলে অর্পিতার কখনো মনে হয়নি।

এই মা এখন শাণিত, বুদ্ধিদীপ্ত চকচকে চোখে মেয়ের দিকে তাকিয়ে আছে, ঠোঁটের কোণে কৌতুকের হাসির আভা, যেন বলতে চায় ভাবিস না যে আমি তোদের কথা বুঝি না, বুঝি।
ক’দিন পর বাড়ি ফিরে সৌম আর নন্দিতা নিঃশব্দে ঘরে ঢোকে। কলিং বেলের শব্দ শুনে দরজা খোলে জাকিয়া খাতুন নিজে, কিন্তু দুজনের কেউই তার দিকে তাকায় না। বাড়িতে অর্পিতা ও শুভ নেই। সুতরাং জাকিয়া খাতুনকে নিজের ওপরই ভরসা করতে হবে। দরজার একটি কপাট খোলা, হু-হু করে বাতাস ঢুকছে, একতলা বাড়ি বলে সামনের প্রাঙ্গণ থেকে শুকনো পাতা উড়ে আসছে। জাকিয়া খাতুন দরজায় পিঠ ঠেকিয়ে ওদের ঘরের বন্ধ দরজার দিকে তাকিয়ে থাকে। তাহলে কি ওদের কোনো ভালো খবর নেই? কিন্তু কী হয়েছে তা জানার জন্য কৌতূহল প্রকাশ করে না। জাকিয়া খাতুন ধীরেসুস্থে দরজা বন্ধ করে বেডরুমে আসে। আশরাফুল আলম কপালে হাত রেখে শুয়ে আছে। জাকিয়া খাতুনের পায়ের শব্দ পেয়ে চোখ না খুলেই বলে, কী হয়েছে?

ঘরের ভেতরে একগাদা ধুলা আর শুকনো পাতা ঢুকল। বাইরে একটি ছোট ঘূর্ণিঝড়ের মতো উঠেছিল।
তোমার কী হয়েছে জাকিয়া খাতুন?
এই সংসারে শিশু আসবে এমন আশা নেই।
আশরাফুল আলম কিছু বলার আগেই দুজনে শুনতে পায় কলিং বেলের শব্দ। জাকিয়া খাতুন দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকায়। বুঝতে পারে এটা অর্পিতার অফিস থেকে ফেরার সময়। আশরাফুল আলম আর জাকিয়া খাতুন দুজনেই দরজা খোলার জন্য ছুটে যায়। অর্পিতা দুজনকে এসসঙ্গে দেখে আশ্চর্য হয়। চেঁচিয়ে বলে কী হয়েছে? দুজনের মুখে কথা নেই। অর্পিতা দুজনের হাত ধরে ঝাঁকুনি দেয়। তখন দরজা খুলে সৌম ওকে ডাকে।
অর্পিতা আমার ঘরে আয়।
সন্ধ্যায় অর্পিতা বাবা-মাকে বলে, সমস্যাটা সৌমর। ও কখনোই বাবা হতে পারবে না। নন্দিতা ঠিক আছে। বেচারা!
অর্পিতা শ্বাস ফেলে চুপ করে যায়। বাড়িজুড়ে গা ছমছম করা অখণ্ড নীরবতা। কোথাও কোনো শব্দ নেই।
শেষ পর্যন্ত এই বাড়ির সবটুকু মনোযোগ অর্পিতার ওপর গিয়ে পড়ে। ও একটি চমকপ্রদ ঘটনা ঘটিয়ে ফেলে এবং তার পক্ষে অবস্থান নেয়।

একদিন সকালবেলা অফিসে যাওয়ার আগে অর্পিতার মাথা ঘুরে উঠলে ও দেখতে পায় ওর চোখের সামনে বিন্দু বিন্দু অজস্র হলুদ ফুলকি, কিন্তু অল্প সময়ে নিজেকে সামলে নিতে পারে ও। জাকিয়া খাতুন টেবিলে নাস্তা রেডি করছিল। সন্দেহগ্রস্ত দৃষ্টিতে কপাল কুঁচকে জিজ্ঞেস করে, কী হয়েছে মা?
মাথা ঝিমঝিম করছে। শরীরও কেমন জানি লাগছে।
অফিসে যেতে হবে না, শুয়ে থাক।
না, অফিসে যেতে হবে। অনেক কাজ আছে। নাস্তা দাও। আমি আসছি।
আসছি বলে দ্রুত পায়ে বাথরুমে ঢোকে অর্পিতা। বমি করে। খালি পেটে বমির তোড় কম, কিন্তু কষ্ট হয়, যেন পেট মুচড়ে নাড়িভুঁড়ি উগলে আসছে। জাকিয়া খাতুন মেয়ের পিছু এসে বাথরুমের দরজায় দাঁড়ায়। বুঝতে পারে বমি করার ভঙ্গিটা চেনা, বাচ্চা পেটে এলে বেশিরভাগ মেয়েদের এমন বমি হয়। কিন্তু অর্পিতার হবে কেন? জাকিয়া খাতুন বুঝতে পারে ওর নিজের মাথাটা টলছে। চোখের সামনে বিন্দু বিন্দু হলুদ ফুলকি উড়ছে। ঘাড় ঘুরিয়ে অর্পিতা কী বলবে, মা তোমার জন্য সুখবর আছে। তোমার সংসারে বাচ্চা আসছে!

না, জাকিয়া খাতুনের মুখ থেকে অস্ফুট ধ্বনি বের হয়। ও ভয়ে নড়তে পারে না। অর্পিতা বেসিনের দিকে মুখ নামিয়ে জলের ঝাপটা দিচ্ছে। বেশ অনেকক্ষণ ধরে ও জল নাড়ে। জাকিয়া খাতুনের মনে হয় জল নেড়ে ও স্বস্তি পাচ্ছে। কিন্তু ওর নিজের ভেতরে জলের ভয়াবহ প্লাবন ভাসিয়ে নিচ্ছে দু’কূল। ওর বুকের ভেতরের নিজস্ব জমিটুকু জলের নিচে। তখন অর্পিতা মুখ ঘুরিয়ে স্বাভাবিক কণ্ঠে বলে, ফেরার পথে ডাক্তারের কাছে যাব। ওষুধ নিয়ে আসব। ঠিক হয়ে যাবে।
জাকিয়া খাতুন আস্তে করে বলে, দাঁড়া।
কিছু বলবে মা?
হ্যাঁ। দম নেয় জাকিয়া খাতুন।
কী বলবে বলো। আমার দেরি হয়ে যাচ্ছে।
তুই কাউকে ভালোবাসিস?
থমকে যায় অর্পিতা। তারপর স্মার্ট ভঙ্গিতে বলে, জীবনকে আমি উদার দৃষ্টিতে দেখি। আমার সংস্কার নেই মা।
তুই আমার প্রশ্নের উত্তর দিলি না।
দুই-চারজন তো আমার চারপাশে আছে কিন্তু আমি এখনও কাউকে নির্বাচন করিনি।
আমার মনে হয় তুই নির্বাচন করেছিস। আয় নাস্তা খাবি।
জাকিয়া খাতুন ভয় ঝেড়ে ফেলে টেবিলের দিকে এগিয়ে যায়। পরিবারের অন্যরা টেবিলে বসে গেছে। আশরাফুল আলম হাসতে হাসতে বলে, এই ভোরবেলা মা-মেয়ের সভা কিসের? আমরা কি জানতে পারি কি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হলো?

দুজনের কেউই আশরাফুল আলমের কথার জবাব দেয় না। চেয়ার টেনে বসে নাস্তা খেতে মনোযোগী হয়। একটা পরোটা খেয়ে অর্পিতা বুঝতে পারে ওর শরীর আবার গুলিয়ে উঠছে। ও দুহাতে মুখ চেপে ধরে ছুটে বাথরুমে যায়। ডাইনিং টেবিলে বসে সবাই শুনতে পায় যে অর্পিতা বমি করছে। নন্দিতা উঠে ওর কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। আশরাফুল আলম জাকিয়া খাতুনের দিকে তাকিয়ে বলে, ওর কী হয়েছে?
জাকিয়া খাতুন প্রবল বিরক্তিতে মুখ ঝামটা দিয়ে বলে, জানি না।
অর্পিতা বিকেলে বাড়ি ফিরলে জাকিয়া খাতুন কঠিন দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে, ডাক্তার কী বলেছে?
ইউরিন টেস্ট করতে হবে।
ও সোজা নিজের ঘরের দিকে হেঁটে যায়। মায়ের সামনে দাঁড়ায় না। ডাক্তার যা সন্দেহ করছে সেটা সত্যি হবে কি-না তা নিয়ে নিজের ভেতরে প্রবল উত্তেজনা। কিন্তু সেটা কারো সঙ্গে এই মুহূর্তে ভাগ করার উপায় নেই। ও দরজা বন্ধ করে কাপড় খুলে ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখে। নিজের শরীরে এত বিস্ময় ছিল তা কি ও কোনোদিন জানতে পেরেছিল!
দু’দিন পর বাড়িতে একটা একতরফা ঘোষণা ওকে দিতে হয়। প্রথমে ভেবেছিল মা আর নন্দিতাকে বলবে। পরে ভাবল, অন্যায়টা কোথায়? এই সংসার তো একটা শিশু চায়। ও মা হবে, এর চেয়ে বড় খবর এই সংসারের আর কি হতে পারে?

ডিসেম্বর ২৪ তারিখ, শীত পড়েছে দারুণ, বাইরে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টিও হচ্ছে। আকাশে কালো মেঘের ভেসে যাওয়া দেখার কেউ নেই। ওরা সবাই সোফার ওপর গুটিসুটি বসে আছে। শুধু উসখুস করছে শুভ। আগামীকাল ক্রিসমাস, প্যাট্রিসা বলেছে ওর সঙ্গে সারাদিন কাটাতে। বৃষ্টি দেখে ও বিরক্তি বোধ করছে। কালকের প্রোগ্রামটা নষ্ট হতে পারে এমন এক আশঙ্কায় ও চুপসে বসে আছে। কিন্তু অর্পিতা ঘরে এসে দাঁড়ালে সবাই নড়েচড়ে বসে।
ও সুন্দর করে সেজেছে। ময়ূরকন্ঠী রঙের চমৎকার তাঁতের শাড়ি পরনে, সঙ্গে একই রঙের টিপ। হালকা লিপস্টিক ঠোঁটে, লম্বা চুলের গোছা পিঠের ওপর ছড়িয়ে আছে। হাতের কাছে বেলি ফুলের মালা থাকলে ও খোঁপা বাঁধত। গায়ে কালো রঙের শাল। ওকে দেখে শুভ চেঁচিয়ে বলে, তোকে দারুণ দেখাচ্ছে অর্পিতা। সৌম সায় দেয়। বলে, অর্পিতা আজ একদম অন্যরকম। ওকে দেখে আমার ভেনাসের কথা মনে হচ্ছে।
নন্দিতা উঠে ওর কাছে এসে দাঁড়ায়। বলে, ওকে আমার সরস্বতীর মতো মনে হচ্ছে। যেন সাদা ধবধবে রাজহাঁসের পিঠে-
থামো। জাকিয়া খাতুন সবাইকে থামিয়ে দেয়। বলে, ও আজ আমাদের একটা খবর দেবে। আমরা ওর কথা শুনব।

অর্পিতা ঠোঁটে মৃদু হাসি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। আশরাফুল আলম নরম কণ্ঠে বলে, তুই আমাদের কী বলবি মা?
দাঁড়াও খবরটা শোনার আগে আমি নোরা জোনসের সিডিটা ছেড়ে আসি। শুভ উঠে দাঁড়ায়।
যখন মৃদু লয়ে নোরা জোনসের কণ্ঠের সুর ভেসে বেড়ায় চারদিকে তখন অর্পিতা দু’পা সামনে এগিয়ে এসে বলে, আজ আমার ভীষণ আনন্দের দিন। আমার আনন্দ তোমাদের সঙ্গে ভাগ করে নিতে চাই।
সবাই উদগ্রীব হয়ে ওর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে পলকহীন।
অর্পিতা কণ্ঠে শব্দের জোয়ার এনে বলে, ডাক্তার বলেছে আমি মা হবো।
পলকহীন চোখগুলো পাথুরে চোখের মতো স্তব্ধ হয়ে থাকে। তারপর একে একে যে যার ঘরে চলে যায়। ঘরে অর্পিতা একা। শুভ ভল্যুম বাড়িয়ে দিয়েছে। অর্পিতার মনে হয় পুরো বাড়িজুড়ে সুরের অপূর্ব মূর্ছনা। একা হয়ে যাওয়ার অনুভব ওর ভেতরে নেই।



রাইজিংবিডি/ঢাকা/১০ জুলাই ২০১৫/তাপস রায়

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন